হু কিল্ড মুজিব - এ. এল. খতিব

ক্রান্তিকাল

                আগস্ট ১৯৭৫ ছিল বাংলাদেশের জন্য ক্রান্তিকাল। শেখ মুজিবুর রহমান প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল করছিলেন এবং এমন সব পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন যা সমাজে গুরুতর প্রভাব রাখছিল। দেশে তখন একটি মাত্র রাজনৈতিক দল ছিল- বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) বাকশালে সেনাবাহিনী, পুলিশসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব ছিল এবং বাকশাল দেশের প্রশাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে যাচ্ছিল। ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের তারিখ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত গভর্নরবৃন্দ নিজ নিজ জেলার দায়িত্ব গ্রহণ করলে আমলাদের গুরুত্ব কমে আসবে। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত করে দেশের জেলা পর্যায়ে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত করার পরিকল্পনা ছিল। এটি ছিল একটি বিপ্লবী পদক্ষেপ।

                ১৪ আগস্ট ১৯৭৫ এর সন্ধ্যাটি অন্যান্য দিনের চেয়ে আলাদা মনে হয়নি।

                পরদিন শেখ মুজিবুর রহমানকে সংবর্ধনা দেয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রস্তুতি চলছিল।

                ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে একটি কালো পতাকা মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরের বছর শেখ মুজিবকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নস্তরের কর্মচারিদের ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে। যখন তিনি মুক্ত হন তখন তিনি জানতে পারেন তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

                পরদিন সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি উপস্থিত হবেন চ্যান্সেলর হিসেবে।

                বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি গ্রেনেড ফোটার প্রেক্ষিতে শেখ মুজিবকে আগমনের সময় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২৫/২৬ মার্চে রাতে বাঙালিদের উপর পাক বাহিনীর আক্রমণের পর থেকেই গ্রেনেড হামলা আর বোমা বিস্ফোরণ ঢাকাবাসীর জন্য নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং কারণে কারোই ঘুমের ব্যাঘাত ঘটত না। তবুও অনেক ধরণের গুজব শোনা যাচ্ছিল

                রাত সাড়ে আটটার দিকে শেখ মুজিবকে গণভবন থেকে তার নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন।

                শেখ মুজিবের দশ বছর বয়সী পুত্র রাসেল খুবই উত্তেজিত ছিল। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের প্রিন্সিপাল পরদিন সকালে শেখ মুজিবকে স্বাগত জানানোর জন্য যে ছয়জন স্কুল ছাত্রকে বাছাই করেছেন তার মধ্যে রাসেল একজন।

                কাদের সিদ্দিকী, যাকে মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসিকতার জন্য বাঘা সিদ্দিকী নামে ডাকা হতো, তিনি ছিলেন বিভিন্ন জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত গভর্নরদের মধ্যে একজন। ১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় তিনি যখন তার অসুস্থ মাকে দেখতে পি জি হসপিটালে যান তখন কারওয়ান বাজার এলাকায় একটি ট্যাঙ্ক দেখতে পান। রেডিও স্টেশনের প্রায় বিপরীত দিকে হসপিটালের কাছে আরও একটি ট্যাঙ্ক ছিল। মাকে দেখার পর কাদের সিদ্দিকী গাড়ি চালিয়ে মতিঝিলে যান। সেখানেও একটি ট্যাঙ্ক দেখতে পান: এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে তিন তিনটি ট্যাঙ্ক। তিনি ফিরে যেতে শুরু করেন, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের কাছে আরও একটি ট্যাঙ্ক অবস্থান করছিল, যা হাসপাতাল থেকে বড় জোড় ২০০ মিটার দূরে। তখন রাত ১১ টা বেজে একটু বেশি। কাদের সিদ্দিকী গাড়ী নিয়ে শের--বাংলা নগরে গণভবনের কাছে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে যান। রক্ষীবাহিনীর উপ-পরিচালক আনোয়ারুল আলম শহীদ তাকে জানান বেঙ্গল ল্যান্সারকে তিনটি ট্যাঙ্ক বের করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে ঢাকার রাস্তায় চারটি ট্যাঙ্ক কেন দেখা যাচ্ছে। জবাবে শহীদ জানান, “আপনি হয়ত একটি ট্যাঙ্ক দুবার দেখেছেন।  হতে পারে। শহীদ একজন সাবেক ছাত্রনেতা এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তার কথায় সন্দেহ করার কোন অবকাশ ছিল না।

                প্রতি বৃহস্পতিবার রাতেই রুটিন করে ট্যাঙ্ক মহড়া অনুষ্ঠিত হতো এবং মাসে দুবার বেঙ্গল ল্যান্সার সেকেন্ড আর্টিলারি যৌথ মহড়া করত।

                কাদের সিদ্দিকীর বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়। তিনি তার বোনকে সকালে তাকে ঘুম থেকে ডাকতে নিষেধ করেন। বেশ কিছুদিন ধরেই গভর্নরদের ট্রেনিংয়ের জন্য তিনি খুব ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পরদিন এক মধ্যাহ্ন ভোজের মধ্য দিয়ে এই ট্রেনিং প্রোগ্রাম সমাপ্ত হবার কথা, যে অনুষ্ঠানে সব মন্ত্রীদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল।

                কাজেই পরদিন খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠার কোন প্রয়োজন ছিল না। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তাপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জামিল সেদিন একটি বিশ্রামহীন রাত কাটান। তার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন আর এর মধ্যেই পরদিন সকালে তাকে রাষ্ট্রপতিকে প্রহরা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যেতে হবে। এটি তার জন্য নতুন কোন দায়িত্ব ছিল না, তবুও তিনি বেশ অস্বস্তিতে ছিলেন। তাকে মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দা ইউনিটের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, কিন্তু কোন কারণে তখন পর্যন্ত তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়নি। জামিলের স্ত্রী তাকে ঘুমাতে বলেন। জবাবে জামিল বলেন  আমি ঘুমাতে পারছি না। 

                খন্দকার মোস্তাক আহমেদও সেদিন নিঘুম রাত কাটান। পুরোনো ঢাকার ৫৪ আগামসি লেনে তার বাসায় সেদিন অনেক দর্শনার্থী এসেছিলেন। আগত দর্শনার্থীদের একজন ছিলেন তার ভাতিজা মেজর রশিদ।

                সে রাতে তাহের উদ্দীন ঠাকুরও প্রচণ্ড উত্তেজিত ছিলেন। যে কোন ফোন কল আসা মাত্রই তিনি আঁতকে উঠছিলেন। নামায পরে তিনি নিজের স্নায়ু ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করছিলেন। রাতে গোসল করে তিনি প্রস্তুত হয়েছিলেন, যেন অসময়েই তার কোন একটি বৈঠকে যাওয়ার কথা রয়েছে। বাড়িতে আসা একজন অতিথি তার এহেন উত্তেজিত অবস্থা দেখে বেশ অবাক হন।

                ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিবকে স্বাগত জানানোর সর্বশেষ প্রস্তুতি চলছিল, সেখান থেকে শেখ মুজিবের পুত্র কামালের ফিরে আসতে মধ্যরাত পার হয়ে যায়।

                একই সময়ে ঢাকা সেনানিবাসেও একটি ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের সর্বশেষ প্রস্তুতি চলছিল।

                রাতের অন্ধকার থাকতেই কর্নেল ফারুক বেঙ্গল ল্যান্সারের জওয়ানদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন, এসব জওয়ানদের খুনিদের ছোট দল হিসেবে শিকারে যাবার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি নিজে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো পোষাকে ঢাকা বেঙ্গল ল্যান্সারের জওয়ানদের দেখতে লাগছিল মিলটনের প্যারাডাইস লস্ট এর শয়তানের দঙ্গলের মত।

                ফারুক জওয়ানদের মধ্যে আগুন আর বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি জওয়ানদের বলেন শেখ মুজিব বিদেশী শক্তির কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছেন এবং সেনা বাহিনী ল্যান্সার ভেঙ্গে দিতে চেষ্টা করছেন। তিনি জওয়ানদের ভীতিকে কাজে লাগান এবং তাদের ইসলামের দোহাই দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেন।

                তখন চুড়ান্ত-আঘাত হানার সময় এসে গিয়েছিল।

                তারা তিনটি সারিতে বিভক্ত হয়ে পথে নামে। তাদের ল্যৰন্থ দুই কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে ছিল। ভোর হওয়ার ঠিক আগে আগে রক্ষী বাহিনীর সদস্যরা তাড়াহুড়া করে শের-এবাংলা নগরে এমএনএ হোস্টেলের বাইরে অবস্থান নেয়। তাদের অধিকাংশের পরনে ছিল লুঙ্গি আর পা ছিল খালি। আশে পাশের এলাকায় বসবাসকারিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রক্ষী বাহিনীর সদস্যদের সরিয়ে দেয়া হয়। এয়ারপোর্টের রানওয়ে ধরে খুব দ্রুত একটি ট্যাঙ্ক এগিয়ে আসে, একটি দেয়াল ভেঙ্গে দেয় এবং ট্যাঙ্কের কামানটি কাপের দিকে তাক করা থাকে।

                সর্বমোট ত্রিশটি ট্যাঙ্ক সেদিন ঢাকার বিভিন্ন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন করা হয়েছিল। শেখ মুজিব, তার ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত এবং তার ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণির বাস ভবন সে রাতে একই সঙ্গে ঘিরে ফেলা হয়।

                সেনা সদস্যরা শেখ মুজিবের বাড়ির চারদিক থেকে গুলি ছুড়তে শুরু করে। নিচ তলায় জানালার কাচ ভেঙ্গে গুলি ঢুকছিল ঘরের মধ্যে, সব কটি শোবার ঘর ছিল নিচতলাতেই। একটি বুলেট মুজিবের ছোট ভাই শেখ নাসেরের হাতে আঘাত করে।

                বাড়ির সবাই শেখ মুজিবের ড্রেসিং রুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন, কারণ কটিই। তখন তুলনামূলক নিরাপদ ছিল। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকসেনাদের বাড়ি ঘেরাও করার ঘটনারই যেন পুনরাবৃত্তি ঘটছিল।

                মুজিব কয়েকজন কর্মকর্তাকে ফোন করেন।

                বেগম মুজিব তার একটি শাড়ি ছিড়ে তাই দিয়ে নাসেরের হাতে ব্যান্ডেজ করে দেন।

                কামাল নিচে নেমে আসেন এবং বাড়ির নিরাপত্তা রক্ষীদের প্রতিরোধ করার নির্দেশ দেন, কিন্তু তাদের আগেই নিরস্ত্র করা হয়েছিল। যখন কামাল নিরাপত্তা রক্ষীদের প্রতিরোধ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করছিলেন সে সময় মেজর হুদা বাড়িতে প্রবেশ করেন। নিরাপত্তা রক্ষীরা তাকে স্যালুট করে।

                মেজর হুদার সাথে থাকা লোকদের একজন কামালকে গুলি করে।

                ইতিমধ্যে ব্রিগেডিয়ার জামিল দ্রুত শেখ মুজিবের বাসভবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তাকে বহনকারি জিপটি যখন মুজিবের বাড়ি থেকে মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে ছিলো তখন সোবহানবাগ মসজিদের কাছে কয়েকজন জওয়ান চিৎকার করে তাদের থামতে বলে  হল্ট জামিল তার পরিচয় দেন। জওয়ানরা আগে থেকেই তাকে চিনতে পেরেছিল। জামিলকে থামানোর জন্যই তাদের সেখানে রাখা হয়েছিল। তারা হুমকির সুরে জামিলকে জানায় পথে যে যাবার চেষ্টা করবে তাকে গুলি করার নির্দেশ আছে আমাদের উপর। তাদের হুমকি উপেক্ষা। করে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করলে জওয়ানরা তাকে গুলি করে।

                ততক্ষণে সেনা সদস্যরা মুজিবের বাড়িতে তছনছ শুরু করে দিয়েছে। তারা আবিষ্কার করে একটি কক্ষ চারদিক থেকে বন্ধ- এটি ছিল শেখ রেহানার শোবার ঘর। সেনারা দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করে, ফলে একটি আলমারি ভর্তি জিনিস ঘরের মেঝেতে ঝনঝনিয়ে পড়ে।

                ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে যেমন করেছিলেন সেভাবেই মুজিব ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন আর বলেনওরা কি চায় আমাকে দেখতে দাও।  সে রাতে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। আজ সামনে তার নিজের দেশের সেনারা।

                মুজিব একটি চেক লুঙ্গি আর সাদা ফতুয়া পরে ছিলেন।

                সিঁড়িতে মুজিবের সঙ্গে হুদার দেখা হয়। তিনি বলেন  তাহলে তুমিই এসব করছ। কি চাও তুমি?  আমরা আপনাকে নিতে এসেছি , জবাব আসে। মুজিব বাজ খাই কণ্ঠে বলেন  তুমি কি আমার সাথে কৌতুক করছ? আমি কখনোই এদেশকে ধ্বংস হতে দিবনা।  হুদা ব্রিত হয়ে পড়েন। একজন গৃহকর্মী চিৎকার করে বলে ওঠেকামাল ভাই আর নেই।  সময় হাবিলদার মোসলেহ উদ্দীন টেরেস থেকে নেমে আসছিলেন, তিনি গালাগাল করেন এবং পেছন থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে মুজিবের ওপর গুলি চালান।

                জওয়ানরা যা পাচ্ছিল তাই কুড়িয়ে নিচ্ছিল। বেগম মুজিব মিনতি করেনতোমাদের যা ইচ্ছা নিয়ে যাও, শুধু আমাদের প্রাণে মেরো না।কিন্তু গুলির শব্দ শুনে তিনি বেরিয়ে আসেন। তিনি বলেনতোমরা তাকে হত্যা করেছ, আমাকেও হত্যা কর।  তাকে চিরতরে নিস্তব্ধ করে দেয়া হয়।

                শেখ জামাল, তার স্ত্রী রোজী এবং কামালের স্ত্রী সুলতানা তখনও ড্রেসিং রুমের ভেতরে ছিলেন। স্টেন গানের এক ঝাঁকগুলিতে তারা তিনজন নিহত হলেন।

                বন্দুকধারীরা বাথরুমে নাসেরকে খুঁজে পায় এবং গুলি করে হত্যা করে।

                রাসেল এক কোণায় ভয়ে কুঁকড়ে ছিল।  আমাকে আমার মার কাছে নিয়ে যাও  বলে সে কেঁদে ওঠে। নৃশংস খুনিদের একজন বলেআমরা তোমাকে তোমার মার কাছেই পাঠাবো একজন পুলিশ অফিসার অনুনয় করেন রাসেলের জন্য তো একটা বাচ্চা মাত্র সেই পুলিশ অফিসারও মারা যান। গুলিতে একটি হাত উড়ে যাওয়ার পরও রাসেল অনুনয় করছিলআমাকে মেরোনা, আমাকে মেরোনা।উত্তরে এসেছিল একটি বুলেট।

                রাসেলের মৃতদেহ পড়ে ছিল তার মার পাশেই।

                মুজিবের বাসভবনে পৌঁছাতে ফারুক রশিদের দেরি হয়ে গিয়েছিল। সবাই নিহত হয়েছেন এটা নিশ্চিত হবার জন্য ফারুক বাড়ির উপরে উঠেছিলেন। তিনি কাউকে ফোনে সংবাদ জানান।

                শেখ মণি সাহায্যের জন্য এখানে সেখানে ফোন করছিলেন। কিন্তু কোন সাহায্যই আসছিল না।

                মণি বসার ঘরে আসলেন সেনা সদস্যদের সাথে দেখা করতে, যারা ইতিমধ্যেই গায়ের জোড়ে তার বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল। মণির উপর গুলি চালানোর ঠিক আগের মুহূর্তে তার স্ত্রী ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে তার সামনে দাঁড়ান।সরে পড়ুন চিল্কার করে বলল একজন জওয়ান আর গুলি চালানো হল।

                স্বামী-স্ত্রীর মৃতদেহ রক্তের গঙ্গার মধ্যে পড়ে রইল।

                মণি সাথে সাথে মারা গেলেও, আরজুর দেহে তখনও প্রাণ ছিল। তিনি বললেনআমাকে পানি দাও তার তিন বছর বয়সী ছেলে শেখ ফজলে নূর তাপস তাকে জিজ্ঞেস করলমা তুমি আর বাবা মেঝেতে শুয়ে আছো কেন?  কোন উত্তর আসল না। বিস্ময়ে ভয়ে বিমূঢ় হয়ে ছোট ছেলেটি বলে উঠলতুমি কথা বলছ না কেন?” আরজুর মধ্যকার মাতৃসত্ত্বা জেগে উঠল। তিনি শেষবারের মত বললেনআমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাও। আমাকে বাঁচাও। আমার দু টি ছোট বাচ্চা আছে।

                তখন আরজুর গর্ভে ছিল তার তৃতীয় সন্তান।

                যখন সেরনিয়াবাত বুঝতে পারলেন সেনারা তার বাড়িটি ঘিরে ফেলেছে তিনি শেখ মুজিব কে ফোন করলেন। মুজিব জানালেন তিনি কিছুক্ষণ পর তাকে ফোন করবেন। তিনি তার জামাতা শেখ মণিকেও ফোন করলেন। ফোন বাজলেও শেষ মণির বাসা থেকে কেউ ফোন তুলছিলেন না।

                সেরনিয়াবাত নিচে বসার ঘরে নেমে এলেন। তার স্ত্রী, পুত্র-কন্যারা, ভাগ্নে শহীদ, বাড়িতে আগত অতিথিরা এবং কাজের লোকেরা সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়ে ছিলেন। সবাই ছিলেন শুধু তার পুত্র হাসানাত বাদে। হাসানাত ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, তিনি বাড়ির সামনের দরজায় ব্যারিকেড দিয়ে ছিলেন এবং সময় ক্ষেপণের চেষ্টায় বাড়ির দিকে যেই এগিয়ে আসবে তাকেই গুলি করার হুমকি দিচ্ছিলেন। তিনি পেছনের জানালা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সব জায়গাই সেনাসদস্যরা ছিল। তিনি ফাঁদে আটকা পড়েছিলেন। তিনি একটা ড্রেসিং রুমে আটকা পড়েছিলেন, তার হাতে একটি রিভলবার ছিল এবং মারা যাবার। আগে অন্তত একজন খুনিকে হত্যা করতে তিনি বদ্ধ পরিকর ছিলেন।

                মেজর শাহরিয়ার এবং হুদার (যারা তখন সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন না) নেতৃত্বে একটি দল সেরনিয়াবাতের বাড়িতে প্রবেশ করে। সেরনিয়াবাত বলেনআমাকে তোমাদের কমান্ডিং অফিসারের সাথে কথা বলতে দাও আমাদের কোন কমান্ডিং অফিসার নেই। কিন্তু আপনি কে?  প্রশ্ন করেন মেজর শাহরিয়ার। যখন শাহরিয়ার সেরনিয়াবাতের পরিচয় জানতে পারেন তখন তার মুখে বাঁকা হাসি খেলে যায়। পর মুহূর্তেই সেরনিয়াবাত বুলেটের আঘাত নিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। তার কন্যা হামিদা গগনবিদারি চিৎকার করে তার বাবাকে আড়াল করতে ঝাপিয়ে পড়েন। বুলেট তার দেহের নিমাংশে পায়ে আঘাত হানে। হাসানাতের শিশু পুত্র বাবু ভয়ে কেঁদে ওঠে। শহীদ তাকে কোলে তুলে নেয়। তারা দুজনেই গুলিবিদ্ধ হন। সে সময় ভয়ঙ্কর গোলাগুলি হয়। আরও যারা সেরনিয়াবাতের। বাসভবনে নিহত হন তারা হলেন তার ১৪ বছর বয়সী কন্যা বেবি, তার বছর বয়সী পুত্র আরিফ এবং তিন জন অতিথি।

                সেরনিয়াবাতের স্ত্রী আমিনা, কন্যা হামিদা পুত্র খোকন গুলিতে আহত হন।

                মেজর হুদার ভাই নুরুল ইসলাম মনজুর সারা বাড়ি খুঁজে দেখেন। তিনি জানতে চান  হাসানাত কোথায় ?

                খুনিরা সেরনিয়াবাতের ভাগ্নে শহীদকে তার পুত্র হাসানাত ভেবে ভুল করে। তখন হাসানাতকে খোঁজা শুরু হয়।

                রমনা থানার ওসি বেগম সেরনিয়াবাত, হামিদা খোকনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠান।

                গোলাগুলির শব্দে ধানমণ্ডি এলাকায় বসবাসকারি জনৈক ভারতীয় কূটনীতিক তার বাড়ির ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ান। তার চেয়ে কয়েক ফুট দূরে তার এক প্রতিবেশী যিনি একজন প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা এবং বর্তমানে একজন সফল ব্যবসায়ী, চিন্তিত ভঙ্গিতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।

                তখন একটি রকেট ছোড়া হল। এর মাধ্যমে সংকেত দেয়া হল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মিশন সফল হয়েছে।

                সাবেক মুক্তিযোদ্ধা এবং বর্তমানে ব্যবসায়ী এমনভাবে মাথা ঝাকালেন যেন কেউ তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। কূটনীতিকের দিকে ফিরে তাকিয়ে তিনি হেসে বললেনসব শেষ হয়েছে। আপনার রেডিওটি চালু করুন।

                তখন সকাল ছয়টা বেজে এক মিনিট। ঢাকা রেডিও থেকে ঘোষণা করা হচ্ছিল সেনাবাহিনী শেখ মুজিব সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছে। বার্তা ঘোষক নিজেকে মেজর ডালিম হিসেবে পরিচয় দেন এবং বলেনখন্দকার মোস্তাক আহমদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী। ক্ষমতা দখল করেছে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। শেখ মুজিবকে বন্দী করা হয়েছে এবং তার সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। 

                পরে আর একটি ঘোষণায় জানানো হয়পদচ্যুত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সকালে সেনাবাহিনী কর্তৃক তার বাসভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সময় নিহত হন। 

                প্রকৃত খবর ধীরে ধীরে প্রকাশ করা হচ্ছিল।

                ঘোষণাটির একটি সংশোধিত রূপে জানানো হয় শেখ মুজিবের বাসভবন থেকে প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়।

                মোহম্মদপুরে বস্তি এলাকায় একটি রকেট বিস্ফোরণে জন নিহত হয়। ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের শব্দে এলাকাবাসীর ঘুম ভাঙ্গে। আলি আকসাদ এটিকে আরও একটি অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা মনে করে শেখ মুজিবকে ফোন করেন। ফোন বাজলেও ওপাশ থেকে কেউ ধরছিল না। তখন আলি আকসাদ শেখ মণিকে ফোন করেন। সেখানেও একই অবস্থা। তিনি তখন মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদসহ আরও কয়েকজন মন্ত্রীকে ফোন করে খবর দেন। তারাও তাকে জানান শেখ মুজিবের বাড়িতে কেউ ফোন ধরছে না।

                আকসাদ রেডিও চালু করলেন। রেডিও তখন শেখ মুজিবের নিহত হওয়ার খবর প্রচার করছিল। প্রচণ্ড ভয় আকসাদকে গ্রাস করল। দেশটা কি আরেকটা ইন্দোনেশিয়া হয়ে যাবে?

                 তুমি কি খবর শুনেছ?” একজন শুভাকাক্ষী প্রশ্ন করেন আকসাদকে। জবাব আসেহ্যা। শুভাকাক্ষী আকসাদকে বলেনএক্ষুণি পালিয়ে যাও  এবং ফোন কেটে দেন।

                আকসাদকে এর চেয়ে বেশি কিছু বলার দরকার ছিল না। তিনি খুব দ্রুত তার স্ত্রী দুই সন্তান নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। বাচ্চারা প্রশ্ন করলে তিনি তাদের বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছেন বলে সান্তনা দেন।

                তিনি দ্বিতীয়বারের মত ভয়াবহ আতঙ্কে দেশত্যাগ করছিলেন।

                ওঠো!” কাদেরের বোন চিৎকার করে তাকে ডাকলেন।তোমার ফোন এসেছে।  তার আরেক বোন তাকে ফোন করেছেন। তিনি বললেন  দেশে অভ্যুত্থান হয়েছে।কাদের কিছু না বুঝেই প্রশ্ন করলেনঅভ্যুত্থান?” তার বোন তাঁকে বললেনযত দ্রুত পার পালিয়ে যাও। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। ওরা তোমাকেও খুঁজতে আসবে।  বেতারে প্রচারিত ঘোষণাটা ফোনে পরিষ্কার শোনা গেল।

                একটি হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে কাদের সিদ্দিকী বাড়ি ছাড়লেন। তার ড্রাইভার তাঁকে নিয়ে বের হতে রাজি হলো না। কাদের ভাবলেন দীর্ঘ তিন বছর ধরে বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসা ড্রাইভারও এই বিপদের সময় তার কথা শুনছিল না। তিনি ড্রাইভারকে বললেনআমাকে গাড়ির চাবি দাও।  ড্রাইভার কোন উত্তর দিল না, কিছুক্ষণ পর সে এক প্রতিবেশীর গাড়ি নিয়ে এল এবং প্রায় হুকুমের সুরে বললগাড়িতে উঠুন। 

                রেডক্রসের প্রধান গাজী গোলাম মোস্তফা বাড়ির দেয়াল টপকে একটি গোয়াল ঘরে লুকিয়ে থাকলেন। তিনি একদম ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তার প্রতিবেশীরা দয়া করে তাকে ধরিয়ে দেননি, কিন্তু তাঁকে বাড়িতে আশ্রয় দেয়াটাও তাদের জন্য বিপদজনক ছিল।

                মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বস্টারের সহকারীরা মুজিব হত্যার সংবাদ তাকে জানানোর জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন; কিন্তু রাষ্ট্রদূত তার বাসভবনে বা সাধারণত যেসব জায়গায় তাকে পাওয়া যায় তার কোন জায়গায়ই ছিলেন না।

                ভোর ছয়টার সময় তিনি কোথায় ছিলেন? মিশন সফল হওয়ার খবর রশিদ তার চাচা মোস্তাককে সাথে সাথেই জানিয়ে দেন। তবুও যখন রশিদ কিছু সৈন্য নিয়ে মোস্তাক কে রেডিও স্টেশনে নিতে যান, তখন মোস্তাক বার বার জিজ্ঞেস করছিলেনতুমি কি নিশ্চিত বঙ্গবন্ধু মৃত? 

                পদ্মার এক মাঝি তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেনকোন বাপের বেটাই বঙ্গবন্ধুরে খুন করতে পারবো না। 

                মোস্তাকের মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা তার স্ত্রীকে বলেছিলেনতুমি কি মোস্তাকের চোখগুলো লক্ষ করেছ? তার চোখগুলো ঠিক সাপের মত। এমন মানুষ নিজের স্বার্থের জন্য খুন করতে পারে। ওর আশে পাশে আমি সব সময়ই অস্বস্তি বোধ করি।

                কর্মকর্তার স্ত্রী তার ভীতির কথা শুনে হেসেছিলেন। কিন্তু সেই মোস্তাক এখন দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। এখন এদেশের কি হবে?

                সাপেরা দাঁতে শান দিচ্ছিল।

                ১৩ আগস্ট থেকে মাহবুবুল আলম চাষী কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ হন। কুমিল্লা একাডেমীতে তার সহকর্মীরা কাউকে কিছু না জানিয়ে তার চলে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তিনি হঠাৎ উদয় হন ১৫ আগস্ট সকালে ঢাকা রেডিও স্টেশনে, তার সাথে ছিলেন মোস্তাক এবং তাহেরউদ্দীন ঠাকুর।

                এই দুষ্ট ত্রয়ী ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার পথ বন্ধ করতে চেয়েছিলেন, অবশেষে তারা সফলতার মুখ দেখেছেন।

                দিল্লিতে লাল কেল্লায় স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজে ভাষণ দিতে যাওয়ার আগে আগে ইন্দিরা গান্ধী মুজিব হত্যার খবর জানতে পারেন। খবর পেয়ে তিনি হতবাক হয়ে যান।

                তিনি আগেই মুজিবকে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে তার জীবন হুমকির মুখে রয়েছে; কিন্তু মুজিব এই আশঙ্কা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেনওরা আমার সন্তানের মত। 

                ঢাকা রেডিও থেকে এই বাণীটি নিয়মিত প্রচারিত হতে থাকলদুর্নীতি, অবিচার এবং স্বৈরতন্ত্রের অবসানের পর এখন দেশের মানুষের সামনে দেশসেবা করার প্রকৃত সুযোগ তৈরি হয়েছে। আসুন আমরা এই সুবর্ণ সুযোগের সদ্ব্যবহার করি। 

                ধুর  বলে নিজের রেডিওটিতে বিরক্তিতে ঘুষি বসিয়ে দিলেন আশরাফ, একজন প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা।সুযোগ! সুযোগ! মোস্তাকের চক্রান্ত অবশেষে বাস্তবায়িত হয়েছে। সব বিশ্বাসঘাতকেরা এখন আবার বেরিয়ে আসবে। আমাদের আবার। ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। 

                আশরাফের স্ত্রী কাঁদছিলেন।

                অনেক নারীই প্রকাশ্যে মুজিবের জন্য কেঁদেছিলেন।

                একজন সাংবাদিক খুব আনন্দের সাথে তার প্রতিবেশীকে জানালেনমুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।  বলেই তার মনে হল হয়তো তিনি একটু বেশি আগেই আনন্দ উদযাপন করে ফেলছেন। তিনি ভাবলেনযদি মুজিব সত্যিই নিহত না হয়ে থাকেন?  মনে সন্দেহ নিয়ে সাংবাদিক তার রেডিওটি চালু করলেন খবরটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য। রেডিওর খবর শুনে তার ভয় কেটে গেল, এই মুহূর্তে ভয়ের কিছু নেই।

                এই সাংবাদিকটি ছিলেন মুসলিম লীগ সমর্থক। কিন্তু শেখ মুজিবের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে অনেকেই তার জন্য সেদিন শোক করেছিলেন।

               ঢাকা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে সাভারে রক্ষীবাহিনীর সদর দপ্তরে কেউ কেউ প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বললেও অনেকেই মেজরদের সাথে সংঘাতে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন। তারা বলছিলেনআমাদের তো কোন ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী কামান নেই। 

                রক্ষীবাহিনীর মহাপরিচালক নুরুজ্জামান মুহূর্তে লন্ডনে ছিলেন, সিদ্ধান্ত নেয়ার মত কেউ সাভারে ছিলেন না। রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা শেখ মুজিবের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহযোগী তোফায়েল আহমেদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তোফায়েল শোকে এতটাই কাতর ছিলেন যে লড়াইয়ের আদেশ দেয়ার অবস্থা তাঁর ছিল না।

                ঢাকায় অবস্থানকারী একজন ভারতীয় সাংবাদিকের স্ত্রী তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললেনতাড়াতাড়ি ওঠো। কিছু একটা ঘটেছে। কারফিউ দেয়া হয়েছে। রেডিওতে খবর শোন।  তার স্ত্রী তাকে মুজিব হত্যার খবরটি সরাসরি দেননি।

                ঢাকা রেডিও থেকে বার বার জানানো হচ্ছিল শেখ মুজিব নিহত হয়েছেন এবং খন্দকার মোস্তাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।

                সাংবাদিক তার রিপোর্ট লিখলেন এবং সচকিত ভাব নিয়ে কেন্দ্রীয় টেলিগ্রাফ অফিসের দিকে এগিয়ে গেলেন।

                স্টেডিয়ামের কাছে একটি ট্যাঙ্ক অবস্থান করছিল। এখানে ওখানে লোকজনের ছোট ছোট জটলা দেখা যাচ্ছিল। টেলিগ্রাফ অফিসের একজন কর্মকর্তা বললেনআপনি আপনার টেলিগ্রাম এখানে রেখে যেতে পারেন, কিন্তু এটি পাঠানো হবে না। আমাদের কোন টেলিগ্রাম না পাঠানোর নির্দেশ দেয়া আছে।  টেলিগ্রাম অফিসে ইতিমধ্যেই একজন সামরিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

                একজন রেডিও কর্মকর্তা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিলেন। টেলিফোনের শব্দে তার ঘুম ভাঙলেও অলসতার কারণে তিনি ফোনটি ধরছিলেন না। তার স্ত্রী তাকে জানালেন  তোমাকে জরুরী ভিত্তিতে রেডিও স্টেশনে হাজির হতে বলা হয়েছে।  তিনি ফোন ধরলে ওপাশ থেকে হুকুম আসলএখনই আসুন।কি ঘটছে তা তিনি। বোঝার চেষ্টা করছিলেন। রেডিওতে দিনের প্রথম সম্প্রচারের সময় তখনও হয়নি। তবুও অভ্যাসবশত তিনি রেডিওটি চালু করলেন খবর শোনার জন্য। খোদা! ভয়ঙ্কর; ভয়ঙ্কর।

                রেডিও স্টেশনে পৌঁছে তিনি আবিষ্কার করলেন মেজর শাহরিয়ার স্টেশনের দায়িত্বে আছেন। তার সামনে টেবিলে একটি স্টেনগান রাখা ছিল। একজন অফিসার অনুগত সুরে বললেন  সবাই কাজ করছে।  শাহরিয়ার টেবিলে রাখা অস্ত্রটির দিকে ইঙ্গিত করে বললেনযতক্ষণ এটি এখানে থাকবে ততক্ষণ সবাই কাজ করবে। 

                একই রকম ঔদ্ধত্য পাকিস্তানি সেনারা দেখিয়েছিল ১৯৫৮ সালের অক্টোবর যখন পাকিস্তানে সেনা শাসন কায়েম করা হয়েছিল।

                একজন কর্নেল যখন কাজে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন তখন তার সহকর্মী তাকে ফোন করলেন। সহকর্মীটি তাকে বললেনতুমি কি রেডিওতে খবর শুনেছ?  যখন তিনি জানালেন যে খবর শোনা হয়নি, তখন ওপাশ থেকে তাকে বলা হলতাহলে এখনই শোন। 

                একটি মার্কিন সংবাদ সংস্থার রিপোর্টার অভ্যূত্থান হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মুজিব হত্যার খবর রিপোর্ট করেন। রিপোর্টে বলা হয় বাংলাদেশ একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। সম্পূর্ণ উল্টো পথে যাত্রা।

                নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে রেডিও পাকিস্তানেও প্রচার করা হয় যে বাংলাদেশ এখন একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র।

                তাৎক্ষণিকভাবে সংবাদটি নিশ্চিত বা অস্বীকার করা হয়নি। যখন চক্রান্তের মাধ্যমে মোস্তাক আহমেদ ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন সে মুহূর্তে এই খবরটি গুরুত্বহীন। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ বেতারের নাম বদলে হয়েছে রেডিও বাংলাদেশ।

                পশ্চিম ইউরোপে কোন একটি দেশে বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রদূত এই অভ্যূত্থানে ভুট্টোর কি ভূমিকা থাকতে পারে তা ভেবে দেখছিলেন। এই রাষ্ট্রদূত যখন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরে কাজ করতেন তখন ভুট্টো পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন। সে সময় একবার ইরানের রাজধানীতে ভুট্টোর কোন একজন পরিচিতের কাছ থেকে একটি প্যাকেট সংগ্রহ করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তাকে। সংগ্রহ করার পর প্যাকেটটি তরুণ কূটনীতিকের কক্ষ থেকে হারিয়ে যাবার আগ পর্যন্ত এই পুরো কাজটিকে একটি স্বাভাবিক কাজ মনে হয়েছিল।

                ১১ থেকে ১৪ আগস্ট সময়ে মুজিবের দুই কন্যা হাসিনা রেহানা ব্রাসেলসে ছিলেন। রেহানা ছুটি দীর্ঘায়িত না করে বাড়ি ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। ১২ আগস্টে তিনি হাসিনাকে বলেনআমি ভয়ঙ্কর সব স্বপ্ন দেখছি। আমি দেখেছি দেশের মানুষ আবার ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আমার খুব ভয় করছে। আমি বাড়ি। ফিরে যেতে চাই।

                যা হোক, ১৪ আগস্ট বিকেলে হাসিনা রেহানা দুজনেই খুব উৎফুল্ল ছিলেন।

                একটি অনুষ্ঠান থেকে তারা দুজনে অনেক রাত করে বাড়ি ফিরেছিলেন। পরদিন সকালে তাদের ফ্রান্সে যাওয়ার কথা থাকলেও তারা রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের কন্যাদের সাথে গল্প করছিলেন। হাসিনার মনে হঠাৎ কুসংস্কার কাজ করতে শুরু করল, তিনি বললেনআমরা অনেক বেশি হাসছি। ভাবছি সামনে আমাদের অনেক কাদতে হবে কি না। 

                পরদিন সকালে বন থেকে হাসিনার স্বামী . ওয়াজেদের জন্য একটি ফোন আসে। তিনি তার স্ত্রীকে ফোনটি ধরতে বলেন, কিন্তু ওপাশ থেকে . ওয়াজেদকেই চাওয়া হয়। ওয়াজেদ বুঝলেন নিশ্চয়ই খারাপ কিছু ঘটেছে। ফোনে . ওয়াজেদকে বলা হলএখনই বন চলে আসুন। 

                যখন হাসিনাকে জানানো হল দেশে একটি অভ্যুত্থান হয়েছে, তার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল  কেউ বেঁচে নেই! 

                সেনা সদরে উধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা অভ্যূত্থানকারী মেজরদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া যায় তা ভাবছিলেন। এই মেজররা শুধু একটি অভ্যূত্থানই করেননি, তারা আগে পিছে না ভেবে ঘোষণা করেছেন দেশের ক্ষমতা এখন সেনাবাহিনীর হাতে। উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অত্যুথানের রাজনৈতিক ফলাফল উপেক্ষা করলেও সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা নিয়ে ভাবিত না হয়ে পারছিলেন না। মেজরদের মধ্যে কেউ কেউ বাহিনী থেকে অব্যহতি পেলেও অনেকেই তখনও বাহিনীতে ছিলেন। এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়া হলে সেনাবাহিনীর  চেইন অফ কমান্ডবলতে কিছু থাকবে না। তখন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবস্থান কি হবে?

                উর্ধ্বতন সামরিক কর্তাদের কেউ কেউ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও, অনেকে দ্বিমত পোষণ করেন এবং পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন। যতক্ষণ তাদের নিজ নিজ চাকুরী বহাল আছে ততক্ষণ অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নেয়ার দরকার কী?

                মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ ছিলেন সেনাবাহিনীর প্রধান, কিন্তু তিনি ছিলেন একজন উদ্যোগহীন ব্যক্তি এবং তার কর্তৃত্ব সব সময়ই তার সহকারী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল।

                যখন উর্ধতন কর্মকর্তারা অভ্যুত্থানকারী মেজরদের বিষয়ে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে তা নিয়ে তর্ক করছিলেন তখন মেজর ডালিম একটি জিপ চালিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের দ্রুত মনস্থির করতে বলেন। ষড়যন্ত্রকারীরা সে সময় সবকিছুর নিয়ন্ত্রণে ছিল।

                ততক্ষণে সকাল দশটা বেজে গেছে। চার ঘন্টা সময় নষ্ট হয়ে গেছে। উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কোন ব্যবস্থা নেয়ার ইচ্ছা থাকলে তারা এর মধ্যেই কোন পদক্ষেপ নিতেন।

                সকল বাহিনীর প্রধানরাই নতুন সরকারের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেন।

                দ্বিতীয় আর্টিলারি রেজিমেন্টের একজন অফিসার কর্নেল আবু তাহেরকে সকালে ফোন করে জানান যে মেজর রশিদ তাকে বাংলাদেশ বেতারে থাকতে বলেছেন। অফিসারটি তাহেরকে শেখ মুজিবের নিহত হওয়ার খবরও জানান।

                শেখ মুজিবের নিহত হবার এবং মোস্তাকের ক্ষমতা গ্রহণের খবরে কর্নেল তাহের হতবাক হয়ে যান। তিনি বলেনআমি ভাবছিলাম এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হবে এবং এমনকি আমরা আমাদের স্বাধীনতাও হারাতে পারি। 

                তাহের আরও জানানবেলা সাড় এগারোটায় প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা নিয়ে আমি বাংলাদেশ বেতার ছেড়ে আসি। আমি অনুভব করছিলাম জাতির জনকের হত্যার পেছনে বিদেশী শক্তির হাত থাকতে পারে।  মুহূর্তে তিনি যা অনুভব করছিলেন দিন দুয়েক পর তা একটি অভিযোগ আকারে সামনে আসে।

                মোস্তাক এবং তাহের উদ্দীন ঠাকুর বাংলাদেশ বেতার থেকে বেরিয়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদে আসেন। তাদের গাড়ির সামনে একটি ট্যাঙ্ক এবং পেছনে দুটি সাঁজোয়া যান ছিল। মোস্তাকের চোখ দুটি বন্ধ ছিল যেন তিনি গভীরভাবে কিছু ভাবছিলেন। তাহের উদ্দীন চিন্তিতভাবে পাশের মসজিদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

                মোস্তাকের গাড়িটি যখন প্রেসক্লাব এলাকা দিয়ে যাচ্ছিল অনেক সাংবাদিক তার দিকে এগিয়ে যান। একজন কবি চিত্কার করে প্রশ্ন করেন আপনার কি কোন লজ্জা নেই? গতকালও আপনি শেখ মুজিবের নামে জয়ধ্বনি দিয়েছেন।

                কেউ তার প্রশ্নের জবাব দেননি।

                মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের পক্ষে কাজ করেছেন এমন একজন সাংবাদিক মোস্তাককে তার সাফল্যে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেনআমি রেডিওতে ঘোষণার জন্য আতঙ্ক নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। ভাগ্যিস অভ্যূত্থান সফল হয়েছে। অন্যথায় আমি বিপদে পড়ে যেতাম। 

                এমনি আরও কেউ কেউ ছিলেন যারা আনন্দিত হয়েছিলেন। কিন্তু হাজার হাজার মানুষ সে সময় শোকে ভেঙ্গে পড়েছিলেন।

               ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মোস্তাক মোহাম্মদুল্লাহকে উপরাষ্ট্রপতি করেন। শেখ মুজিবের সর্বশেষ মন্ত্রী সভায় দুজন সাবেক রাষ্ট্রপতি ছিলেন আবু সাইয়িদ চৌধুরী এবং মোহাম্মদুল্লাহ। মোস্তাকের সরকারে দু জনেরই স্থান হয়েছিল। আবু সাইয়িদ চৌধুরীকে কামাল হোসেনের পরিবর্তে নতুন পররাষ্ট্র মন্ত্রী করা হয়।

                ১৯৭১ সালে তাজউদ্দীন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী, .এইচ.এম. কামরুজ্জামান এবং মোস্তাক এই কজন মিলে প্রবাসী সরকার গঠন করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সহকর্মীদের না জানিয়ে পাকিস্তান সরকারের সাথে সমঝোতা করার চেষ্টা করায় মোস্তাক একা হয়ে পড়েছিলেন। এখন আবার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মোস্তাক সামনে চলে এসেছেন।

                ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে তাজউদ্দীন আহমেদ মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন। দলে বা সরকারে তার কোন পদ ছিল না। যুদ্ধকালীন সময়ের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি খুব উদ্যোমী ছিলেন। কিন্তু এখন তিনি একজন ভেঙ্গে পড়া মানুষ।

                যখন সৈনিকেরা তাজউদ্দীনের বাড়িতে গিয়েছিল তিনি তাদের বলেনতোমরা আমার নেতাকে খুন করেছ, আমাকেও খুন করে ফেল।  তার আশঙ্কা তখন সত্যি হয়েছে, তার চরম শত্রু এখন ক্ষমতায়। পরিস্থিতি অন্য রকম হলে তিনি হয়ত লড়াই করতেন, কিন্তু তখন তার কিছুই করার ছিল না।

                সংবিধান অনুসারে শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর সৈয়দ নজরুল ইসলামের দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার কথা। কিন্তু সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়ার মত ব্যক্তিত্ব তার ছিল না। একজন শুভাকাক্ষী তাকে উদ্যোগ নিতে বললেও, তিনি এতোটাই আতঙ্কগ্রস্থ ছিলেন যে সামনে কি হবে তাই তিনি ভাবতে পারছিলেন না।

                . এইচ, এম, কামরুজ্জামান একজন চমৎকার কিন্তু নির্বিরোধ প্রকৃতির লোক ছিলেন। তাকে প্রতিরোধ যুদ্ধের নেতা হিসেবে কল্পনা করাও কঠিন ছিল।

                মুজিব সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এম. মনসুর আলী জনতেন তার নির্দেশ কেউ মানবেনা, তারপরও আত্মসমর্পণ না করে তিনি পালিয়ে যান। কিন্তু দুদিন পর তার বাসভবনের কাছেই কলাবাগান এলাকা থেকে সেনা সদস্যরা তাকে। গ্রেপ্তার করে।

                বেলগ্রেড থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় বাংলাদেশে অভ্যূত্থানের কথা জানতে পারেন . কামাল হোসেন। তার স্ত্রী হামিদা এর কিছুদিন আগেই দেশে ফিরেছেন, কি মুহূর্তে দেশে ফেরত আসা তার জন্য বিপদজনক ছিল। তিনি বন থেকে যান।

                কোন অবস্থাতেই তিনি মোস্তাক সরকারে যোগ দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। বন্ধুদের . কামাল বলেনআমরা সম্মানের সাথে বাঁচবো অথবা মরবো শেখ মুজিবের মন্ত্রণালয়ের কিছু সংখ্যক মন্ত্রী ইতিমধ্যেই মোস্তাক সরকারের সাথে সমঝোতা করেছিলেন এবং কেউ কেউ সমঝোতা করার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। কিন্তু অবশিষ্টদের বিকেলে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য সেনা সদস্য দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

                ফণীভূষণ মজুমদার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পিজি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ছিলেন। যখন সেনা সদস্যরা তাকে বঙ্গভবনে নিয়ে যেতে আসে তখন আরেকজন রোগী কবি জসিমউদ্দীন তাকে শক্ত করে ধরে রাখেন আর সেনা সদস্যদের কাছে আবেদন করেনউনি একজন ভাল মানুষ তাকে নিয়ে যেও না।

                বিকেলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি , , মোহাম্মদ হোসাইন বঙ্গভবনে দশজন মন্ত্রী ছয়জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে ষোলোজনের মন্ত্রিসভাকে শপথ পাঠ করান।

                দশজন মন্ত্রীর মধ্যে দুজন ছিলেন ফণীভূষণ মজুমদার এবং মনোরঞ্জন ধর, দুজনকে মোস্তাকের প্রয়োজন ছিল। মোস্তাক প্রাণপণে চাইছিলেন এটা প্রমাণ করতে যে মুজিবের জায়গায় তার রাষ্ট্রপতি হওয়া ছাড়া তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি।

                শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তাহের উদ্দীন ঠাকুর এতোটাই লজ্জা পাচ্ছিলেন যে নারীদের অনেকে তাকেদুলা মিয়া  বলছিলেন। তিনি এখন মোস্তাকের প্রধান সহযোগী।

                তিনি একজন প্রতিমন্ত্রী হলেও বিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না যে নতুন সরকারে তিনি একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

                বাংলাদেশে রক্তপাতের ঘটনায় ভারতের প্রতিক্রিয়া কি হবে তা নিয়ে সংশয়ে থাকা নতুন সরকার ভারতের সাথে যোগাযোগ রাখছিল। তাহের উদ্দীন ঠাকুর তার প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে জোড়ের সাথে বলেন যে তারা ভারতের সাথে যোগাযোগ রাখছেন, যদিও পাকিস্তান বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নাম ভুলে যান, এক পর্যায়ে তিনি জিজ্ঞেস করেনমার্কিন রাষ্ট্রদূতের নামটা যেন কি?” তখন একজন সাংবাদিক তাকে মনে করিয়ে দিলে তিনি নামটি ঠিক মত বলেন।

                কর্নেল জামিলের মৃতদেহ সৎকারের জন্য যেন ছেড়ে দেয়া হয় তা বলার জন্য ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ কর্নেল ফারুককে ফোন করেন। কর্নেল জামিলকে ঢাকায় কবর দেয়া হবে এই শর্তে ফারুক মৃতদেহ হস্তান্তরে রাজি হন।

                ঢাকাস্থ বনানী কবরস্থানে মুজিবের স্ত্রী, তিন পুত্র এবং দুই পুত্রবধুকে তাদের রক্তাক্ত জামা-কাপড় পরিহিত অবস্থাতেই কবর দেয়া হয়। তাদের সৎকারের সময় কোন ধর্মীয় রীতি রেওয়াজ পালন করা হয়নি এবং কবরের গায়ে কোন নাম ফলকও ছিল না।

                রেডিও স্টেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে মোস্তাকের ভাষণের লিখিত কপি বিতরণ করা হয়। তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ নিজের অবস্থান সম্পর্কে অনিশ্চিত ছিলেন, তিনি মোস্তাকের ভাষণের কপিটি পড়ে তার প্রশংসা করেন। জবাবে মোস্তাক বলেনআপনার কি মনে হয় এই ভাষণটি একদিনে লিখা হয়েছে , প্রথমবারের মত মোস্তাক তার উচ্ছ্বাস লুকাতে ব্যর্থ হন।

                তার প্রথম ভাষণে মোস্তাক খুনীদের  সূর্য সন্তান এবংডয়হীন হৃদয়ের অধিকারী  বীর বলে সম্বোধন করেন। কিন্তু বিজয়ের মুহূর্তে মোস্তাক ভয় পাচ্ছিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছিলেন যে  দায়িত্ব তিনি বাধ্য হয়ে কাঁধে তুলে নিয়েছেন  এবং  জাতির বৃহত্তর স্বার্থ এবং উদ্ভুত পরিস্থিতির ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা ভেবেই তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি ভাষণে আরও বলেন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বন্ধু রাষ্ট্রের অনেককে প্রাণ দিতে হয়েছে তিনি ভারতের নাম উল্লেখ করেননি। তিনি ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার কথাও বলেন। তবুও তিনি ভাষণের শেষ করেন  বাংলাদেশ জিন্দাবাদ  দিয়ে; প্রতিরোধের স্লোগান, বিজয়ের স্লোগান  জয় বাংলা  কে তিনি বা তার সঙ্গী ষড়যন্ত্রকারীরা নিজেদের স্লোগান মনে করতে পারেননি।

                বাংলাদেশে রক্তপাতের ঘটনায় ভুট্টোর প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়াটি ছিল সঠিক সময়োচিত, যদিও এটি ছিল সম্পূর্ণ অনুভূতিশূন্য। তিনি বলেনশেখ মুজিব তার পরিবারের করুণ পরিণতিতে আমি শোকাহত।  যদিও ১৫ আগস্টে ভুট্টো শুধু পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে বিশেষ করে ইসলামিক রাগুলোকেও আহবান জানান যেন তারা বাংলাদেশের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দেন। তিনি বলেন, “এই আহবান জানানোর মূলে রয়েছে আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কারণে আমাদের দেশটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়ার ঘটনার ব্যথা ভরা অভিজ্ঞতা

                ঢাকায় এই হত্যাযজ্ঞের দিনে বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি উপহারের ঘোষণাও দেন। তিনি বলেনবাংলাদেশের ভ্রাতৃসুলভ জনতার জন্য বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে পাকিস্তান সরকার ৫০,০০০ মেট্রিক টন চাল, ১০ মিলিয়ন গজ থান কাপড় এবং মিলিয়ন গজ সুতি কাপড় পাঠাবে।  তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেন যে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের ক্ষমতা অনুসারে আরও বড় আকারের সাহায্য দেয়া হবে।

                মুজিবকে হত্যা করার কারণেই কি উপহার?

                ১৬ আগস্ট, হত্যাযজ্ঞের পরদিন একজন মেজর এবং একজন লেফটেন্যান্ট কিছু সৈন্যসহ টুঙ্গিপাড়ায় হেলিকপ্টারে অবতরণ করেন। তারা গ্রামের পেশ ইমামকে ডেকে পাঠান এবং তাকে প্রশ্ন করেন গ্রামের মানুষ শেখ মুজিবের কবর দিতে চায় কি না। উত্তর আসে যে মুজিবের লাশ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হলে তারা তার সৎকার করতে রাজি আছে।

                গ্রামের মানুষকে বলা হয় তাদের দশ থেকে বারোটি কবর খুঁড়তে হতে পারে, তবে তখনকার মত একটি কবর প্রস্তুত করাই দরকার।

                দুপুর আড়াইটায় সৈনিকেরা শেখ মুজিবুর রহমানের লাশ নিয়ে আসে। ইতিমধ্যেই গোপালগঞ্জের উপ-বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের একটি শক্তিশালী দল নিয়ে সেখানে হাজির হন। একজন মেজর লাশটি কবরে নামিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কাজটি ইসলাম বিরোধী হত।আমাদের অবশ্যই মৃতদেহ দেখতে দিতে হবে।  গ্রামের মানুষ জোড়ের সঙ্গে দাবি জানায়। মেজর তাদের কাছে জানতে চানআপনারা কি লাশ না দেখে কবর দিতে পারেন না?  তখন গ্রামের পেশ ইমাম মৌলভী শেখ আব্দুল হালিম বলেনআমরা সেটা করতে পারি যদি আপনারা তাকে শহীদের মর্যাদা দেন মেজরের কাছে কথার কোন জবাব ছিল না। আপনারা কি তাকে ইসলামী রীতি অনুসারে দাফন কাফন করাতে চান না?  আবার প্রশ্ন করেন মৌলভী।

                এবারও কোন জবাব আসল না।

                মুহূর্তটি ছিল খুব উত্তেজনাকর। সেনা কর্মকর্তারা একটা দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলেন। তাদের উপর পরিষ্কার নির্দেশ ছিল গ্রামবাসী যেন কোন অবস্থাতেই শেখ মুজিবের মৃতদেহ দেখতে না পায়। কিন্তু একজন মুসলমানকে তার ধর্মীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করলে অন্য মুসলিমরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে পারে। শেষ পর্যন্ত মেজর দাফন এবং কাফন সম্পন্ন করতে রাজি হন, কিন্তু এগুলো করতে হবে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে।

                কফিনটি খোলা হল।

                মুজিবের দেহ ছিল বুলেটে ক্ষত বিক্ষত এবং বরফ ভরা কফিনটি ছিল রক্তস্নাত।

                বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গ্রামবাসী কফিনটি ঘিরে দাঁড়িয়েছিল।

                এই নিস্তদ্ধতা ছিল ভয়ঙ্কর। প্রতি মুহূর্তেই আশে পাশের গ্রামগুলো থেকে শত শত মানুষ ভিড় করছিল। তাদেরকে বাঁধা দিয়ে দূরে রাখা হচ্ছিল, কিন্তু যে কোন সময় তারা বাঁধা ভেঙ্গে চলে আসতে পারে। লেফটেনেন্ট চিকার করে উঠলেনজলদি করুন। কি হলো? আমাদের ফিরে যেতে হবে।” “আপনাদের পাঁচ মিনিট সময় দেয়া হলহুক্কার করলেন মেজর।

                মুজিবের দেহটি তার গ্রামের বাড়ির বারান্দায় নিয়ে যাওয়া হল। তারা শরীরে মোট ২৯ টি বুলেটের ক্ষত ছিল। একটি ক্ষত, যা সম্ভবত অটোমেটিক রিভলবারের গুলিতে হয়েছে, ছিল তার পিঠে।

                তার কুর্তার এক পকেটে ছিল তার পাইপ আর ভাঙ্গা চশমা।

                মুজিবের গ্রামের বাড়িতে কেউ ছিল না এবং আশে পাশের দোকানপাট সব বন্ধ ছিল। কেউ একজন একটি সাবান নিয়ে এল। শেষ গোসল করানোর জন্য পানি গরম করার সময় ছিল না। এমন কি সমস্ত রক্তের দাগ পরিষ্কার হওয়ার আগেই মেজর চেঁচিয়ে উঠলেন  জলদি করুন। আপনাদের আর কত সময় লাগবে। 

                সুজিবের মা সায়রা খাতুনের নামে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল থেকে চারটি শাড়ি নিয়ে আসা হল। কিন্তু মেজর কাফনের কাপড় সেলাই করার সময়টুকুও তাদের দিতে রাজি ছিলেন না।

                যখন জানতে চাওয়া হল মৃতের জানাজার নামায হবে কি না, তখন মেজর জানালেন তা হবে। মেজর একজন পুলিশ সদস্যকে জিজ্ঞেস করলেন তারা জানাজায় অংশ নিতে চায় কি না। পুলিশ সদস্যটি জানালেন তাদের অযু করা থাকলে তারা জানাজায় অংশ নিতেন। তারা জানাজায় অংশ নেন নি।

                মুজিবকে তার বাবার কবরের পাশে চিরন্দ্রিায় শায়িত করা হল।

                মোস্তাকের প্রস্তাব

                ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় শেখ মুজিব যখন তার দুই কন্যা হাসিনা রেহানাকে পাকিস্তানি সেনারা হানা দেয়ার আগে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেন তখন রেহানা তার বাবাকে আঁকড়ে ধরে থাকেন আর কাঁদতে কাঁদতে বলেন  আমি যাব না। আমাদের যদি মরতেই হয় তাহলে একসাথে মরব।  তাঁকে জোড় করে তার বাবার কাছ থেকে আলাদা করতে হয়েছিল।

                কিন্তু এখন রেহানা বিদেশের মাটিতে।

                অভ্যূত্থানের খবর শোনার পর শেখ হাসিনার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিলকেউ বেঁচে নেই।  কিন্তু কিছু উড়ো খবর শোনা যাচ্ছিল যে তার মা ছোট ভাই রাসেল তখন জীবিত আছেন। তিনি এই বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে ছিলেন।

                মুজিবের মেয়ের জামাই ওয়াজেদের কাছে ১৬ আগস্ট ঢাকা থেকে একটি ফোন আসে। ফোন করেছিলেন মিসেস আবু সাইয়িদ চৌধুরী, তিনি হাসিনা রেহানাকে নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন। তিনি হাসিনা রেহানাকে সব ধরণের সাহায্য করার আশ্বাস দেন এবং . ওয়াজেদকে তারা যেখানে আছেন সেখানেই থাকার উপদেশ দেন। তিনি আরও বলেন সাইয়িদ চৌধুরী লিমাতে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যাওয়ার সময় তাদের সাথে দেখা করবেন।আমরা তোমাদের পাশে থাকবো  তিনি বলেন।

                তাদের দিশেহারা অবস্থার মধ্যেও এই ফোন আসায় তাঁরা অবাক হয়েছিলেন। আবু সাইয়িদ চৌধুরী তাদের কোন নিকটজন ছিলেন না। সর্বোপরি তিনি মোস্তাক সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হয়েও তাদের সহায়তা করার কথা বলছিলেন। এই ফোন নিশ্চয়ই নতুন সরকারের পরামর্শে করা হয়েছে অথবা অন্তত নতুন সরকারের অনুমোদন নিয়ে করা হয়েছে। তাদের খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তারা ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। যখন একটি মাত্র বাক্য লিখে আশ্রয় প্রার্থনা করছিলেন তখন ওয়াজেদের হাত কাঁপছিল।

                রাজধানী বন- অবস্থান করা আর নিরাপদ মনে হচ্ছিল না। ঢাকা থেকে এখানে কেউ চলে আসতে পারে। কার্ল-তে ওয়াজেদের একটি ফ্ল্যাট ছিল; আশ্রয় প্রার্থনা করে লেখা চিঠির জবাব আসা পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হল।

                ঢাকায় পত্রিকা বিলি করে এমন একটি ছেলে মুজিব হত্যার পরদিন মুজিবের জন্য অনেক কাদছিল। এক ভারতীয় সাংবাদিক তাকে স্মরণ করিয়ে দিলেনতুমি তো মুজিবের অনেক সমালোচনা করতে।  ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতেই জবাব দিলভালো বা মন্দ যাই হোক, তিনিই ছিলেন আমাদের একমাত্র নেতা; তার নিন্দা করতাম কারণ দোষারোপ করার মত আর কেউ আমাদের নেই। 

                এই ছেলেটির মত আরও অনেকেই নিজেদেরকে এতিম মনে করছিলেন।

                দেশের মানুষের মনের অবস্থা বঙ্গপোসাগরের নিম্নচাপের মতোই গুরুগম্ভীর বিস্ফোরণমুখী ছিল; যে কোন মুহূর্তেই এটি একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারতো।

                পুরো পরিস্থিতি বুঝতে পেরে মোস্তাক হত্যাযজ্ঞের সাথে নিজের সম্পৃক্ততা মুছে ফেলতে মরিয়া ছিলেন। গণরোষের শিকার যদি কেউ হয় তা মেজররা হোক।

                মোস্তাকের কিছু বন্ধু সহযোগী সে সময় এটা প্রমাণ করতে ব্যস্ত ছিলেন যে মেজররা নিজেরাই এই অভ্যুত্থান করেছেন এবং সম্পর্কে মোস্তাক আগে কিছুই জানতেন না। মোস্তাকের এক বন্ধু বলেনযখন একজন মেজর কিছু সৈন্য নিয়ে তাকে নিতে আসে তখন তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন যে ওরা তাকেও হত্যা করবে।  কিন্তু যখন বোঝা গেল যে কেউ এই গল্প বিশ্বাস করছে না তখন মোস্তাকের বন্ধুরা বলতে লাগলেন যে মোস্তাককে বলা হয়েছিল অভ্যূত্থানটি হবে রক্তপাতহীন। প্রমাণ হিসেবে তারা বলছিলেন যে যখন মোস্তাক হত্যাযজ্ঞের কথা জানতে পারেন তখন তিনি বলেছিলেনএমন তো কোন কথা ছিল না। 

                তাদের মতানুসারে মুজিবের কবর টুঙ্গিপাড়ায় দিয়ে মোস্তাক মুজিবের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন এও বলেন যে, “মোস্তাক ভাই একজন আল্লাহভক্ত মুসলমান, যিনি দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েন। 

                প্রার্থনারত পতঙ্গ?

                ষড়যন্ত্রকারীরা বুঝতে পেরেছিলমুজিবকে সরিয়ে দিতে হবে মোস্তাকের ভাতিজা মেজর রশিদ যে তার চাচার চেয়ে কম ভণ্ড, তার ভাষ্যমতে  শেখ মুজিবকে নির্বাসিত করা বা তাকে জেলে পাঠানো সম্ভব ছিল না। কারণ তিনি খুবই ধূর্ত এবং ক্ষমতাধর ছিলেন। তাকে হত্যা করাই ছিল একমাত্র উপায়। 

                মুজিব এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে তাকে নির্বাসিত বা কারাবন্দি করা সম্ভব ছিল না। তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর একমাত্র উপায় ছিল তাঁকে হত্যা করা।

                খুব অল্প লোকই মোস্তাকের সহযোগীদের গল্প বিশ্বাস করেছিলেন, অনেকেই বিশ্বাস করেন ১৩ বা ১৪ আগস্টে যে ভারতীয় হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়েছিল তা মূলত শেখ মুজিবকে উদ্ধার করার মিশন নিয়ে আসছিল।

                ভারতীয় হেলিকপ্টার নিয়ে কোন রহস্য ছিল না। কিছু কিছু ভারতীয় হেলিকপ্টার সত্যিই পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারী করত। ১৪ আগস্ট তারিখে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার প্রেসনোট শেখ মুজিব অনুমোদন করেছিলেন, যা পরদিন পাঠানোর কথা ছিল।

                ভারতেও অনেকে বিশ্বাস করেন যে হেলিকপ্টারটি উদ্ধার করার জন্যই পাঠানো হয়েছিল।

                হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়েছিল অভূত্থানের একদিন আগে, তারপরও শেখ মুজিবউদ্ধার তৎপরতা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। যে সেনাসদস্যরা ১৫ আগস্ট ভোরে মুজিবের বাড়ি ঘেরাও করেছিল তারা তাকে অপ্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে যায়।

                আর বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত সমর সেন সে সময় ছিলেন দিল্লীতে।

                মুজিবের শেষ বার্তা ছিল স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতের রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে পাঠানো বাণী।

                তাহের উদ্দীন ঠাকুরের প্রেস ব্রিফিংয়ের জন্য ১৬ আগস্ট সাংবাদিকরা বঙ্গভবনে অপেক্ষা করছিলেন। দু জন মেজর উত্তেজিত হয়ে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। তাহের ক্রাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করছিলেন। হুদা আত্মনিমগ্ন হয়ে একা একা হাঁটছিলেন। কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি অন্যমনস্ক থেকেই জবাব দিচ্ছিলেন। ফারুক সাংবাদিকদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেনবন্ধুরা আমি কি আপনাদের জন্য কিছু করতে পারি?

                এরকম মিষ্টি সুরেই কি এই লোকটি হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা করেছিলেন? অবাক হয়ে কথাই ভাবছিলেন এক সাংবাদিক।

                মুজিবের মৃত্যু সংবাদে ভারতে শোক নেমে আসে। কেউ কেউ হয়ত ভাবছিলেন মুজিব নিজেই এর জন্য দায়ী, কিন্তু বেশির ভাগই মুজিব তার পরিবারের মৃত্যুতে শোকাহত ছিলেন। তিনি একজন মহৎ দেশপ্রেমিক নেতা হিসেবে প্রশংসিত ছিলেন।

                ভারত সরকারের একজন মুখপাত্র শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেনআমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম হওয়ায় আমরা তাকে সব সময়ই সম্মান করে এসেছি।  এই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব  ভারতেও পড়বে।

                যুগোস্লাভিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী তার বার্তায় বলেনযুগোস্লাভিয়ার সর্বস্তরের মানুষ বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতার মৃত্যুতে সমবেদনা জানাচ্ছে। তার মৃত্যুতে বিশ্ব একজন জনপ্রিয় রাষ্ট্রনেতাকে হারালো; আর জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন হারালো জোট নিরপেক্ষ দেশগুলোর একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে। 

                মুজিব হত্যার ঘটনায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আব্দুল রাজ্জাক শোকাহত হন। কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী শেখ সালাহও শোক প্রকাশ করেন।

                শেখ মুজিবের প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছুড়ে ফেলায় নিউইয়র্ক টাইমস গভীর দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে। কিন্তু মৌলবাদীদের দৃষ্টিতে অসাম্প্রদায়িকতা হল ধর্মদ্রোহীতার নিকৃষ্ট উদাহরণ। করাচি থেকে লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় পাঠানো খবরে এস, আর, গৌরি লেখেনমুজিব বাংলাদেশকে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করে পাকিস্তানের জনগণকে হতাশ করেছেন।

                লন্ডনের টাইমস পত্রিকা যা কুখ্যাত ছিল উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নের জন্য সেনা শাসনকে সমাধান হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য; লিখেছিলসেনাশাসন দেশটির জন্য প্রয়োজনীয় এবং ফলদায়ক; এর ফলে দেশে নিরস্ত্রীকরণ ঘটবে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকিও কমবে।গার্ডিয়ানের কূটনৈতিক সংবাদদাতা আশা প্রকাশ করেন যে নতুন সরকার মুজিবের সামপ্রতিক বামপন্থীনীতি গুলো থেকে সরে আসবে।

                সুদানের রাষ্ট্রপতি গাফফার নামিরি ১৬ আগস্ট চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে রিয়াদ আসেন। একই দিনে সৌদি আরব সুদান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। সৌদি আরবের রাজা খালেদ মোস্তাকের প্রতি বার্তায় বলেনআমার প্রিয় ভাই, আমি আমার নিজের সমগ্র সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতা গ্রহণ উপলক্ষে আপনাকে জানাচ্ছি আন্তরিক অভিনন্দন। স্রষ্টার কাছে আমাদের প্রার্থনা থাকবে আপনি যেন আপনার গৃহীত উদ্যোগে সাফল্য অর্জন করেন এবং ইসলামের স্বার্থ রক্ষার্থে এবং বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যেতে পারেন।

                সৌদী আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার পূর্বশর্ত ছিল দেশটিকে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা। স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনাকে ছুড়ে না ফেলে বাংলাদেশের পক্ষে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রে পরিণত হওয়া সম্ভব ছিল না। মুজিব ডাবতেই পারতেন না যে কেউ তাকে বাংলাদেশকে একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র করার প্রস্তাব দিতে পারে।

                ভুট্টো ১৯৭৫ সালের ১৮ এপ্রিল কাবুলে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমীতে তার ভাষণে বলেন, ১৯৭২ সালে আমি সিমলায় গিয়েছিলাম কারণ তখন আমাদের শান্তি দরকার ছিল। কিন্তু এখন পাকিস্তানের চেয়ে ভারতেরই বেশি শান্তি দরকার। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা এখন ভারত বাংলাদেশের নিজেদের স্বার্থের জন্যই দরকার। তিনি আরও বলেন, “শিগগিরই অঞ্চলে কিছু বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে।  ভুট্টো ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সেনা অভ্যুত্থানের ইঙ্গিত এখানে দিয়েছিলেন ভাবলে সেটা হয়তো একটু বেশিই দূরদর্শিতা হয়ে যাবে, তবুও অনেকেই এমন দাবি করেছেন। যাই হোক তিনি শুধু ভুট্টো সরকারকে খুব দ্রুত স্বীকৃতি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং সরকারকে শক্তিশালী করতে তার পক্ষে যা করা সম্ভব তার সবই করেছেন।

                ১৯৭৪ সালের জুন মাসে ভুট্টোর ঢাকা সফরে যে ১০৭ সদস্য বিশিষ্ট দল আসে। তার মধ্যে থাকা এক সাংবাদিক সফর শেষে করাচীরডেইলী নিউজ  পত্রিকায় বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনার কথা লিখেন। তার কাছে সম্ভাবনাকে চমৎকার মনে হয়েছিল। কেউ ভাবতে পারেন একজন পাকিস্তানির পক্ষে হয়ত সেনা অভ্যুত্থান ছাড়া ক্ষমতার পালা বদলের অন্য কোন উপায় ভাবা সব নয়।

                বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনায় যারা এক ধরণের অসুস্থ আনন্দ পেয়েছিলেন এমন অনেক পাকিস্তানিই সেটি লুকিয়ে রাখতে পারেননি। পাকিস্তানিদের মধ্যে যারা তখনও ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে ঢাকায় যৌথ বাহিনীর কাছে পাক সেনার আত্মসমর্পণের অপমান ভুলতে পারেননি তারা ভাবছিলেন রক্তাক্ত অভূত্থানের মাধ্যমে তাদের অপমানের প্রতিশোধ নেয়া হয়েছে।

                কিছু কিছু পাকিস্তানি সংবাদপত্র শেখ মুজিবকে একজন  বিশ্বাসঘাতক  হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তার মর্মান্তিক মৃত্যুকে বলে  পাপের শাস্তি

                জেড, . সুলেরী মত পাকিস্তানের তখনকার শীর্ষ পর্যায়ের সকলেই পাকিস্তানকে ভেঙ্গে দুই টুকরা করার জন্য দায়ী বিশ্বাসঘাতক মুজিবের মৃত্যুতে সন্তুষ্ট ছিলেন। লাহোরের একটি দৈনিকে তিনি মত প্রকাশ করেন যে যতোক্ষণ মুজিব জীবিত থাকবেন ততোক্ষণ পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না। তার মতে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির আগেই বিনাশর্তে শেখ মুজিবকে ছেড়ে দেয়াটা ছিল একটি ভুল। পাঞ্জাব শেখ মুজিবের বিনাশর্তে মুক্তি মেনে নিতে পারেনি।

                সুলেরীর মতে শেখ মুজিব না থাকলে বাংলাদেশ কোনদিন দাঁড়াতে পারতো না। হংকংভিত্তিক ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ-এর ইসলামাবাদ প্রতিনিধি সালামাত আলী বলেন, “মুজিবের পক্ষে ভারতীয় চাপ মোকাবেলার লক্ষ্যে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব ছিল না, কারণ তিনি মনে করতেন এর ফলে দেশের মধ্যে থাকা পাকিস্তানপন্থীরা উৎসাহিত হবে এবং তার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যাবে।

                মোস্তাক এমনটি ছিলেন না।

                বাংলাদেশের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হওয়ার ঘোষণার পরে আর কোন পরিবর্তন আসেনি। ঢাকাকে তার অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য ইসলামাবাদ চাপ দিতে থাকে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দুই রাজধানীর মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে বার্তা আদান-প্রদান ঘটে। ধারণা করা যায় ঢাকা থেকে যে ব্যাখ্যা আর নিশ্চয়তা দেয়া হয় তাতে ইসলামাবাদ সন্তুষ্ট হয়েছিল।

                মোস্তাকের হাত শক্তিশালী করা প্রয়োজনীয় ছিল। যদিও তিনি প্রথমে বাংলাদেশকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র করার ঘোষণা দিয়ে পিছিয়ে আসেন, তারপরও তিনিই বাংলাদেশ পাকিস্তানের সম্পর্ক উষ্ণতর করতে পারবেন বলে ভাবা হচ্ছিল। কি হতো যদি মোস্তাক ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল সভা, যে সভায় দলের নাম থেকেমুসলিমশব্দটি বাদ দেয়ার সর্ব সম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, সে সভা, ত্যাগ করে বেরিয়ে না যেতেন। এর ১৬ বছর পর ১৯৭১ সালে যখন তার সংগ্রামী সতীর্থরা দেশের স্বাধীনতা ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারছিলেন না, তখন এই মোস্তাক পাকিস্তানের সাথে আলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার প্রথম ভাষণেই তিনি  জয় বাংলা  স্লোগানটি বাদ দেন।

               মুস্তাক আহমেদ নামের একজন শীর্ষ পাকিস্তানি সাংবাদিক বলেন, “বাংলাদেশ নিজেকে ইসলামিক রাষ্ট্র ঘোষণা করুক বা না করুক, দেশটি ইসলামিক বলয়ের মধ্যেই থাকবে। তিনি আরও যোগ করেন, “মোস্তাকের চিন্তায় পাকিস্তানের নামই সবার আগে আসা উচিৎ। 

                দেশটি তখন যেন  মুসলিম বাংলা  হয়ে গিয়েছে। এই শব্দটির কথা ভাবায় অনেক পাকিস্তানিই ভুট্টোর প্রশংসা করেন।

                সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর প্রধান অধ্যাপক গোলাম আযম বাংলাদেশের নতুন সরকারকে সমর্থন দেয়ার জন্য সকল মুসলিম দেশকে অনুরোধ করেন।

                ঢাকা স্বাধীন হওয়ার ঠিক আগে আগে বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য দায়ী যে আল-বদর বাহিনী, সে বাহিনীর সদস্যদের জামায়াতে ইসলামী থেকে বেছে নেয়া হয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই জামায়াতে ইসলামী নামের দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়।

                ভুট্টোকে তার কর্মকাণ্ডের জন্য ভূয়সী প্রশংসা করে খাজা খায়েরুদ্দীন বলেন, “এটি যেন মাত্র শুরু হয়। আল্লাহ যেন বাংলাদেশকে একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে দেশটিকে ইসলামী শাসনের উজ্জ্বল উদাহরণ করার মত ক্ষমতা খোন্দকার মোস্তাক আহমেদকে দেন। 

                মুক্তিযোদ্ধাদের মোকাবেলা করার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের দেশীয় দোসররা যে শান্তি কমিটি করে তার কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন এই খাজা খায়েরুদ্দীন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর খাজা খায়েরুদ্দীনকে শেখ মুজিব একটি পাসপোর্ট দেন যাতে করে তিনি লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করতে পারেন। কিন্তু খায়েরদ্দীনের গন্তব্য সংগত কারণেই ছিল ইসলামাবাদ, কিন্তু মুজিবের পক্ষে একজন পুরোনো বন্ধুর করা অনুরোধ না রেখে থাকা সম্ভব ছিল না।

               কট্টর ডানপন্থী এমন পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ সাংবাদিকরা পাকিস্তান বাংলাদেশকে নিয়ে একত্রে একটি  কনফেডারেশন  গঠন করার সম্ভাবনাটিকে একেবারে উড়িয়ে দেননি।

                এর পাশাপাশি এমন অনেক পাকিস্তানিও ছিলেন যারা শেখ মুজিবের মৃত্যুতে শোকাহত ছিলেন।

                করাচী থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক আল ফাত্তাহ-এর সম্পাদক ওয়াহাব সিদ্দিকী বলেন, “তিনি (মুজিব) তার দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু হায় তার নিজের লোকেরাই তাঁকে হত্যা করল। তাকে হত্যা করা ছাড়া নতুন সরকারের আর কোন উপায় ছিল না কারণ তিনি এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে তাকে জেলে বা নির্বাসনে পাঠালে জনরোষের কারণে সরকারকে বিপদে পড়তে হত।

                 বক্তব্য এমন একটি সাপ্তাহিকের পক্ষ থেকে এসেছিল যেটি ছিল চীনপন্থী এবং এটি ভুট্টোকে সমর্থন দিয়েছিল।

                অনেকেই এই অভ্যুত্থানের পেছনে সিআইএর হাত ছিল বলে সন্দেহ করেছিলেন এবং ঘটনার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার যোগসূত্র স্থাপন করেছিলেন। ওয়াহাব সিদ্দিকী আরও এগিয়ে গিয়ে মতামত দেন, “বর্তমানে যা ঘটেছে তা সিআইএ ১৯৬৯ সাল থেকে যে পরিকল্পনা করে আসছে তার ধারাবাহিকতা ছাড়া কিছু নয়।

                রেডিওতে প্রচারিত অভ্যুত্থানের প্রথম ঘোষণায় খন্দকার মোস্তাকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে বলা হলেও, মোস্তাক চাইছিলেন প্রমাণ করতে যে সেনাবাহিনীই স্বপ্রণোদিত হয়ে অভূত্থান ঘটিয়েছে। ১৫ আগস্টে তার ভাষণে মোস্তাক বলেন সেনাবাহিনীকে বাধ্য হয়েই ক্ষমতা দখল করতে হয়েছে।  কিন্তু মাত্র জন নিম্ন পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তা যাদের মধ্যে অনেকেই তখন আর সেনাবাহিনীতে নেই আর দুই থেকে তিনশ সেনা সদস্য এই অভূত্থানটি ঘটিয়ে ছিলেন। সৈনিকদের মধ্যে অল্প কয়েক জনই শুধু শেখ মুজিবকে হত্যা করার পরিকল্পনার কথা জানতেন। এবং মেজররা নিজেদের যাই ভেবে থাকুন না কেন, প্রকৃত অর্থে তারা ছিলেন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে সহযোগী মাত্র।

                অভ্যুত্থানের ফলে খুব ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর মুখোশ উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল, যাদের একমাত্র লক্ষ্যই ছিল ক্ষমতা কুক্ষিগত করা। মোস্তাক ছিলেন ধূর্ত, আর মেজররা ছিলেন উচ্চাকাক্ষী রোমাঞ্চপ্রবণ তরুণ। তাদের কোন রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল এবং তারা জানতেন যে তাদের পক্ষে বৃহত্তর জনতার সমর্থন আদায় করা সম্ভব ছিল না। তারপরও মোস্তাককে একজন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ জনপ্রিয় নেতা এবং অভূত্থানকারী মেজরদের আদর্শবাদী তরুণ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা হয়েছিল।

                জয়প্রকাশ নারায়ণ ১৭ আগস্ট তার প্রিজন ডায়রীতে লিখেন যখন মোস্তাক ভারতে এসেছিলেন তাকে অন্যান্য নেতাদের মতোই মুজিবের অনুরাগী ভক্ত মনে হয়েছিল। কিন্তু জয়প্রকাশের বিশেষ সহযোগী , সি, সেন বাংলাদেশ থেকে যখন ভারতে ফেরত যান তখন জয়প্রকাশকে জানান যে মোস্তাক এখন মুজিবের থেকে দূরে সরে গেছেন  এবং  মুহূর্তে আওয়ামীলীগে সর্বোপরি সারাদেশে মুজিবের নেতৃত্বকে হুমকির মুখে ফেলার মত যদি কেউ থাকে, তবে সেটা মোস্তাক। 

                জয়প্রকাশ আরও লেখেন, “কে জানত মোস্তাক এমন নির্মম প্রক্রিয়ায় মুজিবের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করবেন এবং সফলতা লাভ করবেন?  প্রকৃত অর্থে এটি কোন চ্যালেঞ্জ ছিল না। বরং এটি ছিল একটি চক্রান্ত।

                জয়প্রকাশ এরপর লিখেন, “শেষ কথা এটাই: মোস্তাক সম্পর্কে আমার মনে দুইটি ধারণা তৈরি হয়েছিল, তাকে অন্যদের তুলনায় বেশি পশ্চিমাপন্থী আর একটু বেশি। মুসলিম চেতনার অধিকারী মনে হয়েছিল।  জয় প্রকাশ আসলে ভদ্রতা করেই একটু কমিয়ে বলছিলেন।

                , সি, সেন ঢাকায় অবস্থান কালে মোস্তাকের লোকজনের সাথেই বেশি সময় কাটিয়েছিলেন এবং মোস্তাকের সাথে তার উষ্ণ সম্পর্ক ছিল, তারপরও মুজিবের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার যোগ্যতা মোস্তাকের ছিল এটা ভাবাটা তার পক্ষে নির্বুদ্ধিতা ছিল। এটা কি ইচ্ছা প্রসুত কল্পনা ছিল না কি সেন ইচ্ছাকৃতভাবেই জয়প্রকাশকে ভুল পথে চালিত করছিলেন।

                কর্নেল তাহের তার বক্তব্যে সঠিক কথাটি বলেছেন, “এটা স্পষ্ট ছিল জনগণের মধ্যে মোস্তাকের কোন ভিত্তিই ছিল না। সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র অংশ বাদে পুরো সেনাবাহিনীতে তার কোন সমর্থক ছিল না, ঠিক যেমন জনগণের মধ্যেও তার জন্য কোন সমর্থন ছিল না।

                পুরো দেশ তো দূরের কথা, মোস্তাক তার নিজের নির্বাচনী এলাকাতেও জনপ্রিয় ছিলেন না। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি অল্পের জন্য হারেননি। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তার যে জীবনবৃত্তান্ত সরকার প্রকাশ করে তা ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তার ভয়াবহ ফলের লজ্জা কিছুটা ঢেকে দেয়। জীবন বৃত্তান্তে লেখা হয়  ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে মোস্তাক কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি-হোমনা নির্বাচনি এলাকা থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের একজন সাবেক মন্ত্রী নির্বাচনে তার জামানত হারান।  কিন্তু ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের বিষয়ে জীবন বৃত্তান্তে শুধু মোস্তাকের পুনর্বার নির্বাচিত হওয়ার কথাটাই লেখা হয়।

                ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় এলাকার মধ্যে ২৯১টি তে শতকরা ৭২ ভাগের বেশি ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ জয় লাভ করে। এর মধ্যেও মোস্তাক মাত্র ৭০০ ভোটের ব্যবধানে জয় পান।

                পরাজয়ের ভয়ে তিনি মুজিবকে বিশেষভাবে অনুরোধ করে নির্বাচনের আগে তার নির্বাচনি এলাকা সফর না করালে হয়তো তিনি নির্বাচনে হেরেই যেতেন।

                যখন মুজিবকে একজন বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, “মোস্তাককে নির্বাচনে জেতাতে সাহায্য করা কি আপনার জন্য খুব জরুরী ছিল?  তখন জবাবে একটু হেসে মুজিব বলেছিলেন, “সে আমার একজন পুরোনো সহকর্মী। 

                মোস্তাকের নির্বাচনী জয়ে সাহায্য করতে পেরে মুজিব নিজের উপর সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু মোস্তাক মুজিবের জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত ছিলেন, এবং তিনি যে অল্পের জন্য নির্বাচনে হারেননি তা নিয়েও তার ক্ষোভ ছিল। খুব কাছের বন্ধুদের সাথে আলাপকালে মোস্তাক প্রায়ই ক্ষোভের সাথে বলতেন, “এত জনপ্রিয় হওয়ার মত এমন কি করেছেন শেখ মুজিব? আমিও তো আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং আমি সাত বছর কারাবন্দীও ছিলাম।

                ক্ষমতার সাথে সাথে নতুন নতুন বন্ধু আর ভক্ত জুটে যায়, কিন্তু মোস্তাকের খুব কম বন্ধু আর ভক্ত ছিল, এমন কি তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও পরিস্থিতি খুব বদলায়নি। মোস্তাক ক্ষমতা গ্রহণের এক সপ্তাহ পর একজন মধ্যবয়স্ক লোক দাউদকান্দি সেতুর কাছে মোস্তাকের প্রশংসা করার ভুল করে বসেন। সাথে সাথেই কিছু তরুণ তার উপর চড়াও হন। এটা মোস্তাকের নিজের নির্বাচনী এলাকা ছিল, কি তার পক্ষে কথা বলার মত লোক সেখানে কেউ ছিল না। মধ্যবয়স্ক লোকটি কোন মতে ক্ষমা প্রার্থনা করে পাড় পেয়ে যান।

                যে মেজররা বঙ্গভবনে অবস্থান নিয়েছিলেন তাদের হাবভাব এমন ছিল যেন তারা পাকিস্তানের সামরিক জান্তার উত্তরাধিকারী। তারা ক্ষমতার দম্ভে উন্মত্ত আচরণ করছিলেন আর সবার কাছেই বিরক্তিকর হয়ে উঠছিলেন। তারা তাহের উদ্দীন ঠাকুর এবং আরও কয়েকজন মন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়েছিলেন, যাদেরকেই তাদের অপছন্দ হচ্ছিল তাদের গ্রেফতার করছিলেন, কিছু কিছু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বলপ্রয়োগ করে অর্থ আদায় করেছিলেন এবং মাঝে মাঝে এমন কি রাষ্ট্রপতির আদেশও লম্বন করছিলেন। তারপরও এই মেজরদের মনে হচ্ছিল তাদেরকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তারা বাকিদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যকার বিভেদ তাদের সেই অনুভূতিকে চাপা দিচ্ছিল। এসব হতাশা থেকে এই মেজরদের মধ্যে কেউ কেউ প্রায়ই লাথি দিয়ে রাষ্ট্রপতি মোস্তাকের কক্ষে ঢুকে পড়ে তার সামনেই ক্ষোভে ফেটে পড়ছিলেন। তারা আরও রাজনীতিবিদকে হত্যার হুমকি দিচ্ছিলেন। জনরোষের কথা ভেবে মোস্তাক তাদের নিবৃত করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু তাদের রক্ত পিপাসা তখন বেড়ে গিয়েছে, ক্ষুদ্ধভাবে অফিসারদের মধ্যে একজন বলে উঠেছিলেন, “আমরা যদি মুজিবকে হত্যা করতে পারি, তবে অন্য যে কাউকেই হত্যা করা আমাদের দ্বারা সম্ভব।  তার বক্তবের ইঙ্গিতটি স্পষ্ট ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতির ছত্রছায়ায় না থাকলে এই মেজরদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার ঝুঁকি ছিল, অন্যদিকে এই মেজরদের ছাড়া মোস্তাকও অসহায় হয়ে পড়তেন। কাজেই ভাল লাগুক বা না লাগুক মোস্তাক আর মেজরদের নিরুপায় হয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে থাকতেই হয়েছিল।

                একদিকে মোস্তাক সেনা অফিসারদের শান্ত রাখার চেষ্টা করছিলেন, অন্যদিকে তিনি রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছিলেন। রাজনীতিবিদদের সাথে আলোচনায় তিনি দাবি করতেন যে তিনি না থাকলে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণভাবেই ক্ষমতা দখল করে নিত।

                অভ্যুত্থানের কয়েকদিন পর মোস্তাক ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফফর) এর মোজাফফর আহমদকে বলেছিলেন, “যখন আমরা রেডিও স্টেশনে ছিলাম তখন মেজররা আমাকে বারবার বাংলাদেশকে একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করার জন্য চাপ দিচ্ছিল। আমি তাদের বলেছিলাম, “বাবা, এতো তাড়াহুড়ো করা যাবে এই এখন এখানে বসেও আমি দেখতে পাচ্ছি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি মিছিল আমাদের দিকে অর্থাৎ রেডিও স্টেশনের দিকে এগিয়ে আসছে। 

                বাংলাদেশকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হলে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হবার আশঙ্কা না থাকলে মোস্তাক হয়তো ঘোষণাটি দিয়েই ফেলতেন। তার কোন জনসমর্থন ছিল না, সেনাবাহিনীর একটা খুব ছোট অংশ শুধু তার সাথে ছিল। তাকে আগে ক্ষমতায় ঠিকমত বসতে হবে, তিনি ধীরে চলার নীতি গ্রহণ করেছিলেন।

                আওয়ামী লীগের সাংসদদের সাথে আলোচনার সময় মোস্তাক শেখ মুজিবকে  বঙ্গবন্ধু  বলে সম্বোধন করছিলেন। তিনি বলেন যখন পরিবারের কর্তাব্যক্তির মৃত্যু হয়, তখন পরিবারের সদস্যরা শোকগ্রস্ত থাকেন, কিন্তু তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোও পালন করে যেতে হয়। তিনি বঙ্গবন্ধুর জন্য শোকাহত ছিলেন, কিন্তু দেশ পরিচালনার গুরু দায়িত্বগুলোও তাকে পালন করে যেতে হচ্ছে বলে মোস্তাক দাবি করছিলেন। মেজররা তাকে সংসদ বিলুপ্ত করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। এতোদিন তিনি তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারলেও, তার দলীয় সতীর্থরা তাকে সহায়তা না করলে তার পক্ষে এটা আর বেশি দিন চালিয়ে নেয়া সম্ভব ছিল না।

                আওয়ামী লীগের অধিকাংশ সাংসদই মোস্তাকের এই সহায়তা প্রত্যাশাকে ঘৃণার চোখে দেখেছিলেন। যখন তাদের সমর্থন পেতে মোস্তাক ব্যর্থ হলেন তখন তিনি অন্যদের দারস্থ হন যাতে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা যায়।

                দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদনা পর্ষদের সভাপতি মইনুল হোসেন হঠাৎ আবিষ্কার করেন যে তার গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। রাজনৈতিকভাবে মোস্তাকের অনেক কাছের লোক হওয়ায় সময় পর্দার আড়ালে থেকে মোস্তাকের জন্য সমর্থন আদায়ের চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন।

                স্বাভাবিক কারণেই সবাই জানতো, নতুন সরকার সব গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তাদের পছন্দের লোক বসাবে। শফিউল আযমকে বিশেষভাবে সন্তুষ্ট করতে সেক্রেটারি জেনারেল পদ দেয়া হয়, এবং মাহবুবুল আলম চাষীকে রাষ্ট্রপতির প্রধান সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়। তবারক হোসেনকে নতুন সরকারের পররাষ্ট্র সচিব করা হয়। এই তিনজনই পাকিস্তানপন্থী ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নানাভাবে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছিলেন। নতুন সরকারের চরিত্রটা এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও নিশ্চয়ই উদ্যোগগুলো লক্ষ করা হয়েছিল।

                ১৯৭১ সালের দুর্ভাগ্যজনক সেই মার্চ মাসে শফিউল আযম ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সচিব। এই পদে তিনিই প্রথম বাঙালী ছিলেন না যেমনটি অনেক সাংবাদিক ধারণ করে থাকেন। এর দশ বছর আগে আইয়ুব খানের সেনা শাসনামলে কাজী আনোয়ারুল হক, যিনি আই পি এস ক্যাডার থেকে এসেছিলেন তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। হক একজন ভদ্র রুচিশীল ব্যক্তি ছিলেন, যার সঙ্গীত সাহিত্যপ্রীতি সবার জানা ছিল। যাই হোক পাকিস্তানি সেনা গোয়েন্দারা বিশ্বাস করে না এমন কোন বাঙালীকেই কখনো পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সচিব করা হয়নি।

                এই কাজী আনোয়ারুল হক ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর আবার দৃশ্যপটে হাজির হন, প্রথমে সেনা সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে এবং পরে একজন মন্ত্রী হিসেবে।

                ১৯৭১ সালের মার্চের তারিখে যখন মুজিব অসহযোগের ডাক দেন তখন প্রায় সর্বস্তর থেকেই সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। সরকারী কর্মকর্তারা মুজিবকে সমর্থন দিয়েছিলেন, এমন কি ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে শপথ পাঠ করাতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু শফিউল আযম তার পদ আঁকড়ে ছিলেন, এমনকি ২৫ ২৬ মার্চে গণহত্যার পরও বেশ কিছু সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

                শামসুদ্দীন নামের একজন তরুণ সিএসপি অফিসার ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে সিরাজগঞ্জে উপবিভাগীয় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। পাকবাহিনী যখন সিরাজগঞ্জ দখল করে তখন এই তরুণ জাতীয়তাবাদী সিরাজগঞ্জবাসীকে সাথে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। শফিউল আযম বৈবাহিক সম্পর্কে এই শামসুদ্দীনের আত্মীয় ছিলেন। তিনি শামসুদ্দীনকে ঢাকায় আসতে সম্মত করান এবং তাকে সেনা কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়ে যান।

                শফিউল আযম তার বন্ধু জেনারেল রাও ফরমান আলী তাকে শামসুদ্দীনের কোন ক্ষতি না করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু মিষ্টভাষী ফরমান আলী রূঢ়ভাষীব্যাঘ্র  জেনারেল নিয়াজীর চেয়েও ভয়ঙ্কর লোক ছিলেন।

                শামসুদ্দীনকে প্রচণ্ড অত্যাচার করে হত্যা করা হয়, এবং এমন কি কবর দেয়ার জন্য তার লাশটিও তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।

                 ঘটনায় শফিউল আযম যদি মর্মাহত হয়েও থাকেন, তা তিনি প্রকাশ করেননি। তিনি তার দায়িত্ব পালন করেছেন বলে ভেবেছেন এবং এর ফলে পাকিস্তানি সরকারকে তার সেবা দেয়ার যে ইতিহাস তা থেকে একটি কলঙ্ক মুছে গেল বলে ভেবেছিলেন।

                পরে শফিউল আযমকে পাকিস্তানে বদলী করা হয়। এটা তার জন্য ভালোই হয়েছিল, কারণ ঢাকায় থাকলে তাকে নিরন্তর মৃত্যুভয়ের মধ্যে বেঁচে পাকতে হত এবং হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর মোনেম খানের মত তাকেও মুক্তিবাহিনী হত্যা করত।

                ১৯৭৩ সালে শফিউল আযম বাংলাদেশে ফিরে আসেন। অনেকেই তার পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন, তারা তার একাডেমিক সাফল্য আর প্রশাসনিক কাজে দক্ষতার উপর বিশেষভাবে জোড় দিয়েছিলেন। কিন্তু মুজিব তাকে মেনে নিতে পারেননি।

               মাহবুবুল আলম চাষী একজন বেশ রুচিশীল এবং মনোমুগ্ধকর ব্যক্তিত্ব ছিলেন। শফিউল আযমের সাথে তার পার্থক্য ছিল যে তিনি সহজেই লোকের সাথে মিশতে পারতেন। পঞ্চাশের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানি দূতাবাসে কর্মরত থাকা অবস্থায় মার্কিন প্রশাসন একাডেমিক বলয়ে যেসব লোকের সাথে তার পরিচয় হয়েছিল তিনি তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।

                তিনি ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে অব্যাহতি নেন এবং কৃষি কাজে নিয়োজিত হন। তিনি কুটনীতিক হিসেবে তার প্রতিশ্রুতিশীল ক্যারিয়ার ফেলে চাষাবাদে মন দিচ্ছিলেন। অনেকে তাকে একজন আদর্শবাদী লোক ভাবতেন, অনেকে তার কাজকে পাগলামী মনে করছিলেন। কিন্তু সত্য ছিল এটাই যে তাকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পর জেনারেল আইয়ুব খান সে নীতি নিয়েছিলেন যেটাকে পাকিস্তানি প্রচার করা  একটি নিরপেক্ষ নীতি  বলতে ভালবাসতেন, সেই নীতি বাস্তবায়নের জন্য এই অত্যন্ত মার্কিনপন্থী কৃটনীতিককে বহাল রাখা সমস্যার মনে করছিল তখনকার সরকার। মাহবুবুল আলমের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ থাকলেও সে সময়কার পররাষ্ট্র সচিব আজিজ আহমদ খানের বদান্যতায় সে অভিযোগগুলো তদন্ত হয়নি (ঘটনাচক্রে ১৯৭৫ সালের আগস্টে যখন অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় তখন আজিজ আহমেদ পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন)

                সারাবিশ্বে যখনসবুজ বিপ্লব কে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সকল সমস্যার সহজ সমাধান হিসেবে প্রচারণা চালানো হচ্ছিল সে সময়টাতে মাহবুবুল আলম কৃষিকাজ শুরু করেন। আন্তর্জাতিক মহল থেকে তিনি বিভিন্ন সুবিধা পেয়েছিলেন কারণে।

                চাষী  বলতে বোঝায় এমন ব্যক্তি যিনি তার নিজের অথবা অন্যের কাছ থেকে বর্গা নেয়া ক্ষুদ্র এক খণ্ড জমিতে কৃষিকাজ করেন। মাহবুবুল আলম ছিলেন একজন ভদ্রলোক কৃষক, কিন্তু পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের পার্থক্য এই জায়গায় যে এখানে বিত্তশালী হলে সেটা রাজনীতি করার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এখানকার সব রাজনৈতিক নেতারাই হয় মধ্যবিত্ত অথবা কৃষক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট ভালো জানতেন বলেই নিজেকে একজন চাষী হিসেবে উপস্থাপন করছিলেন। প্রথমদিকে তার বন্ধুরা তাকে কৃষক হিসেবে অবজ্ঞার চোখে দেখলেও, তিনি তার নতুন ভূমিকায় এত ভালভাবে মানিয়ে নিয়েছিলেন যে ক্রমে সবাই তাকে মাহবুবুল আলম চাষী নামে ডাকতে লাগল।

                ১৯৭১ সালের ২৫ ২৬ মার্চে পাক বাহিনী যখন বাঙালীর উপর চড়াও হল তখন মাহবুবুল আলম সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি কয়েকদিনের জন্য কৃষিকাজ বন্ধ রাখবেন। তিনি বুঝেছিলেন সময়টাতে তিনি তার কূটনৈতিক দক্ষতা যোগাযোগগুলো কাজে লাগাতে পারবেন। শফিউল আযম যখন পূর্ব পাকিস্তানে তার পদ আঁকড়ে থাকলেন, সে সময়টাতে মাহবুবুল আলম সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গেলেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তাদের মধ্যে তেমন পার্থক্য ছিল না।

                ১৯৭১ সালের এপ্রিলে যখন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হল তখন মোস্তাক বেশ নির্লিপ্তভাবেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, কারণ তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আবিষ্কার করেন যে পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে তিনি কিছু বিশেষ সুবিধা পেতে পারেন। মাহবুবুল আলম চাষী ছিলেন তখন পররাষ্ট্র সচিব। মোস্তাক মাহবুবুল আলম চাষীর জুটিটি হয়েছিল চমৎকার।

                মোস্তাক তার সহযোদ্ধাদের না জানিয়ে পাকিস্তান সরকারের সাথে আঁতাত করতে অধীর ছিলেন, আর মার্কিন সরকারও তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা রুখে দিতে চাইছিল; এই দুয়ের মধ্যে একজন আদর্শ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছিলেন মাহবুবুল আলম চাষী।

                মুক্তিযুদ্ধ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে তখন তাদের চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যায়। মাহবুবুল আলম চাষীকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়। মোস্তাক তখনও পররাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন, কিন্তু তাকে ক্ষমতাহীন করে রাখা হয়েছিল।

                ষড়যন্ত্রকারী তাদের সহযোগীদের জন্য এটি ছিল একটা বিশাল আঘাত। তারা তখন সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।

                ১৯৫৮ এর অক্টোবরে যখন আইয়ুব খান সেনা শাসন জারি করেন তখন পাকিস্তানের আমলারা বেশ বিপদে পড়ে যান, কিন্তু আমলাদের সহযোগিতা আইয়ুব খানের প্রয়োজন ছিল এবং খুব দ্রুতই আমলারা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠলেন।

                বাংলাদেশে যারা অভূত্থান সংঘটিত করেছিল তাদের কোন ক্ষমতার ভিত্তি ছিল না এবং তাদের কর্তৃত্বকে কেউ সরাসরি চ্যালেঞ্জ না করলেও সেটি প্রশ্নের সম্মুখীন ছিল; ফলে তাদের আমলাতন্ত্রের উপর অনেকখানি নির্ভর করতে হচ্ছিল।

                নতুন সরকার সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও নিজেদের পছন্দের লোক বসাচ্ছিল। অক্টোবরের ২৪ তারিখে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল এম. . জি, ওসমানীকে রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, এবং মেজর জেনারেল শফিউল্লাহর জায়গায় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান করা হয়।

                আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ১৯৭০ ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে ওসমানী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন এবং মুজিব সরকারের একজন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যখন দেশে শুধু একটি মাত্র রাজনৈতিক দল থাকবে। এমন সিদ্ধান্ত সংসদে নেয়া হয় তখন তিনি সংসদ সদস্যের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। কারও পরামর্শ নয়, এটি তিনি করেছিলেন নিজ দায়িত্বেই। তিনি একজন দৃঢ়চেতা এবং সৎ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু রাজনীতির ময়দানে তিনি এতটাই অদূরদর্শী ছিলেন যে তার কারণে তার বন্ধুদের মাঝে মাঝেই লজ্জায় পড়তে হত।

                তার ন্যূনতম বিবেচনাবোধ থাকলে তিনি বুঝতে পারতেন যে ষড়যন্ত্রকারীরা শুধু তার নামটিই ব্যবহার করতে চাইছে এবং তিনি তাদের প্রস্তাবিত পদটি গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতেন। রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করে তিনি জনমনে দ্বিধা তৈরি করেছিলেন এবং একটি আপোষ করেছিলেন। কিছু সময় পর তিনি পদ থেকে পদত্যাগ করলেও ততক্ষণে যে ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। জিয়া সেনা প্রধান হতে যাচ্ছেন এটা সবাই জানতেন। জিয়া শফিউল্লাহ একই ব্যাচের হলেও অর্ডার অফ মেরিট অনুসারে জিয়া নিজের জেষ্ঠ্যতা দাবি করতে পারেন।

                এরশাদের উত্থান বেশ কৌতুহলোদ্দীপক হলেও, এটা সবার দৃষ্টির অগোচরে থেকে যায়। সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তারা খুব দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে যান এবং কিছু মেজর দুই তিন বছরের মধ্যেই মেজর জেনারেল হয়ে যান। কিন্তু এরশাদকে পাকিস্তান থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার বেশ পরে ১৯৭৩ সালে ফিরিয়ে আনা হয়। এছাড়াও তিনি অফিসার ট্রেনিং স্কুল থেকে পাশ করেছিলেন, কোন মিলিটারি একাডেমী থেকে নয়। মোট কথা এরশাদ সেনাবাহিনীর এলিটদের মধ্যে ছিলেন না। এরপরও ১৯৭৫ সালে ভারতে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় তাকে তিন মাসের মধ্যে দুইবার পদোন্নতি দেয়া হয়: জুন। মাসে তাকে প্রথমে ব্রিগেডিয়ার পদে এবং আগস্ট মাসে তাকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। এমনকি বাংলাদেশে যখন চারপাশেই খুব দ্রুত অনেকের পদোন্নতি হচ্ছে তখনও এরশাদের উপরে ওঠার গতি ছিল চমকে দেবার মত।

                এয়ার ভাইস মার্শাল তওয়াবকে জার্মানী থেকে ফিরিয়ে এনে অক্টোবরের ১৬ তারিখে বিমান বাহিনীর প্রধান করা হয়। তিনি ন্যাটো এয়ারফোর্স স্কুলে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালনের পর তার জার্মান স্ত্রীকে নিয়ে জার্মানীতেই বসবাস করছিলেন।

                ১৫ আগস্ট সকালে রেডিওতে বাংলাদেশ এখন সেনা শাসনের অধীনে আছে বলে যে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল তার কোন সত্যতা ছিল না। কেউই সেনা শাসন জারির ঘোষণা দেয়নি।

                ২০ আগস্ট মোস্তাক নিজেকে সেনা শাসন জারি করার, সেনা আইন বহাল করার এবং বিশেষ আদালত চালু করার ক্ষমতায় ক্ষমতায়িত করে নেন।

                দুই দিন পর সরকারের মনে হয় যে কিছু বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, “সংবিধান এখনও বলবৎ আছে, এবং সংবিধানে উল্লিখিত রাষ্ট্রের চারটি প্রধান নীতি- জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, সমাজতন্ত্র গণতন্ত্র-অপরিবর্তিতই আছে। এমন কি জাতীয় সংসদও বিলুপ্ত করা হয়নি। 

                ১৯৭১ সালে অস্থায়ী সরকারে মোস্তাকের সহকর্মী ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচ কামরুজ্জামান; মোস্তাক এদেরকে তার সরকারে যোগ দেয়ার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা ফাঁদে পা দেননি। যখন মিষ্টি কথায় কাজ হয়নি, তখন মোস্তাক তাদের হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও কোন ফল হয়নি।

                এই চারজনসহ আরও কয়েকজন নেতাকে ১৯৭৫ সালের ২৩ আগস্ট সেনা আইনের আওতায় গ্রেফতার করা হয়।

                একজন পাকিস্তানি সাংবাদিক সন্তোসের সাথে উল্লেখ করেন যে মোস্তাক মুজিব নগর সরকারে তার চারজন সহযোগীকে গ্রেফতার করেছেন যারা সবাই ভারতের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন।

                ভারতের নাম উল্লেখ করতে মোস্তাকের ভীষণ অস্বস্তি ছিল, এমন কি তার ১৫ আগস্টের ভাষণে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রতিবেশী দেশের নাগরিকদের জীবন দেয়ার কথা বলেছিলেন তখনও তিনি ভারতের নাম উল্লেখ করেননি। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি ভারতের প্রশংসা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রায় করেছিলেন। তিনি ভারতকে খুব ভাল বন্ধু, সোভিয়েত ইউনিয়নকেডাল বন্ধু আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেবন্ধু  বলে আখ্যা দেন, যখন ২০ আগস্ট তিনটি দেশ থেকে আগত প্রতিনিধিদের স্বাগত জানান।

                তিনি একই ধারা বজায় রাখেন ২৫ আগস্টে ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা চিঠিতে। তিনি বলেন, “আমাদের দুই দেশের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মূলে রয়েছে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যৌথভাবে যে সংগ্রাম ত্যাগ স্বীকার করেছি সেগুলো। বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণের কাছে দুই দেশের মধ্যে যে বন্ধুত্ব রয়েছে তা অমূল্য।  দুই দেশের মধ্যে যে সমস্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সমঝোতা রয়েছে সেগুলোর প্রতি সম্মান দেখানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিজ্ঞা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। পরিশেষে তিনি বলেন, “কোন ধরণের দ্বন্দ্ব এবং সংঘাত ছাড়া আমাদের দুই দেশের সরকারগুলো নিজেদের মধ্যকার বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ব শান্তি বজায় রাখতে একে অপরকে সহায়তা করবে বলে আমার যে আত্মবিশ্বাস রয়েছে তা আপনার কাছে বিনীতভাবে প্রকাশ করছি।

                মোস্তাক দেশের মধ্যেই বিভিন্ন দিক থেকে চাপে ছিলেন। এর মধ্যে সীমান্তে যেকোন ধরণের উত্তেজনা তার অবস্থানকে আরও কঠিন করে তুলত।

                ইন্দিরা গান্ধী তার জবাবে জানান তিনিও বিশ্বাস করেন যে  ভারত বাংলাদেশ অঞ্চলের উন্নতি অগ্রগতির জন্য একসাথে কাজ করে যাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন, তিনি আরও বলেন আমরা আমাদের যৌথ ত্যাগের কথা অবশ্যই মনে রাখবো।  ইন্দিরা গান্ধীর এই সঠিক কিন্তু নিরুত্তাপ প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের সংবাদপত্রে ফলাও করে প্রচার করা হয় এবং এমনকি একজন রেডিওতে বলে বসেন যে এটি বাংলাদেশে পট পরিবর্তনে ভারতের সম্মতির লক্ষণ।

                যদিও চীন ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের পথে বাঁধা হয়ে ছিল, কিন্তু তারা এটা জোড় দিয়েই বলছিল যে মুজিবের বিরুদ্ধে তাদের কোন বিদ্বেষ নেই। কিন্তু মুজিব হত্যার মাত্র ১৬ দিনের মাথায় ৩১ আগস্ট চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

                চীনের স্বীকৃতি লাভ বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোতে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এই সংবাদপত্রগুলো চীনকে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে দেখত। ঢাকার একটি সংবাদপত্রে প্রথম পাতায় সম্পাদকীয়তে লেখা হয়  বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এখন নিরাপদ। 

                আগের জাতীয় পোষাকে এখন আর চলছিল না। এখন দরকার হয়ে পড়ল আরেকটু বেশি ইসলামিক কোন কিছুর।

                যখন মন্ত্রীসভায় নতুন জাতীয় পোষাক কি হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা চলছিল, তখন মোস্তাক তার মাথার টুপি খুলে টেবিলের উপর রাখেন। এই ইঙ্গিতটি বুঝতে পেরে একজন মন্ত্রী প্রস্তাব করেন গলাবন্ধ একটি লম্বা কোট এবং মাথায় টুপি হওয়া উচিৎ নতুন জাতীয় পোষাক। প্রস্তাবটি সর্ব সম্মতভাবে মন্ত্রী সভায় পাশ হয়ে যায়।

                এটি ছিল আসলে পাকিস্তানের জাতীয় পোষাক। মোস্তাক শুধু জিন্নাহ টুপিটি বদলিয়ে দেন।

                কোথা থেকে তারা অতি অল্প সময়ে এতগুলো মোস্তাক টুপি জোগাড় করেছিল? এগুলো ভারত থেকে অর্ডার দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল।

                সকল রাষ্ট্রীয় প্রকাশনায় মোস্তাক টুপি বিশেষভাবে দেখানো হত। মতা নিয়ে এক ধরণের লড়াই তখন চলছিল, কেউ নিশ্চিত ছিলেন না আসলে তখন কে দেশ চালাচ্ছিল। অভ্যুত্থানকারী মেজররা রাষ্ট্রপতির আদেশ অমান্য করছিলেন, সেন সদর দপ্তর রাষ্ট্রপতি আর এই মেজরদের মতাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করছিলেন।

                সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস সেনা সদর দপ্তর থেকে একজন অফিসার ফোন করে নির্দিষ্ট কিছু খবর প্রকাশ করার নির্দেশ কে দিয়েছেন সেটা জানতে চান। জবাব আসে এই খবরগুলো প্রকাশের নির্দেশ এসেছে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিবের কাছ থেকে। খবরগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেন অফিসার।

                কার নির্দেশ মেনে কাজ করতে হবে?

                একজন মুসলিমের জন্য যে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া বাধ্যতামূলক, মোস্তাক তার চেয়ে বেশি নামায পড়তে লাগলেন।

                পাকিস্তানি সুর

                পাকিস্তান আমলে সেনা বাহিনী কর্তৃক অভূত্থানের মাধ্যমে প্রতিটি বেসামরিক সরকার উৎখাতের পেছনে অজুহাত হিসেবে দেখানো হত  গৃহযুদ্ধকে।

                অজুহাত হিসেবে তার চেয়েও বেশি শোনা গেছে  ইসলাম হুমকির মুখেএরকম অজুহাত। দেশ বিভাগের পর একদম শুরু থেকেই এই অজুহাত এত বেশি ব্যবহৃত হয়ে এসেছে যে একবার তুরস্কের রাজা ফারুক বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে পাকিস্তানিরা মনে করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে ইসলাম বলতে কিছু ছিল না। ঢাকার একজন সম্পাদক ফারুকের কথাই একটু অন্যভাবে লিখেছিলেনমোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সহায়তায় ব্রিটিশরা পাকিস্তান তৈরি করার আগে ইসলাম কখনোই এতোটা বিপন্ন ছিল না।

                পাকিস্তান শুরু থেকেই একটি বাফার স্টেট  হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছিল, এবং আগে বা পরে সেনাবাহিনী সেখানে মতা দখল করতই; সর্বোপরি পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরু থেকেই  ইসলাম হুমকির মুখে  এই সুরের সাথে তাল মিলিয়ে চলা হয়েছে।

                জেনারেল জিয়াউল হক বেশ গর্বের সাথেই বলেছেন, “শান্তিপূর্ণ অভ্যুত্থানের একটি ঐতিহ্য আমরা গড়ে তুলেছি। 

                অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার উৎখাত করার ঐতিহ্য!

                অন্যদিকে বাংলাদেশের মানুষের ছিল দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস এবং যে সমস্ত রাজনীতিবিদ সেনানায়ক সাম্প্রদায়িকতা লালন করতেন তাদের এদেশের মানুষ সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখান করেছিল। তারপরও যেদিন মুজিবকে হত্যা করা হয়েছিল সেদিন এবং তার পরেও এদেশে  গৃহযুদ্ধআরহুমকির মুখে থাকা ইসলাম  এমন সব পাকিস্তানি সুর বাজানো হয়েছিল।

                বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই এদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং মুজিবের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করেছিলেন তাদের কেউ কেউ চক্রান্তে যুক্ত ছিলেন। তারা ভেতরে থেকেই চক্রান্ত করছিলেন। তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন বলে যে সাধারণ বিশ্বাস ছিল তা তাদের কাজ সহজ করে দিয়েছিল। এদের বদলে যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলেন তারা অভূত্থান করতেন তাহলে সাথে সাথেই এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠত।

                ১৫ আগস্টের তিনটি আক্রমণকারী দলের নেতৃত্বে যে মেজররা ছিলেন তারা সবাই ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৈরি এবং অধিকাংশ পাকসেনা অফিসারদের মতই তারাও মনে করতেন তাদের জন্ম হয়েছে শাসন করার জন্য এবং নিজেদের মহৎ মনে করার বিভ্রমে আক্রান্ত ছিলেন তারা মেজর ফারুক ছিলেন এদের মধ্যে সবার আগে।

                এই মেজরদের মধ্যে কয়েকজন পাকিস্তানেরঅপারেশান ফনিক্স অংশ ছিলেন।

                ইসলামের নামে পাক দখলদার বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে এত বেশি অপকর্ম সংঘটিত করেছিল যে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এমন কি;  ইনশাআল্লাহ  বাআসসালামুআলাইকুম  এর মত নিত্যদিনের সম্ভাষণ শুনলেও অনেক মুক্তিযোদ্ধা ক্ষোভে ফেটে পড়তেন। এসব মুক্তিযোদ্ধাদের ভাইদের পাকিস্তানিরা হত্যা করেছিল এবং বোনদের সম্ভ্রমহানী করেছিল; আর এই শব্দগুলো শুনলে তাদের সেসব পাকিস্তানিদের কথা মনে পড়ে যেত।

                এসব অপকর্ম এস মাসুদুর রহমান নামে একজন শীর্ষস্থানীয় পাকিস্তানি সাংবাদিকের কাছে এতটাই খারাপ লেগেছিল যে তিনি পাকসেনাদের খুনী, লুটেরা ধর্ষক বলেছিলেন।

                কিন্তু পাকসেনারা পূর্ব পাকিস্তানে তাদের অপকর্ম নিয়ে গর্বিত ছিল। পাক সেনাদের মনে এমন ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে তারা বাঙালীর আরও হাজার বছর শাসন করবেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে যখন পাক সেনারা ধরে নিয়েছিল যে বাঙালীর স্বাধীনতার চেতনাকে চিরতরে গুড়িয়ে দিতে সম হয়েছেন, তখন পাক বাহিনীর একজন কর্নেল বলেছিলেন, “এই ভূখণ্ডটি এখন আর কায়েদ আজমের পাকিস্তানের অংশ নয়, বরং এটি অমাদের বিজিত ভূমি। বাঙালীরা এতদিন ঔপনিবেশিকতার কথা বলেছে, এখন তারা ঔপনিবেশিকতার প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারবে। তারা আর কখনো এমন কি স্বাধীনতার স্বপ্নও দেখবে না।

                ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে একজন পাকিস্তানি মেজর ডের স্পেইগেল কে বলেনতাদের মধ্যে এমন আতঙ্ক সৃষ্টি করতে হবে যেন বাঙালীর তৃতীয় প্রজন্মও এটা মনে রাখে। 

                এরপরও চার বছরের মধ্যেই ফারুক এবং রশিদ পাক বাহিনী ইসলামের নামে এদেশের মানুষের উপর যে নির্যাতন চালিয়েছিল তা ভুলে যান।

                সানডে টাইমসে ৩০ মে ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ফারুক বলেন, “মুজিব তার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছিলেন। ইসলাম হল এদেশের মানুষের ধর্ম, আর এই একটি জিনিসই সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দিতে পারে।

                ফারুক আরও বলেন, “মাত্র সাড়ে চার বছর সময়ের মধ্যেই মুজিব বাংলাদেশকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলেন। তার মতে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালীন প্রায় ২০ লক্ষ লোকের প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। প্রকৃত সংখ্যাটি ৩০ লক্ষ, ২০ লক্ষ নয়।

                কিন্তু ফারুক তার বক্তব্যে ভুলক্রমে শেখ মুজিবের শাসন আমল এক বছর বেশি বলেছিলেন, যা তার পক্ষে বেশ বেমানান ছিল। খুব সম্ভবত তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি যে দিন মুজিব তার পাকিস্তানে বন্দী দশা শেষ করে ঢাকায় ফেরত আসেন তার পরিবর্তে ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে মুজিবের শাসনামল হিসেবে গণনা করেছিলেন। তারিখে মুজিব এবারের  সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামএই ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন।

                এমন কি হতে পারে যে ফারুকও ইয়াহিয়া খানের মতোই মনে করেন মুক্তি সংগ্রামের সময় বাঙালী জাতিকে যে দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তার জন্য মুজিব দায়ী, যদিও কথা তার সরাসরি বলার সাহস ছিল না?”

                ফারুক সেই সব অতি ব্যবহৃত রাজনৈতিক ফাঁকা বুলি ব্যবহার করেছিলেন যা সাধারণত সুযোগ সন্ধানীরা ধর্মকে তাদের নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ আদায়ে ব্যবহার করে থাকেন। এমন কি পাকিস্তানের সবচেয়ে পথভ্রষ্ট জেনারেলের এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট রাজনীতিকরাও একথা বলতেন যে বাঙালী নেতারা প্রকৃত মুসলিম নন।

                কুয়েতের দৈনিক আল রাই আল আমানকে তাহেরউদ্দীন ঠাকুর বলেন, “শেখ মুজিবের মৃত্যুর ফলে দেশ গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা পেয়েছে।

                তাদের দয়া দেখাবার জন্যই নিষ্ঠুর হতে হয়েছে, এমন কি নারী শিশুদেরকেও তারা হত্যা করেছিলেন দেশ কে বাঁচাবার জন্যই।

                গর্বের সাথে ঠাকুর আরও যোগ করেন, “আমরা অভ্যুত্থানের স্বীকৃতিও চাইনি, শুধু সরকারে পরিবর্তন এনেছি।আর কিছুই না।

                এটা একটি ব্যতিক্রমী অভ্যুত্থান ছিল; এখানে পরিবর্তনের চেয়ে ধারাবাহিকতার উপর জোড় বেশি দেয়া হয়েছিল। ষড়যন্ত্রকারীরা সবাইকে এটাই বোঝাতে চেয়েছিল যে তারা যদি কোন ধরণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেষ্টা না করে তাহলে তাদের কোন তি তো হবেই না বরং থেকে তাদের লাভ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

                রশিদ বলেন তার এমন একজন মুখপাত্রের দরকার ছিল যে জনগণকে এটা ভাবতে বাধ্য করবে-“আমাদের ধৈর্য ধরে দেখা উচিৎ শেষ পর্যন্ত কি হয়।জনগণ একটু দ্বিধান্বিত থাকলেই অল্প সময়ের মধ্যে তারা এই অভ্যুত্থানকে নিজেদের নিয়তি বলে মেনে নিবে এবং অত্যুত্থানকারীরা নিরাপদে সরে যেতে পারবে।

                ১৫ আগস্ট সকালে যখন মেজররা একটু দ্বিধায় ছিলেন যে শেখ মুজিবের মৃত্যুর খবর প্রচার করা হবে কি না, তখন তাহের উদ্দীন ঠাকুর তাদের খবরটি প্রচারে চাপ দিয়ে বাধ্য করেন। ঠাকুরের মতে শেখ মুজিবের মৃত্যুর খরব প্রচারে কিছু ঝুঁকি রয়েছে ঠিকই, কিন্তু যদি জনতা ভাবতে শুরু করে মুজিব জীবিত তাহলে বিপদের সম্ভাবনা আরও বেশি। মুজিব জীবিত এমন ধারণা জনমনে থাকলে জনগণ সেনা আইন ভঙ্গ করে ১৯৭১ সালের মত রাস্তায় নেমে আসতে পারে।

                ঠাকুরের সিদ্ধান্তই ঠিক ছিল: মুজিবের হত্যার সংবাদে সবাই হতবাক হয়ে পড়ে, প্রতিবাদ করতে পারে এমন ব্যক্তিরা এতটাই হতাশ হয়ে পড়েন যে দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সবাই বাড়িতেই থেকে যান, যদিও তারা জানতেন যে তাদেরও হত্যা করা হতে পারে।

                এদের মধ্যেই একজনকে আগস্টের হত্যাযজ্ঞের অনেক পরে যখন শুভাকাক্ষীরা তার  ইস্পাতের মত দৃঢ় স্নায়ুর  জন্য প্রশংসা করেন তখন তিনি বলেন, “সেই সকালে আমি এতটাই বিহবল হয়ে পড়েছিলাম, যেন আমার স্নায়ুগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছিল যেখানে মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে সেখানে আমার জীবনের পরোয়া করে কোন লাভ নেই। সবকিছুকেই তখন নিল আর অর্থহীন লাগছিল। 

                অভ্যুত্থানের কিছু সময় পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের তরুণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন () বলেন, “এই অভূত্থান আমাকে একটুও অবাক করেনি। কূটনৈতিক মহলে বেশ কিছুদিন ধরেই নিয়ে গুঞ্জন ছিল। জুলাই মাসে একজন কূটনীতিক আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন আসন্ন অভ্যুত্থানটি কারা করবে, কট্টর ডানপন্থীরা না কি কইর বামপন্থীরা।

                কট্টর ডান বা বাম গোষ্ঠীর মধ্য থেকে ছাড়া আর কারও অভূত্থান করার সম্ভাবনা ছিল না।

                 দুই গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্যগুলো এতোটাই অস্পষ্ট যার সাথে তুলনা করা যায়। দুটি দেশের যার মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে এমন একটি নদী যা প্রায়শই পথ পরিবর্তন করে। 

                একটু থেমে মঞ্জু আরও যোগ করেন, “শেখ মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন যে তার পক্ষে পুরো দেশের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়, তিনি নিজেও তাই আর বাঁচতে চাননি।

                মুজিব প্রায়ই মৃত্যুর কথা বলতেন। ১৯৭১ সালের মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ আয়োজিত যে বিশাল সমাবেশে তিনি ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন সেখানে তিনি বলেছিলেন, “মনে রাখবে আমি কখনোই দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিবনা, এমন কি এজন্য মৃত্যুর