হক ভাসানী সোহরাওয়ার্দী মুজিব - রামেন্দ্র চৌধুরী

   অভিমুখ 

 স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের (১৯৭১ খ্রি.) প্রসঙ্গে প্রথম এবং প্রধানতম নামটি হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রাসঙ্গিক পূর্বাপর রাজনীতির আলােচনায় অনিবার্যভাবেই উঠে আসে আরাে তিনটি নাম : শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী। তাঁদের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মত-পথ নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা বিতর্ক থাকলেও ইতিহাসের স্বীকৃত সত্য হচ্ছে, এঁরাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক চালচিত্রের চারপ্রধান। কখনাে এককভাবে, কখনাে একত্রে, এমনকি কখনাে পারস্পরিক মতভেদবৈপরিত্বের ভেতর দিয়েও, প্রধানত তাঁরাই বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপট নির্মাণ এবং প্রভাবিত করেছিলেন। নিঃসংশয়ে বলা যেতে পারে, অতীতের মতই আগামীতেও বহুকাল এঁরা প্রবল প্রাসঙ্গিক থাকবেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে। প্রাজ্ঞজন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর একটা তর্কাতীত পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করা যেতে পারে শুরুতেই : “ইতিহাস একদিকে যেমন সত্যবাদী, আবার অন্যদিকে তার রয়েছে এক ধরণের হেঁয়ালিপনা। খ্যাতিমানের খ্যাতির পাশাপাশি রয়েছে অখ্যাতি। যিনি বীর, তিনিই আবার অবরেণ্য দুর্জন। যে যেভাবে দ্যাখে। সবাই একজন প্রকৃত বীরকে বীরের সম্মান দেবে না, দেয়নি।  ইতিহাসবিদেরাও সবাই সবক্ষেত্রে একমত হতে পারে না। দলীয়-সাম্প্রদায়িক আনুগত্যের বাইরে সবাই নন, যদিও ইতিহাস তাই দাবি করে”(১(১)/৬৫)। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এক আলােচনায়। বাংলাদেশের সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের উল্লেখ করে বলেছিলেন : হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, এ কে ফজলুল হকের মত অভিজ্ঞ নেতারাও। অনেক অবদান রেখেছেন। কিন্তু অপেক্ষাকৃত তরুণ হয়েও একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না” অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, “শেখ মুজিবুর রহমান একটি মহাকাব্যের নায়ক ছিলেন। এই মহাকাব্য জাতীয়তাবাদের । সকলকে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন, ছাপিয়ে উঠেছেন। কেন পারলেন? অন্যরা কেন পারলেন? প্রধান কারণ সাহস। শেখ মুজিবের মত সাহস আর কারাে মধ্যে দেখা যায়নি। ফাঁসির মঞ্চ থেকে তিনি একাধিকবার ফিরে এসেছেন, আপােষ না করে। শেখ মুজিবের সাহস ব্যক্তিগত স্বার্থের পুষ্টিসাধনে নিয়ােজিত হয়নি। তিনি তাঁর দলের লােক ছিলেন, শ্রেণীরও ছিলেন। কিন্তু পার হয়ে গিয়েছিলেন ওই দুই সীমান্ত, পরিণত হয়েছিলেন জনগণের নেতায়। সাহস মওলানা ভাসানীরও ছিল। ভাসানী পাকিস্তানি শাসকদের দেখেছেন, ওই শাসকদের পেছনে সাম্রাজ্যবাদীদের সমর্থনটাও দেখতে পেয়েছেন। দেখেছেন সামন্তবাদকেও। শেখ মুজিবের দেখাটা ছিল সেই তুলনায় সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট। স্বাধীনতা ছাড়া অন্য সবকিছুই যে অসম্ভব, এটা তিনি বুঝে নিয়েছিলেন লক্ষ্য নির্দিষ্ট ও প্রত্যক্ষ ছিল বলেই তার জন্য সাফল্য এল, মওলানার সাফল্যটা কোনাে কেন্দ্রীভূত ও দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপ নিল না” (১(২)/৭৮০-৭৮১)। হক-ভাসানী-সােহরাওয়ার্দী-মুজিব প্রমুখ চারজনই রাজনীতির মানুষ, আর তাই, সংজ্ঞা-নির্ধারিত জীবনী নয় বরং রাজনীতির আয়নায় প্রতিফলিত তাঁদের জীবনের দিকে ফিরে তাকাতে চাই। ভারত-ভাগের(১৯৪৭) আগে, বাংলার চারটি ভিন্ন স্থানে, এবং ততােধিক উল্লেখ্য, চারটি ভিন্ন আর্থ-সামাজিক পরিবেশে জন্ম হয়েছিল চারজনের। সাধারণ পর্যালােচনাতেই এ-সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, তাঁদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণ-কর্মকে আজীবন প্রভাবিত করেছে শৈশব অভিজ্ঞতার পারিবারিক এবং আর্থ-সামাজিক পরিবেশ। এমনটি হওয়াই স্বাভাবিক। বিজ্ঞানের পরীক্ষালব্ধ সত্য হচ্ছে, “Any living being is a product of heredity and environment । বিরল ব্যতিক্রম থাকতেই পারে, কিন্তু ব্যতিক্রমটা সাধারণ নিয়ম নয়। তদানীন্তন বাংলার আর্থ-সামাজিক পারিপার্শ্বিকতার দিকে, সংক্ষেপে হলেও নজর ফেরালে বাংলাদেশের রাজনীতির চার-প্রধানের জীবন ও কর্মের উপলব্ধি সহজ হতে পারে। গােলাম মুরশিদ লিখেছেন : “দুই বাংলায়  ১৮৮০ সালের দিকে মুসলমানদের সংখ্যা হিন্দুদের ছাড়িয়ে যায়। মুসলমানরা বেশির ভাগ বাস করতেন পূর্ব বাংলায়; আর হিন্দুদের বেশির ভাগ পশ্চিম বাংলায় । শ্রেণী হিসেবেও বাঙালিদের পরিষ্কার দু টি ভাগ ছিলাে। আগে সমাজের উপর তলায় বাস করতেন উচ্চবর্ণের হিন্দুরা আর সামান্য কিছু উর্দু-ভাষী মুসলমান। বাকি শতকরা ৯০ জনেরও বেশি ছিলেন গ্রামের মুসলমান আর নিচু জাতের হিন্দু।  চাষী, জেলে, কামার, কুমাের, লেখাপড়া শেখার প্রয়ােজন তারা বােধ করেননি” (২/১১)। “উচ্চ শ্রেণীর মুসলমানের সংখ্যা ছিল মুসলমানদের শতকরা দু’ভাগের চেয়েও কম। তারা বেশির ভাগই এসেছিলেন বাংলার বাইরে থেকে। তাদের অনেকেই তাই নিজেদেরকে বাঙালি বলে শনাক্ত করতেন না। সমাজে মস্ত পরিবর্তন এসেছিলাে ইংরেজ আমলে। রাজধানী আসে কলকাতায়। এ জায়গায় যারা বাস করতেন, তারা বেশির ভাগ ছিলেন হিন্দু। মুসলমানও ছিলেন, কিন্তু তাঁরা ছিলেন আধাবাঙালি, কথাবার্তা বলতেন উর্দুতে” (২/১২-১৩)। সারা বাংলায় স্বদেশী আন্দোলনের প্রবল জোয়ার ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনার সৃষ্টি করতে পারেনি। রবীন্দ্র-বয়ানে তার কারণ-সন্ধান করেছেন আবদুশ শাকুর : “এ দেশের কোন সফল কীর্তি আমরা আশা করতে পারি? আদুরে ছেলের মত আমরা আব্দারের ঠোঁট ফুলিয়ে ভাঙবার কাজেই আছি। স্বদেশী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। যে নূতন চেতনা আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল তারপরে একটা প্রাপ্তির সম্ভাবনা যেমনই ঘটল, অমনই শুরু হল স্বার্থের সংঘাত । অপঘাত ঘটতে বিলম্ব হল না। সেই মহৎ আদর্শকে আমরা আর ফিরে পাইনি। স্বার্থের পাঁকেই গড়াগড়ি দিয়ে মাতামাতি করেছি”(৩/২২৬)। সাহিত্যিক-সাংবাদিক-রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন :“ধর্ম ও কৃষ্টির ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম দুইটা স্বতন্ত্র সমাজ আগে হইতেই ছিল। অর্থনীতিতে মুসলমানদের অধঃপতনে জীবনের সকল স্তরে হিন্দু ও মুসলমান দুইটা পৃথক জাতি (এভাবে ‘জাতি  গঠিত হয় কিনা, তা এখানে আলােচ্য নয় -র.চ.) হইয়া গেল। পরিস্থিতিটা এমন হৃদয় বিদারক ছিল যে কংগ্রেসের নিষ্ঠাবান কর্মী হইয়াও আমি কংগ্রেস সহকর্মীদের সামনে জনসভায় কঠোর ভাষায় এই পার্থক্যের কথা  বলিতাম : বাংলার জমিদার হিন্দু প্রজা মুসলমান; বাংলার মহাজন হিন্দু খাতক মুসলমান; উকিল হিন্দু মক্কেল মুসলমান;..ইত্যাদি ইত্যাদি। যতই বলিতাম ততই উত্তেজিত হইতাম”(৪/১৬১-১৬২)। এমন পরিস্থিতিকেই যথার্থ অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক : “পলিটিকস্ অব বেঙ্গল ইজ ইন রিয়েলিটি ইকনমিকস্ অব বেঙ্গল। বাংলার অর্থনীতিই বাংলার আসল রাজনীতি”। অর্থনীতি ও রাজনীতির আন্ত-সম্পর্কের বিষয়টি দেশ-কাল নির্বিশেষেই অনস্বীকার্য বটে। বামপন্থী রাজনীতিক-লেখক অজয় রায় বলছেন, “মধ্যযুগে ভারতবর্ষের যে অঞ্চল বঙ্গ হিসেবে খ্যাত ছিল তার মধ্যে বর্তমান বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ অঙ্গীভূত ছিল । তবে ভাষার ঐক্য যে এই অঞ্চলের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী জনগােষ্ঠীকে পুরােপুরিভাবে ঐক্যবদ্ধ করে সংহত এক জাতিসত্তায় পরিণত করতে পারেনি তা তাে পরবর্তী কালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান দাবির সপক্ষে বাংলার মুসলিম জনগণের বিপুল সমর্থন থেকে প্রমাণিত। সেদিন এই ঘটনার পিছনে এখানে জাতীয় কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির অভাব, ব্রিটিশ সরকারের বিভেদ নীতি। প্রভৃতি কাজ করেছে, এটা সত্য, তবে তার সাথে এটাও সত্য যে, এ দেশের মানুষ ধর্ম ও অন্যান্য বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে তখনাে সংহত জাতিগঠনের পর্যায়ে পৌঁছুতে পারেনি” (৫/৭)। সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক অনুপম সেনের পর্যবেক্ষণ : ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা বাংলাদেশ দখল করার পর, “পারস্পরিক  বিদ্বেষের ফলে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম একশ’ বছরে বাংলার মুসলমানেরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হয়। মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের হিন্দু মধ্য-শ্রেণীর একাংশ বিভিন্ন রাজকার্যে নিয়ােজিত হওয়ার লক্ষ্যে ফারসি ভাষার চর্চায় বিপুলভাবে মনােনিবেশ করেছিল।  ফারসির বদলে যখন (১৮৩৭) ইংরেজিকে রাষ্ট্রপরিচালনার ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হল তখন তারা ইংরেজি চর্চায় মনােনিবেশ করে। কিন্তু মুসলমান অভিজাত শ্রেণীর পক্ষে ব্যাপারটা অত নির্দ্বন্দ্ব ছিল না।  স্যার সৈয়দ আহমদ আলীগড় আন্দোলনের (১৮৫৭-পরবর্তী) মাধ্যমে মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানানাের পরেই কেবলমাত্র কিছু কিছু মুসলমান ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করে।  মুসলিম মধ্য শ্রেণীর বিকাশ হিন্দু মধ্য শ্রেণীর বিকাশের তুলনায় প্রায় অর্ধশতাব্দী পিছিয়ে পড়ে। এই অসম বিকাশের কারণেই এই উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সুষম বিকাশ হয়নি”(6/vi)। হিন্দু-মুসলমান রাজনৈতিক বিভেদ-বিভাজনের কথা বলি অসম বিকাশের কথা কিংবা সামাজিক সাম্প্রদায়িকতার কথা, বিচার্য এমন প্রেক্ষাপটেই। আন্তরিক উপলব্ধির প্রয়ােজনে, এসব কথা স্মরণে রেখেই বারবার ফিরে তাকাতে হবে হক-ভাসানী-সােহরাওয়ার্দী-মুজিবের দিকে। 

  চার প্রধানের উৎস সন্ধান : জন্ম, পারিবারিক পরিচয়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ এবং কর্মজীবনের শুরু। 

  এক নিঃশ্বাসে যখন হক-ভাসানী-সােহরাওয়ার্দী-মুজিব বলা হয়, তখন তাঁদের পর্যায়ক্রমিক প্রবীণতার দিকটিও জানা হয়ে যায়। এঁদের মধ্যে শেরে বাংলা ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২) ছিলেন প্রবীণতম আর বঙ্গবন্ধু মুজিব (১৯২০-১৯৭৫) কনিষ্ঠতম। শেরে বাংলা বিভিন্ন উপলক্ষেই মুজিবকে  নাতি  বলে উল্লেখ করেছেন আর ভাসানী (১৮৮০-১৯৭৬ খ্রি.) ‘পুত্রসম’ বিবেচনা করতেন মুজিবকে। সােহরাওয়ার্দীর (১৮৯২-১৯৬৩) বিবেচনায় ‘One of my star organisers’ ছিলেন মুজিব। তারা তিনজনই ছিলেন মুজিবের নেতা এবং রাজনৈতিক গুরু। প্রসঙ্গতই উল্লেখ্য যে, রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্রে গুরু-শিষ্যে মতান্তর হয়েছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণেই, কিন্তু কেউ কখনাে মুজিবকে সরাসরি পরিত্যাগ করেননি। অপরদিকে মুজিব তাঁর নেতা বা গুরুদের সাথে বিভিন্ন সময়ে প্রবল মতভিন্নতার কারণে আপত্তি-অভিমান প্রকাশ করলেও অভিযােগ-বিরােধিতা করেননি কখনাে, সতত সম্মান প্রদর্শন করেছেন যথােচিতভাবেই । লেখক, সংস্কৃতিজন মফিদুল হক উল্লেখ করেছেন, কোলকাতায় ছাত্রজীবনে (১৯৪২- ৪৭) “ফজলুল হকের সান্নিধ্যে এলেও শেখ মুজিব অধিকতর আকৃষ্ট হয়েছিলেন হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী দ্বারা। ফজলুল হকের রাজনীতির তখন এক অস্থির পর্ব চলছে। কৃষক-প্রজা পার্টি গঠন করে বাংলার প্রজাকুলের মধ্যে আলােড়ন তুললেও ফজলুল হক রাজনীতিতে স্থিরপ্রত্যয়ী ছিলেন না। পক্ষান্তরে সােহরাওয়ার্দী বৈপ্লবিক না হলেও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ছিলেন স্থিতধী এবং  মুসলিম অভিজাতগােষ্ঠী তথা নবাব পরিবারের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিরােধী। শেখ মুজিবকে বিশেষ স্নেহ দিয়েই বরণ করেছিলেন সােহরাওয়ার্দী এবং তাঁর কাছেই শুরু হয় মুজিবের রাজনীতির পাঠ”(১(৩)/১৫১৮-১৫১৯)। ব্রিটিশভারতে কোলকাতা-কেন্দ্রিক রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতায় হক সােহরাওয়ার্দীর পরে আসে ভাসানী-মুজিবের নাম। ব্রিটিশ-ভারতে রাজনীতিতে যুক্ত হলেও ভাসানী-মুজিব গুরুত্ব অর্জন করেছিলেন দেশ-বিভাগের পরে ঢাকা-কেন্দ্রিক রাজনীতিতে। আলােচ্য চার-প্রধানের প্রবীণতম আবুল কাসেম ফজলুল হকের জন্ম বরিশাল। (বর্তমান ঝালকাটি) জেলার সাতুরিয়া গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস বরিশাল জেলার চাখার গ্রামে। শেরে বাংলার পিতা মােহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ছিলেন বরিশাল জেলার একজন খ্যাতনামা উকিল। মেধাবী ছাত্র ফজলুল হক বরিশাল জেলা স্কুল এবং কলিকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে লেখাপড়ার পর ১৮৯৫ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতশাস্ত্রে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৯৭ সালে ডিস্টিংশনসহ বি.এল. পাস করে স্যার আশুতােষ মুখােপাধ্যায়ের সহকারী হিসেবে কলিকাতা হাইকোর্টে আইনব্যবসা শুরু করেন। তারপর কিছুকাল কলেজে অধ্যাপনা এবং ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি করে ১৯১১ সালে আবার হাইকোর্টের আইন ব্যবসায়ে ফিরে আসেন” (৭(৪)/২)। “ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি ছেড়ে দেয়ার পর হতে মৃত্যু পর্যন্ত ফজলুল হক সক্রিয় রাজনীতি করেছেন। কিন্তু মত ও পথ, লক্ষ্যাদর্শ সম্পর্কে তার কখনও কোন সুস্পষ্ট ধারণা অথবা আস্থা ছিল বলে মনে হয় না। একাধিকবার তিনি ক্ষমতা ও সুনামের সর্বোচ্চ শিখরে উঠেছেন; কিন্তু কোনােটাই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবু পল্লীবাংলার মানুষ তাকে ভালােবেসেছে, মনে করেছে, তিনি এক বটবৃক্ষ যার ছায়া তাদের জন্য বরাভয়। ফজলুল হক পল্লীবাংলার দুঃখী মানুষের আপদে বিপদে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেনও। ফজলুল হক সাহেবকে মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলিম সমাজের নির্মাতা বললে অত্যুক্তি হয় না। 

 …সুনির্দিষ্ট মতাদর্শের অভাব এবং সুবিধাবাদী রাজনীতি সত্ত্বেও ফজলুল হক সাহেব বাঙালির ইতিহাসে একজন স্মরণীয় ব্যক্তি”(৮/১৯১-১৯২)। কৃষক-দরদী নেতা হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর জন্ম “সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে পিতার নাম হাজী শরাফত আলী খান। অল্প বয়সে পিতামাতার মৃত্যু হলে এক চাচার আশ্রয়ে থেকে মাদ্রাসায় পড়াশােনা করেন। মাদ্রাসা-শিক্ষার শেষে টাঙ্গাইল জেলার কাগমারির এক প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যােগ দেন। এখানে কৃষকদের ওপর জমিদার-মহাজনদের শােষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তােলার চেষ্টা করেন। এজন্য তাঁকে কাগমারি ত্যাগ করতে হয়। তিনি আসামের জলেশ্বর চলে যান। সেখানে সুফী সাধক শাহ নাসিরউদ্দিন বােগদাদীর ইসলাম প্রচার মিশনে তিন বছর কাজ করেন। তারপর বােগদাদীর উৎসাহে উত্তর ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় গিয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন” (৭(৪)/২৪০-২৪১)। উল্লেখ্য যে, “আসামের ধুবড়ি জেলার ভাসানচরে 

  বাঙালি কৃষকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করার সময় সেখানকার কৃষকসমাজ তাঁকে ‘ভাসানীর মওলানা  বলে ডাকতে শুরু করলে তিনি ‘ভাসানী’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেন। মওলানা ভাসানী ‘মজলুম জননেতা পরিচয়ে বিখ্যাত হয়ে আছেন।। শহীদ সােহরাওয়ার্দী “১৮৯২ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর কলিকাতা মহানগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা স্যার জেহাদুর রহিম জাহিদ সােহরাওয়ার্দী ছিলেন কলিকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি। তিনি কলিকাতা মাদ্রাসা-ই-আলীয়া, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশােনা করেন। ১৯২০ সালে দেশে ফিরে তিনি কলিকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন” (৭(৫)/৩৪০) । ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন বলছেন, “সােহরাওয়ার্দী বাঙালি নন, যদিও একসময় আলাদা বাংলা রাষ্ট্রের প্রস্তাব করেছিলেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু তাঁকে গুরু মানতেন, সেজন্যই হয়তাে অনেকের ধারণা তিনি বাঙালি” (১(১)/২৯২)। পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে তাঁর যতটা গ্রহণযােগ্যতা ছিল, পশ্চিম পাকিস্তানে আদৌ ততটা ছিল না। 

 বৈরুতের হােটেলে মৃত্যুর পরে, স্বজন-পরিজনের সম্মতিতেই তাকে ঢাকায় সমাহিত করা হয়। সুতরাং জন্মসূত্রে যা-ই হােক, বাংলা এবং বাঙালির রাজনীতিবিদ হিসেবেই সােহরাওয়ার্দী স্মরণীয়। তিনি গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ পরিচয়ে উল্লিখিত হয়ে থাকেন। “বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক ও প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০সালের ১৭ই মার্চ ফরিদপুর (বর্তমান গােপালগঞ্জ) জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান এবং মাতার নাম সাহেরা খাতুন। তিনি গােপালগঞ্জ থেকে স্কুলের পড়াশােনা সমাপ্ত করে কলিকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৪৭ সালে বি.এ.  পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন”(৭(৫)/২০৪)। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীদের ন্যায্য দাবিদাওয়ার আন্দোলনে (১৯৪৯) জড়িয়ে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটেছিল। পারিবারিক পরিচয় প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু নিজেই উল্লেখ করেছেন : “টুঙ্গিপাড়ার শেখ বংশের নাম কিছুটা এতদঞ্চলে পরিচিত। শেখ পরিবারকে একটা মধ্যবিত্ত পরিবার বলা যেতে পারে । শেখ বােরহানউদ্দিন নামে এক ধার্মিক পুরুষ এই বংশের গােড়াপত্তন করেছেন বহুদিন পূর্বে। শেখ বংশের যে একদিন সুদিন ছিল, তার প্রমাণস্বরূপ মােগল আমলের ছােট ছােট ইটের দ্বারা তৈরি চকমিলান দালানগুলি আজও আমাদের বাড়ির শ্রীবৃদ্ধি করে আছে। এই বংশের অনেকেই এখন এ বাড়ির চারপাশে টিনের ঘরে বাস করেন। আমি এই টিনের ঘরেই জন্মগ্রহণ করি । শেখদের আভিজাত্যটাই থাকল, অর্থ ও সম্পদ শেষ হয়ে গেল” (৯/১-৫)। 

 বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান লিখেছেন, “রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ক্ষণজন্মা পুরুষ। তাই বলে জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তারা ক্ষমতার অধিকারী হয়ে জন্মান না। বংশ, বিদ্যা, বুদ্ধি ও বিত্তের ওপর রাজনৈতিক প্রতিপত্তি অনেকখানি নির্ভর করে। শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে এসবের কোনােটারই বিশেষ ভূমিকা ছিল না । শেখ মুজিবকে কর্মী হিসেবে অন্যদের প্রশংসা কুড়াতে হয়েছে। কর্মী থেকে আঞ্চলিক নেতা এবং আঞ্চলিক বা গােষ্ঠী নেতা থেকে সারা দেশের নেতা হতে শেখ মুজিবকে নিরলস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে হয়েছে”(১(১)/৮৯)। সােহরাওয়ার্দীর জন্ম কোলকাতা মহানগরের সমৃদ্ধ চাকরিজীবী পরিবারে। সােহরাওয়ার্দীর পিতৃপরিবারে দৃশ্যমান স্বাচ্ছল্য থাকলেও স্থায়ী সম্পদ-ভিত্তি ছিল না। বাকি তিনজনেরই জন্ম পূর্ব বাংলার গ্রামীণ পরিবেশে। অর্থনৈতিকভাবে ফজলুল হক ছিলেন উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবেরের সন্তান। ভাসানী এসেছিলেন বিত্তহীন পরিবার থেকে। শেখ মুজিবের জন্ম নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে। পারিবারিক আর্থিক অবস্থান এবং স্থানীয় পরিবেশের সুস্পষ্ট ভিন্নতাই তাঁদের রাজনৈতিক জীবনেও ভিন্নতার সূচনা করেছিল। হক-সােহরাওয়ার্দীর রাজনীতির শুরু ‘ওপরতলা’য় নেতার পরিচয়ে, বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের (প্রাদেশিক পরিষদ) নির্বাচিত সদস্য হিসেবে। অপরদিকে ভাসানী-মুজিব রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী হিসেবে। কর্মজীবনে হক-সােহরাওয়ার্দী ছিলেন আইনজীবী এবং জীবনের শেষ পর্যন্ত রাজনীতির পাশাপাশি সেই পেশা-পরিচয় গুরুত্বের সাথেই অব্যাহত রেখেছিলেন। ভাসানী-মুজিবের কার্যত কোনাে পেশা-পরিচয় ছিল না। তারা দু জনেই ছিলেন সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ। বলা চলে, জন্মসূত্রে যে পারিবারিক পরিবেশ পেয়েছিলেন, সেটিই হক-সােহরাওয়ার্দীর কর্মজীবনের গতিমুখ নির্ধারণ করে দিয়েছিল। ভাসানী টাঙ্গাইলের কাগমারিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও জমিদার-মহাজনদের বিরূপতার কারণে তিনি চাকরি ছেড়ে স্থানান্তরে | (আসামে) চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। মুজিবের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছিল সম্পূর্ণই প্রতিকূলে, তিনি আইনের ছাত্র হিসেবে পরিকল্পিত শিক্ষাজীবন সমাপ্তই করতে পারেননি। ছাত্রজীবনজুড়েই মুজিব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কার করার পর থেকেই তিনি সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ। বঙ্গবন্ধু পরিচয়ে উল্লিখিত শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জাতিরজনক এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে (বিবিসি জরিপ, ২০০৪) স্বীকৃত-সম্মানিত। স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব-আদর্শের বিরােধী জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ তারিখে বঙ্গবন্ধু মুজিবকে স্ত্রী-পুত্রপরিজনসহ নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। ঘটনাক্রমে তখন বিদেশে থাকায় বেঁচে রয়েছেন কেবল তাঁর দু কন্যা   শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। 

  হক-ভাসানী-সােহরাওয়ার্দী-মুজিব : রাজনৈতিক জীবনের সূচনার কথা। 

  হক-ভাসানী-সােহরাওয়ার্দী-মুজিব, চারজনেরই রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল ‘ব্রিটিশ-ভারত’এর অবিভক্ত বাংলায়। অতঃপর পাকিস্তানের রাজনীতিতে চারজনই অনস্বীকার্য গুরুত্বের অধিকারী হয়েছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে, পাকিস্তান। আমলের মতই নানা সংশয়-প্রশ্নের জন্ম দিলেও, এ কথা সত্য যে, রাজনীতির প্রায় সকল দৃশ্যপটেই মৃত্যুর (১৯৭৬) পূর্ব পর্যন্তই মওলানা ভাসানীর প্রত্যক্ষ কিংবা পরােক্ষ উপস্থিতি ছিল অবধারিত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে উজ্জ্বলতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আততায়ীদের হাতে নিহত (১৯৭৫) হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং রাজনীতির প্রধানতম পুরুষ। এখানেই বলে রাখা যেতে পারে, রাজনৈতিক ঘটনাক্রম এবং বাস্তবতার কারণেই বর্তমান আলােচনার সুবৃহৎ অংশ জুড়ে থাকবে বঙ্গবন্ধু মুজিবের কথা। 

  শেরে বাংলা ফজলুল হক রাজনৈতিক জীবনের সূচনাতেই বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত (১৯১৩) হয়েছিলেন। সােহরাওয়ার্দী রাজনীতিতে যােগ দিয়েছিলেন মওলানা মুহম্মদ আলী এবং মওলানা শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের আহ্বানে। তিনি “খিলাফত আন্দোলন ও স্বরাজ আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯২১ সালে তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন”(৮(৫)/৩৪০)। তাঁরা উভয়েই নিজ নিজ পছন্দ এবং পরিবেশ-প্রয়ােজনমত দল পরিবর্তন করেছেন, তবে অনস্বীকার্য যে, তাঁদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের বিষয়টি যতটা ব্যক্তিগত অবস্থান-মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যে ছিল, আদর্শের প্রশ্ন ততটা জড়িত ছিল না। তাঁরা। উভয়েই আজীবন পাশ্চাত্যধারার গণতন্ত্রে আস্থাশীল ছিলেন। শেরে বাংলার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন হয়তাে নানা পর্বেই সংশয়-বিতর্কের কারণ হয়েছে কিন্তু তিনি কখনাে সাম্প্রদায়িকতাকে সমর্থন যােগাননি। কিন্তু সােহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক জীবন এদিক থেকেও সম্পূর্ণরূপে কলঙ্কদাগ-মুক্ত নয়। 

 আর্থ-সামাজিক অবস্থানগত পার্থক্যের কারণেই ভাসানী-মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের সূচনাতে ছিল লক্ষণীয় ভিন্নতা। প্রকৃতপক্ষেই ভাসানী-মুজিব কারাে সমর্থনসহযােগিতায় নয়, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উপলব্ধি আর প্রেরণা থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন। মওলানা ভাসানী প্রথম জীবনে টাঙ্গাইল জেলার কাগমারিতে প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। সেখানে সাধারণ কৃষকদের ওপর জমিদার এবং মহাজনদের শােষণ-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলন শুরু করায় তাকে কাগমারি ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। তখন তিনি আসাম প্রদেশে চলে যান। পরবর্তী সময়ে (১৯০২) আসামেই মাত্র ২২ বছর বয়সে সন্ত্রাসবাদী (স্বদেশী আন্দোলন নামে পরিচিত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের চরমপন্থী অংশ কর্তৃক পরিচালিত) আন্দোলনে যােগদানের মধ্য দিয়ে ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়” (৭(৪)/২৪১)। বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন রাজনীতির দর্শক-সারি থেকে : “চোখের চিকিৎসার পর মাদারীপুরে (১৯৩৭) ফিরে এলাম, কোন কাজ নেই। শুধু একটা মাত্র কাজ, বিকালে সভায় যাওয়া। তখন স্বদেশী আন্দোলনের যুগ। স্বদেশী আন্দোলন তখন মাদারীপুর ও গােপালগঞ্জের ঘরে ঘরে। আমার মনে হত, মাদারীপুরে সুভাষ বােসের দলই শক্তিশালী ছিল । আমাকে রােজ সভায় বসে থাকতে দেখে আমার উপর কিছু যুবকের নজর পড়ল। ইংরেজদের সম্পর্কে আমার মনেও বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হল। ইংরেজদের এ দেশে থাকার অধিকার নাই। স্বাধীনতা আনতে হবে। আমিও সুভাষ বাবুর ভক্ত হতে শুরু করলাম” (৯/৯)। বঙ্গবন্ধু আরাে উল্লেখ করেছেন : “শেরে বাংলা তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং সােহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। তারা গােপালগঞ্জে (১৯৩৮) আসবেন। মুসলমানদের মধ্যে বিরাট আলােড়নের সৃষ্টি হল। আমার বয়স একটু বেশি, তাই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করার ভার পড়ল আমার উপর । আমি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করলাম দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে। পরে দেখা গেল, হিন্দু ছাত্ররা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী থেকে সরে পড়তে লাগল । এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম সে আমাকে বলল, কংগ্রেস থেকে নিষেধ করেছে আমাদের যােগদান করতে। যাতে বিরূপ সম্বর্ধনা হয় তারও চেষ্টা করা হবে। আমি এখবর শুনে আশ্চর্য হলাম। কারণ, আমার কাছে তখন হিন্দু-মুসলমান বলে কোন জিনিস ছিলনা। আমাদের নেতারা বললেন, হক সাহেব (কৃষক-প্রজা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা) মুসলিম লীগের সাথে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন বলে হিন্দুরা ক্ষেপে গিয়েছে। এটা আমার মনে বেশ একটা রেখাপাত করল। হক সাহেব ও শহীদ সাহেব এলেন, সভা হল। শান্তিপূর্ণভাবে সকল কিছু হয়ে গেল । শহীদ সাহেব গেলেন মিশন স্কুল দেখতে । তাঁকে সম্বর্ধনা দিলাম। তিনি (ফেরার পথে) ভাঙা ভাঙা বাংলায় আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করছিলেন, আর আমি উত্তর দিচ্ছিলাম। আমাকে ডেকে নিলেন খুব কাছে, আদর করলেন এবং বললেন, “তােমাদের এখানে মুসলিম লীগ করা হয় নাই’? বললাম, কোনাে প্রতিষ্ঠান নাই। মুসলিম ছাত্রলীগও নাই। তিনি নােটবুক বের করে আমার নাম ও ঠিকানা লিখে নিলেন। কিছুদিন পরে আমি একটা চিঠি পেলাম, তাতে তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন এবং লিখেছেন কলকাতা গেলে যেন তার সঙ্গে দেখা করি। আমিও তার চিঠির উত্তর দিলাম । এইভাবে মাঝে মাঝে চিঠিও দিতাম” (৯/১০-১১)। হক-সােহরাওয়ার্দীর গােপালগঞ্জ পরিভ্রমণের পরে শহরে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান আড়াআড়ি একদিন মারামারিতে রূপ নেয়। “দুই পক্ষে ভীষণ মারপিট হয়। আমরা দরজা ভেঙ্গে মালেককে (মুজিবের বন্ধু, একটি হিন্দু বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছিল) কেড়ে নিয়ে চলে আসি। হিন্দু নেতারা রাতে বসে হিন্দু অফিসারদের সাথে পরামর্শ করে একটা মামলা দায়ের করল। খন্দকার শামসুল হক মােক্তার সাহেব হুকুমের আসামি। আমি খুন করার চেষ্টা করেছি, লুটপাট দাঙ্গাহাঙ্গামা লাগিয়ে দিয়েছি। আমাদের জেল হাজতে পাঠানাের হুকুম হল। এসডিও হিন্দু, জামিন দিল না । সাত দিন পরে আমি প্রথম জামিন পেলাম। আমার জীবনে প্রথম জেল”(৯/১২-১৩)। আজ ভাবতেও বিস্ময় জাগে, একটা চরম সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে আক্রান্ত-ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রাজনৈতিক জীবনের। সূচনা হলেও মুজিব পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠেছিলেন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির উজ্জ্বল উদাহরণ, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং প্রতিষ্ঠাতা। প্রয়াত বিচারপতি সৈয়দ মােহাম্মদ হােসেন একটি লেখায় বলেছিলেন : “ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা থেকে ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তার যে ঐতিহাসিক রূপান্তর তার প্রধান সূত্রধর ও মধ্য-শিরােমণি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান”(১০/১০)। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে আস্থাশীল ছিলেন ভাসানী-মুজিব উভয়েই। কিন্তু ফারাকও ছিল। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বর্ণনায় : “মওলানার একটা। সীমাবদ্ধতা ছিল। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সম্পূর্ণরূপে অসাম্প্রদায়িক ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি যে সমাজতন্ত্রের কথা ভাবতেন, তাকে তিনি ভাবতেই পারতেন না ধর্মকে বাদ দিয়ে। পরিচ্ছন্ন সমাজতন্ত্র নয়, তার লক্ষ্য ছিল ইসলামি সমাজতন্ত্র যার দরুন সামন্তবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিয়ােজিত হয়েও তিনি (ভাসানী) সামন্তবাদের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন, এমনটা বলা যাবে না। মওলানার সমাজতন্ত্রের তুলনায় (শেখ মুজিবের) বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল অধিকতর ধর্মনিরপেক্ষ। ছিল তা ভাষাভিত্তিক, যে-ভাষা কোনাে সম্প্রদায়ের সম্পত্তি নয়, সব বাঙালির মানসিক ও ব্যবহারিক সম্পদ বটে। এবং ওই জাতীয়তাবাদ প্রত্যাখ্যান করেছিল ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদকে বেশ প্রবলভাবে” (১(২)/৭৮১)। 

  আবু জাফর শামসুদ্দীন লিখেছেন, “সােহরাওয়ার্দী সাহেবের ব্যক্তিগত সাহস, ব্যক্তিত্ব, একই সঙ্গে অর্থের প্রতি আসক্তি ও অবহেলা, অর্থ সঞ্চয়ে অবিশ্বাস, অনুসারীদেরকে পুত্রবৎ প্রতিপালন, পরিশ্রম করার অসাধারণ ক্ষমতা ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য। সােহরাওয়ার্দী তেমন বড় ব্যক্তিত্বের অধিকারী না হলেও তার মধ্যে একটা যুদ্ধংদেহি মনােভাব ছিল । মনে হয়, সােহরাওয়ার্দী ছিলেন নিঃসঙ্গ মানুষ। বহু লােকের সঙ্গে তিনি মিশতেন, বহু রকমের রাজনীতি করেছেন   প্রথমে ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সহকারী হিসেবে তাঁর জীবনারম্ভ, জীবন শেষ হলাে আওয়ামী লীগে   কিন্তু তাঁর কোনাে পরমাত্মীয়। বন্ধু ছিল না। তিনি সর্বদা লােক পরিবৃত থাকতেন কিন্তু তবু তিনি ছিলেন তাঁদের থেকে আলাদা। আচার-আচরণ জীবনযাপন প্রণালীতে তিনি ছিলেন পুরােপুরি পশ্চিমী, রাজনীতি করতেন কুসংস্কারাচ্ছন্ন নিরক্ষর জনসাধারণের। ব্যক্তিগত জীবনে তার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার লেশমাত্রও ছিল না” (৮/৩৮০-৩৮১)। সাহিত্যিক-সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী লিখেছেন, “হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দীকে আমি কাছে এবং দূরে থেকে বহুবার দেখেছি। যতবার দেখেছি, ততবারই মনে হয়েছে, তিনি গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়ক। ভুল করে এযুগের বাংলাদেশে (অবিভক্ত বাংলা) জন্মেছেন। আপােষের রাজনীতির পরিণাম কী মর্মান্তিক হতে পারে, শহীদ সােরাওয়ার্দীর জীবন তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ” (১১/১৩১)। সােহরাওয়ার্দী ব্যক্তিগতভাবে অসাম্প্রদায়িক হলেও তাঁর নানাবিধ রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত কন্ট্রাডিকশন’এর কারণেই সম্ভবত তিনি কোনাে মহলেরই নিঃসংশয় আস্থাভাজন হতে পারেননি। ১৯৪৭ খ্রি. ভারত-ভাগের প্রাক্কালে “বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ রেখে স্বাধীন ও সার্বভৌম এক নতুন রাষ্ট্রগঠনের চেষ্টা করেছিলেন তিন নেতা   শরৎচন্দ্র বসু, আবুল হাশিম (তদানীন্তন বাংলার মুসলিম লীগের অসাম্প্রদায়িক চিন্তাবিদ) এবং হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী। প্রথম দু’জনের আন্তরিকতা নিয়ে কোনাে প্রশ্ন তােলেননি ঐতিহাসিক ও রাজনীতির গবেষকেরা। কিন্তু সােহরাওয়ার্দী প্রসঙ্গে অনেকেই সন্দেহ পােষণ করেছেন। কারাে কাছেই তাঁর বিশ্বাসযােগ্যতা ছিল না। 

 না তাঁর নিজের দল মুসলিম লীগের সহকর্মীদের কাছে না বাঙালি হিন্দুদের কাছে। মাউন্টব্যাটেন ও বরােজও তাকে সন্দেহ করতেন”(১২/৯)। উল্লেখ্য যে, “যুক্ত বাংলা গঠনের আন্দোলনে তিনি (সােহরাওয়ার্দী) শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেননি। দিল্লিতে মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় (মতান্তরে কনভেনশন’, ১৯৪৬) জিন্নাহর প্রতি আপসমূলক নীতি গ্রহণ করে বাংলা-ভাগের প্রস্তাবে সমর্থন করেন। যে কারণে শহীদ সাহেবের এই আপস   অর্থাৎ বাংলাদেশে মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা ও সভাপতির পদ   এ দু’টিই রক্ষা করা, তার কোনটিই 

  শেষ পর্যন্ত হল না। বাংলাদেশ (অবিভক্ত বাংলা প্রদেশ) ভাগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিন্নাহর ইঙ্গিতে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ পার্টির নেতৃত্ব থেকে শহীদ সাহেব অপসারিত হলেন। নতুন নেতা নির্বাচিত হলেন খাজা নাজিমুদ্দিন। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রীর পদ গেল প্রতিক্রিয়াশীল খাজা নাজিমুদ্দিন ও তার গ্রুপের দখলে” (১১/১৩১)। “১৯৪৬- ৪৭-এ শেখ মুজিব ছিলেন মুসলিম লীগের পতাকাবহনকারী তরুণ ছাত্রনেতা। হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী তাঁর রাজনৈতিক গুরু। সােহরাওয়ার্দী অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের ধারণাকে কখনাে রাষ্ট্রপরিচালনায় স্বাগত জানাননি। মাঝে মাঝে এর পক্ষে যে অবস্থান নিয়েছেন, তা ক্ষমতার আসনকে ধরে রাখতে। রাজনৈতিক গুরুর প্রভাবকে সম্পূর্ণ অতিক্রম করেছিলেন শেখ মুজিব উত্তরকালে । কি ভাবে শেখ মুজিবের মুসলিম লীগের আদর্শ থেকে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শে উত্তরণ ঘটেছিল” (১২/১৪) তার বর্ণনা এখানে বিশেষ প্রাসঙ্গিক নয়। তবে, অনেক পর্যবেক্ষক এবং রাজনীতি বিশ্লেষকেরই অভিমত হচ্ছে, সােহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক স্ববিরােধিতা এবং আপষকামিতার পথ-পরিণাম থেকেই স্থির-লক্ষ্য রাজনীতির শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ব্যক্তিগত অসাম্প্রদায়িকতা আর রাজনৈতিক অসাম্প্রদায়িকতা আদৌ সমার্থক নয়, তবে অনস্বীকার্য যে, ব্যক্তিজীবনে অসাম্প্রদায়িক না হলে কিছুতেই রাজনৈতিক অসাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মনিরপেক্ষতায় আস্থাশীল হওয়া অসম্ভব। “শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভার নেতা ছিলেন। মুসলিম লীগের বিপরীতে শ্যামাপ্রসাদ বাংলায় হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে এসেছিলেন। .ব্যক্তি শ্যামাপ্রসাদ অসাম্প্রদায়িক ছিলেন সে ব্যাপারে কোনাে দ্বিমত নেই। কিন্তু রাজনীতিক শ্যামাপ্রসাদকে আমরা অস্বীকার করি কি করে?”(১২/৯)। অপরদিকে স্মরণ করা যেতে পারে এ. কে ফজলুল হকের কথাও। তিনি একবার মুসলিম লীগের সাথে (১৯৩৭ খ্রি.) আরেকবার হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদের সাথে (১৯৪১ খ্রি.) কোয়ালিশন করে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হলেও কখনাে কোনাে মহল থেকেই তাঁকে সাম্প্রদায়িকতাবাদী বলে অভিযােগ করা হয়নি। 

  চার প্রধানের রাজনৈতিক জীবনের আদি পর্ব : ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলায় 

  পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, হক-ভাসানী-সােহরাওয়ার্দী-মুজিবের জন্ম এবং রাজনৈতিক জীবনের সূচনাও ব্রিটিশ-ভারতের অবিভক্ত বাংলায়। ঐ পর্বে এ. কে. ফজলুল হক বাংলা এবং সর্বভারতীয় পর্যায়েও বিপুল বৈচিত্র্যময় এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকার অধিকারী হয়েছিলেন। সােহরাওয়ার্দী সর্বভারতীয় পর্যায়ে পরিচিতি অর্জন করলেও তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মােটামুটি বাংলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। মওলানা ভাসানী আসাম প্রদেশে স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। অপরদিকে শেখ মুজিব তখন ছিলেন কোলকাতা-ভিত্তিক মুসলিম লীগের সক্রিয় ছাত্রকর্মী। এ. কে. ফজলুল হক “১৯১৩ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৫সালে তিনি কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সূচনা করেন। ১৯১৮ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সেক্রেটারি এবং ১৯১৯ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯২৩ সালে মুসলমানদের পক্ষ থেকে তিনি স্বরাজ্য পার্টির নেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট  নামক চুক্তিটি সম্পাদন করেন” (৭(৪)/২)। সােহরাওয়ার্দীও এ চুক্তি সম্পাদনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। সারা ভারতেই, বিশেষত বাংলায় “হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের অবনতি ঘটলে তিনি (সােহরাওয়ার্দী) দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সহযােগিতায় ‘বেঙ্গল প্যাক্ট নামে হিন্দু-মুসলিম চুক্তি সম্পাদনের পক্ষে কাজ করেন” (৭(৫)/৩৪০)। আলােচনার প্রাসঙ্গিকতায় ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’এর মূল প্রতিপাদ্য সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত উল্লেখ করা যেতে পারে। আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, “স্যার আব্দুর রহিম, মৌলবী আব্দুল করিম, মৌলবী মুজিবুর রহমান, মওলানা আকরম খাঁ ও মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী প্রভৃতি মুসলিম নেতৃবৃন্দ এবং মিঃ জে. এম. সেনগুপ্ত, মি. শরৎচন্দ্র 

   বসু, মি. জে. এম. দাশগুপ্ত ও ডা. বিধান চন্দ্র রায় প্রভৃতি হিন্দু নেতার সহযােগিতায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন (১৯২৩, এপ্রিল) ঐতিহাসিক ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ নামক হিন্দু-মুসলিম চুক্তিনামা রচনা করেন। তিনি স্বরাজ্য পার্টি ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটিকে দিয়া ঐ প্যাক্ট মনযুর করাইলেন”(৪/৪৯)। প্যাক্টের শর্ত হিসেবে স্বীকার করা হয়েছিল যে, “সরকারি চাকরিতে মুসলমানরা জনসংখ্যানুপাতে চাকরি পাইবে এবং যতদিন ঐ সংখ্যানুপাতে (তৎকালে ৫৪%) না পৌঁছিবে ততদিন নতুন নিয়ােগের শতকরা ৮০টি মুসলমানদেরে দেওয়া হইবে। সরকারি চাকরি ছাড়াও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে, যথা কলিকাতা কর্পোরেশন, সমস্ত মিউনিসিপ্যালিটি এবং ডিস্ট্রিক্ট ও লােকাল বাের্ডসমূহে মুসলমানরা ঐ হারে চাকরি পাইবে”(প্রাগুক্ত)। প্যাক্ট-বিরােধী হিন্দু নেতাদের বক্তব্য ছিল, “দেশবন্ধু বাংলাদেশ মুসলমানের কাছে বেচিয়া দিযাছেন। তারা আশা করছিলেন, প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির প্রকাশ্য অধিবেশনে এটি অনুমােদিত হবে না। কিন্তু দেশবন্ধু সিরাজগঞ্জে মওলানা আকরম খাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কংগ্রেসের অধিবেশনে (১৯২৪) সফলতার সাথেই চুক্তিটি অনুমােদন করাতে পেরেছিলেন। ‘বেঙ্গল প্যাক্ট সম্পর্কে সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রাজ্ঞজন এবং কংগ্রেসী রাজনীতিবিদ মৌলানা আবুল কালাম আযাদের একটি পর্যবেক্ষণমূলক মন্তব্য উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুধাবনের জন্য একান্তই গুরুত্বপূর্ণ : “His (Chittaranjan Das) attitude made a great impression on the Muslims of Bengal and outside. I am convinced that if he had not died a premature death, he would have created a new atmosphere in the country. It is a matter for regret that after he died, some of his followers assailed his position and his declaration was repudiated. The result was that the Muslims of Bengal moved away from the Congress and the first seed of partition was sown” (১৩/২৪)। ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ সম্পাদনের পরেই কোলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে (১৯২৪) দেশবন্ধু “নিজে মেয়র নির্বাচিত হইয়াছেন। জনপ্রিয় তরুণ মুসলিম নেতা শহীদ সােহরাওয়ার্দীকে ডিপুটি মেয়র করিয়াছেন”(৪/৫০)। এ তথ্যটি ‘বেঙ্গল প্যাক্ট প্রণয়নের ব্যাপারে দেশবন্ধুর সাথে সােহরাওয়ার্দীর সংযােগ-সহযােগিতার বিষয়টি সপ্রমাণ করে। সােহরাওয়ার্দীই ছিলেন “কলিকাতা কর্পোরেশনের প্রথম মুসলমান ডেপুটি মেয়র” (৭(৫)/৩৪০)। প্রসঙ্গতই উল্লেখ্য যে, পরবর্তীকালে “১৯৩৫ সালে ফজলুল হক কলিকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন”(৭(৪)/৩)। দেশবন্ধুর মৃত্যুর (১৯২৫) পরে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ বাতিল হয়ে গেলে “সােহরাওয়ার্দী কংগ্রেস ও স্বরাজ্য দলের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং ১৯৩৬ সালে মুসলিম লীগে যােগ দেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে তিনি কলিকাতার দু’টি আসনে নির্বাচিত হন” (৭(৫)/৩৪০)। পরবর্তী সময়ে, ১৯৪০ সালে সুভাষ বসুর উদ্যোগে-প্রস্তাবে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন মুসলিম লীগ নেতা আব্দুর রহমান সিদ্দিকী। নেতাজী সুভাষ বসু আরাে বিধান করেছিলেন যে, “পর্যায়ক্রমে প্রতি তিন বছরে মুসলিম মেয়র হইবেন”(৪/১৯৪)। স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৩৭ সালে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের অল্পকাল পূর্বে ফজলুল হক সাহেব তাঁর সহযােগী সমর্থকদের নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিশেষ লক্ষ্যে নতুন রাজনৈতিক দল কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করেন” (৫/১৫৮)। কৃষক-প্রজা পার্টির লক্ষ্য ছিল মুসলিম আসনে সংখ্যাধিক্য অর্জন। বাংলার প্রাদেশিক পরিষদে মােট আসনসংখ্যা ছিল ২৫০টি, যার মধ্যে ১২২টি ছিল সংরক্ষিত মুসলিম আসন। বর্ণহিন্দুদের আসন ছিল ৬৪, তফশিলী হিন্দু ৩৫, ইউরােপিয়ান ২৫ এবং অ্যাংলাে-ইন্ডিয়ান ৪টি আসন। স্বাভাবিকভাবেই প্রাদেশিক সরকার গঠনের জন্য কমপক্ষে ১২৬টি আসন পাওয়ার দরকার ছিল। ঐ সময় বাংলার সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা ছিলেন কৃষক-প্রজা পার্টির নেতা শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক। মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন নাজিমউদ্দিন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কৃষক-প্রজা পার্টি এবং মুসলিম লীগের তীব্র ভােটযুদ্ধে পটুয়াখালি আসনে শেরে বাংলার কাছে নাজিমুদ্দিন শােচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, “ফজলুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয় গভর্নরের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য স্যার নাজিমুদ্দিন ‘মােহাম্মদী’র মওলানা আকরম খাঁ এবং ইস্পাহানি-ভ্রাতাগণসহ বাংলার প্রায় সকল মুসলিম জমিদার তালুকদার নওয়াব নাইট খান বাহাদুর এবং কলকাতার অবাঙালি মুসলিম ব্যবসায়ী সমাজ। ওরা (জিন্নাহর উদ্যোগে-পরামর্শে) গঠন করেন ‘ইউনাইটেড মুসলিম প্রগ্রেসিভ পার্টি (কার্যত বেনামী মুসলিম লীগ)। শহীদ সােহরাওয়ার্দী ঐ দলেই ছিলেন। মুসলিম লীগ কাগজে-কলমে ছিল । বাংলার প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম শ্ৰেণী মুসলিম লীগের নামে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সাহস পায়নি। ওরা সাম্প্রদায়িক ভাবাবেগ সৃষ্টি করে বাজিমাৎ করতে চেয়েছিল, মি. জিন্নাহ আড়াল থেকে ইউনাইটেড মুসলিম প্রগ্রেসিভ পার্টিকে বুদ্ধি-পরামর্শ দিচ্ছিলেন। এ দলের টাকা-পয়সার অভাব ছিল না। মুখপত্ররূপে ছিল দৈনিক  স্টার অব ইন্ডিয়া এবং সাপ্তাহিক ‘মােহাম্মদী  প্রভৃতি পত্রিকা” (৮/১৫৮-১৫৯)। তথাপি ১৯৩৭-এর নির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর লেখা থেকে প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি : “নাজিমুদ্দিন সাহেব পটুয়াখালী থেকে পরাজিত হয়ে ফিরে আসলেন। তার রাজনীতি থেকে সরে পড়া ছাড়া উপায় ছিল না। শহীদ সাহেব হক সাহেবকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বললেন, 

 আমি নাজিমুদ্দিন সাহেবকে কলকাতা থেকে বাই-ইলেকশনে পাস করিয়ে নেব। যদি হক সাহেব পারেন, তাঁর প্রতিনিধি দিয়ে মােকাবিলা করতে পারেন। হক সাহেবও লােক দাঁড় করিয়েছিলেন নাজিমুদ্দিন সাহেবের বিরুদ্ধে। নাজিমুদ্দিন সাহেবই শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করলেন, শহীদ সাহেবের দয়ায়। সেই নাজিমুদ্দিন সাহেব শহীদ সাহেবকে অপমানই করলেন”(৯/৪২)। প্রসঙ্গতই উল্লেখ করা দরকার, ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কৃষক-প্রজা পার্টি ৫৯টি, কংগ্রেস ৫৪টি, মুসলিম লীগ ৩৯টি আসন লাভ করেছিল, অর্থাৎ কারাে পক্ষেই এককভাবে সরকার গঠন করা সম্ভব ছিল না। প্রয়ােজন পড়েছিল ‘কোয়ালিশন’ সরকার গঠনের। কিন্ত কংগ্রেসের সহযােগিতা না পেয়ে শেরে বাংলা বাধ্য হয়েই মুসলিম লীগ, তফশিলী এবং অপরাপর ছােটো ছােটো দলের সহযােগিতায় বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠন (১এপ্রিল, ১৯৩৭) করেছিলেন। সােহরাওয়ার্দী কোলকাতায় বিজিত দু’টি আসনের একটি নাজিমউদ্দিনের অনুকূলে ছেড়ে দেয়াতে উভয়েই সেই কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছিলেন। 

  শেরে বাংলার মন্ত্রিসভায় নাজিমউদ্দিন হয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর সােহরাওয়ার্দী বাণিজ্য ও শ্রমমন্ত্রী। পরবর্তী সময়ে নাজিমুদ্দিন চরম অপমান-শত্রুতা করেছেন শেরে বাংলার প্রতিও। “১৯৩৭এ ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা পার্টির সাথে কংগ্রেসের কোয়ালিশন সরকার গঠন করে বাংলার শাসনক্ষমতায় শরিক হওয়া উচিত ছিল। তা না করে সেসময় অসাম্প্রদায়িক ফজলুল হককে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। ক্ষমতার প্রতি দুর্বলতা ছিল ফজলুল হকের। কংগ্রেসকে কোনােভাবেই সাথে না পেয়ে বাধ্য হয়ে তিনি মুসলিম লীগের সাথে মিলে কোয়ালিশন গঠন করেন এবং বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন। মুসলিম লীগ এই সুযােগই খুঁজছিল। ফজলুল হকের হাত ধরেই তাদের বাংলার শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠান। এর পরের ইতিহাস ১৯৪৭ র বাংলা বিভাগ পর্যন্ত মুসলিম লীগ বাংলার শাসনক্ষমতা নিজেদের দখলে রাখতে সমর্থ হয়েছিল” (১২/২৬-২৭)। “ফজলুল হক সাহেবের ‘কৃষক-প্রজা পার্টি’ নামে হলেও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ছিল। তাছাড়া এ দলের পক্ষে একটি চৌদ্দ-দফা কর্মসূচিও প্রচারিত হয়। ঐ কর্মসূচিতে বিনা খেসারতে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ, অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন, বাংলাদেশের জন্য স্বায়তুশাসন প্রভৃতি প্রতিশ্রুতি ছিল। কৃষক-প্রজা। পার্টির আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক কর্মসূচি পল্লীর সাধারণ মুসলিম সমাজের সমর্থন লাভ করে। নিম্নবেতনের চাকরিজীবী এবং মুসলিম ছাত্র সমাজের সমর্থনও ছিল। ফজলুল হক সাহেবের দলের প্রতি। হক সাহেব জিতলেন। তাঁর দলও মুসলিম আসনে সংখ্যাধিক্য লাভ করল। ইউনাইটেড মুসলিম প্রগ্রেসিভ পার্টি রাতারাতি নাম পরিবর্তন করে মুসলিম লীগ হয়ে গেল। ফজলুল হক সাহেব নিজেই (কয়েক মাস পরে) মুসলিম লীগে যােগ দিলেন; হলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি” (৮/১৫৯-১৬০)। ১৯৩৭ সালের অক্টোবরে ফজলুল হক “যােগ দেন নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লক্ষৌ অধিবেশনে। তিনি পেয়ে যান বাংলার মুসলিম লীগের সভাপতির পদ” (১২/৩০)। উক্ত সম্মেলনে “ফজলুল হকের অনলবর্ষী ও বীরত্বব্যঞ্জক বক্তৃতায় আকৃষ্ট হয়ে লক্ষৌবাসীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁকে ‘শের-এ-বাংলা বা শেরে বাংলা উপাধিতে ভূষিত করে” (৭(৪)/৩)। “১৯৪০-এ শেরে বাংলা ফজলুল হকই উত্থাপন করেছিলেন মুসলিম লীগের বিখ্যাত লাহাের প্রস্তাব। এত করেও ফজলুল হক মুসলিম লীগে লীন হয়ে যেতে পারলেন না। মন্ত্রিসভায় মুসলিম লীগের সহকর্মীদের সাথে তাঁর বনিবনা হচ্ছিল না। দলের ‘Sole spokesman জিন্নাহও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না ফজলুল হককে। মতভেদ চূড়ান্ত পর্যায়ে গেলে ফজলুল হক মুসলিম লীগ ত্যাগ করেন ১৯৪১-এ (১২/৩০)। মুসলিম লীগ সমর্থন প্রত্যাহার করায় তাঁর মন্ত্রিসভারও পতন হয় । মন্ত্রিসভার পতনের পর “ক্ষমতার প্রতি দুর্দমনীয় আকর্ষণ তাকে টেনে নিয়ে যায় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে ফজলুল হক শ্যামাপ্রসাদ (হিন্দু মহাসভার নেতা) এবং কংগ্রেসের একাংশকে নিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। বাংলার প্রধানমন্ত্রী রূপে দ্বিতীয়বার শপথ নেন ১২ ডিসেম্বর, ১৯৪১-এ। মন্ত্রিসভায় যােগ দেওয়ার কথা ছিল শরৎচন্দ্র বসুর, কিন্তু বাংলার ছােটলাট (গভর্নর) স্যার জন হারবার্ট (মন্ত্রিসভার) শপথ গ্রহণের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ভারত-রক্ষা আইনে শরৎ বসুকে গ্রেফতার করেন, ব্রিটিশরাজ চাননি শরৎ বসুর সাথে ফজলুল হকের কোনাে রাজনৈতিক মিলন । শরৎ বসুর অনুপস্থিতিতে মন্ত্রিসভায় (অর্থ দপ্তরসহ) দ্বিতীয় স্থান পান শ্যামাপ্রসাদ। শ্যামাপ্রসাদকে মন্ত্রিসভায় নেওয়ার ব্যাপারে ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা পার্টির সহকর্মীদের আপত্তি ছিল” (১২/৩০-৩১)। এ আপত্তি একান্ত সঙ্গত ছিল বলেই মানতে হয়। “শ্যামা-হক মন্ত্রিসভাকে শান্তিতে থাকতে দেননি গভর্নর হারবার্ট। মুসলিম লীগের সাথে ষড়যন্ত্র করেই ২৮মার্চ ১৯৪৩-এ তিনি বাধ্য করেন ফজলুল হককে পদত্যাগ করতে।  শেরে বাংলা এর পরে আর কখনাে অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে তার যােগ্য অবস্থান নিতে পারেননি। বলা যায় তাকে চলে যেতে হয়েছিল রাজনীতির অন্তরালে ।  ২৪ এপ্রিল, ১৯৪৩ খাজা নাজিমউদ্দিনের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় স্থানে থাকেন সােহরাওয়ার্দী, তাঁকে দেওয়া হয় বেসামরিক সরবরাহ (খাদ্য) দপ্তরের ভার। ১৯৪৫’র ২৮ মার্চ এক অনাস্থা ভােটে নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভার পতন ঘটে । ১৯৪৬’র ফেব্রুয়ারিতে  অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মুসলিম লীগ নির্ধারিত মুসলিম আসনে বিপুলভাবে বিজয়ী হয়। 

 হিন্দু আসনে জয়ী হয় কংগ্রেস। কৃষক-প্রজা পার্টি পায় ৫টি আসন,  ফজলুল হকেরই ছিল ২টি আসন। ১৯৪৬’র নির্বাচন মুসলিম লীগকে বাংলার মুসলমানদের পক্ষে কথা বলার সময় ও একক ক্ষমতা প্রদান করে। ২৪ এপ্রিল মুসলিম লীগের নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেয় শহীদ সােহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে” (১২/৩২-৩৩)। মন্ত্রিসভায় বগুড়ার মােহাম্মদ আলী যােগ দেন অর্থমন্ত্রী হিসেবে। আবু জাফর শামসুদ্দিনের মন্তব্য, বাংলা ছাড়া ভারতের অন্য সবকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে মুসলিম লীগের অবস্থা ছিল শােচনীয়। মুসলিম লীগের এই দুরবস্থার সময়ে মি. জিন্নাহর পাশে এসে দাঁড়ান কৃষক-প্রজা পার্টির নেতা এ. কে. ফজলুল হক । স্বপ্রতিষ্ঠিত কৃষক-প্রজা পার্টির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ফজলুল হক সাহেব মুসলিম লীগে যােগ দেন । হন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট; নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য। বাংলার দুর্ভাগ্যের সূচনা সেদিন থেকে। তিনি মি. জিন্নাহর মাকড়সা রাজনীতির জালে নিজেকে জড়িয়ে না ফেললে তখন দ্বিতীয় এমন কোনাে বাঙালি মুসলমান নেতা ছিলেন না যিনি মুসলিম লীগকে বাংলাদেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। মি. জিন্নাহ ইসলাম ধর্মকে তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ সিদ্ধির হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করেছিলেন । অসংখ্য মুসলিম নেতা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিদে স্বাধীনতা সগ্রামে যােগ দিয়ে জেল খেটেছেন। মি. জিন্নাহ এবং মিঃ এ. কে, ফজলুল দু জনই কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ দুই করেছেন। কিন্তু  জেলে যাওয়ার মত হঠকারিতার রাজনীতি করেননি। ফজলুল হক সাহেবের গণ-সংযােগ এবং গণ-বক্তৃতার ক্ষমতাকে (Mass demagogy) কাজে লাগিয়ে দেয়াটা, জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় সাফল্য। ফজলুল হক সাহেবকে দিয়ে ১৯৪০ সালে লাহােরে তথাকথিত পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করানাে হয়। চারিদিকে বাহবা ধ্বনি উঠল । প্রশংসা ও স্তুতির মধ্যগগনে তিনি ভারসাম্য হারান। সাম্প্রদায়িকতা তুঙ্গে তােলার জন্যে যা কিছু করা আবশ্যক ছিল, মুসলিম লীগ ফজলুল হক সাহেবকে দিয়ে সে কাজগুলাে করিয়ে নেয়। এরপর প্রয়ােজন হলাে ফজলুল হক সাহেবকে বর্জন করার । ফজলুল হককে মুসলিম লীগ হতে বহিষ্কার (১৯৪২) করা হলাে” (৮/১৮৫-১৮৭)। তখনকার সময়ে পল্লী-বাংলার রাজনীতিতে শেরে বাংলার অনন্য গুরুত্ব এবং সাধারণ মানুষের মনে তার অবস্থান-সম্মানের দিকটি চমৎকারভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর লেখায়। “একদিনের কথা মনে আছে, আব্বা বললেন, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের বিরুদ্ধে কোনাে ব্যক্তিগত আক্রমণ না করতে। একদিন আমার মা ও আমাকে বলেছিলেন,  বাবা যাহাই কর, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলিও । শেরে বাংলা মিছামিছিই ‘শেরে বাংলা’ হন নাই। বাংলার মাটিও তাঁকে ভালােবেসে ফেলেছিল। যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেছি, তখনই বাধা পেয়েছি। একদিন একটা সভা করছিলাম আমার নিজের ইউনিয়নে, হক সাহেব কেন লীগ ত্যাগ করলেন, কেন পাকিস্তান চান না এখন? কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন? এই সমস্ত আলােচনা করছিলাম, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লােক দাড়িয়ে বললেন, যাহা কিছু বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাইনা। জিন্নাহ কে? তার নামও শুনি নাই । আমাদের গরিবের বন্ধু হক সাহেব । শুধু এটুকুই না, যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কালাে পতাকা দেখাতে গিয়েছি জনসাধারণ আমাদের মারপিট করেছে। অনেক সময় ছাত্রদের নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি”(৯/২২)। আলােচনার প্রাসঙ্গিকতায় এখানে কিছুটা দীর্ঘ উদ্ধৃতি উপস্থাপন করছি কামরুদ্দীন আহমদের বাংলার মধ্যবিত্তের বিকাশ’ বইটির ১ম খণ্ড থেকে, যাতে শেরে বাংলা, সােহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবকেও রাজনৈতিক আদর্শ-বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত অবস্থানের নিরিখে উপলব্ধি করা যেতে পারে । “ফজলুল হক কোন সংগঠনকেই সহ্য করতে পারতেন না   কৃষক-প্রজা পার্টিকে ১৯৩৮সনে কবর দিতে যেমন ইতস্তত করেননি তেমনি করেননি মুসলিম লীগকে দূরে ফেলে দিতে -১৯৪২ সালে (মতান্তরে ১৯৪১)। বাংলার রাজনীতিতে ইতিমধ্যে যে পরিবর্তন এসেছিল সেটি তিনি বুঝতে পারেননি।  তিনি নিজেকে ‘ইনস্টিটিউশন’ বলে মনে করতেন। এ দুর্বলতাই তাঁর পতনের মূল কারণ হয়েছিল। এ ব্যাপারে শহীদ সােহরাওয়ার্দীর পথ ছিল ভিন্ন। রাজনীতি ক্ষেত্রে প্রবেশ করেই তিনি বুঝলেন যে কলকাতার উপর সম্পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে পারলেও বাংলার প্রধানমন্ত্রী হবার জন্য তা যথেষ্ট নয়। পূর্ব বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের উপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারলে তাকে সারা জীবন মন্ত্রিসভার একজন সাধারণ সদস্য হয়েই থাকতে হবে। অসুবিধা তার ছিল অনেক। প্রথমত পূর্ব বাংলায় তাঁর কোন আত্মীয়-স্বজন ছিল না, দ্বিতীয়ত, তাঁর বাংলা ভাষা জানা ছিল না।  প্রথমে দৃষ্টি পড়ল ফজলুল হকের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার (অতি দূর সম্পর্কের) বন্ধন ঝালাই করা।  ঐ আত্মীয়তার সূত্রেই প্রথম সােহরাওয়ার্দী সাহেব পূর্ব বাংলায় ফজলুল হক সাহেবের সঙ্গে তাঁর মন্ত্রী হিসেবে ঘুরতেন। বাংলায় বক্তৃতা অভ্যাস করার জন্য ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লিখে তাই সভায় বলতেন বা পড়তেন। বছর দুয়েক তিনি ঐভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং ইংরেজি জানা লােকদের সঙ্গে যােগাযােগ সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন”। “এ পথে যখন খুব বেশি দূর এগােনাে গেল না, তখন শহীদ সাহেব খুঁজে বেড়াতে লাগলেন কলকাতার ছাত্রদের মধ্যে এমন একজন যুবক যাকে তিনি গ্রহণ করতে পারবেন নিজের বলে এবং যার মধ্যে রাজনীতির নেশা আছে, যে রাজনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে চাইবে তাঁর সম্পূর্ণ পৃষ্ঠপােষকতা পেলে । ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত অনেককে তিনি পরীক্ষা করেছেন কিন্তু তিনি যেমনটি চেয়েছিলে তেমনটি পাননি । ১৯৪৩ সালে আবুল হাশিম সাহেব মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর মুসলিম লীগ বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থীতে ভাগ হ’ল ।  শহীদ সাহেব বুর্জোয়া কিন্তু তিনি শিল্পপতিও নন জমিদারীর মালিকও নন।  কলকাতার সাধারণ মানুষের সঙ্গেই ছিল তাঁর উঠা-বসা ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর  অনেক লােক সংসদে প্রবেশ করলেন যারা তাঁদের জেলার অভিজাতদের প্রতি ঘৃণা পােষণ করতেন। তাঁরা শহীদ সাহেবকে জননেতা হিসেবে গ্রহণ করতে নারাজ ছিলেন না। এমনি পরিস্থিতিতে শহীদ সাহেবকে প্রতিক্রিয়াশীল দলের মধ্যে ধরা হ’ল না। ফলে আবুল হাশিমের আন্দোলনের পূর্ণ সুযােগ সংসদীয় রাজনীতিতে শহীদ সাহেবই গ্রহণ করেছিলেন। “যখন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের বার্ষিক কাউন্সিল সভা ডাকা (১৯৪৪) হ’ল তখন সােহরাওয়ার্দী, নাজিমুদ্দিন ও মওলানা আক্রাম খান একত্রে বসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, আবুল হাশিম সাম্যবাদীদের দ্বারা পরিচালিত সুতরাং মুসলিম লীগের সম্পাদক পদে তাঁকে রাখা যায় না। আবুল হাশিমের অনুরাগীদের মধ্যে একটা ভয়ানক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ল। নির্বাচনের পূর্বের দিন সন্ধ্যার দিকে সােহরাওয়ার্দী সাহেবের সম্মুখে ফজলুল কাদেরের (চৌধুরী) নেতৃেত্বে বিক্ষোভ প্রদর্শন আরম্ভ হ ল   বক্তৃতা করল প্রথম নুরুদ্দীন তারপর (শেখ) মুজিবুর রহমান।  মুজিবের বক্তৃতা জোরালাে হয়েছিল এবং যুক্তিপূর্ণও, ফলে সােহরাওয়ার্দী সাহেব কাউন্সিলের ওপর সিদ্ধান্তের ভার ছেড়ে দিতে রাজি হলেন। সে মুহূর্তেই শহীদ সাহেব বেছে নিলেন শেখ মুজিবুর রহমানকে । এতদিনে যেন শহীদ সাহেব সন্ধান পেলেন তিনি যাকে খুঁজছিলেন তাকে” (১৪(১)১১৩-১১৬)। 

  ২২-২৪ মার্চ, ১৯৪০ সালে লাহােরের মিন্টো পার্কে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে তদানীন্তন বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক মুসলিম লীগের পক্ষে যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, সেটিই ‘লাহাের প্রস্তাব  হিসেবে উল্লিখিত হয় এবং তাকে পরের দিন থেকেই সংবাদপত্রে  পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামে পরিচিত করে তােলা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, প্রস্তাবটিতে ‘পাকিস্তান  শব্দটিও ছিল না, ছিল না একক রাষ্ট্রের কথাও। প্রস্তাবে বলা হয়েছিলো : “No constitutional plan would be workable or acceptable to the Muslims unless geographical contiguous units are demarkated into regions which should be so constituted with such territorial readjustments as may be necessary. That the areas in which the Muslims are numerically in majority as in the North-Western and Eastern zones of India should be grouped to constitute independent states in which the constituent units shall be autonomous and soverign” 

 শেরে বাংলার ‘লাহাের প্রস্তাব’ (১৯৪০ খ্রি.) ভারতীয় ইতিহাসে বহুল আলােচিত। তবে কমই আলােচিত হয় যে, কূট-কৌশলী জিন্নাহ সেই লাহাের প্রস্তাবটি অবিকৃত রাখেননি। দিল্লিতে ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের ‘কনভেনশন’এ ‘লাহাের প্রস্তাব’এর মূল লক্ষ্য-ভিত্তিটাকেই বদলে ফেলা হয়েছিল। দিল্লি কনভেনশন’এর অভিজ্ঞতায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : “জিন্নাহ সাহেব বক্তৃতা করলেন,  মনে হচ্ছিল সকলের মনেই একই কথা, পাকিস্তান কায়েম করতে হবে । সাবজেক্ট কমিটির  প্রস্তাব লেখা হল, সেই প্রস্তাবে লাহাের প্রস্তাব থেকে আপাতদৃষ্টিতে ছােট কিন্তু মৌলিক একটা রদবদল করা হল। একমাত্র হাশিম সাহেব আর সামান্য কয়েকজন যেখানে পূর্বে  স্টেটস্  লেখা ছিল, সেখানে ‘স্টেট লেখা হয়, তার প্রতিবাদ করলেন, তবু তা পাস হয়ে গেল । ১৯৪০ সালে লাহােরে যে প্রস্তাব কাউন্সিল পাস করে, সে প্রস্তাব আইনসভার সদস্যদের কনভেনশন পরিবর্তন করতে পারে কি না এবং সেটি পরিবর্তন করার অধিকার আছে কি না, এটা চিন্তাবিদরা ভেবে দেখবেন। কাউন্সিলই মুসলিম লীগের সুপ্রিম ক্ষমতার মালিক” (৯/৫২)। জিন্নাহর ইচ্ছায় বাংলার এবং তখন সারা ভারতে একমাত্র মুসলিম লীগ প্রধানমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দীর উত্থাপিত ‘কনভেনশন প্রস্তাব’এর মূল কথা ছিল : “The Muslims are convinced that with a view to saving Muslim India from the domination of the Hindus and in order to afford them full scope to develop themselves .it is necessary to constitute a soverign, independent state comprising Bengal and Assam in the North-East zone and in Punjab, NW Frontier Province, Sind and Baluchistan in the North-West Zone.” সােহরাওয়ার্দীর কনভেনশন প্রস্তাব’এ পাকিস্তান নামক একক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যটি আরাে স্পষ্ট করেই উল্লেখ করা হয়েছিল, “The Zones comprising Bengal and Assam in the North-East and in Punjab, NW Frontier Province, Sind and Baluchistan in the North-West of India, namely Pakistan Zones, where the Muslims are in a dominant majority, be constituted into one soverign independent state and an unequivocal undertaking be given to implement the establishment of Pakistan ”(৯/৫৩-৫৪)। মুসলিম লীগের ১৯৪০ খ্রি. লাহাের প্রস্তাব’এর কথা বলা হােক কিংবা ১৯৪৬ খ্রি. ‘দিল্লি কনভেনশন’এর প্রস্তাব, দু’টিই জিন্নাহর অভিপ্রায়ে-নির্দেশে উপস্থাপিত হয়েছিল। এক্ষেত্রে জিন্নাহ তাঁর কুশলী চালে, হক-সােহরাওয়ার্দীকে পরস্পর বিপরীত অবস্থানে ঠেলে দিয়ে দুর্বল করে দিতে পেরেছিলেন। লাহাের প্রস্তাব উপস্থাপনের পরে জিন্নাহ-নাজিমুদ্দিন অক্ষের অভিপ্রায় অনুসারে শেরে বাংলাকে মুসলিম লীগ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। এবার ‘দিল্লি কনভেনশন’এর প্রস্তাব উপস্থাপনের পরে এল সােহরাওয়ার্দীর পালা। ইতিহাস সাক্ষী, বিলম্ব হয়নি এক্ষেত্রেও। “প্রতিভা, জ্ঞান, বিদ্যা-বুদ্ধি, বাগ্মিতা ও জনপ্রিয়তায় ফজলুল হকের কাছে জিন্নাহ কিছুই ছিলেন না”, আবদুল গাফফার চৌধুরীর এমন বক্তব্যকে যদি নিতান্তই বাঙালি-প্রীতির লক্ষণ বলা হয়, পরবর্তী তথ্যটিকে কী বলা হবে? “ঐতিহাসিক লাহাের সম্মেলনে জিন্নাহ যখন বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, তখন ফজলুল হক এসে সভামণ্ডপে পৌঁছেন। হাজার জনতা উঠে দাঁড়িয়ে জিন্নাহর বক্তৃতা উপেক্ষা করে ‘শেরে বাংলা জিন্দাবাদ  স্লোগান দিতে শুরু করে। শেরে বাংলার উপস্থিতিতে আর বক্তৃতা দেওয়া সম্ভব নয় দেখে জিন্নাহ বলে ওঠেন ‘শের যখন এসে গেছেন তখন আমার পথ ছেড়ে দেওয়াই ভালাে। বলে বক্তৃতা অসমাপ্ত রেখে তিনি বসে পড়েন। সম্ভবত তখনই জিন্নাহ এবং অবাঙালি উর্দুভাষী মুসলিম লীগ নেতারা বুঝেছিলেন যে, সর্বভারতীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বাঙালি ফজলুল হক তাদের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ”(১১/১৫৮)। এই ফজলুল হকই রাজনীতির ঘুরপাকে জড়িয়ে পরবর্তী সময়ে জিন্নাহর কাছে চিঠি লিখে ক্ষমা চেয়ে পুনরায় মুসলিম লীগের সদস্য হয়েছিলেন কিন্তু তাঁকে আবারও দলটি ছাড়তে হয়েছিল, সে-কথা যথাস্থানে আলােচনায় আসবে। ফজলুল হক মন্ত্রিসভার পতনের (১৯৪৩) জন্য মুসলিম লীগ তথা জিন্নাহর বিরােধিতা এবং কূট-কৌশল অবশ্যই বহুলাংশে দায়ী ছিল। “এ হচ্ছে ঘটনার একদিক। অপরদিকে ব্রিটিশ সরকারও যুদ্ধকালে (২য় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৩৯-১৯৪৫ খ্রি.) ফজলুল হককে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারছিল না। জাপানিদের ভয়ে বাংলাদেশে ‘পােড়ামাটি নীতি’ (ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পিত) অনুসরণ করার পক্ষপাতী ছিলেন না ফজলুল হক। এই পােড়ামাটি নীতিই ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের জন্য প্রধানত দায়ী। ব্রিটিশ সরকার ফজলুল হক মন্ত্রিসভাকে বিতাড়িত করতে চাইছিল” (৮/১৮৭)। এমন সব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিরােধিতার কারণে “ফজলুল হক সাহেবের প্রধানমন্ত্রিত্ব এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অবসান হলাে বটে কিন্তু অন্য দিক থেকে তাঁর জন্য এটা শাপে বর হলাে। তেতাল্লিশের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং সে সময়ের ব্যাপক দুর্নীতির দায়-দায়িত্ব থেকে ফজলুল হক সাহেব নিস্কৃতি পেলেন” (৮/১৯৬)। ফজলুল হক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলার সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য জমিদারি 

 উচ্ছেদ, মহাজনী আইন, ঋণ-সালিশী বাের্ড, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ইত্যাদি সুদূরপ্রসারী আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ-প্রবর্তন করার জন্যই বাংলার ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন। যুক্তবাংলার শিক্ষামন্ত্রী হিসেবেও তিনি বিপুল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। এসময় কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ বাংলার মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি বহু উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর উদ্যোগে পরবর্তীকালে কলিকাতা লেডি ব্রাবাের্ন কলেজ, ঢাকার বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট (বর্তমান শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়), চাখার কলেজ, ইডেন গার্লস কলেজ ছাত্রীনিবাস (এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লা মুসলিম হল) ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়। তাছাড়া তিনি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসমূহে মুসলমান ছাত্রদের জন্য আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং মুসলিম এডুকেশন্যাল ফান্ডও গঠন করেন” (১৩(৪)/২-৩)। শেরে বাংলা যতবার মন্ত্রী হয়েছেন, ততবারই শিক্ষা মন্ত্রণালয় হাতে রেখে শিক্ষা বিস্তার এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে যথাসম্ভব কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ১৯৩৭-১৯৪৭ পর্যন্ত দশ বছর বাংলার তিনজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন এবং শহীদ সােহরাওয়ার্দী। ২৯ মার্চ, ১৯৪৩-এ ফজলুল হক মন্ত্রিসভার পতনের পরে বাংলায় খাজা নাজিমুদ্দিনেরর মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন বেসামরিক সরবরাহ তথা খাদ্যমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দী। “১৯৪৩ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বাংলার ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা ধ্বংসকারী দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়াছিল । এই দুর্ভিক্ষের দায়িত্ব ও অপরাধ গিয়ে বর্তে নাযিম মন্ত্রিসভার ঘাড়ে। এই দুর্ভিক্ষে অনুমান পঞ্চাশ লক্ষ লােক মারা গিয়াছে”। তদানীন্তন ‘প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রচার সম্পাদক সাহিত্যিক-সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, “ঐ আকালের জন্য  উভয় মন্ত্রিসভাই (হক-মন্ত্রিসভা এবং পরবর্তী নাজিমুদ্দিন-মন্ত্রিসভা) অংশত দায়ী ছিলেন। আসলে আকালের কারণ ঘটাইয়াছিলেন ভারত-সরকার। পঞ্চাশ সালের ঐ নজিরবিহীন আকালে মুসলিম বাংলা কিছু-কিছু মানব-সেবীর সন্ধান পাইয়াছিল। এঁদের মধ্যে শহীদ সােহরাওয়ার্দীর নাম সকলের আগে নিতে হয়। অত অভাবের মধ্যেও ধৈর্য ও সাহসে বুক বাধিয়া গ্রুয়েল কিচেন ও লঙ্গরখানা খুলিয়া আর্ত ও ক্ষুধার্তের সেবা করিয়াছিলেন, আহার-নিদ্রা ভুলিয়া দিনরাত চড়কির মত ঘুরিয়া বেড়াইতেন(৪/২৩৪-২৩৭)। অথচ সেই দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গে আবুল মনসুর আহমদই তাঁর “ফুড কনফারেন্স’ পুস্তকে স্যার নাজিমুদ্দিনকে ‘মহিষে বাংলা ; শহীদ সাহেবকে  কুত্তায়ে বাংলা  ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করেন। অন্যদিকে মুসলিম লীগ কাগজ ‘আজাদ’ও শহীদ সাহেবের পক্ষে ওকালতি করার জন্য ব্যস্ততা দেখায়নি ঘরােয়া দলাদলির কারণে।  মুসলিম লীগের অনেকেই মানুষের দুর্দশার জন্য শহীদ সাহেবকেই দায়ী (escape goat) করতে সচেষ্ট ছিলেন। পরিষদ সদস্য আবুল হাশিম সাহেবও বেসরকারি সরবরাহ মন্ত্রীর বেশ কড়া সমালােচনা করেন”(১৪(২)/২০-২১)। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আরম্ভ হয়েছে ।  এমন দিন নাই রাস্তায় লােক মরে পড়ে থাকতে দেখা যায় না। আমরা কয়েকজন ছাত্র শহীদ সাহেবের কাছে যেয়ে বললাম, কিছুতেই জনসাধারণকে বাঁচাতে পারবেন না, মিছামিছি বদনাম নেবেন। তিনি বললেন, দেখি চেষ্টা করে কিছু করা যায় কিনা, কিছু লােক তাে বাঁচাতে চেষ্টা করব । তিনি রাতারাতি বিরাট সিভিল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্ট গড়ে তুললেন। কন্ট্রোল’ (রেশন ব্যবস্থা) দোকান খােলার ব্যবস্থা করলেন। গ্রামে গ্রামে লঙ্গরখানা খােলার হুকুম দিলেন। কেন্দ্রীয় সরকারকে ভয়াবহ অবস্থার কথা জানালেন চাল, আটা ও গম বজরায় করে আনতে শুরু করলেন”(৯/১৭-১৮)। “শহীদ সাহেবের প্রথম কাজ হ’ল কলকাতা শহরে রেশনের ব্যবস্থা করা। এ সম্বন্ধে কারাে কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরােধ করে দু’জন দক্ষ লােক নিয়ে কলকাতার জন্য রেশনের একটি পরিকল্পনা তৈরি হ’ল তারপর ঢাকা, চিটাগাং-এর পরিকল্পনা। রেশন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বিপদ সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখা। যেখানে সব জিনিসের অভাব সেখানে এ সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখা খুবই শক্ত। ঐ সময় আমি দেখেছি শহীদ সাহেবকে দিনে আঠার ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে। তাঁর যেন জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য   মানুষকে বাঁচাতে হবে (১৪(২)/২০)। 

  উপরোল্লিখিত কয়েকটি সূত্রে সােহরাওয়ার্দীর সপ্রশংস উল্লেখ করা হলেও আরাে বিভিন্ন সূত্রেই তার বিরূপ সমালােচনাও করা হয়েছে। নােবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন প্রমাণ করেছেন যে, “১৯৪৩ খ্রি. দুর্ভিক্ষ খাদ্যঘাটতির জন্য হয়নি। 

 পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ থাকা সত্ত্বেও সরকার এবং একশ্রেণীর ব্যবসায়ী মানুষের মুখ (থেকে খাদ্য ছিনিয়ে তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। পঞ্চাশের মন্বন্তরের জন্য দায়ী ছিল অবশ্যই ব্রিটিশরাজ এবং সেই সাথে  . শুধু অর্থনীতি নয়, রাজনীতি এবং ইতিহাসের গবেষকরাও দায়ী করেন নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভাকে  বিশেষ উল্লেখ করেন বেসামরিক সরবরাহ (খাদ্য) দপ্তরের মন্ত্রী সােহরাওয়ার্দী এবং বাংলার মুসলিম লীগের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ইস্পাহানির নাম”(১২/৩৩-৩৪)। জহুর হােসেন চৌধুরীর মন্তব্য : “একটি লােককেও অনাহারে মরতে দেব না, প্রয়ােজন হলে প্রত্যেকটি বাড়ির তক্তপােশের নিচে সার্চ করে মজুদকৃত চাউল বার করব’   সে সময় খাদ্যমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দীর এ ঘােষণা নির্মম পরিহাস হিসেবে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে। বস্তুত মজুদদার ও কালােবাজারীদের বিরুদ্ধে কোন কঠোর ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়নি। একটি উল্লেখযােগ্য মামলা দায়ের করা হয়নি । চালের কালােবাজারী ও মজুদদারির ব্যাপারে সে যুগে দুই ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান যুক্তভাবে সর্বাপেক্ষা কুখ্যাতি অর্জন করে তাদের একটি ছিল মাড়ােয়ারী আর একটি পশ্চিমা মুসলমান। এই মুসলমান প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা নিখিল বঙ্গ ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কর্ণধারদের অন্যতম ছিলেন”(১৫/১২)। একই সূত্রে বলা হয়েছে, দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলগুলি মুসলিম প্রধান ছিল, যে লক্ষ লক্ষ কৃষক মারা গিয়েছিল, তাদের “শতকরা সত্তরজনই মুসলমান”। ২৪ এপ্রিল ১৯৪৬ থেকে ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ পাকিস্তানের জন্ম বা দেশভাগের আগে পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতাসীন ছিলেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী। এসময়ের সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য এবং কলঙ্কজনক ঘটনা ছিল ১৬ আগস্ট, ১৯৪৬ মুসলিম লীগের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ বা ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস । এ ঘটনাটির জন্যও সােহরাওয়ার্দী সম্যকরূপেই নন্দিত এবং নিন্দিত হয়েছিলেন। বােম্বাইতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের কার্যকরী অধিবেশনেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল যে, পরবর্তী ১৬ আগস্ট ভারতজুড়ে মুসলমানদের ‘Direct Action Day. ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস  পালন করা হবে। মৌলানা আজাদের বর্ণনায় সেই দিনটির বাস্তবতা ঃ “16 August was a black day in the history of India. Mob violence unprecendented in the history of India plunged the great city of Calcutta into an orgy of bloodshed, murder and terror. Hundredas of lives were lost. Thousands were injured .. Processions were brought by the League which began to loot and commit acts of arson. Soon the whole city was in the grip of goondas of both the communities” (১৩/১৬৯)। জিন্নাহ বুঝতে পারছিলেন, ব্রিটিশদের চলে যাবার সময় এসেছে, তারা ভারতের শাসন-ক্ষমতা হস্তান্তর করতেও আগ্রহী। অথচ ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে পাকিস্তান। সৃষ্টি করে দিচ্ছে না। এমন হতাশার চাপ কাটানােই ছিল প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’এর প্রধান লক্ষ্য। তাহলে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’এর সংগ্রাম  তাে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধেই হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আদৌ তা হয়নি। প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ অথবা অঘােষিত ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’   যা-ই বলা হােক না কেন, একটা সাংঘাতিক কিছু ঘটতে চলেছে, এ কথাটা কিন্তু ভারত সরকার বা বড়লাট ওয়াভেলের অজানা ছিল না। কিন্তু সংঘাত আটকানাের জন্য সরকার কার্যকর কিছু করেনি বরং করেছিল উল্টোটাই, দাঙ্গদমনে পুলিশ-মিলিটারিকে সরকারি নির্দেশেই কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। ১৬ই আগস্ট জিন্নাহর ঘােষিত প্রত্যক্ষ  সংগ্রাম দিবস’সহ তিনচারদিনব্যাপী কোলকাতায় সংগঠিত একান্ত অযৌক্তিক এবং চরম অমানবিক বর্ণনা এড়িয়ে যাওয়াই ভালাে। কারণ, মানুষ হিসেবে মানুষের, হিন্দু-মুসলমান যেপরিচয়েই হােক না কেন, পাশবিক বর্বরতা মানবিক চিত্তকে আহত এবং কলুষিত করে। এ কথাও অজানা নয় যে, এমন ঘটনায় বিধ্বস্ত-বিপন্ন হয় সাধারণ মানুষ, 

 আর অসাধারণ-মানুষ’, যারা কলকাঠি নাড়েন, তারা ভালই থাকেন, ফায়দাও হয় তাদেরই। তবে ইতিহাসের মােড়-ফেরানাে ঘটনাটির পেছনের রাজনীতির কথা কিছুটা হলেও আলােচনা করা প্রয়ােজন। 

  সেদিন মুসলিম লীগ রাজনীতির দাবার বোড়ে হয়েছিল বাংলা, বাংলার ভােট এবং রক্তের মূল্যেই কেনা হয়েছিল পাকিস্তান। বাঙালি রাজনীতিবিদ এবং তখন কোলকাতায় কর্মরত সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদের প্রণিধানযােগ্য মন্তব্যে : “১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট কলিকাতায় কেয়ামত নামিয়া আসিল।  প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমার নিজের বিবেচনায় এর প্রাথমিক দায়িত্ব মুসলিম লীগ নেতৃত্বের । কায়েদে-আযম ১৬ই আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম-দিবস ঘােষণা করিয়া দিলেন । কিন্তু কোনও কার্যক্রম ঘােষণা করিলেন না। তবে এ কথা তিনি বলিয়াছিলেন : আজ হইতে মুসলিম লীগ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ ত্যাগ করিল। আমরা ধরিয়া নিলাম সভা-সমিতিতে হুমকি দিয়া উত্তেজনাপূর্ণ প্রস্তাবাদি পাস হইবে। আমার অনেক হিন্দু বন্ধুর সাথে আলাপ করিয়া বুঝিলাম হিন্দুরাও তাই ধরিয়া নিয়াছিল। প্রধানমন্ত্রী শহীদ সাহেবের নির্দেশে বাংলা সরকার ১৬ই আগস্ট সরকারি ছুটির দিন ঘােষণা করিলেন । মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা হইলেই লীগের পার্টি-প্রােগ্রামকে সরকারি ছুটির দিন গণ্য করা হইবে, এটা কোনও যুক্তির কথা নয়। কংগ্রেস মন্ত্রিসভারা তা করেনও নাই” (৪/২৫১-২৫৩)। জিন্নাহর প্রত্যক্ষ অগ্রামের ডাকের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার মুসলিম লীগ নেতা, প্রাক্তন ধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন “কলিকাতা মুসলিম ইনিস্টিটিউটের এক সভায় ঘােষণা করিলেন :  আমাদের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ইংরাজের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দুর বিরুদ্ধে। হিন্দুরা সন্ত্রস্ত এবং শেষ পর্যন্ত এগ্রেসিভ হইয়া উঠিল” (৪/২৫১)। শুধু খাজা নাজিমুদ্দিনই নন, আরাে কিছু প্রােপাগান্ডার তথ্য মেলে। জিন্নাহ বলেছিলেন, “আমি নীতি-নৈতিকতার কথা বলতে রাজি নই। এখন আমরা পিস্তল পেয়ে গিয়েছি এবং তাকে ব্যবহার করার অবস্থায় রয়েছি”(৮/৩৬)। লীগপন্থী মর্নিং নিউজ’ লিখেছিল, “কোন নাগরিক অথবা সেনার দ্বারা কোন ব্রিটিশ পুরুষ বা নারীকে উৎপীড়ন করা কেবল বােম্বাইতে গৃহীত প্রস্তাবের বিরােধিতা করা নয়, উপরন্তু তা হল ইসলাম গর্মের তত্ত্ব ও বক্তব্যের পরিপন্থী। হিন্দুদের মত ব্রিটিশরাও ছিল মুসলমানদের কাছে বিধর্মী। কিন্তু স্পষ্টতই বলা হয়েছিল যে ব্রিটিশদের উৎপীড়ন করা ইসলাম ধর্মবিরােধী। এর পরিণামে যা হওয়ার প্রত্যক্ষ সংগ্রামের দিনে তাই হয়েছিল” (১৬/৮৬)। উল্লেখ্য যে, তখন স্বরাষ্টমন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল প্রধানমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দীর হাতেই। ৫ আগস্ট স্টেটসম্যান  পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে সােহরাওয়ার্দী লিখেছিলেন : “আজ মুসলমানদের কাছে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনাে উদ্দেশ্যই প্রিয় অথবা মহান নয়”। আর ১৬ আগস্ট কোলকাতা ময়দানের জনসভায় সােহরাওয়ার্দী বলেছিলেন “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য মাত্র ২৪ ঘণ্টা সময় পাওয়া গেছে” (১২/৪১)। মৌলানা আজাদ লিখেছেন, কোলকাতা থেকে দিল্লি যাবার জন্য অনেক কষ্টে দমদম বিমানবন্দরে পৌঁছানাে সম্ভব হয়েছিল। বিমানবন্দরের কাছে বিরাট একদল মিলিটারিকে অবস্থানরত দেখে আজাদ জিজ্ঞেস করেছিলেন, “Why they were not helping in resorting order, they replied that their orders were to stand ready but not to take action. Throughout Calcutta, the military and the police were standing by but remained inactive while innocent men and women were being killed চ (১৩/১৬৯)। কোলকাতা শহরে চারদিনব্যাপী মারাত্মক সাম্প্রদায়িক সংঘাতে হতাহতের সঠিক সংখ্যা জানা যায় না, তবে বড়লাট ওয়াভেল বলেছিলেন, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের দাঙ্গায় কোলকাতায় যত মানুষ মারা পড়েছিল, পলাশীর যুদ্ধেও তত মানুষ মারা যায়নি। স্মরণ করা যেতে পারে, “১৯৪৬-এ কলকাতায় মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ২৬ শতাংশ, হিন্দু জনসংখ্যা ৬৬ শতাংশ। প্রত্যক্ষ সংগ্রামের প্রথম দিন পার হতেই হিন্দুরা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে যােগ দিয়েছিলেন শিখরা” (১২/৪৭)। “কলিকাতায় স্বভাবতই হিন্দুর চেয়ে মুসলমানের জান-মালের ক্ষতি হইয়াছিল অনেক বেশি। এই খবর অতিরঞ্জিত আকারে পূর্ব বাংলায় পৌঁছিলে নােয়াখালি জেলায় হিন্দুরা নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়। তারই প্রতিক্রিয়ায় বিহারের হিন্দুরা তথাকার মুসলমানদিগকে অধিকতর নৃশংসতার সাথে পাইকারিভাবে হত্যা করে। দেশভাগের আগে পর্যন্ত বাংলা-বিহারের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাই নৃশংস অমানুষিকতার সর্বাপেক্ষা লজ্জাকর নিদর্শন। অনেক অতি-সাম্প্রদায়িক মুসলমান আজও সগর্বে বলিয়া থাকে কলিকাতা দাঙ্গাই পাকিস্তান আনিয়াছিল। এ কথা নিতান্ত মিথ্যা নয়। এই দাঙ্গার পরে ইংরাজ-হিন্দু-মুসলিম তিনপক্ষই বুঝিতে পারেন, দেশ বিভাগ ছাড়া উপায়ন্তর নাই” (৪/২৫৪-২৫৫)। প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের আহ্বান ছিল সারা ভারতেই, কিন্তু অন্য কোথাও নয়, কোলকাতাতেই অমন নারকীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল কেন? অনেকে বলেন, বাংলায় মুসলিম লীগ শাসন বলবৎ ছিল। অনেকেই আবার ভিন্নমত পােষণ করেন, “পাকিস্তান গঠন সম্পর্কে বাংলার প্রধানমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দীর মনােভাব কেমন, তা নিয়ে জিন্নার মনে সংশয় ছিল। সােহরাওয়ার্দী চেষ্টা করেও জিন্নার কাছের মানুষ হয়ে যেতে পারেননি। সেজন্য বাংলার মুসলমানদের ওপর তার প্রভাব কত তা দেখাবার সুযােগ সােহরাওয়ার্দী খুঁজছিলেন। প্রত্যক্ষ সংগ্রামের আহ্বান তাঁর কাছে সেই সুযােগ এনে দেয়। সেনাবাহিনীকে দূরে সরিয়ে রেখে এবং পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে তিনি দেখাতে পেরেছিলেন যে তাঁর ডাকে মুসলমানদের একটি অংশ পাকিস্তানের দাবি নিয়ে কী বর্বরােচিত ঘটনা সংঘটিত করতে পারে” (১৬/৮৭)। 

 অসংখ্য মানুষ মারা পড়েছিল কোলকাতার দাঙ্গায়, এ কথা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি সত্য, মনুষ্যত্বের সবটুকু মেরে ফেলা সম্ভব হয়নি, কখনাে সম্ভব হয় না। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, “সামগ্রিক উন্মত্ততার মধ্যেও দু’একটা সাহসিক মানবিকতার দৃষ্টান্ত মহত্ত্বের উজ্জ্বলতায় ঝলমল করিতেছে। হিন্দুএলাকায় উন্মত্ত জনতা বেষ্টিত মুসলমান পরিবারকে রক্ষার জন্য হিন্দু নারী-পুরুষের বীরত্ব এবং মুসলিম এলাকায় ঐ অবস্থায় পতিত হিন্দু পরিবার রক্ষায় মুসলিম নারীপুরুষের বীরত্ব ইতিহাসে সােনার হরফে লেখা থাকার যােগ্য” (৪/২৫২)। এ বক্তব্য। থেকে আমরা অবশ্যই লক্ষ্য করবাে যে, হিন্দু বা মুসলমান পরিচয়ের জন্য কেউ মনুষ্যত্ব হারায় না, মনুষ্যত্ব হরাবার কারণটা মানুষের ধর্ম-পরিচয়ে নয়, খুঁজতে হবে অন্যত্র । কোলকাতায় প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের চরম অমানবিকতার মাঝেও ‘সাহসী মানবিকতা এবং মহত্ত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবেও সামনে চলে আসে সােহরাওয়ারদির নাম। হতে পারে, ইতােমধ্যে যা বলা হয়েছে এবং অতঃপর যা বলা হবে, তার মাঝেই নির্দেশিত হয় তাঁর ব্যক্তিচরিত্রের দ্বিমুখিতা। ওপরের কথাগুলি যদি সােহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক চারিত্র্য-লক্ষণ হয়, তাহলে পরের কথাগুলি অবশ্যই তাঁর ব্যক্তিচরিত্রের অনুষঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। আবু জাফর শামসুদ্দীন লিখেছেন : “ডাইরেক্ট অ্যাকশনে নামার পর যখন গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং শুরু হলাে তখনও একমাত্র শহীদ সােহরাওয়ার্দীই জীবন বিপন্ন করে মারমুখী হিন্দু মহল্লায় যাচ্ছিলেন। অন্য মুসলিম লীগ নেতাদের নাম তখন শােনা যায়নি”(৮/২৩০)। প্রসঙ্গতই মুজিব লিখেছেনঃ “সােহরাওয়ার্দী সাহেবকে ধরতে পারছি না। ফোন করলেই খবর পাই লালবাজার আছেন। লালবাজার পুলিশ হেডকোয়ার্টার । শহীদ সাহেব রাতদিন পরিশ্রম করেছেন, শান্তি রক্ষা করবার জন্য” (৯/৬৫-৬৬)। অসাম্প্রদায়িক এবং মানবিক মুজিবকে চিনবার জন্যই এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ইসলামিয়া কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক, পরবর্তী সময়ে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ভবতােষ দত্তের আট দশক  নামক স্মৃতিকথা থেকে বিবরণটি উদ্ধৃত করেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : “ছাত্ররা আমাদের অত্যন্ত সমাদরে গ্রহণ করেছিলেন। প্রায় সব ছাত্রই অবশ্য লীগ-পন্থী। পাকিস্তান-কামী। মুসলমান শিক্ষকেরাও তাই। বাংলাভাষীদের (ছাত্র) সংখ্যা ছিল বেশি। এই বাংলাভাষী দলের নেতা ছিল একটি কৃশকায় ছেলে   নাম শেখ মুজিবুর রহমান। ছাত্ররা যে আমাদের জন্য কতটা করতে পারত তার প্রমাণ পেলাম ১৯৪৬-এর রক্তাক্ত দাঙ্গার সময়। বালিগঞ্জ থেকে ইসলামিয়া কলেজের রাস্তায় পদে পদে বিপদ। এই রাস্তা আমাদের ছাত্ররা পার করে দিত। কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি ইসলামিয়া কলেজের সেইসব মুসলমান ছাত্রদের যারা আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে বিপজ্জনক এলাকাটা পার করে দিতেন। এই-সব ছাত্রদের একজনের নাম ছিল শেখ মুজিবুর রহমান”(১(১)/২৪১) । 

 উপরের উদ্ধৃতি থেকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় একজন হিন্দু শিক্ষকের চোখে মানবিক মুজিবের কথা জানা গেল। এবার সেই মুজিবের চোখে একজন হিন্দুশিক্ষককে দেখা যাক। “ইসলামিয়া কলেজে গরীব ছেলেদের সাহায্য করবার জন্য একটা ফান্ড ছিল। সেই ফান্ড দেখাশােনার ভার ছিল বিজ্ঞানের শিক্ষক নারায়ণ বাবুর। আমি (মুজিব) আর্টসের ছাত্র ছিলাম, তবু নারায়ণ বাবু আমাকে খুব ভালবাসতেন। তিনি যদিও জানতেন, আমি প্রায় সকল সময়ই  পাকিস্তান, পাকিস্তান’ করে বেড়াই। ইসলামিয়া কলেজের সকল ছাত্রই মুসলমান। একজন হিন্দু শিক্ষককে সকলেই এই কাজের ভার দিত কেন? কারণ, তিনি সত্যিকারের একজন শিক্ষক ছিলেন। হিন্দুও না, মুসলমানও না। যে টাকা ছাত্রদের কাছ থেকে উঠত এবং সরকার যা দিত, তা ছাড়াও তিনি অনেক দানশীল হিন্দু-মুসলমানের কাছ থেকে চাঁদা তুলে জমা করতেন এবং ছাত্রদের সাহায্য করতেন। এই রকম সহানুভূতিপরায়ণ শিক্ষক আমার চোখে কমই পড়েছে” (৯/৩৭-৩৮)। কোলকাতায় ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’এর অমানবিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া স্তিমিত হয়ে আসার সময়, “পহেলা সেপ্টেম্বর ১৯৪৬ সালে শেরে বাংলা জিন্নাহকে এক চিঠি লেখেন তাঁর অতীতের দোষত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়ে   এবং অদ্ভুত ব্যাপার জিন্নাহও এক সপ্তাহের মধ্যেই তাকে ক্ষমা প্রদর্শন করলেন এবং তাকে আবার মুসলিম লীগের সদস্য হবার অধিকার দিলেন। ফজলুল হক মনে করেছেন, এমনি বিপদের দিনে মুসলমানদের একসঙ্গে কাজ করা উচিত, হয়ত জিন্নাহও তাই ভেবে এবার আর তার সঙ্গে অপমানসূচক ব্যবহার করেননি। অন্যদিকে কেউ কেউ ভাবলেন এটা খাজা। সাহেবদের চাল। আবুল হাশিমকে শেষ আঘাত হানবার কৌশল মাত্র” (১৪(২)/৭৭)। কয়েক বছর পরে (১৯৫৩) ফজলুল হক আবার মুসলিম লীগে যােগ দিয়েছিলেন এবং আবারও তাকে মুসলিম লীগ ছেড়ে যেতে হয়েছিল। ১৯৪৭-এ বাংলা-ভাগ (ভারত-ভাগের সাথেই) এবং কোলকাতাসহ পশ্চিম বাংলা ভারতের ভাগে পড়ার বিষয়গুলি নিশ্চিত হয়ে যাওয়াতে মুসলিম লীগে সােহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম গ্রুপের রাজনৈতিক অবস্থান বােধগম্য কারণেই নাজুক হয়ে পড়েছিল। তখন নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্পাদক লিয়াকত আলী খান। স্বভাবতই জনপ্রিয় মুসলিম লীগ নেতা এবং অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী, কোলকাতাবাসী সােহরাওয়ার্দীকে আরাে হীনবল করে দিতে চাইলেন। আর তাই, লিয়াকত আলী পূর্ব বাংলা মুসলিম লীগের নেতৃত্ব নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। আবুল মনসুর আহমদ এটাকে মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ‘নৈতিক মরাল ও এথিক্যাল অপরাধ  বলে বর্ণনা করেছেন। লিয়াকত আলীর পরিকল্পনা এবং পূর্ব বাংলা মুসলিম লীগে নবাগত সিলেট জেলা মুসলিম লীগারদের সমর্থনে। “Nazimuddin was elected as the leader of the pariamentary party and became the Chief Minister-designate of East Bengal. Suhrawardy decided to stay on in Calcutta for the time being and joined Gandhi in his peace mission to restore communal harmony there. Abul Hashim also decided to remain in India” (১৭/৩০-৩১)। “নাজিমুদ্দিন সাহেব নেতা নির্বাচিত হয়েই দলবলসহ ঢাকা চলে গেলেন। একবারও চিন্তা করলেন না, পশ্চিম বাংলার হতভাগা মুসলমানদের কথা । নাজিমুদ্দিন সাহেব মুসলিম লীগ বা অন্য কারাের সাথে পরামর্শ না করেই ঘােষণা করলেন ঢাকাকে রাজধানী করা হবে। তাতেই আমাদের কলকাতার উপর আর কোনাে দাবি রইল না। নেতারা যদি নেতৃত্ব দিতে ভুল করে, জনগণকে তার খেসারত দিতে হয়। কেন্দ্রীয় লীগের কিছু কিছু লােক কলকাতা ভারতে চলে যাক এটা চেয়েছিল বলে আমার মনে হয় । সােহরাওয়ার্দী নেতা হলে তাদের অসুবিধা হত তাই তারা পিছনের দরজা দিয়ে কাজ হাসিল করতে চাইল”(৯/৭৮-৭৯)। তৎকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় কামরুদ্দীন আহমদ লিখেছেন, আবুল হাশিম, সােহরাওয়ার্দী এবং শরৎ বসুর নতুন রাষ্ট্র হিসেবে যুক্ত বাংলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা জানাজানি হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই মুসলিম লীগের কর্ণধারদের মধ্যে এক আশঙ্কা জেগে উঠে। তারা ধরে নেয় যে, বাংলা অবিভক্ত থাকলে আবার আবুল হাশিম ও সােহরাওয়ার্দীর রাজত্ব কায়েম হবে। এদিকে শরৎ বাবুর  ইচ্ছা শহীদ সাহেবকে একটু পেছনে রেখে আবুল হাশিম সাহেবকে সম্মুখে রাখা   কারণ, শহীদ সাহেবের প্রতি হিন্দুদের চরম বিরূপ মনােভাব ছিল” (১৪(২)/৮৪)। জিন্নাহ ও অবাঙালি লীগ কোটারির দুশ্চিন্তা ছিল, “সােহরাওয়ার্দী যদি নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তানের লীগ নেতা এবং মুখ্যমন্ত্রী হন, তাহলে তিনি তার শক্তির ও নেতৃত্বের ভিত্তি খুঁজবেন বাঙালি মুসলমানের মধ্যে এবং তাদের তিনি সমর্থন ও শক্তি যােগাবেন। তাহলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামােতেও অবাঙালি পুঁজি ও নেতৃত্ব বাঙালি পুঁজি ও নেতৃত্বের হাতে মার খাবে। সুতরাং তাদের জন্য সবচাইতে নিরাপদ হচ্ছে অবাঙালি ও উর্দুভাষী নাজিমুদ্দিনকে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা মুখ্যমন্ত্রী বানানাে । ফলে দেশভাগের সময় সােহরাওয়ার্দী বাংলাদেশে মুসলিম লীগ নেতৃত্ব ও পার্লামেন্টারি দলের নেতৃত্ব হারালেন । পূর্ব বাংলায় কিছুদিনের জন্য গণতান্ত্রিক কণ্ঠ, বিরােধী কণ্ঠ একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায়” (১১/১৫৯-১৬০)। জহুর হােসেন চৌধুরীর মন্তব্য : “বাঙালি মুসলমান লীগে যােগদান করলেও এর নেতৃত্বের কোন অংশ তারা পায়নি। উর্দুভাষী হওয়া ও বাংলাদেশে চিফ মিনিস্টার হওয়া সত্ত্বেও জনাব সােহরাওয়ার্দীকে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়” (১৫/১৮)। অতঃপর তাঁকে অপসারণ করা হয়েছিল প্রাদেশিক মুসলিম লীগের নেতৃত্ব এবং পার্লামেন্টারি পার্টির নেতৃত্ব থেকেও। 

  “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় যার অবদান ছিল সবচাইতে বেশি তিনি শহীদ সােহরাওয়ার্দী । ১৯৪৬ সালের নির্বাচনটি ছিল পাকিস্তান ইস্যুতে গণভােট। বঙ্গ প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কর্ণধার শহীদ সােহরাওয়ার্দী নির্বাচনে এক রেকর্ড সৃষ্টি করেন, ১১৯টি মুসলিম আসনের মধ্যে ১১৩টিতে বিজয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন,  জিন্নাহর প্রতারণা এখানেই শুরু; তাই পুণরায় মুসলিম লীগের কাউন্সিল ডাকেন (দিল্লিতে) ১৯৪৬ সালের ৯ ও ১০ এপ্রিল এবং সােহরাওয়ার্দীকে দিয়ে লাহাের প্রস্তাবের ‘States’ শব্দটির পরিবর্তে ‘State  সংশােধনী প্রস্তাব উত্থাপন ও গ্রহণ করে এক পাকিস্তানের পটভূমি সৃষ্টি করেন। ইতিপূর্বে ৩ এপ্রিল (১৯৪৬) শহীদ সােহরাওয়ার্দী বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে খাজা নাজিমুদ্দিনকে পরাজিত করে নেতা নির্বাচিত (হন) এবং ২৪ এপ্রিল মন্ত্রিসভা গঠন করেন। জিন্নাহর ষড়যন্ত্রে ৫/৮/৪৭ তারিখে সােহরাওয়ার্দীকে ৭৫:৩৯ ভােটে পরাজিত করে নেতা নির্বাচিত হন খাজা নাজিমুদ্দিন। ১৯৪৭ সালের ১৩ আগস্ট শহীদ সােহরাওয়ার্দী পূর্ববঙ্গের ক্ষমতা খাজা নাজিমুদ্দিন এবং ইতিপূর্বে ডা. প্রফুল্ল চন্দ্র ঘােষের কাছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা হস্তান্তর করেন” (সরদার সিরাজুল ইসলাম :‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও ভাষা আন্দোলন’; দৈনিক জনকণ্ঠ, ৬-০২- ১৩ খ্রি.)। তৎকালে বাংলার মুসলিম লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং ব্যক্তিত্বের সংঘাত প্রসঙ্গে কামরুদ্দীন আহমদ লিখেছেন, পূর্ববাংলার মুসলিম লীগ পার্টির ‘পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা নির্বাচনের বিষয়টিও “পাকিস্তান হবার আগেই ঠিক হয়ে যাবে। শহীদ সাহেব (বাংলার প্রধানমন্ত্রী) আমাদের বললেন যে, তিনি ঐ গুজবে বিশ্বাস করেন না। তবু আমরা হাশিম সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম : ‘লিডার’ নির্বাচন যদি অনুষ্ঠিত হয় তবে আমাদের করণীয় কি? তিনি বললেন, “আমাদের কিছু করার নেই । আমরা নিরপেক্ষতা বজায় রাখব। আমার মনে হয়, আবুল হাশিম সাহেবের ঐ সিদ্ধান্ত শেখ মুজিবুর রহমান ও তােফাজ্জল হােসেন (মানিক মিয়া) মেনে নেননি   আর সেদিন থেকেই তাঁদের সঙ্গে আবুল হাশিম সাহেবের সকল সম্পর্ক  শেষ পর্যন্ত তিক্ততায় পৌঁছেছিল। শহীদ সাহেব অনেক ভােটের ব্যবধানে ( নাজিমুদ্দিনের কাছে) হেরে গেলেন। শহীদ সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি হিন্দুস্তানেই থেকে যাবেন। সেজন্য তিনি পশ্চিমবাংলার মুসলিম লীগ দলের নেতা নির্বাচিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গ পরিষদে বিরােধী দলের আসনে বসার ব্যবস্থা করলেন” (১৪(২)/৮৮)। বঙ্গবন্ধুর কথা :“আমাদের পক্ষে কলকাতা থাকা সম্ভবপর না, কারণ অনেককে গ্রেফতার করেছে। শহীদ সাহেবের কাছে বিদায় নিতে গেলাম। তাঁকে রেখে চলে আসতে আমার মনে খুব কষ্ট হচ্ছিল। আমার মন বলছিল, কতদিন মহাত্মাজী শহীদ সাহেবকে রক্ষা করতে পারবেন? কয়েকবার তার উপর আক্রমণ হয়েছে। শহীদ সাহেবকে বললাম, চলুন স্যার পাকিস্তানে, এখানে থেকে কি করবেন?’ বললেন ‘যেতে তাে হবেই, তবে এখানে এই হতভাগা মুসলমানদের জন্য কিছু একটা না করে যাই কি করে? সমস্ত নেতা চলে গেছে, আমি চলে গেলে এদের আর উপায় নাই। তােমরা একটা কাজ কর, দেশে গিয়ে, সাম্প্রদায়িক গােলমাল যাতে না হয়, তার চেষ্টা কর। চেষ্টা কর, যাতে হিন্দুরা চলে না আসে। ওরা এদিকে এলেই গােলমাল করবে, তাতে মুসলমানরা বাধ্য হয়ে পূর্ব বাংলায় ছুটবে। যদি পশ্চিম বাংলা, বিহার ও আসামের মুসলমান একবার পূর্ব বাংলার দিকে রওনা হয়, তবে পাকিস্তান, বিশেষ করে পূর্ব বাংলা রক্ষা করা কষ্টকর হবে। পাকিস্তানের মঙ্গলের জন্যই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা (পূর্ব বাংলায়) হতে দিও না”(৯/৮২)। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর হক-ভাসানী-মুজিব ফিরে এলেন তাঁদের জন্মভূমি পূর্ববঙ্গে, সােহরাওয়ার্দী কিছুকালের জন্য পশ্চিমবঙ্গে রয়ে গেলেন। আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগ নেতৃত্ব এবং প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে সােহরাওয়ার্দীকে অপসারণের পর, তাঁকে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারে মন্ত্রিত্ব গ্রহণের অনুরােধ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী এবং গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ স্বয়ং লিয়াকত আলীকে সােহরাওয়ার্দী জানিয়েছিলেন, “ভারতীয় মুসলমানদের একটা হিল্লা না করিয়া তিনি ভারত ছাড়িতে পারেন না”(৪/২৬৮)। কামরুদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেছেন : ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮ স্বল্পকালীন ঢাকা সফর শেষে “শহীদ সাহেব কলকাতা ফিরে যাবার কিছুদিন পরেই জিন্নাহ সাহেব তাঁকে পাকিস্তানের পুনর্বাসন ময়ী হিসেবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যােগদিতে অনুরােধ করেন। শহীদ সাহেব জিন্নাহ সাহেবকে জানিয়ে দিলেন যে, তিনি যে কাজের ভার নিয়েছেন (কোলকাতার মুসলমানদের শান্তি ও পুনর্বাসন) তা ছেড়ে তখন তিনি মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করতে পারেন না।” (১৮/১১১)। সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ দু টি বিষয়ে নিজের সুস্পষ্ট অভিমত সংবাদপত্রে প্রদত্ত বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন সােহরাওয়ার্দী। বিষয় দু’টি ছিল : “এক, পাকিস্তান হাসিল হওয়ার পর পাকিস্তানের জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নাম আর মুসলিম লীগ থাকা উচিত নয়। দুই, পাকিস্তানের হিন্দুদের রাজনৈতিক আনুগত্য বিচারে উদার বাস্তব দৃষ্টি অবলম্বন করা উচিত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে উভয় রাষ্ট্রেই জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার স্বীকার করিতে গেলেই জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে অসাম্প্রদায়িক হইতেই হইবে। ভারতের যেমন ন্যাশনাল কংগ্রেস আছে, পাকিস্তানেরও তেমনি ন্যাশন্যাল লীগ করিতে হইবে। কথাটা যুক্তিসঙ্গত এবং কায়েদে-আযমের মতও তাই; এই ধারণায় আরাে অনেক মুসলিম নেতা শহীদ সাহেবের এই মত সমর্থন করেন”(৪/২৭৩)। কিন্তু এসব কারণেই তিনি পাকিস্তান সরকার তথা মুসলিম লীগের কায়েমি স্বার্থবাদী নেতৃবৃন্দের চরম বিরাগভাজন হয়েছিলেন। 

 অতঃপর আলােচ্য অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে ভাসানী-মুজিব প্রসঙ্গ। মওলানা ভাসানী রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই ১৯০২ সালে ইংরেজ-বিরােধী স্বদেশী আন্দোলনের সন্ত্রাসবাদী ধারায় যুক্ত হওয়াতে দশ মাস কারাবন্দি ছিলেন। দেশবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ভাসানী ১৯১৯-এ কংগ্রেস দলে যােগ দিয়েছিলেন। সিরাজগঞ্জে (১৯২৪)অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কংগ্রেসের যে অধিবেশনে দেশবন্ধুর ‘বেঙ্গল প্যাক্ট অনুমােদিত হয়েছিল, মওলানা ভাসানী সেখানে কৃষক-প্রজাদের ওপর জমিদার-মহাজনের নির্যাতনের প্রাণস্পর্শী বিবরণ উপস্থাপন করেছিলেন। ফলে আবার তাকে (বাংলা) দেশ ছেড়ে আসামে পাড়ি জমাতে হয়। আসামের ধুবড়ি জেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসানচরে বসবাসরত বাঙালি কৃষকদের সংঘবদ্ধ করে তিনি এক বিশাল সম্মেলনের আয়ােজন করেন। পরে তাঁর কর্মস্থল হয় আসামের ঘাগমারি অঞ্চল। সেখানে তিনি বাঙালি কৃষকদের জন্য চিকিৎসা কেন্দ্র, স্কুল, মাদ্রাসা ইত্যাদি স্থাপন করেন। ১৯৩৫ সালে আসামের স্থানীয় লােকরা আসাম থেকে বাঙালিদের বহিষ্কার করার জন্য বাঙালখেদা’ আন্দোলনের ডাক দিলে তিনি এর বিরুদ্ধে পাল্টা আন্দোলন গড়ে তােলেন”(৭(৪)/২৪১)। উল্লেখ্য যে, “১৯৩০ সালের পূর্ব পর্যন্ত আসামে বহিরাগতদের (প্রধানত ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে আগত মুসলমান কৃষক) বসবাস একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখার জন্য সরকার কর্তৃক টেনে দেওয়া ভৌগােলিক সীমারেখাই ইতিহাসে ‘লাইন প্রথা  নামে পরিচিত। পূর্ববঙ্গের ভূমিহীন ও জমিদার-মহাজনদের দ্বারা লাঞ্ছিত নিপীড়িত বহু মানুষ আসামের দুর্গম অরণ্যভূমি পরিষ্কার করে আবাদ শুরু করলে সরকার প্রথম দিকে তাদের স্বাগত জানায় এবং উৎসাহিত করে। অল্পদিনের মধ্যে তারা কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে শুরু করে। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলাে বিভিন্নভাবে বাধা সৃষ্টি করতে থাকে এবং সরকার লাইন প্রথা প্রবর্তন করে (গােপীনাথ বড়দলৈ-এর কংগ্রেসী সরকার পুলিশ ও হাতি নিয়ােগ করে উদ্বাস্তু কৃষকদের ঘরবাড়ি ভেঙ্গে উৎখাত করে দিচ্ছিল) ..মওলানা ভাসানী আসামে পূর্ববঙ্গের হতভাগ্য কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ‘লাইন প্রথা’ ও ‘বাঙাল খেদা’ আন্দোলনের তীব্র বিরােধিতা করে নতুনভাবে আন্দোলন পরিচালনা করতে থাকেন। এই আন্দোলনের চাপে ১৯৪০ সালের শেষভাগে আসামের অ্যাডভােকেট জেনারেল লাইন প্রথার কার্যকারিতা স্থগিত করতে বাধ্য হন। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন এলাকা থেকে লাইন প্রথা প্রত্যাহার করা হয়  .লাইন প্রথা-বিরােধী আন্দোলনের সাফল্য আসামে পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করেছিল (৭(৫)/৯০-৯১)। তবে স্মরণ করা যেতে পারে যে, সিলেট জেলা তখন আসাম প্রদেশের অন্তর্গত ছিল, ১৯৪৭ জুন মাসে সিলেট জেলার পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে ‘রেফারেন্ডাম’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু দেশভাগের পূর্ব পর্যন্ত দশ বছর আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি থাকা সত্ত্বেও “মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী রেফারেন্ডামে কোন সাহায্যই করেননি” (১৪(২)/১৪১)। জহুর হােসেন চৌধুরী লিখেছেন :“মওলানা ভাসানীকে আমি প্রথম দেখি ১৯৪৫-৪৬ সালে কলকাতায় ‘লাইন প্রথা বিরােধী আন্দোলনের নেতা হিসেবে মওলানা ভাসানী তখন খ্যাতির উচ্চতম শিখরে। প্রথম দর্শনেই মওলানা ভাসানীকে আমার অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতৃবর্গের চেয়ে ভিন্ন ধরনের বলে মনে হলাে। আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও, কংগ্রেসী মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে যথেষ্ট তীব্র কথাবার্তা বললেও একবারও তাকে ‘হিন্দু  শব্দটি উচ্চারণ করতে শুনলাম না। তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য - তিনি কেবল যে মুখে চাষী-জনতার সুখ-দুঃখের কথা বলছেন তা নয়, তাদের সঙ্গে একাত্মবােধ করার সাধনায়ও সিদ্ধিলাভ করেছেন । দেশবিভাগের পরে  মওলানা সাহেবের সঙ্গে আমার আবার দেখা হয়। আসাম থেকে সদ্য-আগত। বড়দলৈর জেল থেকে বেরােবার পর তিনি দেশে এসেছেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের মারফতে স্বদেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার জন্য। কিন্তু মওলানাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার জন্য তদানীন্তন  মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।   একটি প্রচারপত্রও দেখলাম যে, সর্দার প্যাটোই মওলানা সাহেবকে পাঠিয়েছেন পূর্ব পাকিস্তানকে ধ্বংস করে। ভারতের সঙ্গে জুড়ে দেয়ার জন্য। শহীদ সাহেবের ভাগ্যেও একই লাঞ্ছনা জুটল।  রাজনীতি সচেতন মধ্যবিত্ত জনতা পাকিস্তান আন্দোলনের এ দুই পরীক্ষিত অগ্রনায়ক সম্বন্ধে ক্ষমতাসীনদের অপপ্রচারে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে নাই”(১৫/৩৯-৪০)। মওলানা ভাসানী ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক জীবন মিলিয়ে যথার্থই ‘ক্যারিশমেটিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। একদিকে তিনি সমাজতন্ত্রী-বামপন্থী, অপরদিকে ‘পীরালী’ প্রথা-আচরণে অভ্যস্থ ছিলেন। ভাসানীর আদর্শে আস্থাশীল আবু জাফর শামসুদ্দিনের লেখা থেকে প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি : “খুব সম্ভব ১৯৪৫ সালের। শেষদিকে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ঐ সম্মেলন (বাহাদুরাবাদ ঘাটে) আহ্বান করেছিলেন। আসাম মন্ত্রিসভার বাঙ্গাল-খেদা নীতি ছিল আলােচ্য বিষয় । তিনি (ভাসানী) ছিলেন ময়মনসিংহ, রংপুর এবং আসামের ধুবড়ি জেলা। এবং ব্রহ্মপুত্রের চর অঞ্চলের পীর। গিয়ে দেখি কম করেও লক্ষাধিক। লােক । গরু-খাসি-বকরি বে-এন্তেহা জবাই হচ্ছে। ভাত গােশত ডাল রান্না চলছে। সবাই ফ্রি আহার করছেন। বলাবলি হতে শুনেছি, জিনেরা মওলানা ভাসানীর। তাঁবে। খাওয়া-খাদ্য ওরাই যােগায়। চেয়ে দেখলাম, জিন্নাত নয় মওলানা ভাসানীর মুরিদরাই যার যেমন আওকাত কিছু না কিছু নিয়ে আসছে, চাল ডাল গরু, খাসি সমানে আসছে; মাতবর শ্রেণীর মুরিদগণ সেগুলি জমা নিচ্ছেন এবং প্রয়ােজন মতাে খরচ করছেন” (৮/২২০-২২১)। 

  আরেকদিন একটি সভা থেকে মওলানা ভাসানীর ফেরার পথে, “কিছু দূর অন্তর অন্তর লােকজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে তেলের শিশি, পানির ঘটি, মাটির ঢেলা প্রভৃতি। গাড়ি থামিয়ে মওলানা ভাসানী ফু দিচ্ছেন আর ওরা দু চারটা করে পয়সা পীরের হাতে দিচ্ছে। মওলানা পকেটে পুরছেন এবং পথিমধ্যে ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিলিয়ে দিচ্ছেন। পথিমধ্যে প্রাপ্ত একটি পয়সাও মওলানা নিয়ে আসেননি”(৮/২২৬)। দেশের নিরক্ষর জনসাধারণের মধ্যে মওলানা ভাসানীর জনপ্রিয়তার প্রসঙ্গে আবু জাফর শামসুদ্দিন এ কথাও লিখেছেন যে, “শুধু পীর-মুরিদী এই জনপ্রিয়তার কারণ ছিল না। তিনি জনসাধারণের একজন রূপে তাদের পরম আত্মীয়রূপে মিশতে পারতেন। তাঁর মার্কিনের লুঙ্গি, সাদা পাঞ্জাবি তালের আঁশের টুপি অথবা সাদা টুপি ছিল সাধারণের সঙ্গে আত্মীয়তার প্রতীক” (৮/২২১)। দেশ-বিভাগের পরে তিনি টাঙ্গাইল জেলার কাগমারিতে বসবাস শুরু করেন এবং মত-পথ পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে আমৃত্যু (১৭ নভেম্বর, ১৯৭৬) রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। 

 স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৩০-এ মওলানা ভাসানী মুসলিম লীগে যােগ দিয়েছিলেন, ১৯৩৬-এ সােহরাওয়ার্দী, ১৯৩৭-এ ফজলুল হক আর শেখ মুজিব যােগ দিয়েছিলেন ১৯৩৯-এ। শেখ মুজিব নিজেই জানিয়েছেন, “১৯৩৯ সালে কলকাতা যাই বেড়াতে । শহীদ সাহেবকে বললাম, গােপালগঞ্জে মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করব এবং মুসলিম লীগও গঠন করব । খন্দকার শামসুদ্দীন সাহেব এমএলএ তখন মুসলিম লীগে যােগদান করেছেন। তিনি সভাপতি হলেন ছাত্রলীগের। আমি হলাম সম্পাদক। মুসলিম লীগ গঠন হল। একজন মােক্তার সাহেব সেক্রেটারি হলেন, অবশ্য আমিই কাজ করতাম। মুসলিম লীগ ডিফেন্স কমিটি একটা গঠন করা হল। আমাকে তার সেক্রেটারি করা হল। আমি আস্তে আস্তে রাজনীতির মধ্যে প্রবেশ করলাম” (৯/১৩-১৪)। তবে এ কথা সবারই জানা, সরাসরি মুসলিম লীগে যােগ না দিলেও কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র জীবনের শুরু (১৯৪২) থেকেই শেখ মুজিব ছিলেন সােহরাওয়ার্দীর অনুসারী সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী। দুর্ভিক্ষ (১৯৪৩) পরবর্তী মুসলিম লীগের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আবু জাফর শামসুদ্দীন লিখেছেন : “তখন নেতৃত্ব নিয়ে লড়াই চলছে। বামপথ ও ডানপথের নামে । একপক্ষে ছিলেন মওলানা মােহাম্মদ আকরম খাঁ ( ঢাকায় ‘আজাদ’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা; জন্মসূত্রে পশ্চিমবঙ্গীয়), খাজা নাজিমুদ্দীন ইউসুফ আলী চৌধুরী (মােহন মিয়া) প্রমুখ । অপরপক্ষে বৈপ্লবিক ইসলাম এবং রাব্বানিয়াত তত্ত্ব নিয়ে মাঠে অবতীর্ণ হন বর্ধমানের জমিদার আলীগড়ের এম.এ আবুল হাশেম (হাশিম) সাহেব । সােহরাওয়ার্দী সাহেবও এ উপদলে ছিলেন। সােহরাওয়ার্দীআবুল হাশেম উপদলের প্রধান প্রধান ছাত্রকর্মীদের মধ্যে ছিলেন ফরিদপুরের শেখ মুজিবুর রহমান, ঢাকার শামসুদ্দীন আহমদ, টাঙ্গাইলের শামসুল হক প্রমুখ”(৮/১৯৫-১৯৬)। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “আবুল হাশিম সাহেব মুসলিম লীগ কর্মীদের মধ্যে একটা নতুন প্রেরণা সৃষ্টি করেন এবং নতুনভাবে যুক্তিতর্ক দিয়ে বােঝাতে চেষ্টা করতেন যে, পাকিস্তান দাবি হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দু-মুসলমানদের মিলানাের জন্য এবং দুই ভাই যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সুখে বসবাস করতে পারে তারই জন্য। তিনি আমাদের কিছুসংখ্যক কর্মীকে বেছে নিয়েছিলেন, তাদের নিয়ে রাতে আলােচনা সভা করতেন মুসলিম লীগ অফিসে। হাশিম সাহেব আমাদের বললেন, একটা লাইব্রেরি করতে হবে, তােমাদের লেখাপড়া করতে হবে। শুধু হিন্দুদের গালাগালি করলে পাকিস্তান আসবে না। আমি ছিলাম শহীদ সাহেবের ভক্ত। হাশিম সাহেব শহীদ সাহেবের ভক্ত ছিলেন বলে আমিও তাকে (হাশিম সাহেবকে) শ্রদ্ধা করতাম, হাশিম সাহেব বলতেন, মুসলিম লীগকে প্রতিক্রিয়াশীলদের হাত থেকে উদ্ধার করতে হবে। গ্রাম থেকে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে”(৯/২৪)। উল্লেখ্য যে, শেখ মুজিবুর রহমান কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রজীবনেই (১৯৪২-৪৭) সােহরাওয়ার্দীর অনুসারী তরুণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সকলেরই প্রশংসা-মনােযােগ আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে বেকার হােস্টেল এবং ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। হােস্টেল বা কলেজ সংসদ নির্বাচনে তার মনােনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনাে প্রার্থী দাঁড়াতাে না। কোনাে সময় বিভিন্ন ছাত্র-গ্রুপের মতান্তর-বিভেদ ঘটলে সকল পক্ষই তাঁকে মেনে নিত । তিনি ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে গােপালগঞ্জের মুসলিম। লীগের সংগঠক-সমন্বয়কের দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন করেছেন। সবিশেষ উল্লেখযােগ্য যে, দেশভাগের আগে সিলেটের পাকিস্তানে যােগদানের প্রশ্নে যে ‘রেফারেন্ডাম  (জুন, ১৯৪৭) হয়েছিল, সেখানে সােহরাওয়ার্দী পাঁচ শত স্বেচ্ছাসবক পাঠিয়েছিলেন। মুজিব লিখেছেন : “মওলানা তর্কবাগীশ, মানিক ভাই ( তােফাজ্জল হােসেন, পরবর্তী সময়ে ইত্তেফাকের সম্পাদক), ফজলুল হক ও আমি পাঁচশত কর্মী নিয়ে একদিন সিলেটে পৌঁছি। আমাদের জন্য সিলেটের গণভােট কমিটির শুধু কোন এলাকায় কাজ করতে হবে,  সেখানে পৌঁছে দিতে হয়েছে। যাবতীয় খরচপত্রের ব্যবস্থা শহীদ সাহেব করে দিয়েছিলেন” (৯/৭৫-৭৬)। এ তথ্য থেকে লক্ষণীয় যে, শেখ মুজিব তখনই কর্মী পর্যায় থেকে নেতৃত্বে উঠে আসছেন। 

  হক-ভাসানী-মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন : 

 সােহরাওয়ার্দীর পাকিস্তানে আগমন 

 দেশভাগের পরে হক-ভাসানী-মুজিবের পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসাটা ছিল যথার্থই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। অপরদিকে শহীদ সােহরাওয়ার্দীর জন্ম এবং পৈতৃক নিবাস ছিল পশ্চিম বাংলার কলকাতায়। মুসলিম লীগের রাজনীতি এবং পাকিস্তান আন্দোলনে যুক্ত থাকলেও তাঁকে আসতে হয়েছিল পাকিস্তান সরকারের আরােপিত অনেক বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে, প্রায় দু বছর পরে। সবার আগে পূর্ব বাংলায় (ঢাকায়) এসেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি লিখেছেন : “আমি ভাবতাম, পাকিস্তান কায়েম হয়েছে, আর চিন্তা কি? এখন ঢাকায় যেয়ে ল’ ক্লাসে ভর্তি হয়ে কিছুদিন মন দিয়ে লেখাপড়া করা যাবে। চেষ্টা করব, সমস্ত লীগ কর্মীদের নিয়ে যাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা না হয়। সেপ্টেম্বর (১৯৪৭) মাসে ঢাকা এলাম। পূর্বে দু একবার এসেছি বেড়াতে। পথঘাট ভাল করে চিনি না। ১৫০ নম্বর মােগলটুলীতে উঠব ঠিক করলাম । শামসুল হক সাহেব ওখানেই থাকেন। মুসলিম লীগ ও অন্যান্য দলের কর্মীদের সভা ডেকেছেন আমাকে পূর্বেই খবর দিয়েছেন। তাই কয়েকদিন পূর্বেই এসে হাজির হতে হল। শামসুল হক সাহেব বললেন, ‘জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় কনফারেন্স করব? সরকার নাকি এটাকে ভাল চোখে দেখছে না। আমাদের কনফারেন্স যাতে না হয়, সেই চেষ্টা করছে এবং গােলমাল করে কনফারেন্স ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমি বললাম, এত তাড়াতাড়ি এরা আমাদের ভুলে গেল হক সাহেব । হক (শামসুল) সাহেব হেসে দিয়ে বললেন, এই তাে দুনিয়া” (৯/৮২-৮৩)। পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ-বিরােধী রাজনীতির কথা হােক কিংবা অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সূচনা, সর্বার্থেই ১৫০ নং মােগলটুলী হয়ে উঠেছিল তার আদি ঠিকানা এবং শেখ মুজিব তখন থেকেই কথায়-কাজে হয়ে উঠছিলেন পূর্ব বাংলার প্রথম সক্রিয় প্রতিবাদী রাজনীতিবিদ। 

 শেখ মুজিবের পরেই কোলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক। আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন: “পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকাতে সমগ্র রাজনৈতিক কার্যকলাপ ও রাষ্ট্র-নেতারাও চলিয়া আসিয়াছেন। হক সাহেব তখনও কলিকাতায় পড়িয়া আছেন। পাকিস্তান-প্রস্তাবের প্রস্তাবক হইয়াও তিনি শেষ পর্যায়ে জিন্নাহ সাহেবের সাথে ঝগড়া করিয়া মুসলিম লীগ হইতে বাহির হইয়া যান। জিন্নাহ সাহেব বলেন, ফজলুল হকের কপালে ওয়াটারলু (চরম পরাজয় ও রাজনৈতিক মৃত্যু) ঘটিয়াছে। যারা ফজলুল হককে জানিত, তারা এটাও জানিত যে, শেরে-বাংলার মৃত্যু (রাজনৈতিক) ঘটে নাই” (৪/২৮৩)। তবে উল্লেখ্য যে, ঢাকায় ফিরেও শেরে বাংলা রাজনীতিতে যােগ দেননি, এমনকি প্রবল মাতৃভাষা আন্দোলনের সময়ও তিনি রাজনীতির সাথে প্রায় সংযােগ-সম্পর্কহীনই ছিলেন। ঢাকায় এসে ফজলুল হক প্রথমে খাজা নাজিমুদ্দিন এবং পরে নুরুল আমিন প্রমুখ। দু’জন মুসলিম লীগার মুখ্যমন্ত্রীর আমলেই প্রাদেশিক সরকারের অ্যাডভােকেট জেনারেল পদে নিয়ােজিত ছিলেন। তিনি ঢাকায় আওয়ামী লীগ গঠনের কর্মী সম্মেলনে (২৩ জুন, ১৯৪৯)কিছু সময় উপস্থিত থাকলেও দলে যােগ দেননি। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : “১৯৫৩সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি অ্যাডভােকেট জেনারেলের পদ থেকে পদত্যাগ করে মুসলিম লীগে (পুনরায়) যােগদান করেন। মুসলিম লীগের মধ্যে তখন কোন্দল শুরু হয়েছিল ভীষণভাবে। মােহন মিয়া সাহেব নুরুল আমিন সাহেবের বিরুদ্ধে গ্রুপ সৃষ্টি করেন এবং হক সাহেবকে মুসলিম লীগের সভাপতি করতে চেষ্টা করে পরাজিত হন। ফলে মােহন মিয়া ও তার দলবল (হক। সাহেবসহ) লীগ থেকে বিতারিত হন। এরপর আমি তাঁকে (ফজলুল হক) আওয়ামী লীগে যােগদান করতে অনুরােধ করলাম। চাঁদপুরে আওয়ামী লীগের এক জনসভায় তিনি যােগদানও করলেন। সেখানে ঘােষণা করলেন, যারা চুরি করবেন, তারা মুসলিম লীগে থাকুন, আর যারা ভাল কাজ করতে চান, তারা আওয়ামী লীগে যােগদান করুন। আমাকে ধরে জনসভায় বললেন, ‘মুজিব যা বলে তা আপনারা শুনুন। আমি বেশি বক্তৃতা করতে পারব না, বুড়া মানুষ। এ বক্তৃতা খবরের কাগজেও উঠেছিল” (৯/২৪৪)। পূর্ব বাংলা বা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে তৃতীয় নামটি মওলানা ভাসানীর। তখন পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন এবং অন্যতম মন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী নির্বাচিত পরিষদ সদস্য ছিলেন না। ১৯৩৫ সালের ভারত-শাসন আইনে অনির্বাচিত পরিষদ সদস্যদের ছয় মাসের অধিক মন্ত্রী থাকার বিধান ছিল না। তাই প্রথম টাঙ্গাইল দক্ষিণ নির্বাচনী এলাকায় আসন খালি হওয়ায় তিনি (নাজিমুদ্দিন) সেখানে প্রার্থী হলেন। ঐ সময় মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী কিছুদিনের জন্য কাগমারী এসেছিলেন, সবাই ধরে তাকে প্রার্থী করে দিলেন। 

  নাজিমুদ্দিন সাহেব ভয় পেয়ে সেখান থেকে তাঁর (নিজের) নাম প্রত্যাহার করলেন   ফলে মওলানা সাহেব বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিষদে নির্বাচিত হলেন। কিন্তু সংসদীয় রাজনীতিতে তার কোন আকর্ষণ না থাকায় তিনি আসামে চলে যান। ওখানে যাবার কিছুদিন পরেই আসাম সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজবন্দি করে রাখে” (১৪(২)/১১০)। বঙ্গবন্ধুর বিবরণ কিছুটা ভিন্ন : “টাঙ্গাইলে দুইটা আইনসভার আসন খালি হয়েছিল। আমাদের ইচ্ছা ছিল, নাজিমুদ্দিন সাহেবের বিরুদ্ধে লােক দেওয়া যায় কিনা? তাঁর শরণাপন্ন হলাম। কিন্তু মওলানা সাহেব এক সিট নিজে এবং এক সিট নাজিমুদ্দিন সাহেবকে দিয়ে নির্বাচন করে এমএলএ হলেন। পরে নির্বাচনী হিসাব দাখিল না করার জন্য মওলানা সাহেবের নির্বাচন বেআইনি ঘােষণা হয়েছিল”(৯/১০১)। আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী আসাম কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে পূর্ব বাংলায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন শেখ মুজিব। পূর্ব বাংলায় ফিরে মওলানা ভাসানী পুনরায় বসবাস শুরু করেছিলেন টাঙ্গাইলের কাগমারিতে। আরাে কিছুদিন পরে ঢাকার রােজ গার্ডেনের যে কর্মিসভায় আওয়ামী মুসলিম লীগ  গঠন করা হয়েছিল, তাতে সভাপতিত্ব করেছিলেন মওলানা ভাসানী। উল্লেখ্য যে, কয়েক মাস আগে কর্মিসভার আহ্বায়ক কমিটি গঠনের সময় মওলানা ভাসানীকে ‘আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি’ পরিচয়ে আহ্বায়ক মনােনীত করা হয়েছিল। সম্পাদক মনােনীত হয়েছিলেন ইয়ার মুহম্মদ খান। প্রসঙ্গত এখানেই উল্লেখ করা যেতে পারে যে, একদিকে তিনি দ্রুতই পূর্ব বাংলায় সরকার-বিরােধী রাজনীতির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, এ কথা যেমন সত্য, তেমনি সত্য এ কথাও যে, সারা জীবন রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও মওলানা ভাসানী প্রথাসিদ্ধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কখনাে আকর্ষণ বােধ করেননি। বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে “মওলানা ভাসানীর কোন শৃঙ্খলাবােধ না থাকায় তিনি অনেক সময় ইচ্ছামত  কাজ পরিচালনা করতেন এবং তার ফলে অনেক ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিতাে” (১৮/১৮)। অতঃপর সােহরাওয়ার্দীর পাকিস্তানে আগমনের প্রসঙ্গ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরবর্তী দু’বৎসরাধিক কাল কোলকাতায় মহাত্মা গান্ধীর সাথে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় নিয়ােজিত থেকে “যখন ঢাকা রওনা হলেন, তখন অর্ধপথে গিয়ে তিনি জানতে পারলেন, তাঁর পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ নিষিদ্ধ। পাকিস্তান গণপরিষদে তার সদস্য পদটিও (জিন্নাহর মৃত্যুর পরে) বাতিল করে দেওয়া হয়” (১১/১৩১)। উল্লেখ্য যে, তিনি তখনও পশ্চিমবঙ্গ (প্রাদেশিক) পরিষদে সদস্যপদ বজায় রেখে সেখানে মুসলিম লীগ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছিলেন। দৃশ্যত একারণেই “সােহরাওয়ার্দী ছিলেন পাকিস্তানে অবৈধ ঘােষিত ব্যক্তি । এ সময় তিনি একবার পাকিস্তানে প্রবেশের চেষ্টা করলে নারায়ণগঞ্জ স্টিমার ঘাট থেকে পুলিশ তাঁকে একখানি ১ম শ্রেণীর রিটার্ন টিকিট ধরিয়ে দিয়ে কলকাতায় ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। সােহরাওয়ার্দীকে কলকাতায় ফেলে রাখার উপর মন্তব্য করতে গিয়ে নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান সে সময়ে ন্যক্কারজনকভাবে উক্তি করেছিলেন Surhrawardi ?  the mad dog let loose by India  – সােহরাওয়ার্দী ভারতের প্রভাবাধীন একটি পাগলা কুকুর” (১৯/৫৬)। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শহীদ সােহরাওয়ার্দীর কোলকাতা থেকে ঢাকায় আসার ব্যাপারে, সম্ভবত স্মৃতি-নির্ভরতার কারণেই বিভিন্ন সূত্রে তথ্য-ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। উপরােদ্ধৃত দু’টি তথ্যেও ভিন্নতা লক্ষণীয়। অপরদিকে কামরুদ্দীন আহমদ উল্লেখ করেছেন, “১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি শহীদ সােহরাওয়ার্দী ঢাকায় আগমন করেন এবং খাজা নাজিমুদ্দিনের অতিথি হন। তাঁর সঙ্গে দু দেশের বাস্তুহারাদের সমস্যা সম্পর্কে সম্বন্ধে আলােচনা করেন। তিনি নাজিমুদ্দিন সাহেবকে বলেন যে, সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করে শান্তি ফিরিয়ে আনতে না পারলে অবস্থা আরাে সংকটাপন্ন হয়ে দাঁড়াবে” (১৪(২)/১১১)। 

  তবে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে উল্লিখিত বিভিন্ন তথ্য থেকে এমন ধারণাই হয় যে, ১৯৪৮-  ৪৯ সময়কালে সােহরাওয়াদী একাধিকবার ঢাকায় এসেছিলেন। এবার পর্যায়ক্রমে সেই তথ্যগুলি উল্লেখ করা যেতে পারে। 

  ঠিক দিন-তারিখের উল্লেখ নেই, তবে প্রসঙ্গ-বিবেচনায় ধারণা করা চলে ১৯৪৮ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন পারিবারিক প্রয়ােজনে “এই সময় আমি কিছুদিনের জন্য কলকাতায় যাই। আমাকে দেখে (সােহরাওয়ার্দী সাহেব) খুব খুশি হলেন এবং বললেন ‘আমি শীঘ্রই পূর্ব বাংলায় যাব এবং কয়েকটা সভা করব, যাতে হিন্দুরা (ভারতে) না আসে। শহীদ সাহেব ঢাকা হয়ে খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে পরামর্শ করে বরিশালে সভা করতে যাবেন ঠিক হল। শহীদ সাহেব ঢাকায় এসে নাজিমুদ্দিন সাহেবের কাছেই থাকতেন। আমরা স্টিমারে বরিশাল রওয়ানা করলাম। কলকাতা থেকে প্রফুল্লচন্দ্র ঘােষও (পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী) এসেছেন”(৯/৮৫-৮৬)। সােহরাওয়ার্দীর দ্বিতীয়বার পূর্ব বাংলায় আসার প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর লেখায় জানা যায় : “দিনটা আমার ঠিক মনে নাই। তবে ঘটনাটা মনে আছে, ১৯৪৮ সালের ভিতর হবে। সােহরাওয়ার্দী সাহেব ঢাকায় এসেছিলেন এবং সলিমূল্লাহ মুসলিম হলে এক ছাত্রসভায় বক্তৃতা করেছিলেন। শহীদ সাহেবের বক্তৃতা এত ভাল হয়েছিল যে, যারা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করতেন তারাও তাঁর ভক্ত হয়ে পড়লেন। শহীদ সাহেব পরে আবার (অর্থাৎ তৃতীয় বার) যখন ঢাকায় আসলেন, তখন কতগুলি সভার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল, যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকে। প্রথম সভার জায়গা ঠিক হল টাঙ্গাইল। স্টিমারে মানিকগঞ্জ যেতে হবে, পথে আরাে একটি সভা হবে। শহীদ সাহেব প্লেন থেকে ঢাকায় নেমে সন্ধ্যায় বাদামতলী ঘাট থেকে জাহাজ ছাড়বে । আমিও সাথে যাব। আমরা শহীদ সাহেবকে নিয়ে জাহাজে উঠলাম। জাহাজ ছয়টায় ছাড়বার কথা, ছাড়ছে না। রাত আটটায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও ডিআইজি পুলিশ শহীদ সাহেবের হাতে একটা কাগজ দিলেন, তাতে লেখা, “তিনি ঢাকা ত্যাগ করতে পারবেন না। তবে যদি কোলকাতা ফিরে যান, সরকারের আপত্তি নাই। তিনি ঢাকায় যে কোনাে জায়গায় থাকতে পারেন তাতেও আপত্তি নাই। শহীদ সাহেব জাহাজ ছেড়ে নেমে আসলেন, আমিও তার মালপত্র নিয়ে সাথে সাথে নেমে আসলাম। দুইদিন পরে শহীদ সাহেবকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে জাহাজে (কোলকাতাগামী) তুলে দিলাম” (৯/১০৮)। সম্ভবত এ ঘটনাটিকেই নানাসূত্রে এই বলে উল্লেখ করা হয় যে, তিনি একবার পাকিস্তানে প্রবেশের (৩জুন, ১৯৪৮) চেষ্টা করলে নারায়ণগঞ্জ স্টিমার ঘাট থেকে পুলিশ তাঁকে একখানি ১ম শ্রেণীর রিটার্ন টিকিট ধরিয়ে দিয়ে কলকাতায় ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল”। এখানে একটি কৌতূহলােদ্দীপক প্রসঙ্গ উল্লেখ করছি যাতে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রাজনীতিবিদ সােহরাওয়ার্দী এবং ‘মুখােশ-ঢাকা’ পুলিশ-আমলা জাকির হােসেনের চারিত্র্য-পরিচয় অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে। সেদিন সােহরাওয়ার্দী যখন স্টিমার থেকে নেমে আসছিলেন, জাকির হােসেন বলেছিলেন ‘আপনি আজ রাতে আমার বাসায় অতিথি হলে সুখী হব । শহীদ সাহেব উত্তরে বললেন, “Thanks.If I am not under arrest I would prefer to remain with my host . জাকির হােসেন বললেন, না, আপনি যেখানে খুশি রাত কাটাতে পারেন। শহীদ সাহেব বললেন,  Tell your Nazimuddin that Suhrwardy is not yet dead. এই জাকির হােসেনকে (পূর্বে কনডেমৃড় হওয়া সত্বেও) তিনি একদিন ঢাকার পুলিশ সুপার করেছিলেন। দেশ বিভক্ত হওয়ার সময়ও তাঁকেই আইজি হিসেবে নিযুক্ত তিনি করেছেন কলকাতা মুসলিম লীগ কর্মীদের মতের বিরুদ্ধে” (১৪(২)/১২২-১২৩)। জাকির হােসেনের সাক্ষাৎ পরবর্তী আলােচনাতেও পাওয়া যাবে। জুন, ১৯৪৮ সােহরাওয়ার্দী বিমানে ঢাকায় এসেছিলেন। তখনকার একটি তথ্যের উল্লেখ করেছেন আবু জাফর শামসুদ্দীন: “ঠিক তারিখটা মনে নেই। পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে সােহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানীর পুনর্বাসন যে কোনাে উপায়ে ঠেকিয়ে রাখাটাই ছিল তৎকালীন মুসলিম লীগারদের একমাত্র রাজনীতি। আমি, জহুর (হােসেন চৌধুরী) এবং আরাে কে কে যেন জনসন রােডে আমার দোকানে বসে গল্প-গুজব করছি। এমন সময় দেখি সমুখে দুটো খালি ট্রাকে রাস্তার গরিব কুলিমজুর এবং বেকার যুবকদের তােলা হচ্ছে। ট্রাক বােঝাই হতেই চোঙ্গায় আল্লাহু আকবর পাকিস্তান জিন্দাবাদ, সােহরাওয়ার্দী মুরদাবাদ ধ্বনি তুলল দু ট্রাকের দু’নেতা। অন্যেরা যােগ দিল, তারপর ট্রাক দুটো তেজগা বিমানবন্দরের দিকে ছুটল। পরে জানতে পেরেছিলাম, প্রতি ব্যক্তিকে ১০টাকা করে পারিশ্রমিক দিয়ে ট্রাক বােঝাই করা হয়েছিল” (৮/২৫৮-২৫৯)। তখন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নুরুল আমিন এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সেক্রেটারি ইউসুফ আলী চৌধুরী। সােহরাওয়ার্দীর আরেকবার (সম্ভবত তৃতীয় বার) পূর্ব বাংলায় আসার কথা বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছেন এভাবে, “শহীদ সাহেবও এই সময় ঢাকা আসলেন এবং মাদারীপুর, গােপালগঞ্জ ও আরও কয়েক জায়গায় সভা করলেন, তাতে ফল খুব ভাল হল। হিন্দুদের দেশত্যাগ করার যে একটা হিড়িক পড়েছিল তা অনেকটা বন্ধ হল এবং পশ্চিম বাংলা ও বিহার থেকেও মুসলমানরা অনেক কম আসতে লাগল । এই সমস্ত সভায় এত বেশি জনসমাগম হত এবং শহীদ সাহেবকে অভ্যর্থনা করার জন্য এত লােক উপস্থিত হত যে নাজিমুদ্দিন সাহেবের সরকার ঘাবড়িয়ে গিয়েছিলেন। এবার শহীদ সাহেব (ঢাকায়) নবাবজাদা নসরুল্লাহ সাহেবের বাড়িতে উঠেছিলেন। শহীদ সাহেবকে বিদায় দিলাম গােপালগঞ্জ থেকে। সবুর সাহেব খুলনায় শহীদ সাহেবকে অভ্যর্থনা করলেন। কারণ, সবুর সাহেব তখনও শহীদ সাহেবের কথা ভুলতে পারেন নাই । তাঁকে সমর্থন করতেন এবং আমাদেরও সাহায্য শরতেন”। প্রসঙ্গতই বঙ্গবন্ধু আরাে উল্লেখ করেছেন, “এইবার যখন শহীদ সাহেব পূর্ব পাকিস্তানে এলেন, আমরা দেখলাম সরকার ভাল চোখে দেখছে না। দু একজন (সরকারি কর্মকর্তা) গােপনে বলেই ফেলেছিল, “উপরের হুকুম, যাতে তারা সহযােগিতা না করে। গােয়েন্দা বিভাগের তৎপরতাও বেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছিল”(৯/১০২-১০৩)। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, শহীদ সােহরাওয়ার্দীর তৃতীয়বার পূর্ব বাংলায় আসাটা কখন হয়েছিল? লক্ষণীয় যে, এসময় পূর্ব বাংলায় বক্তৃতা-সফরে সােহরাওয়ার্দীর সঙ্গী ছিলেন শেখ মুজিব। উল্লেখ করা যেতে পারে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনে জড়িত হয়ে উপাচার্যের বাসভবনে অবস্থান ধর্মঘট করার কারণে শেখ মুজিবকে ১৯এপ্রিল, ১৯৪৯ খ্রি. গ্রেফতার করে নিরাপত্তা আইনে বন্দী রাখা হয়, তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার (২৩ জুন,  ১৯৪৯) পর ২৯ জুন তারিখে । সুতরাং অবধারিত যে, পূর্ব বাংলায় সােহরাওয়ার্দীর তৃতীয় সফরটি ১৯৪৯-এর জুলাই মাসের আগে ঘটেনি। যদিও কামরুদ্দিন আহমদ বলেছেন, “এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি শহীদ সাহেব ঢাকা এলেন তার শান্তি মিশনে”। কোনাে কোনাে তথ্য-সূত্রে জানা যায়, পাকিস্তান হবার পর সেবার ঢাকাতেই খাজা নসরুল্লাহর দিলকুশার বাসায় মওলানা ভাসানী এবং সােহরাওয়ার্দীর প্রথম সাক্ষাৎ-আলােচনা হয়েছিল। 

 “Suhrwardy, had finally ended his residence in India in 1949 to settle in West Pakistan and was more interested in national, rather than provincial politics” (১৭/৪৬)। তখন সােহরাওয়ার্দী কোলকাতা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচীতে ফিরে আইন-পেশা শুরু করেন। পশ্চিম পাকিস্তানে লাহাের-করাচিভিত্তিক, মুসলিম লীগ-বিরােধী রাজনীতি শুরু করার জন্য নিজস্ব সংগঠন গড়ে নাম দিয়েছিলেন ‘জিন্নাহ মুসলিম লীগ’ । কিন্ত “শহীদ সাহেবের পশ্চিম পাকিস্তানে কোনাে রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল না। সুতরাং সেখানে তিনি একটি সংগঠন ড্রইংরুমে বসে তৈরি করে সীমান্ত প্রদেশ ও পাঞ্জাবের ‘উপরের চক্র থেকে কিছু লােক জোগাড় করতে সচেষ্ট হন। সিন্ধুতে   নইলে অন্তত করাচিতে কোন সংগঠন করা যায় কি না তার চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু ..সম্ভব হয়নি। মওলানা ভাসানী সাহেব তাকে ঢাকায় তার কর্মস্থল করতে বললেন। কারণ তাঁর মতে শহীদ সাহেব করাচিতে পাত্তা পাবেন না, মাঝখান থেকে পূর্ব বাংলাও হারাবেন। শহীদ সাহেবের (পঃ পাকিস্তানে বসবাসের) সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল তার উচ্চাভিলাষ। পূর্ববঙ্গে কর্মস্থল করলে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়া কখনাে সম্ভব হবে না ” (১৪(২)/১৩১১৩২)। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি স্থায়ী বসবাসের ঠিকানা পশ্চিম পাকিস্তানে রেখেই পূর্ব বাংলায় গঠিত ভাসানী-মুজিবের ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’এ যােগ দিয়ে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, আমৃত্যু (১৯৬৩) বেশ দীর্ঘকাল। বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছেন : “১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মােহাম্মদ আলী জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেন এবং খাজা নাজিমুদ্দিনকে গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেন জনাব নুরুল আমিন সাহেব। এই সময়ও কিছু সংখ্যক এমএলএ শহীদ সাহেবকে পূর্ব বাংলায় এসে প্রধানমন্ত্রী হতে অনুরােধ করেছিলেন। তিনি রাজি হন নাই। গণপরিষদে একটা নতুন আইন পাস করে শহীদ সাহেবকে গণপরিষদ থেকে বের করে দেওয়া হল” (৯/১০৯)। এখানে পাকিস্তান গণ-পরিষদে গৃহীত সেই নতুন আইনটির কথা উল্লেখ করা দরকার। নতুন আইনে বলা হলাে যে, “পাকিস্তানে যেসব সদস্যদের বাড়ি নেই বা সরকারের নিকট থেকে বাড়ি ‘এলটমেন্ট’ নেননি, তাদের গণ-পরিষদের সদস্য থাকতে দেয়া হবে না। শহীদ সাহেব ‘বিলের বিরােধিতা করলেন। বললেন, কেবল তাঁকেই বের করার জন্য ঐ ‘বিল আনা হয়েছে। তার বা তাঁর পিতা বা পিতামহের কোন বাড়ি কোথায়ও নেই, কি ভারতে কি পাকিস্তানে, তাই বলে সেটি একটা অপরাধ হতে পারে না” (১৪(২)/১২৫)। তথাপি এ আইনেই শহীদ সােহরাওয়ার্দীর গণ-পরিষদ সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছিল। 

 পাকিস্তানি শাসনের শুরু : পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদী আন্দোলনের সূচনা 

 বঙ্গবন্ধুর একটি অনস্বীকার্য উক্তি উদ্ধৃত করেই প্রসঙ্গটি শুরু করা যেতে পারে : “পাকিস্তান হওয়ার সাথে সাথেই ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছিল” (৯/৭৫)। ইতিহাস সাক্ষী, পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে কেবল পশ্চিম পাকিস্তানিরাই নন, তাঁদের তল্পিবাহক এবং সহায়ক হিসেবে সকল পর্যায়েই যুক্ত ছিলেন কতিপয় বাঙালি রাজনীতিবিদ এবং আমলা-প্রশাসকও। শেখ হাসিনার প্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ : “পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পূর্ব পাকিস্তান নামক অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগােষ্ঠী বৈষম্য ও উপেক্ষায় বঞ্চিত হচ্ছিল অনবরত। বাংলাদেশ অর্থাৎ তথাকথিত পূর্ব পাকিস্তান মূলত ছিল পাকিস্তানের একটা কলােনি। অত্যন্ত অবহেলিত একটা প্রদেশ, যা কিনা বারাে শ  মাইল দূরে অবস্থিত।  বড় বিচিত্র আমাদের এই ভূখণ্ড! এখানে একদিকে যেমন রয়েছে। আত্মত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত মানুষ, আবার অপরদিকে রয়েছে বিশ্বাসঘাতকতায় কলঙ্কিত মােনাফেক” (১(১)/২৩-২৪)। ১৯৪৭-১৯৭১ কালপর্ব-জুড়ে হক-ভাসানী-সােহরাওয়ার্দী-মুজিব প্রমুখ চারজন মহান। রাজনীতিবিদের বহুমুখী সচেতন উদ্যোগ-অবদানেই পূর্ব বাংলায় চলেছে নিরবচ্ছিন্ন প্রতিবাদী সংগ্রাম। দেশভাগের পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলার রাজনীতির চার-প্রধানের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানই প্রথম কোলকাতা ছেড়ে ঢাকায় এসেছিলেন এবং কালক্রমে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন এপার বাংলার রাজনীতির প্রধানতম পুরুষ। সুতরাং চার-প্রধানের কনিষ্ঠতম মুজিবের কথা দিয়েই এ পর্যায়ের আলােচনা শুরু করতে হবে এবং অতঃপর ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণে সমধিক পরিমাণেই আসবে তাঁর কথা, এ-সত্যও অনস্বীকার্য । ‘স্থির লক্ষ্যের রাজনীতিবিদ শেখ মুজিব’ নিবন্ধে স্বদেশ রায় লিখেছেন, “শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন বিকশিত হবার অনুকূল পরিবেশ পায় পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই । ঢাকা-কেন্দ্রিক পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে পাকিস্তান সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির আগে পূর্ব বাংলার নেতা ছিলেন শেরে বাংলা আর কোলকাতা-কেন্দ্রিক বাংলার মুসলিম নেতা ছিলেন হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী। পাকিস্তান সৃষ্টির কিছুকাল আগে থেকে মুসলিম লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক শেরে বাংলা অনেকটা পরাজিত হন। তিনি রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। কোলকাতা-কেন্দ্রিক যে মুসলমানদের নেতা সােহরাওয়ার্দী পাকিস্তান সৃষ্টির আগে তিনিও মুসলিম লীগের কট্টর রাজনীতির কাছে অনেকখানি পরাজিত হয়েছিলেন। জিন্নাহ-লিয়াকত আলীরা পূর্ব বাংলার রাজনীতি তুলে দেন নবাব পরিবারের হাতে। খাজা নাজিমুদ্দিন হন পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগের নেতা” (১(৩)/১৫২৩-২৪) এবং মুখ্যমন্ত্রী। বিশিষ্ট সংস্কৃতি-জন এবং সাংবাদিক ওয়াহিদুল হক ‘হৃদয়টা ছিল তাঁর আকাশের মত  শিরােনামের নিবন্ধে লিখেছেন : “সােহরাওয়ার্দী পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে হেরে গিয়ে এলেন না এ দেশে, ভারতের মুসলমানদের (ও গান্ধীজীর) সেবা করবার জন্য রয়ে গেলেন ভারতে। মুজিব কি কেবল তারই কারণে প্রতিবাদী রাজনীতি গ্রহণ করলেন? তা হলে মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেবেন কেন? সােহরাওয়ার্দী মুগ্ধতার ব্যাপারটা ছিল মুজিবের অনেক দিন । কিন্তু এটাই তার জীবনের প্রধান নিয়ামক ছিল না। 

  শহীদ সাহেব ও অন্যান্য অনেক মুসলমান নেতাদের মত তিনি পদলালসায় রাজনীতি করতেন না। রাজনীতি তিনি করতেন, তাঁর বুদ্ধিতে যতদূর কুলায়। অধিকাংশের (তথা কৃষকের) মঙ্গলের স্বার্থে, তাঁর অভ্রান্ত কিবলা ছিল সর্বমানবের, তার আশপাশের সর্বগরিবের কল্যাণ। এবং সেখানে পৌঁছবার তাঁর অবলম্বন ছিল এই লাঞ্ছিত নিপীড়িতদের মতামত। সকলেই জানে, তিনি জাতির পালস্ কতটাই না পড়তে পারতেন” (১(৩)/১৫৩৪)। “জনগণের নাড়িনক্ষত্রের খবর তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) ছিল অসাধারণ   শেরে বাংলা বা সােহরাওয়ার্দী কোনমতেই তার সমকক্ষ ছিলেন না। অনেক আদর্শ বা ধারণা তিনি (শেখ মুজিব) আবিষ্কার করেননি, কিন্তু একটি আদর্শকে জনগণের আদর্শে রূপান্তরিত করতে তিনি ছিলেন সার্থক শিল্পী। জনহিতে নিবেদিত এমন নেতা আমি আর দেখিনি”। বাংলাদেশ ও শ্রেষ্ঠতম বাঙালি  নিবন্ধে আবুল মাল আবদুল মুহিত আরাে লিখেছেন, “রবীন্দ্রনাথ শিল্প-সাহিত্য ও রুচির বিকাশে দিশারী। দেশবন্ধু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ। জাতীয়তাবােধ জাগরণে বিপিন পাল চিরবিদ্রোহী। সমাজ বিনির্মাণে রাজা রামমােহন রায় সংস্কারের অগ্রদূত। বাংলা ভূখণ্ডের একীভূত অবস্থান রচনায় গােপাল, ইলিয়াস শাহ ও শায়েস্তা খানরা মহান স্রাট। ধর্মপ্রচারে হযরত শাহ-জালাল বা অতীশ দীপঙ্কর অথবা শ্রীচৈতন্য নতুন দিগন্ত উন্মােচিত করেছেন। একান্তভাবে বাংলার শাশ্বত উত্তরাধিকারের বাহক, একজন 

  সাধারণ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান এদের সবার উপর বাঙালি জাতিকে উপহার দেন একটি জাতিরাষ্ট্র   ৫৭ হাজার বর্গমাইলে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ” (১(২)/৬২৪)। 

 পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব বাংলার জাতীয় জীবনে সর্বাধিক প্রভাবক রাজনৈতিক ঘটনাটি ছিল বাঙালির ভাষা আন্দোলন, অনস্বীকার্যভাবেই যা’ বাঙালির স্বায়ত্তশাসন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথ নির্মাণ করেছিল। ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ বিস্তার ছিল ১৯৪৮- ৫২খ্রি. সময়কালে। এ সময়কালের মধ্যেই ১৯৪৯ খ্রি. সংঘটিত হয়েছিল ভিন্ন দু’টি ঘটনা, একটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ধর্মঘট আর দ্বিতীয়টি আওয়ামী মুসলিম লীগ’এর প্রতিষ্ঠা। নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে, আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা এবং বাংলার ভাষা-আন্দোলন সর্বতােভাবেই ছিল জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলন, জাতীয় গুরুত্বের ঘটনা না হলেও, পরােক্ষভাবে প্রভাবিত করেছিল মুজিবের ব্যক্তি-জীবন। আপাতত এ ঘটনাটির কথাই উল্লেখ করা যেতে পারে, অতঃপর পৃথক শিরােনামে আলােচনা করা যাবে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা এবং ভাষা আন্দোলনের কথা। 

 এমন ধারণাই সঠিক বলে মনে হয় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনের অংশভাগী হওয়ার পরিণাম-প্রতিক্রিয়াই শেখ মুজিবের প্রতিবাদী রাজনৈতিক সত্তাকে ব্যতিক্রমী জীবনের পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। অন্যথায় তিনিও হয়তাে আরাে অনেকের মতই আইনজীবী-রাজনীতিকের প্রথাসিদ্ধ জীবনে জড়িয়ে পড়তেন। কিন্তু ইতিহাসের দাবি ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলন প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর স্বলিখিত বিবরণটি সংক্ষেপে উল্লেখ করা যেতে পারে। 

 “১৫০নম্বর মুগলটুলীতে যেয়ে শুনলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভােগী কর্মচারীরা ধর্মঘট (মার্চ, ১৯৪৯) শুরু করেছে এবং ছাত্ররা তার সমর্থনে ধর্মঘট করছে। কর্মচারীরা বহুদিন পর্যন্ত তাদের দাবি পূরণের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন-নিবেদন করছে একথা আমার জানা ছিল। এরা আমার কাছেও এসেছিল। আমি তাদের বলেছিলাম, প্রথমে সংঘবদ্ধ হােন, তারপর দাবিদাওয়া পেশ করেন, তা না হলে কর্তৃপক্ষ মানবে না। তারা একটা ইউনিয়ন করেছিল, একজন ছাত্র তাদের সভাপতি হয়েছিল।  কর্তৃপক্ষ এদের দাবি মানতে অস্বীকার করেছে। তবু এত তাড়াতাড়ি ধর্মঘটে যাওয়া উচিত হয় নাই” (৯/১১২)। মুজিব কয়েকজন ছাত্রনেতাসহ ভাইস-চ্যান্সেলারের সাথে আলােচনা করে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, ভিসি আশ্বাসও দিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে সমস্যাটি সমাধান হয়নি। শেখ মুজিবের মন্তব্য: “একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্ণধার ও 

  ৫৭ 

  শিক্ষাবিদ সরকারের চাপে কথার মারপ্যাঁচ করতে পারে এটা আমার ভাবতেও কষ্ট হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘােষণা করে ছাত্রদেরকে হল ছাড়তে নির্দেশ দেয়া হলাে এবং ধর্মঘটকারী কর্মচারীদেরকে বরখাস্ত করা হলাে। এমন পরিস্থিতিতে কর্মচারীরা বন্ড দিয়ে একে একে কাজে যােগদান করায় ধর্মঘট শেষ হয়ে গেল। কিন্তু মুজিবসহ সাতাশ জন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন মেয়াদের জন্য (সর্বোচ্চ চার বছর) বহিষ্কার করা হলাে। বহিষ্কৃতদের মধ্যে একজন ছাত্রীও ছিলেন। শাস্তির আদেশে বলা হয়েছিল ১৭ এপ্রিলের মধ্যে দবিরুল ইসলাম প্রমুখ (চার বছরের জন্য বহিষ্কৃত, এক্ষেত্রে মুজিব অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না) চারজন ছাড়া “আর সকলে বন্ড ও জরিমানা দিলে লেখাপড়া করতে পারবে”। ১৬ এপ্রিলের মধ্যেই ছাত্রলীগের কনভেনরসহ অনেক প্রগতিবাদী ছাত্রনেতাই বন্ড-জরিমানা দিয়েছিলেন। কিন্তু মুজিব মুচলেকা দিতে রাজি নন। তিনি ছাত্রলীগের সভা ডেকে কর্তৃপক্ষের শাস্তি-ঘােষণার প্রতিবাদে ছাত্র-ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিলেন। দু দিন ধর্মঘটের পরে, ১৮ এপ্রিল শােভাযাত্রা করে ভাইস চ্যান্সেলরের বাড়িতে গিয়ে মুজিব ঘােষণা করেছিলেন, “আমরা এখানেই থাকব, যে পর্যন্ত শাস্তিমূলক আদেশ প্রত্যাহার করা না হয়। একশ’ জন করে ছাত্র রাতদিন ভাইস চ্যান্সেলরের বাড়িতে বসে থাকবে। একদল যায় আর একদল থাকে। শুধু আমি জায়গা ত্যাগ করতে পারছিলাম না। কারণ, শুনলাম, তিনি পুলিশ ডাকবেন”(৯/১১৭)। এখান থেকেই ১৯ এপ্রিল তারিখ বিকেলে শেখ মুজিবসহ ত্রিশ-পঁয়ত্রিশজন ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ২৩ জুন ১৯৪৯, আওয়ামী মুসলিম লীগ  গঠিত হওয়ার কয়েকদিন পরে, ২৯ জুন শেখ মুজিব কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। শেখ মুজিবের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার এখানেই ইতি ঘটেছিল। 

 কর্তৃপক্ষের শাস্তির আদেশ শেখ মুজিবের না-মানা প্রসঙ্গে কামরুদ্দিন আহমদ লিখেছেন : “তার ঐ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত বাস্তব ও সময়ােপযােগী হয়েছিল। তিনি তখন জননেতা হবার পথে   তার আর ছাত্র থাকা শােভা পাচ্ছিল না। নিজে থেকে পড়াশােনা ছেড়ে না দিয়ে একটা ইস্যুর উপর পড়াশােনা ছেড়ে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছিল এবং রাজনৈতিক দিক থেকেও দক্ষতার পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল” (১৪(২)/১২৮-১২৯)। মুজিবের মনেও তখন ছাত্র-যুব রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ কমে গিয়েছিল। আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার আগে, কারাবন্দি মুজিবের মতামতের জন্য যােগাযােগ করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নিজের কথা, “আমি খবর দিয়েছিলাম, আর মুসলিম লীগের পিছনে ঘুরে লাভ নাই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এরা কোটারি করে ফেলেছে’। আমাকে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আমি ছাত্র প্রতিষ্ঠান করব, না 

  ৫৮ 

  রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠন গঠন হলে তাতে যােগদান করব? আমি উত্তর পাঠিয়েছিলাম, ছাত্র রাজনীতি আমি আর করব না, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই করব। কারণ, বিরােধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে” (৯/১২০)। 

 যে জন্য উপরােক্ত দীর্ঘ বিবরণটি উপস্থাপন করা হলাে, মুজিবের ব্যক্তিগত জীবন এবং বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও একান্ত গুরুত্বপূর্ণ সেই কথাটিও জানা যাক তাঁর লেখা থেকেই : “আব্বা খুবই দুঃখ পেয়েছেন। আমি আইন পড়ব না শুনে বললেন,  যদি ঢাকায় না পড়তে চাও, তবে বিলাত যাও। সেখান থেকে বার এট ল’ ডিগ্রি নিয়ে এস। যদি দরকার হয়, আমি জমি বিক্রি করে তােমাকে টাকা দিব। আমি বললাম, এখন বিলাত গিয়ে কি হবে, অর্থ-উপার্জন আমি করতে পারব না। আমার ভীষণ জেদ হয়েছে মুসলিম লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে। যে পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেছিলাম, এখন দেখি তার উল্টা হয়েছে। এর একটা পরিবর্তন করা দরকার। স্বাধীন হয়েছে দেশ, তবু মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর হবে না কেন? দুর্নীতি বেড়ে গেছে, খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। বিনা বিচারে রাজনৈতিক কর্মীদের জেলে বন্ধ করে রাখা হচ্ছে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মুসলিম লীগ নেতারা মানবে না। পূর্ব পাকিস্তানের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না। সবকিছুই পশ্চিম পাকিস্তানে। আব্বাকে সকল কিছুই বললাম। বললাম,  যদি কিছু করতে না পারি, বাড়ি চলে আসব। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া চলতে পারে না। আমাকে আর কিছুই বললেন না”(৯/১২৫-১২৬)। দেখা যাচ্ছে, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে এবং সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেই শেখ মুজিব হয়েছিলেন সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ এবং এবিষয়ে তাঁর পিতারও নীরব সমর্থন ছিল। 

  ৫৯ 

  আওয়ামী  মুসলিম  লীগ : 

 পূর্ব বাংলার প্রথম প্রতিবাদী রাজনৈতিক সংগঠন 

  টাঙ্গাইলের শামসুল হক আগে থেকেই ছিলেন ১৫০ মােগলটুলিতে অবস্থিত মুসলিম লীগের যুবলীগ কার্যালয়ে, শেখ মুজিবও ঢাকায় এসে (সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭) এখানেই উঠেছিলেন। এসময় তাদের উদ্যোগেই গঠিত হয়েছিল ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ। শামসুল হক নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রথম আহ্বায়ক, শেখ মুজিবুর রহমান ও আতাউর রহমান যুগ্ম সম্পাদক। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারি ‘নিখিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’এর পাশাপাশি শেখ মুজিব (৪জানুয়ারি, ১৯৪৮) গঠন করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, কমিটির আহ্বায়ক হয়েছিলেন নঈমুদ্দিন আহমদ। ১৪-সদস্য নিয়ে গঠিত সাংগঠনিক কমিটিতে শেখ মুজিবুর রহমানসহ তরুণ প্রগতিশীল ছাত্র-কর্মীরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন”(১(২)/৯২৫)। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল। “এক মাসের ভিতর আমি (মুজিব) প্রায় সকল জেলায়ই কমিটি (ছাত্রলীগের) করতে সক্ষম হলাম।  সরকার প্রকাশ্যে নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগকে সাহায্য করত। আর আমাদের (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ) বিরুদ্ধে গােয়েন্দা লাগিয়ে দিত (৯/৮৯)। 

 কোনাে কোনাে পর্যবেক্ষক বলেছেন, ১৫০ নং মােগলটুলিতে সমবেত সােহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের অনুসারীরা মুসলিম লীগ দখল করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। এমন মন্তব্য সঠিক নাকি এঁরা মুসলিম লীগের গণ-ভিত্তিক সম্প্রসারণ ঘটাতে চেয়েছিলেন, সংক্ষেপে হলেও সে তথ্য-সত্য অন্বেষণ করা পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুধাবনের জন্যই অপরিহার্য বটে। আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন : “পাকিস্তান হাসিলের সঙ্গে-সঙ্গেই মুসলিম লীগের দরজা জনগণের মুখের উপর বন্ধ করিয়া দেওয়া শুধু রাজনৈতিক অপরাধ ছিল না, নৈতিক মর্যাল ও এথিক্যাল অপরাধও ছিল। তবু নেতারা কোটারি-স্বার্থ রক্ষার জন্য মুসলিম লীগকে পকেটস্থ করিলেন। 

  ৬০ 

    মুসলিম লীগ কর্মীদের পক্ষে জনাব আতাউর রহমান খাঁ ও বেগম আনােয়ারা খাতুন প্রথমে মওলানা আকরম খাঁ ও পরে চৌধুরী খালিকুযযামানের কাছে দরবার করিয়াও রশিদ বই (পার্টি সদস্য অন্তর্ভুক্তির) পান নাই। তারা বলিয়াছিলেন, এখন তাঁরা আর লীগের বেশি মেম্বর করিতে চান না। এখন শুধু গঠনমূলক কাজ। দরকার। হৈ হৈ করিলে তাতে কাজের বিঘ্ন সৃষ্টি হইবে। অগত্যা মুসলিম লীগ। কর্মীরা প্রথমে নারায়ণগঞ্জে ও পরে টাংগাইলে কর্মী-সম্মিলনী করিয়া মুসলিম লীগের দরজা খুলিয়া দিবার দাবি করেন”(৪/৩০৯-৩১১)। কিন্তু নেতারা কর্ণপাত করেননি, সুতরাং নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শের বাস্তবায়নের জন্য নতুন সংগঠন গঠন করা ছাড়া, কোনাে বিকল্প ছিল না। 

 ঢাকার ১৫০, মােগলটুলিতে “মুসলিম লীগের আবুল হাসেম (হাশিম) ও শহীদ সােহরাওয়ার্দী জোটের তরুণ কর্মী ও ছাত্রবৃন্দ অন্যান্য স্থান থেকে ঢাকায় সমবেত হয়ে  শক্তি বৃদ্ধি করতে শুরু করেন। এই কর্মী শিবিরের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে গঠিত অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন আসাম মুসলিম লীগের নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং সম্পাদক ছিলেন ইয়ার মুহম্মদ খান। ১৯৪৯ সালের ২৩শে ও ২৪শে জুন টিকাটুলির কাজী বশিরের বাসভবন। রােজ গার্ডেন’এ মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিন  শতাধিক কর্মী এতে যােগদান করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিলেন   সামসুল হক, খয়রাত হােসেন, আনােয়ারা খাতুন, আলী আহম্মদ খান, শওকত আলী, আতাউর রহমান খান, আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, কুষ্টিয়ার শামসুদ্দিন আহমদ, আলী আমজাদ খান, ইয়ার মােহাম্মদ খান প্রমুখ। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডভােকেট জেনারেল শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক কিছুক্ষণের জন্য সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। ২৩শে জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ’ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। মাওলানা ভাসানী সভাপতি, সামসুল হক সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান(তখন কারারুদ্ধ) যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরাসহ নবগঠিত দলটির ৪০ সদস্য বিশিষ্ট সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়” (২১/২৪)। বহু প্রতিবাদী ইতিহাসের সাক্ষী ১৫০ নং মােগলটুলিতেই বিশাল সাইনবাের্ড লাগিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। 

 অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, পাকিস্তানের প্রতি মােহভঙ্গের কারণে নেতাকর্মীরা “যখন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি করে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন (২৩ জুন, ১৯৪৯) করেন, তখন করারুদ্ধ শেখ মুজিবুর রহমানকে একজন যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। এ থেকে অনুমান করা যায়, ১৯৪৯ সালেই তিনি কী রকম মর্যাদা লাভ করেছিলেন। মুক্তিলাভ করে (২৯ জুন) শেখ মুজিব সর্বক্ষণ ব্যয় করেন আওয়ামী মুসলিম লীগের সাংগঠনিক কাজে। তবে 

  ৬১ 

  কারাগারে যাওয়া তার পক্ষে নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তবু নিজের বিশ্বাস ও কর্তব্যবােধ থেকে তিনি এতটুকু সরে আসেননি এবং নিজের পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কেও উদ্বিগ্ন হননি”(১(১)/২৪৩)। উল্লেখ্য যে, শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত অনুরােধ সত্ত্বেও, শেরে বাংলার আওয়ামী মুসলিম লীগে যােগ দেননি। সােহরাওয়ার্দীও দলটিতে যুক্ত হয়েছিলেন কিছুদিন পরে। অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হলেও ভাসানী একসময় দলটি ছেড়ে গিয়েছিলেন। মওলানা ভাসানী আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন সম্মিলিত বিরােধী শক্তির প্রতীকী পুরুষ। সােহরাওয়ার্দী সাহেবের রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তিভূমি ছিল পূর্ববঙ্গ। এ বিষয়টা বুঝতে পারার পর তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগে যােগ দেন”(৮/২৬৫)। 

 বঙ্গবন্ধু বলেছেন, “আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের কয়েকদিন পরেই আমার মুক্তির (২৯ জুন, ১৯৪৯ খ্রি.) আদেশ এল। জেলগেটে গিয়ে দেখি বিরাট জনতা আমাদের অভ্যর্থনা করার জন্য এসেছে মওলানা ভাসানী সাহেবের নেতৃত্বে। আমার আব্বাও আমাকে দেখার জন্য বাড়ি থেকে এসেছেন। আমি আব্বাকে সালাম করে ভাসানী সাহেবের দিকে এগিয়ে গিয়ে তাঁকেও সালাম করলাম। সাথে সাথে আওয়ামী মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ, ছাত্রলীগ জিন্দাবাদ’ ধ্বনি উঠল। জেলগেটে এই প্রথম আওয়ামী লীগ জিন্দাবাদ’ হল। শামসুল হক সাহেবকে কাছে পেয়ে তাকে অভিনন্দন জানালাম এবং বললাম, ‘হক সাহেব, আপনার জয়, আজ জনগণের জয় । হক সাহেব আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন,  চল, এবার শুরু করা যাক” (৯/১২১)। প্রকৃতপক্ষে মুজিবের কারামুক্তির পরেই দলটির সাংগঠনিক বিকাশের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল। 

 কামরুদ্দিন আহমদ লিখেছেন, আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের বৎসরাধিককাল আগে থেকেই ১৫০নং মােগলটুলির ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’এর “কি কর্মী কি ছাত্র তারা, শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের নেতৃত্বের প্রতি আকৃষ্ট হল। এদিকে শামসুল হক সাহেবও ভাল সংগঠক শামসুল হক ও শেখ মুজিব স্বতঃস্ফূর্ত জনপ্রিয়তায় বিশ্বাস করত না। তাদের মতে সবকিছুই সংগঠন করতে হয়” (১৪/১০৭)। এখানে প্রসঙ্গতই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ছাত্রলীগ সম্মেলনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কিছু অংশ উদ্ধৃত করা যেতে পারে : “রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রথম প্রয়ােজন সঠিক নেতৃত্বের। সঠিক নেতৃত্ব ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিয়েছে। নেতৃত্বের সাথে প্রয়ােজন আদর্শের। যাকে অপর কথায় বলা যায় ম্যানিফেস্টো। নেতৃত্ব ও আদর্শের পরে প্রয়ােজন নিঃসাৰ্থ কর্মীর। নিঃস্বার্থ কর্মী ছাড়া কোন প্রতিষ্ঠান বড় হতে পারে না, কোন সংগ্রাম সাফল্যমণ্ডিত হতে পারে। এর পরে প্রয়ােজন সংগঠনের। সংগঠন ছাড়া কোন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের 

  ৬২ 

  কাজ সফল হতে পারে না। আওয়ামী লীগের ১৯৪৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত নেতৃত্ব ছিল, আদর্শ ছিল, নিঃসাৰ্থ কর্মী ছিল এবং সংগঠন ছিল। এই ভিত্তির উপরই সংগ্রামে এগিয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগ ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছে”। 

 আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী সাংগঠনিক উদ্যোগ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছেন, “আওয়ামী লীগের প্রথম ওয়ার্কিং কমিটির সভা হয় ১৫০নম্বর মােগলটুলিতে। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক সাহেব তাতে যােগদান করেছিলেন। একটা গঠনতন্ত্র সাব-কমিটি ও একটা কর্মপন্থা সাব-কমিটি করা হল। আমরা কাজ করা শুরু করলাম” (৯/১২১)। শেখ মুজিবের কারামুক্তির আগেই ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে দলটি প্রথম জনসভা আয়ােজন করেছিল, বক্তা ছিলেন মওলানা ভাসানী এবং শামসুল হক। কিন্তু সভাটি মুসলিম লীগ ভাড়াটিয়া গুণ্ডা লাগিয়ে মারপিট করে এবং প্যান্ডেল ভেঙ্গে পণ্ড করে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে পরবর্তী জনসভার আয়ােজন করা হয়েছিল গােপালগঞ্জে। কিন্তু সেটিও সুষ্ঠুভাবে হতে পারেনি, অতঃপর সেই সভার বর্ণনাটি উদ্ধৃত করছি বঙ্গবন্ধুর লেখা থেকেই, যাতে তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের আচরণ এবং বঙ্গবন্ধু তথা আওয়ামী মুসলিম লীগের দ্রুত বিকাশমান জনপ্রিয়তার দিকগুলি উপলব্ধি করা যায় সহজেই। 

 “সভায় হাজার হাজার জনসমাগম হয়েছিল। হঠাৎ সকালবেলা ১৪৪ধারা জারি করা হয়। আমরা সভা মসজিদ প্রাঙ্গণে করব ঠিক করলাম। তাতে যদি ১৪৪ধারা ভাঙতে হয়, হবে। আমরা যখন সভা শুরু করলাম, তখন এসডিও মসজিদে ঢুকে মসজিদের ভিতরে ১৪৪ধারা জারি করলেন। আমরা মানতে আপত্তি করলাম, পুলিশ মসজিদে ঢুকলে মারপিট শুরু হল। দুই পক্ষেই কিছু আহত হল। আমি ও সালাম সাহেব (সভাপতি, ফরিদপুর জেলা আওয়ামী মুসলিম লীগ) সভাস্থান ত্যাগ করতে অস্বীকার করলাম। আমাদের গ্রেফতার করা হল। জনসাধারণও মসজিদ ঘিরে রাখল। মহকুমা পুলিশ অফিসার কাছে এসে অনুরােধ করলেন, ‘গােলমাল হলে অনেক লােক মারা যাবে। এদের বলে দেন রাস্তা ছেড়ে দিতে। আমরা আপনাদের কোর্টে নিয়ে যাব এবং এখনই জামিন দিয়ে দেব। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, জনসাধারণের হাতেও অনেক লাঠি ও নৌকার বৈঠা আছে। সালাম সাহেব ও গােপালগঞ্জ মহকুমার নেতাদের সাথে আলাপ-আলােচনা করে আমি বক্তৃতা করলাম, যা বলার ছিল সবই বললাম এবং রাস্তা ছেড়ে দিতে অনুরােধ করলাম। জনসাধারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের রাস্তা দিল। আমাদের সাথেই জিন্দাবাদ দিতে দিতে কোর্টে এল। রাত আট ঘটিকার সময় আমাদের জামিন দিয়ে ছেড়ে দেয়া হল। তারপর জনগণ চলে গেল। এটা আমাদের আওয়ামী লীগের মফস্বলে প্রথম সভা”(৯/১২৩)। 

  কম্যুনিস্ট নেতা খােকা রায় লিখেছেন, ১৯৫১ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড কম্যুনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক কমিটির পূর্ণাঙ্গ বৈঠকে আওয়ামী মুসলিম লীগ’এর রাজনৈতিক মূল্যায়ন করে বলা হয়েছিল :“১৯৪৯ সনে একটি গণতান্ত্রিক কর্মসূচি নিয়ে সরকার বিরােধী দল হিসাবে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল। তখন আওয়ামী মুসলিম লীগের একটি সাম্প্রদায়িক চরিত্রও (দলের নাম এবং কেবল মুসলিম সদস্য গ্রহণ) ছিল। কিন্তু ঐ দলের কর্মসূচিতে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, রাজবন্দিদের মুক্তি, প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ভােটে নির্বাচন, বিনা খেসারতে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ, বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা প্রভৃতি গণতান্ত্রিক দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। কর্মসূচিতে কোন সাম্প্রদায়িক দাবি ছিল না।  কাজকর্মের মধ্যেও কোন সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। কর্মতৎপরতা পরিচালিত হচ্ছিল মুসলিম লীগ সরকারের গণ-বিরােধী নীতিসমূহের বিরুদ্ধে। তদুপরি, ১৯৪৮সন থেকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ভিতর যে জাতীয় অধিকার বােধ জেগে উঠছিল, আওয়ামী মুসলিম লীগ ছিল তার প্রধান ধারক ও বাহক” (২০/১০৭-১০৮)। 

 এস এ করিম তাঁর ‘শেখ মুজিব : ট্রিয়াম্ফ অ্যান্ড ট্র্যাজেডি’ নামক বইতে উল্লেখ করেছেন, “The party s middle name  Muslim  was dropped in 1955, but from the outset it behaved as a non-communal organisation,   The newspapers in Dhaka were not in sympathy with the reformist ideas of the new party,..Fortunately, this void was soon filled  The newspaper “Ittefaq  was established soon afterwards in August, with Manik Mian as its editor” (17/47)। শহীদ সােহরাওয়ার্দী কর্তৃক কোলকাতায় প্রকাশিত ‘ইত্তেহাদ’ (১৯৪৬ খ্রি.) পত্রিকায় কাজ করার অভিজ্ঞতায় তােফাজ্জল হােসেন (মানিক মিয়া) সােহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন। তাছাড়া, মানিক মিয়া এবং শেখ মুজিবের মধ্যেও প্রীতি-সৌহার্দের সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক চিন্তার বিশেষ সামঞ্জস্য ছিপ। “Mujib sometimes tended to act too hastily; Manik Mian, the older man (by some ten years), was generally calm and thoughtful. By seeking counsel with Manik Mian, Mujib felt assured that he (Mujib) was taking considered, rather than impulsive, action” (প্রাগুক্ত)। ইত্তেফাক’ প্রথমে (১৯৪৯ খ্রি.) সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল, পরে দৈনিক পত্রিকায় (১৯৫৪ খ্রি.) রূপান্তরিত হয়। উল্লেখ্য যে, ‘ইত্তেফাক প্রকাশের প্রাথমিক মূলধন কুড়ি হাজার টাকা দিয়েছিলেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী। প্রথম দিকে পত্রিকাটির প্রকাশক হিসেবে মওলানা ভাসানীর নাম লেখা হতাে। 

  আজ এত বছর পরেও পেছন ফিরে তাকালে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, অসাম্প্রদায়িক এবং প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক লক্ষ্য নিয়ে মুসলিম লীগ-বিরােধী যে দলটি সেদিন গঠিত হয়েছিল, তার নামে ‘মুসলিম  শব্দটি যুক্ত করা হয়েছিল কেন? এবিষয়ে পরিষ্কার একটি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন খােকা রায়, “পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপক জনসাধারণের ওপর তখনও মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রভাব বিদ্যমান ছিল” (২০/১০৭)। সুতরাং সাধারণ জনগণের মন-মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া হঠাৎ করেই সুস্পষ্ট অসাম্প্রদায়িক নাম-পরিচয়ের দল গঠন করে, পাকিস্তান অর্জনকারী দল মুসলিম লীগের বিরােধিতা করলে, জনসমর্থন পাওয়া যথার্থই দুরুহ। হয়ে পড়তাে, এ সত্য অনস্বীকার্য। অর্থাৎ নামকরণে এবং কর্মপন্থায় আওয়ামী মুসলিম লীগের পথটাই তখন সঠিক ছিল। স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আন্দোলন-সংগ্রামের সকল পর্যায়েই বঙ্গবন্ধু জনগণের ‘পালস্ বুঝে জনগণকে সাথে নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন বলেই জনগণও সর্বদাই তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছে। 

 স্মরণ করা যেতে পারে, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্ট লীগ  গঠনের সময়ই শেখ মুজিবের সহযােগী অলি আহাদ এবং তােয়াহা প্রমুখ নতুন সংগঠনের নাম থেকে।  মুসলিম  শব্দটি বাদ দিতে চেয়েছিলেন। “But Mujib argued that if the word Muslim  was deleted, it would give the Government an excuse to misrepresent their aims; he was not opposed to the idea as such, but he believed that it should be considered at the appropriate time, not now” (১৭/৩৮)। ১৯৫৪ খ্রি. নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অভাবিত বিজয়ের পরে ১৯৫৫ খ্রি.  আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নাম থেকে মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে কাউন্সিল অধিবেশনে সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের প্রদত্ত বক্তব্যটির অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা যাচ্ছে : “এ কথা অনস্বীকার্য যে, যে সময় আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম (রাখা) হয়, তখনকার বাস্তব প্রয়ােজন অনুযায়ী আমাদের সংগঠনকে একটি সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সে অবস্থা আর নেই। মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আজ অবসান ঘটেছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল পাকিস্তানবাসীর নিজস্ব রাজনৈতিক জোট হিসেবে গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দান করার মহান দায়িত্ব আজ আওয়ামী লীগ গ্রহণ করতে পারে। আমরা দ্বিধাহীনচিত্তে এ কথা ঘােষণা করিতে পারি যে, দেশের সকল ধর্মের, সকল বর্ণের এবং সকল ভাষাভাষী মানুষকে একটি গণ প্রতিষ্ঠানে সমবেত করা প্রয়ােজন। বস্তুত আওয়ামী লীগ দলকে সম্প্রদায় নির্বিশেষে অবারিত করার মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের প্রগতিশীল ভূমিকাকে অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম হবাে”(২১/২৮-২৯)। এ তাে শুধুই দলীয় নাম পরিবর্তনের বক্তব্য নয়, দলটির মৌলিক আদর্শ এবং মূলগত লক্ষ্যেরও সুস্পষ্ট উচ্চারণ। 

  প্রসঙ্গত অবশ্যই উল্লেখ্য যে, “আওয়ামী লীগকে অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের কাজেও সােহরাওয়ার্দী-নেতৃত্ব ছিল দ্বিধান্বিত। কিন্তু দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন শেখ মুজিব এবং মওলানা ভাসানী। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তানে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি কতটা জনপ্রিয় হবে সে সম্পর্কেও শহীদ সােহরাওয়ার্দী দ্বিধান্বিত ছিলেন। কিন্তু দ্বিধামুক্ত ছিলেন শেখ মুজিব। তিনি সঙ্গে পেলেন মওলানা ভাসানীকে। শহীদ সাহেবের দ্বিধার সুযােগ নিয়ে আওয়ামী লীগের একটা গ্রুপ আব্দুস সালাম খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সাম্প্রদায়িক চরিত্র বজায় রাখার জন্য চক্রান্ত শুরু করলেন। এদের সঙ্গে হাত মেলালেন খােন্দকার মােশতাক আহমেদ। কিন্তু আওয়ামী লীগে ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল নীতির দল ভারী হল। শহীদ সাহেবও সংগঠনটিকে অসাম্প্রদায়িক করার পক্ষে মত দিলেন” (১১/১২৯)। ‘আওয়ামী লীগ’ নব-নামকরণের অব্যবহিত পরেই, ১৯৫৫তে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের পণপরিষদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং দলটি মােট ২২টি আসন লাভ করেছিল। অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগ’ নামকরণের পরেও দলটির গ্রহণযােগ্যতা এবং ভােট পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনই অসুবিধা হয়নি। 

 ১৯৫৬, আগস্ট মাসে আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে যুক্তনির্বাচনের দাবি উপস্থাপন করলে প্রধানমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দীর আগ্রহে বিলটি ১১ অক্টোবর পরিষদে উত্থাপিত হয়। ১২ অক্টোবর ১৯৫৬, পাকিস্তানে ‘যুক্ত নির্বাচন বিলটি অনুমােদিত হয়েছিল। ৩ এপ্রিল, ১৯৫৭ তারিখে আওয়ামী লীগের উত্থাপিত প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদে অনুমােদিত হয়েছিল। বিলটির সমর্থনে প্রাদেশিক পরিষদে প্রদত্ত ভাষণে শেখ মুজিব বলেছিলেন, “স্বায়ত্তশাসনের দাবি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দাবি। এই দাবির ভিত্তিতেই আমরা গত নির্বাচনে(যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম। শাসনতন্ত্র রচনার সময় আওয়ামী লীগের ১২জন সদস্য স্বায়ত্তশাসনের জন্য সংগ্রাম করেছিল। গত ৯ বছরের ইতিহাস পর্যালােচনা করলে বুঝা যাবে আমরা কেন স্বায়ত্ত শাসন চাই। এ আমাদের বাঁচা-মরার দাবি” (২১/২৯)। এখানেই সময়ের সরণীতে কয়েক বছর পিছিয়ে যাওয়া দরকার। আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরবর্তী সময়ে দলটির সংঘটিত সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল, খাদ্য সঙ্কট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ১১ অক্টোবর ১৯৪৯, ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে বিশাল জনসভা শেষে মওলানা ভাসানী, শামসুল হক এবং শেখ মুজিবের নেতৃত্বে মিছিল। উল্লেখ্য যে, তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকায় ‘গভর্নর হাউস’এ অবস্থান করছিলেন। গভর্নর হাউস’এর দিকে যাবার পথে মিছিলটি নবাবপুর রেল ক্রসিং’এ পুলিশী বাধার মুখে পড়ে। অতঃপর বঙ্গবন্ধুর বর্ণনায় : “মওলানা সাহেব রাস্তার উপরেই নামাজে 

  দাঁড়িয়ে পড়লেন। শামসুল হক সাহেবও সাথে দাঁড়ালেন। এর মধ্যেই পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছেড়ে দিল। আর জনসাধারণও ইট ছুড়তে শুরু করল। পুলিশ লাঠিচার্জ করতে করতে এগিয়ে আসছে। একদল কর্মী মওলানা সাহেবকে কোলে করে নিয়ে এক হােটেলের ভিতর রাখল। কয়েকজন কর্মী ভীষণভাবে আহত হল এবং গ্রেফতার হল। শামসুল হক সাহেবকেও গ্রেফতার করল। আমার উপরও অনেক আঘাত পড়ল। একসময় প্রায় বেহুঁশ হয়ে নর্দমায় পড়ে গেলাম। আমাকে কয়েকজন লােক ধরে রিকশায় উঠিয়ে মােগলটুলি নিয়ে আসল। আমার পা দিয়ে খুব রক্ত পড়ছিল। ডাক্তার এল, ক্ষতস্থান পরিষ্কার করল। ইনজেকশন দিয়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল”(৯/১৩২)। 

 প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী এ-সময় ঢাকার জনসভায় বললেন, ‘যাে আওয়ামী লীগ করেগা, উসকো শির হাম কুচাল দে গা’, সুতরাং বলাই বাহুল্য যে, মুজিবকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ যথেষ্টই তৎপর হয়ে উঠেছিল। শেষ রাতে মুজিবের খুঁজে পুলিশ ১৫০, মােগলটুলিতে হানা দিলেও তিনি আহত-অসুস্থ অবস্থায় পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। পরবর্তী দু’দিনের আশ্রয়স্থল ক্যাপ্টেন শাহজাহানের বাড়িতেও আইবি পুলিশ এলে মুজিব পালিয়েছিলেন, কারণ, তাঁর প্রতি গ্রেফতার না হবার নির্দেশ ছিল মওলানা ভাসানীর। পলাতক অবস্থাতেই তিনি ঢাকায় মওলানা ভাসানী এবং ঢাকা থেকে লাহােরে গিয়ে সােহরাওয়ার্দীর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন।  অসমাপ্ত আত্মজীবনী র বর্ণনায় গােপন রাজনীতি আর পলাতক জীবন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা চিন্তার পরিচয় মেলে এবং জানা যায় তৎকালে ভাসানীর চিন্তায় সােহরাওয়ার্দীর প্রতি আস্থার কথাও। 

  তখন মওলানা ভাসানী ইয়ার মােহাম্মদ খানের বাড়িতে থাকতেন। তাঁর সাথে আমার দেখা করা দরকার; কারণ তাকে এখনও গ্রেফতার করা হয় নাই। তাঁকে 

 জিজ্ঞাসা করা দরকার, তিনি কেন আমাকে গ্রেফতার হতে নিষেধ করেছেন। আমি পালিয়ে থাকার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। গােপন রাজনীতি পছন্দ করি না, মওলানা সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কি ব্যাপার, কেন পালিয়ে বেড়াব’? মাওলানা সাহেব আমাকে বললেন,  তুমি লাহাের যাও, কারণ সােহরাওয়ার্দী সাহেব লাহোরে আছেন। সােহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে সারা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারলে ভাল হয়। সােহরাওয়ার্দী সাহেব ছাড়া আর কেউ এর নেতৃত্ব দিতে পারবেন না” (৯/ ১৩৪-১৩৫)। ভাসানীর পরামর্শে মুজিব নাম-পরিচয় গােপন করে লাহােরে গিয়ে সােহরাওয়ার্দী এবং মুসলিম লীগবিরোধী কয়েকজন নেতার সাথেও সাক্ষাৎ করেছিলেন। 

 শেখ মুজিবের তখনকার মনের অবস্থা তাঁরই বর্ণনায় : “প্রায় একমাস হয়ে গেল, আর কতদিন আমি এখানে থাকব? ঢাকায় মওলানা সাহেব, হক সাহেব এবং 

  সহকর্মীরা জেলে আছেন। সােহরাওয়ার্দী সাহেবকে বললাম। তিনি বললেন, ‘ঢাকায় পৌঁছার সাথে সাথেই তারা তােমাকে গ্রেফতার করবে। লাহােরে গ্রেফতার নাও করতে পারে। আমি বললাম, এখানে গ্রেফতার করেও আমাকে ঢাকায় পাঠাতে পারে। আর জেলে যদি যেতেই হবে, আমার সহকর্মীদের সাথে থাকব” (৯/১৪২)। যাবার পথে গিয়েছিলেন ঢাকা-লাহাের বিমানে এবার নাম-ঠিকানা গােপন করে ফিরলেন বিমানে লাহাের-দিল্লি, ট্রেনে দিল্লি-কোলকাতা-খুলনা এবং নৌপথে টুঙ্গিপাড়া হয়ে ঢাকায়। কিন্তু লাহাের বিমানবন্দরেই বুঝতে পেরেছিলেন, গােয়েন্দারা তাঁর পরিচয় জেনে গেছে। তবে সেখানে গ্রেফতার করেনি। ঢাকায় ফেরার অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ১৫০, মােগলটুলির আবাস-আশ্রয় থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হয়েছে। আমার তিনবার জেলে আসতে হল, এইবার নিয়ে” (৯/১৬৮)। 

  ঐতিহাসিক ভাষা-আন্দোলন : 

 বাঙালির অনিবার্য গন্তব্যের যাত্রা-শুরু 

  “বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত যখন পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন সে বিশ্বাস করে যে, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যাপারে হিন্দুই তাকে দাবিয়ে রেখেছে। পাকিস্তান অর্জিত হলেই তার আত্মবিকাশের সব দরজা খুলে যাবে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে যখন ঢাকা পৌঁছাই তখন দেখি সকলে আত্মহারা। অবশ্য হিন্দু মধ্যবিত্ত তখন স্রোতের ন্যায় সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে। কদিন পরেই দেখি দেয়ালে আঁটা পােস্টার   রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই ।  ১৯৪৮ সালের মার্চ  ঢাকা সফরে এসে জিন্নাহ সাহেব ঘােষণা করলেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”(১৫/৪৭), পর্যবেক্ষণটি প্রখ্যাত সংবাদ সম্পাদক জহুর হােসেন চৌধুরীর। পরবর্তী মন্তব্যটিও তারই : “এরপর চার বছর ধরে নিত্যদিনের অভিজ্ঞতায় পূর্ব বাংলার মানুষ দেখল তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পথ প্রসারিত হওয়ার পরিবর্তে সংকুচিতই হচ্ছে।   শাসনতন্ত্রের মুলনীতি কমিটির রিপাের্ট প্রকাশিত হওয়ার পর ঢাকা আরমানিটোলা ময়দানে বিরাট জনসভায় রিপাের্টকে অগ্রহণযােগ্য ঘােষণা করে পূর্ব বাংলার জন্য সার্বিক স্বায়ত্তশাসন দাবি করা হয়। বাংলাকে অবিলম্বে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিও এই আন্দোলনের সময়ে অনুষ্ঠিত প্রতিটি জনসভায় উত্থাপিত হয়” (১৫/৪৮-৪৯)। 

 উল্লেখ্য যে, মূল লাহাের প্রস্তাব’ (১৯৪০) পরিবর্তন করে জিন্নাহর উদ্যোগে “১৯৪৬ খ্রি. মুসলিম লীগের দিল্লি কনভেনশনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দুইটি অঞ্চল নিয়ে দুইটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে একটি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয় চূড়ান্ত হলে গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ ও তমদুন মজলিস বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার লক্ষ্যে গণসচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে তমদুন মজলিসের উদ্যোগে গঠিত হয় প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করে 

  সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলনে যােগ দেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান আইন পরিষদে উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘােষণা দেয়া হয়। শেখ মুজিব তার প্রতিবাদে আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন” (১(২)/১০৮৯)। “২৮ ফেব্রুয়ারি ৪৮, তমদুন মজলিস ও মুসলিম ছাত্রলীগের সভায় ভাষার দাবিতে ১১মার্চ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান সম্বলিত এক বিবৃতিতে সই করেন শেখ মুজিব, নইমুদ্দিন আহম্মদ, আব্দুর রহমান চৌধুরী” ( ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু, সরদার সিরাজুল ইসলাম, জনকণ্ঠ, ২০-২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১২)। 

 “১৯৪৮ সালের ২মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এই পরিষদের পক্ষ থেকে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনের দিন অর্থাৎ ১১মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহ্বান করা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ শেখ মুজিবসহ কয়েকজন ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করে”(১(২)/১০৯৪)। বিচারপতি কে. এম. সােবহান লিখেছেন, “১৯৪৮-এর ১১মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করবার দাবির জন্য প্রথম যে-সব ছাত্রনেতা গ্রেফতার হন, বঙ্গবন্ধু তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন”(১(১)/১০৯)। স্বদেশ রায়ের মন্তব্য, “এই গ্রেফতারের ভিতর দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনের এবং পূর্ব বাংলার তরুণ নেতাদের অন্যতম নেতায় পরিণত হন। ভাষা আন্দোলনের এই পর্ব যাদের দূরদৃষ্টি ছিল। তারা বুঝতে পারে যে, পূর্ব বাংলার রাজনীতি একটি নতুন পথে যাচ্ছে। সে পথ আর যা-ই হােক কোন ধর্মীয় অন্ধকারের ভিতর থাকবে না। এ সময়ে উদার। রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তােলার মত উদার জাতীয় নেতার অভাব দেখা দেয় পূর্ব বাংলায়। কারণ, হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী তখনও ভারতে, শেরে বাংলা নিশ্রুপ। তাছাড়া শেরে বাংলার একটা রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল সব সময়ই। শেখ মুজিবুর রহমান উদ্যোগ নেন আসাম থেকে মওলানা ভাসানীকে পূর্ব বাংলায় নিয়ে আসার জন্য। .একদিকে যেমন জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠন কোন জাতীয় প্রবীণ নেতার মাধ্যমে গড়ে তােলার চেষ্টা করেছেন শেখ মুজিব, তেমনি তিনি কিন্তু ১৯৪৮-এর পর থেকে একদিনের জন্যও কোন আন্দোলন থেকে দূরে থাকেননি” (১(৩)/১৫২৫-২৬)। 

 মুজিবের প্রত্যক্ষ সংগ্রামী মানসিকতার একটি পরিচয় উল্লেখ করেছেন এস, এ. করিম, ১১মার্চ, ১৯৪৮ সচিবালয় ঘেরাওয়ের সময় মুজিবের অন্যতম সহযােগী কামরুদ্দিন আহমদ পরামর্শ দিয়েছিলেন, মুজিবের উচিত সামনে না গিয়ে কোথাও আড়ালে থাকা, তাতে তিনি সাংগঠনিক দক্ষতায় আন্দোলন এগিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু মুজিবের তাৎক্ষণিক জবাব ছিল, “Unless he- Mujib was in the forefront of the struggle, his followers might lose heart and not perform to the best of their abilities” (১৭/৩৯)। কামরুদ্দিন আহমদ নিজেও লিখেছেন, “পরদিন 

  নেতৃস্থানীয় শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ অনেক কর্মীও গ্রেফতার হয় বহু ছাত্র ও কর্মী আহত হয়। আন্দোলন চলতে থাকে। আমার এখনাে ধারণা, নেতারা প্রথম দিন গ্রেফতার না হয়ে পরিচালনার দায়িত্ব নিলে   আন্দোলন আরাে জোরদার হত” (১৪(২)/১১৭)। 

 ছাত্রদেরকে গ্রেফতার করেও মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন স্বস্তিতে ছিলেন না, কারণ গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ কয়েকদিন পরেই ঢাকায় আসছেন। নাজিমুদ্দিন তখন ছাত্রদের দাবি মানার শর্তে একটি চুক্তি করে ছাত্রনেতাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। জেলের ভেতর থেকেই এই চুক্তিনামা অনুমােদন করেছিলেন শেখ মুজিব। তাঁর। অনুমােদন আনার জন্য, সরকারি অনুমতিক্রমে জেলের ভিতরে প্রবেশ করেছিলেন কামরুদ্দিন আহমদ। তিনিই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে চুক্তিটিতে স্বাক্ষর। করেছিলেন, সরকার পক্ষে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন। একটি বিশেষ তথ্য মেলে বিচারপতি সােবহানের লেখায়, “চুক্তিনামার শর্ত অনুযায়ী ছাত্রনেতাদের মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে বার হতে অস্বীকার করেন, যতক্ষণ না সমস্ত রাজবন্দীদের জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন বাধ্য। হয়েছিলেন সে শর্ত মেনে নিতে। সে সময় দুই কমিউনিস্ট নেতা রণেশ দাশগুপ্ত ও রণী রায় রাজবন্দী হিসাবে আটক ছিলেন জেলে”(১(১)/১০৯)। 

 ভাগা আন্দোলন সংক্রান্ত গবেষক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন, “আটচল্লিশ সালের ভাষা আন্দোলনের নেতাকর্মীদের সঙ্গেই ছাত্রনেতা শেখ মুজিবকে প্রথম দেখি সচিবালয়ের প্রবেশ পথে পিকেটিং রত অবস্থায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের পুকুর পাড়ে (এখন নেই) একটি ছাত্রসভায় প্রথম বক্তৃতা করতে শুনি। প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছাত্রদের দাবি মেনে চুক্তিপত্রে সই দিয়েছেন, বন্দি ছাত্রনেতারা মুক্তি পেয়েছেন, তারপরেও শেখ মুজিব ছাত্রসভা ডেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে প্রাদেশিক আইন পরিষদ ভবনের (জগন্নাথ হল পুরাতন মিলনায়তন) দিকে চলে গেলেন। সেই সভায় তিনি নাজিমুদ্দিনের চুক্তিভঙ্গের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। শেখ মুজিব পরিষদ ভবনে বিক্ষোভের মাধ্যমে। দ্বিতীয়বারের মতাে গ্রেফতার হয়ে এটা যথার্থভাবে প্রমাণ করেছিলেন যে খাজা। নাজিমুদ্দিন চুক্তিভঙ্গকারী” (১(৩)১৩৪৮)। 

 ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাথে নাজিমুদ্দিন সরকারের স্বাক্ষরিত চুক্তির ভিত্তিতে ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় মুজিব জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। “ছাত্র-যুবকদের আন্দোলন নতুন মাত্রা পেল যখন ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় এক জনসভায় (রেসকোর্স মাঠে) ভাষণদান কালে জিন্নাহ ঘােষণা করলেন, ‘Let me make it very clear to you that the State Language of Pakistan is going to be Urdu and no other language. বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালাে। 

  পূর্ব বাংলা   অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি শিকড় নিলাে মুসলিম পাকিস্তানে” (১(২)/৯১২)। তিনদিন পরে কার্জন হলে প্রদত্ত ‘কনভােকেশন ভাষণ’এ জিন্নাহ বলেছিলেন, “My dear students, for the sake of Islam I have decided that Urdu alone would be the state language of Pakistan.”- তখন ছাত্রসমাজের প্রথম সারিতে উপবিষ্ট আইনের ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান এবং বরিশালের মেধাবী ছাত্র ফজলুল করিম একই সঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। No, No, Bangla, we want Bengali shall be the state language of Pakistan.  (১৯/৫৫)। সম্ভবত তিনদিন আগের রেসকোর্সের বক্তৃতায় ছাত্র-জনতার প্রতিবাদের কথা মনে রেখেই কার্জন হলের বক্তৃতায় উর্দুই রাষ্ট্রভাষা করা হবে বলতে গিয়ে জিন্নাহ ইসলাম রক্ষার অনুষঙ্গটি যুক্ত করেছিলেন। কমিউনিস্ট নেতা খােকা রায় লিখেছেন, “No, No  বলে ঐ প্রতিবাদ যে খুব বড় ছিল তা নয়। কিন্তু মিঃ জিন্নাহর জনপ্রিয়তা ছিল তখন তুঙ্গে। তার বক্তৃতার মাঝখানে ঐ প্রতিবাদ- সেটি তখন খুব অল্পসংখ্যক ছাত্রের কণ্ঠ হতে ধ্বনিত হলেও, তা থেকে বােঝা যাচ্ছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাদের মাতৃভাষার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগােষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারী ও প্রতিক্রিয়াশীল নীতি মেনে নিতে রাজি ছিল না” (২০/৭৬)। 

 গভর্নর জেনারেল জিন্নাহর ঢাকা সফর এবং উর্দু, কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা    এমন ঘােষণার পর “রাষ্ট্রভাষার দাবি রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে পরিণত হয়। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ এপ্রিল সেই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ। করে। শেখ মুজিবুর রহমানসহ ২৪জনকে জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয় ব্যক্তিগত মুচলেকা প্রদানের মাধ্যমে অনেকেই নিজেদের ছাড়িয়ে নেন, কিন্তু শেখ মুজিব ছিলেন আদর্শ ও নীতিতে অটল। তাই ভাষা আন্দোলনের চরম মুহূর্তেও (২১ফেব্রু, ৫২) তিনি জেলখানা থেকে ছাড়া পাননি” (১(১)২৮২-২৮৩)। 

 ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে ঢাকায় ছাত্র-জনতা নিহত হওয়ার অব্যবহিত পরবর্তী সময়ে আইন পরিষদের অধিবেশনে ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে যখন মওলানা তর্কবাগীশ, খয়রাত হােসেন, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, মনােরঞ্জন ধর, গােবিন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ অধিবেশন বয়কটের প্রস্তাব এনে ছাত্র-হত্যার বিচার দাবি করছিলেন, তখন বাঙালি-সন্তান মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন নির্লিপ্তভাবে। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বললেন, “It s a fantastic story  উচ্ছৃঙ্খলতা দমনের জন্য পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছে। এর জন্য কারাে মৃত্যু হলে আমরা কি করতে পারি? আপনারা জানেন, এর পেছনে কম্যুনিস্ট এবং হিন্দুদের উস্কানি রয়েছে। আমরা এদের নির্মূল করবাে ইনশাল্লাহ্ .”(১৯/৬০)। প্রসঙ্গতই সবিশেষ উল্লেখ্য যে, সেদিন একমাত্র আবুল কালাম শামসুদ্দিন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে। পদত্যাগ করে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তিনি তখন ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। 

  স্মরণ করা যেতে পারে, “১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি করাচীর ‘কনস্টিটুয়ান্ট অসেম্বলি’তে সর্বপ্রথম শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (কংগ্রেস নেতা, কুমিল্লা) দাবি জানান যে, উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষাকেও সরকারি কাজে ব্যবহার করতে হবে।  পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হিসেবে বাংলা তার যােগ্য মর্যাদা পাবার দাবি অবশ্যই জানাবে’ (১৯/৫৫)। এটিই ছিল বাংলা ভাষার মর্যাদার বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের নিকট উত্থাপিত প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু মুজিব গভীর দুঃখের সাথেই বলেছিলেন, “ had a single Bengali Muslim Legislator echoed the sentiments of Dutta, the rulling circle of Pakistan would have had second thought about the wisdom of imposing “One Nation, One Language  Policy in a country as diverse as Pakistan” (১৭/৩৯) 

 মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন প্রকৃতপক্ষে চুক্তি-রক্ষার জন্য ছাত্রনেতাদের সাথে চুক্তি করেননি, তার একমাত্র প্রযােজন ছিল গভর্নর জেনারেল জিন্নাহর আসন্ন সফরটি নিরাপদ করা। সেটিও জিন্নাহর অতি-উৎসাহ এবং অগণতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে সম্ভব হয়নি। অতঃপর নাজিমুদ্দিনই হঠকারী এক ঘােষণায় আন্দোলনকে তুঙ্গস্পর্শী করে তুলেছিলেন। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন ঢাকা সফরে এসে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘােষণা দিলে বাংলা ভাষার আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। নাজিমুদ্দিনের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে শেখ মুজিবুর রহমান জেলখানাতে বসে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে আহ্বান জানান বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গড়ে উঠে সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ”(১(২)/১০৯০)। তবে ৭ ফেব্রুয়ারির পরে মওলানা ভাসানী তার গ্রামে চলে গিয়েছিলেন। শেরে বাংলা ফজলুল হককেও কমিটির সদস্য করা হলে তিনি আপত্তি প্রকাশ করেছিলেন। 

 খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তৃতার পরই শহরে যেন আগুন জ্বলে উঠল। মওলানা আব্দুল হামিদ খান সাহেব ঢাকা মােক্তার লাইব্রেরিতে মুসলিম লীগ ছাড়া সকল পার্টিকে, সকল সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানকে, সকল ট্রেড ইউনিয়নকে ডেকে পাঠালেন। ১৯৫২সন ১৯৪৮সন নয়। এবার আর হিন্দু কে, কম্যুনিস্ট কে, কংগ্রেস কে এ নিয়ে কথা উঠল না। এবারে সকল বাঙালি যেন এক হয়ে দাঁড়াল।  প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে  প্রতিনিধি নিয়ে বৈঠক বসবে ১৫০নং মােগলটুলি অফিসে ৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে। সে সভায় কমিটি অব অ্যাকশন’এর কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হবে বলে ঘােষণা করেন। মওলানা সাহেব।  ৭ তারিখে মওলানা ভাসানীকে সভাপতি, কে জি মাহবুবকে আহ্বায়ক করে ছােট একটি কমিটি (সর্বদলীয়) গঠন করা হয়। প্রস্তাব গ্রহণ করা হল যে, ২১শে ফেব্রুয়ারি সারাদেশে সাধারণ ধর্মঘট পালন করা হবে।  শেখ 

 মুজিবুর রহমান সাহেব (তখন নিরাপত্তা বন্দি) তাঁর নিজস্ব সংগ্রামের কর্মসূচি গ্রহণ করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এবং ফলে দীর্ঘদিন কারাজীবন যাপন করছিলেন তাই ১৯৫২সনের ভাষা আন্দোলনে তাকে আমরা প্রত্যক্ষভাবে পাইনি। তবে তার পরােক্ষ প্রভাব আমরা অনুভব করেছি” (১৪(২)/১৫৬-১৫৭)। এখানে আলােচনার প্রাসঙ্গিকতায় শ্রদ্ধেয় তিনজন ভাষা-সৈনিকের লিখিত কিছু বর্ণনা উদ্ধৃত করছি। 

 ভাষা-সৈনিক গাজীউল হক লিখেছেন, “১৯৫২সালের ভাষা আন্দোলন যখন দানা বেঁধে উঠছে তখন শেখ মুজিবুর রহমান জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় নিশ্ৰুপ ছিলেন না। পরামর্শ দিয়েছেন এবং কারাগারে বন্দি থেকেও আন্দোলনের শরিক হয়েছেন। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘােষণা দিলে ৩০ জানুয়ারি (মতান্তরে ৩১শে) সন্ধ্যায় শামছুল হকের উদ্যোগে ঢাকা বার লাইব্রেরি মিলনায়তনে আহুত সভায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু তখন চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ৩ ফেব্রুয়ারী শামছুল হক, আব্দুস সামাদ। আজাদ ও ডা. গােলাম মাওলার মাধ্যমে মুজিব ভাই সংবাদ পাঠালেন যে, ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী হরতাল ডেকে মিছিল করে ব্যবস্থাপক পরিষদ ভবন ঘেরাও করা যায় কিনা বিবেচনা করে দেখতে। ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের মিছিল শেষে বেলতলায় ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী হরতাল ঘােষণা হলাে”(১(৩)/১৬৪৯)। 

 ভাষা-সৈনিক এবং ভূতপূর্ব রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্মৃতিচারণ : “বঙ্গবন্ধু দীর্ঘদিন। ধরে জেলে আবদ্ধ ছিলেন। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। তাই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।   বঙ্গবন্ধু সে সময় ছাত্র নেতাদের গভীর রাতে আলাপ আলােচনার জন্য ডাকতেন এবং তাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক বিষয় এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে। আলােচনা করতেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিকে রাজবন্দি মুক্তি এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি দিবস হিসেবে পালন করার জন্য বঙ্গবন্ধুই আমাদেরকে নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে প্রথম দিনেই পরিষদ ভবন ঘেরাও করার কথা বলেছিলেন। তিনি আরাে বলেছিলেন যে, একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি আমরণ অনশন করবেন। এ কথা আজ অনেকেই রাজনৈতিক কারণে মানতে চান না, কিন্তু আমি এসব সত্য বলেই জানি”(১(৩)১৬৪৯-৫০)। 

 ভাষা আন্দোলন এবং আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সময়ে বঙ্গবন্ধুর সহযােগী অলি আহাদ লিখেছেন, “প্রহরী পুলিশের ইচ্ছাকৃত নির্লিপ্ততার সুযােগ গ্রহণ করে আমরা তার সহিত হাসপাতালে কয়েক-দফা দেখা করি। এর পরে সরকার তাঁকে ঢাকা জেল থেকে ফরিদপুর জেলে সরিয়ে নেয়”(১(৩)/১৬৫০)। উল্লেখ্য যে, ফরিদপুর জেলেই শেখ মুজিব ও তাঁর সহবন্দি মহিউদ্দিন অনশন ধর্মঘট করেছিলেন। 

  একটানা ১১দিন অনশনের পর সেখান থেকে চরম ভগ্নস্বাস্থ্য অবস্থায় মুজিব ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ মুক্তিলাভ করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ গােপালগঞ্জে এবং টুঙ্গিপাড়ায় কাটিয়ে তিনি ঢাকায় ফিরেছিলেন। 

 পরবর্তী উদ্ধৃতি বঙ্গবন্ধুর কারাবন্দি (১৯৬৬- ৬৯) অবস্থায় লিখিত  অসমাপ্ত আত্মজীবনী  থেকে, “আমি হাসপাতালে আছি (জানুয়ারি ১৯৫২ খ্রি., ‘নিরাপত্তা বন্দী’ হিসাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে)। সন্ধ্যায় মােহাম্মদ তােয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে। আমি ওদের রাত একটার পরে আসতে বললাম। রাতে অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পিছনের বারান্দায় ওরা পাঁচসাতজন এসেছে। পুলিশরা চুপচাপ পড়ে থাকে, কারণ জানে আমি ভাগব না। আমি বললাম সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও খবর দিয়েছি। ছাত্রলীগই তখন ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ নেতারা রাজি হল। অলি আহাদ ও তােয়াহা বলল, যুবলীগও রাজি হবে। আরও বললাম, “খবর পেয়েছি, আমাকে শীঘ্রই আবার জেলে পাঠিয়ে দিবে। কারণ আমি নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি। তােমরা আগামীকাল রাতেও আবার এস । পরের দিন রাতে অনেকেই আসল। সেখানেই ঠিক হল আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারি (১৯৫২ খ্রি.) রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই জনমত সৃষ্টি করা শুরু হবে। আমি আরও বালাম, ‘আমিও আমার মুক্তি দাবি করে ১৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করব। মহিউদ্দিন জেলে আছে। আমার কাছে থাকে। যদি সে অনশন করতে রাজি হয় তার নামটাও আমার নামের সাথে দিয়ে দেবে” (৯/১৯৬-১৯৭)। 

 “সরকার আমাকে ঢাকা জেলে পাঠিয়ে দিলেন, ভালভাবে চিকিৎসা না করে। মহিউদ্দিনও রাজি হল অনশন ধর্মঘট করতে। আমরা দুইজন সরকারের কাছে পহেলা ফেব্রুয়ারি দরখাস্ত পাঠালাম যদি ১৫ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে আমাদের মুক্তি দেওয়া না হয় তাহা হলে ১৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট করতে শুরু করব। যখন জেল কর্তৃপক্ষ অনুরােধ করল অনশন ধর্মঘট না করতে তখন আমি বলেছিলাম, কোন অন্যায় করি নাই। ঠিক করেছি জেলের বাইরে যাব। হয় আমি জ্যান্ত অবস্থায় না হয় মৃত অবস্থায় যাব। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদও গঠন করা হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করা হয়েছে। কারণ, ঐ দিনই পূর্ব বাংলার আইনসভা বসবে। ১৯৪৮সালে ছাত্ররাই এককভাবে বাংলা ভাষার দাবির জন্য সংগ্রাম করেছিল। এবার আমার বিশ্বাস ছিল, জনগণ এগিয়ে আসবে। মাতৃভাষার অপমান কোনাে জাতি সহ্য করতে পারে না” (প্রাগুক্ত)। 

 “জেলের ভেতর আমরা দুইজনে প্রস্তুত হচ্ছিলাম অনশন ধর্মঘট করার জন্য। ১৫ 

  ফেব্রুয়ারি তারিখে সকালবেলা আমাকে জেল গেটে নিয়ে যাওয়া হল মহিউদ্দিনকেও নিয়ে আসা হয়েছে কর্তৃপক্ষ বললেন, আপনাদের অন্য জেলে পাঠানাের হুকুম হয়েছে। ফরিদপুর জেলে। আমরা (ফরিদপুর) জেলগেটে এসে দেখি জায়গাও ঠিক করে রেখেছেন, রাজবন্দিদের সাথে নয়, অন্য জায়গায়। আমরা তাড়াতাড়ি ঔষধ খেলাম পেট পরিষ্কার করার জন্য। তারপর অনশন ধর্মঘট শুরু করলাম। মহিউদ্দিন ভুগছে পুরিসি রােগে, আর আমি ভুগছি নানা রােগে। চারদিন পরে আমাদের নাক দিয়ে জোর করে খাওয়াতে শুরু করল। এদের কথা হল, ‘মরতে দেব না। পাঁচ-ছয় দিন পর বিছানা থেকে ওঠার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। আমরা কাগজি লেবুর রস দিয়ে লবণ-পানি খেতাম। কারণ এর মধ্যে কোনাে ফুড-ভ্যালাে নেই। প্যালপিটিশন হয় নিঃশ্বাস ফেলতে কষ্ট হয়। ভাবলাম আর বেশি দিন নাই”(৯/২০১-২০৩)। 

 “২১শে ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) আমরা উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা নিয়ে দিন কাটালাম, রাতে সিপাহিরা ডিউটিতে এসে খবর দিল, ঢাকায় ভীষণ গােলমাল হয়েছে। কয়েকজন লােক গুলি খেয়ে মারা গেছে। মনে হচ্ছিল চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলেছি। অনেক রাতে একজন সিপাহি এসে বলল, ছাত্র মারা গেছে অনেক। পরের দিন নয়দশটার সময় বিরাট শােভাযাত্রা বের হয়েছে, বড় রাস্তার কাছে জেল। শােভাযাত্রীদের স্লোগান পরিষ্কার শুনতে পেতাম হর্ন দিয়ে একজন বক্তৃতা করছে। কি হয়েছে ঢাকায় কিছু কিছু বুঝতে পারলাম। মাতৃভাষা আন্দোলনে পৃথিবীতে এই প্রথম বাঙালিরাই রক্ত দিল। ২৭তারিখ রাত আটটার সময় আমরা দুইজন চুপচাপ শুয়ে আছি। খােদার কাছে মাপ চেয়ে নিয়েছি। ডেপুটি জেলার এসে আমার কাছে বসলেন এবং বললেন,   আপনার মুক্তির অর্ডার এসে গেছে পরের দিন আব্বা আমাকে নিতে আসলেন। অনেক লোেক জেলগেটে হাজির। আমাকে স্ট্রেচারে করে জেলগেটে নিয়ে যাওয়া হল এবং গেটের বাইরে রেখে দিল, যদি কিছু হয়, বাইরে গিয়ে হােক, এই তাদের ধারণা (৯/২০৩-২০৬)। 

 চরম অসুস্থ অবস্থায় মুক্তিপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধু প্রায় মাস দেড়েক পরিবারের সাথে বাড়িতে কাটিয়ে ঢাকায় ফিরেছিলেন। ১৯৫২সালের ২৭ এপ্রিল আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রভাষা কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদের কনফারেন্সে সমবেত প্রায় পাঁচশত প্রতিনিধির উদ্দেশে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিব বলেছিলেন, “দীর্ঘ আড়াই বছর কারাবাসের পর আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। আপনারা ভাষা-সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন, আমি তখন কারাগারে অনশনরত। আপনারা সংঘবদ্ধ হােন, মুসলিম লীগের মুখােশ খুলে ফেলুন। আমরা বিশৃঙ্খলা চাই না। বাঁচতে চাই, লেখাপড়া করতে চাই, ভাষা চাই। মুসলিম লীগ সরকার আর মর্নিং নিউজ, গােষ্ঠী ছাড়া প্রত্যেকেই বাংলা ভাষা চায়” (১(৩)/১৬৫০-৫১)। এস. এ. করিম 

  লিখেছেন, “One of the outcomes of the conference was the decision  .to observe the Martyrs  Day annually on 21 February. When it was observed for the first time after independence in 1972, Mujib described it as the fountainhead of Bangalee nationalism” (১৭/৫৩)। 

 ১৯৫৫সালে পাকিস্তান গণপরিষদে প্রদত্ত অবিস্মরণীয় বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “অন্য কোন ভাষা জানি কি না জানি তা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমরা এখানে বাংলাতেই কথা বলতে চাই। যদি আমরা এটা উপলব্ধি করি যে, আমরা বাংলা ভাষায় ভাব বিনিময়ে সক্ষম, তা হলে সকল সময়ই বাংলায় কথা বলবাে, এমনকি ইংরেজিতেও যদি আমাদের সমান দক্ষতা থেকে থাকে। যদি আমাদের অনুমতি না দেয়া হয় তবে আমরা হাউজ পরিত্যাগ করবাে। বাংলাকে অবশ্যই হাউজ কর্তৃক গ্রহণ করে নিতে হবে”(১(৩)/১৬৫১)। প্রসঙ্গতই স্মরণীয়, বাংলাদেশের সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই জাতিসংঘে (১৯৭২) প্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন এবং ভাষার প্রতি ভালােবাসার দিকটিও প্রকাশ করতে পেরেছিলেন। তবে তারও অনেক আগে, অক্টোবর, ১৯৫২ পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে শেখ মুজিব গণচীনে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলির শান্তি সন্মেলনে ৩৭টি দেশের কয়েক শত প্রতিনিধির সমাবেশে বাংলাতেই ভাষণ দিয়েছিলেন। অনস্বীকার্য যে, সেদিন মাতৃভাষার প্রতি তাঁর ভালােবাসাটাই যথেষ্ট ছিল না, প্রয়ােজন ছিল যথার্থ সাহসেরও। শান্তি সম্মেলনে তাঁর বাংলা ভাষণটি ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন আতাউর রহমান খান। উল্লেখ্য যে, উক্ত সম্মেলনে ৩০ সদস্যের পাকিস্তান প্রতিনিধিদলে পাঁচজন মাত্র ছিলেন পূর্ব বাংলার। 

 ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে সােহরাওয়ার্দী এবং শেরে বাংলার অবস্থান-দৃষ্টিভিঙ্গ সম্পর্কে ভিন্ন দু’টি ঐতিহাসিক তথ্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। করাচিতে বাস করায় সােহরাওয়ার্দী পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত ঘটনাবলী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, পুলিশের গুলিবর্ষণে ছাত্রজনতার কয়েকজনের মৃত্যুর পর “He issued a statement condemning the police excesses, adding at the same time that Urdu, in his opinion, should be the state language. His statement was so out of tune with the sentiments of the people in East Bengal Mujib flew to Karachi to apprise Suhrawardy about the situation Suhrawardy then issued another statement expressing his full support for Bengali as a state language”(১৭/৫৩)। সােহরাওয়ার্দী তার প্রথম বিবৃতিটি প্রসঙ্গে পরবর্তী সময়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। “২০ নভেম্বর  ৫২ ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে বিরাট জনসভায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি 

  জানানাে হয়। এই সভায় সােহরাওয়ার্দী রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে বলেন, বাংলা এবং উর্দু উভয় ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে এ মত আমি বহু পূর্বে ঘােষণা করেছি। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে যখন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করা হচ্ছিল তখন আমার বক্তৃতা বিকৃত করে প্রচার করা হয়েছিল, যে রেডিও পাকিস্তান আমার কোন কথা ইতিপূর্বে প্রচার করেনি, সেই রেডিও থেকে বিবৃতি বিকৃত করে ৩ দিন ধরে প্রচার করা হয়। আমি ঘােষণা করছি যে, বাংলা এবং উর্দু দুটোই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে এবং ভাবের আদান প্রদানের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে বাংলা এবং পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু শিক্ষা করা উচিত” (প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও ভাষা আন্দোলন ; সরদার সিরাজুল ইসলাম, দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৫-০২-২০১৩)। 

 “১৫ মে, ১৯৫২ থেকে দেশময় বাংলা ভাষার পক্ষে স্বাক্ষর অভিযান শুরু হয়। শহীদ সােহরাওয়ার্দী এই অভিযানের সঙ্গে একাত্মতা ঘােষণা করে নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর করেন ৭জুন ‘৫২” (জনকণ্ঠ, প্রাগুক্ত)। ঢাকায় বাংলা ভাষার সমর্থক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের নাম-তালিকাসহ একটি প্রচার-পত্র প্রকাশ করা হয়। তাতে সােহরাওয়ার্দী এবং ফজলুল হক উভয়ের নামই ছিল। “Huq, however, blamed his unnamed opponents for trying to create a rift between himself and Nurul Amin and publicly dissociated himself from the langage movement,  .he did not want to jeopardize his lucrative position as Advocate General” (১৭/৫৩)। অবশ্য এর কিছুদিন পরেই নুরুল আমিনের লাইন ছেড়ে শেরে বাংলা তাঁর নতুন দল কৃষক শ্রমিক পার্টি (কেএসপি) গঠন করেছিলেন। 

 “১৯৫৩সালের শহীদ দিবসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মওলানা ভাসানী, আবুল হাশিম, মওলানা তর্কবাগীশ, খয়রাত হােসেন, ওসমান আলী, অলি আহাদসহ সকল রাজবন্দি একদিনের জন্য অনশন করেন এবং খােরাকির টাকা কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের কাছে প্রেরণ করতে অনুরােধ করেন। মওলানা ভাসানী ১৮এপ্রিল। থেকে আমরণ অনশন শুরু করলে ২১ এপ্রিল মুক্তিলাভ করেন। ২৫ এপ্রিল  ৫৩ সারাদেশে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ওইদিন পল্টন ময়দানে জিল্লুর রহমানের (তদানীন্তন ফজলুল হক হলের ভিপি এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিরাট সভায় মওলানা ভাসানী বক্তব্য রাখেন। আন্দোলনের তীব্রতায় পরদিন ২৬ এপ্রিল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘােষণা করা হয়। ১৯৫৪সালের ..পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচন ( যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন নামে পরিচিত) ছিল ১২ মার্চ। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা (করার) দাবিটি ইতােমধ্যে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় (নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো) স্থান পেয়েছে এবং ১৯৫৪ সালের শহীদ দিবসে গােটা পূর্ব বাংলা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। অবশেষে জনগণ ভাষার প্রশ্নে 

  চূড়ান্ত রায় দেন মুসলিম লীগ সরকারকে পরাজিত করে”(প্রাগুক্ত, জনকণ্ঠ)। 

 ৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৬ পাকিস্তান কন্সটিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি’তে খসড়া সংবিধানের ওপর আলােচনাকালে “শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম একটি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দানের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, যেহেতু বাংলা দেশের ৫৬% লােকের ভাষা, তাই উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা প্রদান করতে হবে। এটা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দাবি। উল্লেখ করেন যে, বাংলা ও উর্দুকে সমভাবে সমৃদ্ধ করে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদান করাটা সমভাবে কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রাদেশিক সরকারের গুরুদায়িত্ব। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে আরাে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের সবাই চায় যে আজ থেকেই উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করা হােক” (১(৩)/১৫৯৪)। পরবর্তী ১৬ফেব্রুয়ারি তারিখে ‘কনস্টিটুয়ান্ট অ্যাসেম্বলি’তে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে আবার আলােচনা করতে গিয়ে মুজিব বলেছিলেন, “বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন ছাত্র শহীদ হয়েছেন এবং প্রায় ১৫০০জন জেল খেটেছেন”। 

  কটিটুয়ান্ট অ্যাসেম্বলি’তে গৃহীত (১৯৫৬) অন্তর্বর্তী সংবিধানে বাংলাকে উর্দুর সাথে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও পূর্ব বাংলায় গভর্নরের *ন, জরি অবস্থা এবং ১৯৫৮ খ্রি. পাকিস্তানে আয়ুবের সামরিক শাসনে বাংলা ভাষা ও সাটি পিছিয়ে পড়েছিল। উল্লেখ্য যে, ১৯৭১ খ্রি. ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে সেদিন থেকেই দেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। আমরা ক্ষমতা হাতে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা চালু করে দেব। সে বাংলা যদি ভুল হয়, তবে ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশােধন করা হবে” (সূত্র: ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু , স,সিরাজুল ইসলাম, দৈনিক জনকণ্ঠ, ২০-২১ ফেব্রুয়ারি,২০১২)। বাংলা ভাষা জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার প্রকৃত সুযােগ আসে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের সাথেসাথেই। অতঃপর শাসনতন্ত্র তৈরি হয় বাংলায়। “বঙ্গবন্ধুর কাছে ইংরেজিতে লেখা কোন ফাইল পাঠাতে কেউ সাহস করত না”। 

 “১৯৫৬ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির সময় প্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কেএসপি’র আবু হােসেন সরকার। যেখানে ১৯৫২সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম গুলিবর্ষণের ফলে বরকত শহীদ হন সেখানে মুখ্যমন্ত্রী আবু হােসেন সরকার, মওলানা ভাসানী ও বরকতের মাতা যৌথভাবে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এইদিন ঢাকায় দু’টি জনসভা হয়। আরমানিটোলা ময়দানে সভাপতিত্ব করেন মওলানা ভাসানী পল্টনের সভায় সভাপতিত্ব করেন আবু হােসেন সরকার । আরমানিটোলা ময়দানে সমাবেশ শেষে এক বিরাট মিছিল শহর প্রদক্ষিণ 

  করে। ১৯৫৬সালের সংবিধান নির্বাচিত গণপরিষদে গৃহীত হয়। স্বায়ত্তশাসন ও ভাষার প্রশ্নে শেখ মুজিবুর রহমান গণপরিষদে ২১জানুয়ারি ১৯৫৬ সংবিধান যেদিন গৃহীত হয় সেদিন প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্যরা(সহ) গণপরিষদ ত্যাগ করেছিলেন” (প্রাগুক্ত, জনকণ্ঠ, ১৬-০২- ১৩)। 

 বঙ্গবন্ধুর কথা দিয়েই বাংলার ভাষা-আন্দোলন এবং বঙ্গবন্ধুর বাঙালি জাতি-রাষ্ট্র চিন্তা  প্রসঙ্গটি ইতি টানতে চাই, যাতে সহজেই উপলব্ধি করা যাবে, বাংলা আর বাঙালি সম্পর্কিত নিজের চেতনাকে কী গভীর বাস্তবতাবােধ থেকে একটি জাতিরাষ্ট্রে রূপ দিয়েছিলেন। ১৯৭২সালে ঢাকায় সৈয়দ মুজতবা আলী বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনাদের জাতীয়তার ভিত্তি কি কেবল ভূগােল আর ভাষা? বঙ্গবন্ধু মৃদু হেসে বলেছিলেন, না, কেবল ভূগােল আর ভাষা হলেতাে আপনাদের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও বিহার-ওড়িশ্যার অংশবিশেষ দাবি করতাম। আমাদের বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তি বাংলার সকল ধর্মের সকল বর্ণের মানুষের হাজার বছরের মিলিত সভ্যতা ও সংস্কৃতি। তাতে হিন্দু, বৌদ্ধ ও উপজাতীয় সভ্যতার যেমন ছাপ আছে, তেমনি আছে মুসলমান সভ্যতা-সংস্কৃতির মিশ্রণ। বর্তমানের ভারত একটি পলিটিক্যাল ইউনিয়ন। আর আমরা একটি কালচারাল নেশন। হাজার বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের পরিচয় বাঙালি। বহুকাল আমাদের একটি নেশন স্টেট ছিল না। সেটি এখন পেয়েছি। সেটি যদি তার সেকুলার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে আমরা টিকিয়ে রাখতে পারি, তাহলে বাঙালি জাতি বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি বিশ্বে একটি আধুনিক জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাবেই” (১(১)/১২৯-১৩০)। 

  ৮০ 

  ১৯৫৪’র ‘যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন  : 

 মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে বাঙালির ব্যালট-বিস্ফোরণ 

  ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ’ নিবন্ধে ব্যারিস্টার এম, আমীর-উল ইসলাম লিখেছেন, “১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে যৌথ নেতৃত্বে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। যেমনটি বিজয় হয়েছিল (পরবর্তী সময়ের) ১৯০এর নির্বাচনে। সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক ছত্রছায়ায় গড়া পাকিস্তানের শাসকগােষ্ঠী জনগণের এ বিজয়কে মেনে নেয়নি ১৯৫৪ সালে, তেমনি মেনে নেয়নি ১৯৭১-এ” (১(১)/২০২)। প্রকৃতপক্ষেই জনমত বা গণকল্যাণের ভিওিতে নয়, পাকিস্তান শাসিত হতাে সেনা-আমলাচক্রের মর্জি-মাফিক। 

 যুক্তফ্রন্ট গঠন সম্পর্কে বিরল আলােচিত একটি প্রাসঙ্গিক তথ্য উল্লেখ করেছেন কামরুদ্দীন আহমদ : “১৯৫৩ সনের নভেম্বর মাসে বামপন্থী ছাত্ররা এবং যুবসম্প্রদায়  (আসন্ন) নির্বাচনের পূর্বে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে একটি  যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করার জন্যে আন্দোলন চালালেন। ফজলুল হক সাহেব ও মওলানা ভাসানী  একটি ‘যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে রাজি হলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ‘যুক্তফ্রন্ট গঠনের বিরােধিতা করছিলেন। শহীদ সাহেব ঢাকায় এলেন এবং তিনিও যুক্তফ্রন্টের বিরােধিতা করলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বামপন্থীরা ও হামিদুল হক, মােহন মিঞা, আব্দুস সালাম খান কিছু কৃষক-প্রজা ও মুসলিম লীগের নেতারা যুক্তফ্রন্ট গঠনের উপর জোর দিলেন   শেষ পর্যন্ত শহীদ সাহেব ও শেখ মুজিবুর রহমান রাজি হলেন এবং হক সাহেব ও মওলানা সাহেব ‘যুক্তফ্রন্ট’ চুক্তিটি সই করেন” (১৪(২)/১৮৩-১৮৪)। তৎকালীন পরিস্থিতিতে যুক্তফ্রন্ট গঠনের বিষয়ে অনীহার কারণটাও বঙ্গবন্ধুর কথাতেই জানা যায়, “আমি মওলানা সাহেবকে বললাম,  আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিজয় লাভ করবে, ভয়ের কোন কারণ নাই। আর যদি সংখ্যাগুরু না হতে পারি, আইনসভায় আওয়ামী লীগই বিরােধী দল হয়ে কাজ 

  ৮১ 

  করবে। রাজনীতি স্বচ্ছ থাকবে, জগাখিচুড়ি হবে না। আদর্শহীন লােক নিয়ে ক্ষমতায় গেলেও দেশের কাজ হবে না। ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধার হতে পারে” (৯/২৪৯)। এতকাল পরেও মানতেই হয়, সেদিনের তরুণ নেতা শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ধারণাই অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রতিপন্ন হয়েছিল। 

 সাংবাদিক-সাহিত্যক এবং রাজনীতি পর্যবেক্ষক আবু জাফর শামসুদ্দিন লিখেছেন, “ফজলুল হক সাহেবের কৃষক প্রজা পার্টি (প্রকৃতপক্ষে কৃষক শ্রমিক পার্টি   কেএসপি) ছিল একটি নামসর্বস্ব দল। কিন্তু সেদিনের পূর্ব বাংলায় ব্যক্তি ফজলুল হক ছিলেন এক প্রচণ্ড শক্তি। যুক্তফ্রন্টে মওলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম দলকে না টানলেও চলতাে। ওরা ফজলুল হক সাহেবের কৃষক প্রজা দলের সঙ্গে আঁতাত করে যুক্তফ্রন্টে প্রবেশ করে। এ দলটিকে যুক্তফ্রন্টে গ্রহণ করা ছিল একটি মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল। ফলাফল শুভ হয়নি। আওয়ামী লীগ দলে যারা ছিলেন না, যারা রাজনীতি করতেন সমাজে নামধাম কামাবার জন্য তারাই প্রধানত কৃষক প্রজা দলের মাধ্যমে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হন। গণতন্ত্রী দল ছিল প্রকৃতপক্ষে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসীদের মুক্তফ্রন্ট । অবশ্য এ দলেও কিছু কিছু সুযােগ-সুবিধাবাদী ছিলেন। নেজামে ইসলাম দল মুসলিম লীগের বেনামিতে যুক্তফ্রন্টে প্রবেশ করেছিল ” (৮/২৬৬-২৬৭)। 

 বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “প্রত্যেকটা নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী ছিল, যারা ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত নিজ নিজ এলাকায় কাজ করেছে। হক সাহেবের কৃষক শ্রমিক দলের প্রার্থীর অভাব থাকায় বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকা থেকে যারাই ইলেকশন করতে আশা করে তারাই কৃষক শ্রমিক দলে নাম লিখিয়ে দরখাস্ত করেছিল। এমন প্রমাণও আছে, প্রথমে মুসলিম লীগে দরখাস্ত করেছে, নমিনেশন পেয়ে কৃষক শ্রমিক দলে নাম লিখিয়ে নমিনেশন পেয়েছে। নেজামে ইসলাম দল কয়েকজন মওলানা সাহেবের নাম নিয়ে এসেছে, তারা দরখাস্তও করে নাই। তাদের সব কয়জনকে নমিনেশন দিতে হবে। এই দল একুশ দফায় দস্তখতও করে নাই। তবে এই দলের প্রতিনিধি একটা লিস্ট দাখিল করলেন, যাদের নমিনেশন দেওয়া যাবে না। কারণ তারা সকলেই নাকি কমিউনিস্ট। এরা কিছু আওয়ামী লীগের জেলখাটা সদস্য আর কিছু গণতান্ত্রিক দলের সদস্য। এদের দাবি এমন। পর্যায়ে চলে গেল যে, নিঃস্বার্থ কর্মী ও নেতাদের নমিনেশন না দিয়ে যারা মাত্র চারপাঁচ মাস পূর্বেও মুসলিম লীগ করেছে অথবা জীবনে রাজনীতি করে নাই, তাদেরই নমিনেশন দিতে হবে। মাঝে মাঝে হক সাহেবের কাছ থেকে ছােট্ট ছােট্ট চিঠিও এসে হাজির হয়। তাঁর চিঠিকে সম্মান না করে পারা যায় না”(৯/২৫৩)। প্রকৃতপক্ষে ফজলুল হক পূর্বাপর কখনাে রাজনৈতিক দোদুল্যমানতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অপরদিকে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময়ই প্রতিপন্ন হয়েছিল যে, ভিন্ন 

  ৮২ 

  মতাদর্শের নেতাকর্মীদের নিয়ে, আপন লক্ষ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিরল দক্ষতা ছিল মুজিবের। 

 যুক্তফ্রন্ট ২১-দফা ‘ম্যানিফেস্টো’র ভিত্তিতে নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করেছিল। প্রসঙ্গতই উল্লেখ করা অপরিহার্য যে, ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছ দফা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানকালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১-দফা এবং সবিশেষ উল্লেখ্য যে, ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘােষণা আর ১৯৭২সালে প্রণীত সংবিধানেও ২১দফার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। ২১-দফা প্রণয়নের মূল দায়িত্ব পালন করেছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “আবুল মনসুর আহমদ সাহেব বিচক্ষণ লােক সন্দেহ নাই। তিনি তাড়াতাড়ি কফিলুদ্দিন চৌধুরীর সাহায্যে একুশ দফা প্রােগ্রামে দস্তখত করিয়ে নিলেন হক সাহেবকে দিয়ে। তাতে আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসন, বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা, রাজবন্দিদের মুক্তি এবং আরও কতকগুলি মূল দাবি মেনে নেওয়া হল” (৯/২৫১)। তদানীন্তন রাজনৈতিক মতপথের নানা দিক অবহিত হওয়ার জন্য যুক্তফ্রন্ট গঠনের পশ্চাদপটের আরাে কিছু কথা একটু বিস্তারিতভাবেই উল্লেখ করা দরকার। 

 “নির্বাচনী প্রচার অভিযানে যুক্তফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ   প্রধানত শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, সােহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি এলাকায় ব্যাপক গণসংযােগ করেন। আর এই নির্বাচনী প্রচারণার ফলে শেখ মুজিব বিশাল জনগােষ্ঠীর সাথে আরাে নিবিড় এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে গড়ে তুলতে সক্ষম হন। তাঁর সাংগঠনিক শক্তি ও দক্ষতার ব্যাপক বিকাশ ঘটে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অবিশ্বাস্য সাফল্য পাকিস্তানি শাসকদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। মুসলিম লীগ সম্পূর্ণ ধরাশায়ী হয় এবং তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে” (১(১)/১৩৫)। উল্লেখ্য যে, তখনাে ধর্ম-ভিত্তিক পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা বলবৎ ছিল। “যুক্তফ্রন্ট শুধু মুসলিম আসনেই কনটেস্ট করিয়াছিল। ২৩৭টি মুসলিম সিটের মধ্যে ২২৮টিই দখল করিয়াছিল। এই ২২৮টির মধ্যে আওয়ামী (মুসলিম) লীগ ১৪৩, কৃষক-শ্রমিক ৪৮, নিজামে ইসলাম ২২, গণতন্ত্রী ১৩ ও খিলাফতে-রববানী ২ জন পাইয়াছিল। নিজামে ইসলাম কার্যত হক সাহেবের পৃষ্ঠপােষিত দল বলিয়া হক সাহেবের নিজস্ব মেম্বর ছিলেন ৭০জন”(৪/৩৩১)। মুসলমান-অমুসলমান এবং মহিলা আসন মিলিয়ে পূর্ব পাকিস্তান পরিষদে তখন মােট আসনসংখ্যা ছিল ৩০৯টি। ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্টের প্রাপ্ত মােট ২২৮টি আসন বাদে ৯টি মাত্র আসন পেয়েছিল মুসলিম লীগ। উন্মুক্ত সাধারণ আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্টের সহযােগী কংগ্রেস এবং তফশিলী ফেডারেশন ৪২টি এবং কম্যুনিস্ট পার্টি ৪টি আসন পেয়েছিল। বাদ-বাকি ২৬টি আসন পেয়েছিলেন নির্দল প্রার্থী এবং সংরক্ষিত আসনের মহিলারা। 

  ৮৩ 

  রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন এবং যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সাফল্যের মাধ্যমেই পূর্ব বাংলায় অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পথটি রচিত হয়েছিল এবং এ পথ ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশ। কিন্তু কী হতে পারতাে, এ দুটি সাফল্য অর্জিত না হলে? খ্যাতিমান সম্পাদক আবেদ খান ‘শেখ মুজিবই বাংলাদেশের ঠিকানা’ নিবন্ধে লিখেছেন, “সাতচল্লিশের (ভারত-ভাগ) অব্যবহিত পরে পাকিস্তানকে অস্বীকার করা কিংবা জিন্নাহ অথবা মুসলিম লীগ সম্পর্কিত সামান্যতম শব্দ উচ্চারণ করাও ছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। সে সময় থেকেই পাকিস্তানী শাসকগােষ্ঠি শেখ মুজিবকে তাদের আক্রমণের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করেছিল। উনিশ শ’ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন যদি সফল না হত এবং চুয়ান্নর নির্বাচনে যদি মুসলিম লীগের ভরাডুবি না হত, তাহলে বােধ হয় আওয়ামী লীগ। নিষিদ্ধ হত এবং শেরে বাংলা, ভাসানী বা সােহরাওয়ার্দী এবং অবশ্যই শেখ মুজিব, তাজউদ্দিনের জন্য অপেক্ষা করতাে অন্ধ কারাপ্রকোষ্ঠ কিংবা ফাঁসির দড়ি। লক্ষ্য করার ব্যাপার, পাকিস্তানী শাসকগােষ্ঠির রােষানল থেকে শেরে বাংলা, সােহরাওয়ার্দী, ভাসানী কোনও না কোন সময় রক্ষা পেয়েছিলেন, কিন্তু শেখ মুজিবের জন্য নিস্কৃতি ছিল না। কিন্তু এতকিছুর পরেও শেখ মুজিব ক্রমশঃ উজ্জ্বলতর হয়েছেন” (১(২)/৮০২-৮০৩)। 

 নির্বাচনের (৮-১২মার্চ, ১৯৫৪) বিপুল বিজয় সত্বেও যুক্তফ্রন্ট সরকার সফলতা কিংবা স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি, এর পেছনে মুসলিম লীগ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রবল ষড়যন্ত্র যেমন ছিল, তেমনি দায়ি ছিল যুক্তফ্রন্টের অভ্যন্তরীণ বিবাদ-দুর্বলতাও। এখানে প্রসঙ্গতই যুক্তফ্রন্ট গঠনের আগে জগা-খিচুরী রাজনীতি’ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর উক্তিটি স্মরণীয়, “আদর্শহীন লােক নিয়ে ক্ষমতায় গেলেও দেশের কাজ হবে না। ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধার হতে পারে”। আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়ের প্রেক্ষাপটে ভােটার-জনগণের আশা ও আস্থার মর্যাদা নেতারা দিতে পারিলেন না। লিডার নির্বাচনের দিন হইতেই, বরঞ্চ আগে হইতেই, আমাদের মধ্যে ফাটল দেখা দেয়। এই ফাটল রােধ করার চেষ্টা একমাত্র শহীদ সাহেব ছাড়া আর কেউ করেন নাই। কৃষক শ্রমিক পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে, আরও নির্দিষ্ট করিয়া বলিলে হক সাহেব ও শহীদ সাহেবের মধ্যে, মনের অমিল আগে হইতেই ছিল। কারণ এই দুই মহান নেতার নিচে উভয় দলের আরও অনেক নেতা ছিলেন। 

 আওয়ামী লীগের তরুণ নেতাকর্মীরা যুক্তফ্রন্টের সংসদীয়-নেতা নির্বাচনের আগেই কিছু শর্ত আরােপের প্রস্তাব করলে সােহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, হক সাহেবের ওপর “কোনও শর্ত আরােপ করা চলে না। করিলে এটা হইবে হদ্দ বেইমানি। প্রস্তাবকরা অবশ্যই বলিলেন : তারা সত্যসত্যই হক সাহেবকে ছাড়া অন্য কাউকে লিডার 

  ৮৪ 

  নির্বাচন করিতে চান না। শুধু চাপ দিয়া একটা সর্বদলীয় উঁচুস্তরের মন্ত্রিসভা গঠন করিতে চান। বিনাশর্তে হক সাহেবকে স্বাধীনভাবে ছাড়িয়া দিলে লিডার নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে তিনি পার্শ্ব-চরদের দ্বারা বিপথে পরিচালিত হইবেন। তাঁদের যুক্তি শহীদ সাহেবের মনঃপুত হইল না। তিনি আশ্বাস দিলেন, অতীতে যাই হইয়া থাকুক, জীবন-সন্ধ্যায় হক সাহেব আর ভুল করিবেন না। তরুণদের অসন্তোষের মধ্যে সভা ভঙ্গ হইল (৪/৩৩১-৩৩২)। 

 বঙ্গবন্ধুর প্রাসঙ্গিক বর্ণনাটি ভিন্নতর : “নির্বাচনে জয়লাভ করার সাথে সাথে আমাদের কানে আসতে লাগল, জনাব মােহাম্মদ আলী বগুড়া হক সাহেবের সাথে। যােগাযােগ করতে চেষ্টা করছেন পুরানাে মুসলিম লীগারদের মারফতে   যারা কিছুদিন পূর্বে হক সাহেবের দলে যােগদান করে এমএলএ হয়েছেন কৃষক শ্রমিক দলের নামে। সকালবেলা (২ এপ্রিল, ৫৪) আওয়ামী লীগ সদস্যদের সভা (দলীয় কার্যালয়ে) আর বিকালে বার লাইব্রেরি হলে সমস্ত দল মিলে যুক্তফ্রন্ট এমএলএদের সভা। আওয়ামী লীগের সভায় শহীদ সাহেব ও ভাসানী সাহেব উপস্থিত ছিলেন। সভায় (সকালের) রংপুরের আওয়ামী লীগ নেতা খয়রাত হােসেন সাহেব প্রস্তাবের মাধ্যমে বললেন, “জনাব একে ফজলুল হক সাহেবকে নেতা নির্বাচন করার পূর্বে শহীদ সাহেব ও ভাসানী সাহেব তার সাথে পরামর্শ করে মন্ত্রীদের লিস্ট ফয়সালা করা উচিত। একবার তাঁকে যুক্তফ্রন্ট পার্লামেন্টারি দলের নেতা করলে তাঁর দলবলের মধ্যে এমন পাকা খেলােয়াড় আছে, যারা চক্রান্তের খেলা শুরু করতে। পারে। আর একজন ডেপুটি লিডার আমাদের দল থেকে করা উচিত, কারণ আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল যুক্তফ্রন্টের মধ্যে। শহীদ সাহেব বললেন, তিনি নিশ্চয়ই আমাদের দুইজনের সাথে পরামর্শ করবেন মন্ত্রীদের নাম ঠিক করার পূর্বে। বৃদ্ধ মানুষ এখন তাকে আর বিরক্ত করা ঠিক হবে না। ভাসানী সাহেবও শহীদ সাহেবকে সমর্থন করলেন। আমি জনাব খয়রাত হােসেন সাহেবের সাথে একমত ছিলাম। কিন্তু জোর করলাম না। যুক্তফ্রন্ট এমএলএদের সভা হল। শহীদ সাহেব ও ভাসানী সাহেব তাতে উপস্থিত ছিলেন। হক সাহেবকে সর্বসম্মতিক্রমে নেতা করা হল” (৯/২৫৯)। 

 আবুল মনসুর আহমদ আরাে লিখেছেন, “আওয়ামী লীগের তরুণ এমএলএ’রা যা আশঙ্কা করিয়াছিলেন তাই হইল। মন্ত্রিসভা গঠন লইয়া হক সাহেবের সাথে শহীদ সাহেব ও ভাসানী সাহেবের মতান্তর হইল। সে মতভেদও মাত্র দুই দলের দুইজন তরুণের মন্ত্রিত্ব লইয়া। তার একজন হক সাহেবের প্রিয়পাত্র, অপরজন শহীদ সাহেবের। হক সাহেব তার লােকটির নাম প্রস্তাব করায় শহীদ সাহেবও তাঁর লােকটির নাম করেন। নইলে শহীদ সাহেবের লােকটিকে মন্ত্রী করার ইচ্ছা শহীদ সাহেবের নিজেরই ছিল না। বস্তুত ঐ দিনই সকালের দিকে কিছু সংখ্যক আওয়ামী 

  ৮৫ 

  লীগ-কর্মী ঐ লােককে মন্ত্রী করার দাবি করাতে শহীদ সাহেব কর্মীদের ত ধমকাইয়া দেনই, উপরন্তু তাঁর প্রিয়পাত্রটিকেও ধমকাইয়া দেন। যা হােক শহীদ সাহেব তাঁকে এই বলিয়া সান্ত্বনা দিয়া বিদায় করেন যে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি করা তিনি আগে হইতেই ঠিক করিয়া রাখিয়াছেন” (৪/৩৩৩-৩৩৪)। ১৯৫৪ র কথা ১৯৭০-এ লিখতে গিয়েও আবুল মনসুর আহমদ শহীদ সাহেবের প্রিয়পাত্র এবং হক সাহেবের প্রিয়পাত্র পরিচয়ের যে-দুটি নাম আড়ালে রেখেছেন, নানা তথ্য-সূত্রে নাম দু’টি অজানা থাকেনি। শহীদ সাহেবের প্রিয়পাত্র শেখ মুজিবুর রহমান এবং হক সাহেবের প্রিয়পাত্র তাঁরই ভাগিনেয়, সৈয়দ আজিজুল হক, নান্না মিয়া। 

 উল্লেখ্য যে, নির্বাচনের ফলাফল ঘােষণার পরেই মুজিব ইত্তেফাক-সম্পাদক মাণিক মিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। মাণিক মিয়া লিখেছেন, “He (Mujib) informed me that in Faridpur Mohan Mian and Abdus Salam had been reported as saying that on no account would Mujib be allowed to become a minister and that they would ensure his exclusion .Mujib said that he was not interested in becoming a minister but now it had become a matter of prestige with him. He requested me to have a word with Shaheed Suhrawardy. When I told Suhrawardy about this, he was astounded” (১৭/৫৭-৫৮)। 

 সােহরাওয়ার্দীর সাথে প্রায় একই সময়ে সাক্ষাৎ-আলােচনার একটি বর্ণনা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু নিজেই, “আমি যখন নির্বাচনের পরে ফিরে আসি, শহীদ সাহেব আমাকে একাকী ডেকে বললেন, তুমি মন্ত্রিত্ব নেবা কি না? আমি বললাম, আমি মন্ত্রিত্ব চাই না। পার্টির অনেক কাজ আছে, বহু প্রার্থী আছে, দেখে শুনে তাদের করে দেন। শহীদ সাহেব আর কিছুই আমাকে বলেন নাই” (৮/২৫৯)। মাণিক মিয়া এবং বঙ্গবন্ধুর লিখিত দুটি ভিন্ন বিবরণ থেকে অন্ততপক্ষে একটি সত্য উপলব্ধি করা যায় যে, মন্ত্রিত্ব চাওয়া-পাওয়া নিয়ে মুজিব-সােহরাওয়ার্দীর মধ্যে মত-ভিন্নতার কিংবা সােহরাওয়ার্দীর ‘প্রিয়পাত্রটিকে ধমকাইয়া দেবার মতও কিছু ঘটেনি। অথচ ‘রাজনৈতিক ইতিহাস  নামে এমন অনেক কথাই ‘বাজার-চালু হয়ে যায়। প্রসঙ্গতই স্মরণীয় যে, পরবর্তী সময়েও প্রায় একই রকম অভিযােগ একই সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল, সে-কথা যথাস্থানে আলােচ্য। 

 শেরে বাংলার ওপর নেজামে ইসলামীর প্রভাব এবং দলটির ওপর তাঁর অতিনির্ভরতার কারণে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সময় যেমন, তেমনি মন্ত্রিসভা গঠনের সময়ও সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছিল। যুক্তফ্রন্টের মূল সাংগঠনিক শক্তি ছিল আওয়ামী (মুসলিম) লীগ এবং নির্বাচনেও তাদের প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ছিল কে.এস.পি-নেজামে ইসলামীর 

  সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি। শেখ মুজিব ছিলেন তখন আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং যুক্তফ্রন্টের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠক। কিন্তু “ফজলুল হকের কৃষক প্রজা (শ্রমিক) দল এবং নেজামে ইসলাম দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে নারাজ হয়” (৮/২৭৩)। শেরে বাংলা নিজেও আওয়ামী লীগকে, বিশেষত শেখ মুজিবকে মন্ত্রিসভায় নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। তাঁর মূল পার্শ্বচর নেজামে ইসলাম ধুয়া তুলেছিল শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের অনেকেই ক্যুনিস্ট, সুতরাং মন্ত্রিসভায় নেয়া চলবে না। এবিষয়ে নির্বাচন বিজয়ী কেএসপি-প্রার্থী হিসেবে মােহন মিয়া প্রমুখেরও যথেষ্ট উদ্যোগ ছিল। শেখ মুজিব ক্যুনিস্ট   একথা পাকিস্তানি শাসকদের ওপর মহলে ভালােভাবেই ছড়ানাে হয়েছিল। অপরদিকে সােহরাওয়ার্দী-ভাসানী প্রমুখ আওয়ামী নেতৃত্ব যুক্তিসঙ্গতভাবেই বলেছিলেন, কারা মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হবে, সেটি স্থির করবে আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগ থেকে মন্ত্রীপদে মনােনীত ব্যক্তিবর্গকে একসাথেই মন্ত্রিসভায় নিতে হবে। কিন্তু এ.কে ফজলুল হক ৩ এপ্রিল, ১৯৫৪ তারিখে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়েই একক উদ্যোগে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন। 

 তখন প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক কেএসপি’র আবু হােসেন সরকার ও সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া এবং নেজামে ইসলামের আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ। মাত্র তিনজনকে মন্ত্রী করেছিলেন। মাণিক মিয়ার মন্তব্য, “The general public  saw the list of three cabinet ministers did not include any Awami Leaguer, they lost their enthusiasm about the electoral victory At last a compromise was reached on 15 May and Awami League joined the government.” (১৭/৫৮)। আবু জাফর শামসুদ্দিন লিখেছেন, “দেড় মাস পরে  চাপের মুখে বাধ্য হয়ে ১৫ই মে তারিখে আওয়ামী লীগের শেখ মুজিবুর রহমান এবং আতাউর রহমান খানকে মন্ত্রিসভায় গ্রহণ করা হয়। প্রশ্ন জাগতেই পারে, কেন ফজলুল হক তার মন্ত্রিসভার বিলম্বিত সম্প্রসারণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন? 

 নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের সাথেসাথেই ষড়যন্ত্রকারীরা তৎপর হয়ে উঠেছিল। ২৩ মার্চ চন্দ্রঘােনা কাগজ কলে বাঙালি ও উর্দুভাষীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা লাগিয়ে এরই একটা রিহার্সাল’ তারা সম্পন্ন করেছিল। ষড়যন্ত্রকারীরা শেরে বাংলার বিপুল জনপ্রিয়তাকে খর্ব করতে চেয়েছিল। আর প্রধান লক্ষ্য ছিল কেএসপি’র সাথে আওয়ামী লীগের বিভেদ-বৈরিতা বাড়িয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে জনগণের কাছে অগ্রহণযােগ্য করে তােলা। এমন পরিস্থিতিতেই পূর্ব বাংলার গভর্নর চৌধুরী খালিকুজ্জামান চন্দ্রঘােনা কাগজ কলের দাঙ্গার দোহাই দিয়ে শেরে বাংলাকে ২রা এপ্রিলের মধ্যে মন্ত্রিসভা গঠনের তাগাদা দিলেন। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে মাত্র তিনজন মন্ত্রী নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক মন্ত্রিসভা শপথ নিলেন ৩ এপ্রিল। 

  “ভগ্নস্বাস্থ্য লইয়া শহীদ সাহেব করাচি গেলেন। একই বিমানে প্রধানমন্ত্রী হক সাহেব তার মন্ত্রী ও অনেক কৃষক-শ্রমিক মেম্বর লইয়া কেন্দ্রীয় সরকারের আমন্ত্রণে করাচি গেলেন। মওলানা ভাসানী ক্ষুণমনে মফস্সলের বাড়িতে গিয়া বসিলেন। যুক্তফ্রন্টে বড় রকমের ফাটল ধরিল। আওয়ামী লীগের পক্ষ হইতে যাতে এই ফাটল বৃদ্ধির কোনও কাজ না হয়, সেজন্য আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভা ডাকিয়া। আমরা সর্ব অবস্থায় হক মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করিবার প্রস্তাব গ্রহণ করিলাম” (৪/৩৩৪-৩৩৫)। 

 করাচি থেকে ঢাকায় ফিরবার পথে কলকাতায় ৪মে, ১৯৫৪ শেরে বাংলা বলেছিলেন, “Politicians have partitioned the territories, but the common mass should ensure, that everybody live peacefully. Language proved to be the most unifying factor in history and the people of two Bengals, bound together in common language, should forget political divisions and feel themselves to be one” (৮/২৭৪)। ৫ মে তারিখে এটি প্রকাশিত হয়। ঢাকার মর্নিং নিউজ পত্রিকায়। মুসলিম লীগ মহল তােলপাড় লাগিয়ে ফজলুল হককে কোণঠাসা করে ফেলে। পূর্ব বাংলা কিংবা পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম লীগাররা একবারও ভাবলেন না যে, শেরে বাংলা ছিলেন পাকিস্তানের প্রস্তাবক, তিনি ১৯৪৬-৪৭ খ্রি. সময়কালে ‘যুক্ত বাংলার দাবিতে কোনােভাবেই যুক্ত ছিলেন না। এমনকি ভাষা আন্দোলন থেকেও তিনি দূরে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “সুযােগ বুঝে মােহাম্মদ আলী বগুড়া এবং তার দলবলেরা হক সাহেবের বিরুদ্ধে তাই নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। এই বিপদের মুহূর্তে আওয়ামী লীগ নেতা বা কর্মীরা হক সাহেব ও তার দলবলের বিরুদ্ধাচরণ করলেন না। তারা জানিয়ে দিলেন যে, তারা হক মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করবেন। হক সাহেব এই অবস্থায় আওয়ামী লীগারদের সাথে আলােচনা করে পুরা মন্ত্রিসভা গঠন করতে আগ্রহ প্রকাশ করতে লাগলেন” (৯/২৬২)। 

 “১০ই মে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে (ঢাকায়) এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় শেরে বাংলাও উপস্থিত ছিলেন এবং ঘােষণা করেন মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত করে আওয়ামী লীগকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে” (২১/২৮)। পরবর্তী প্রসঙ্গ-কথা বঙ্গবন্ধুর লেখা থেকে : “মওলানা সাহেব ও আমি টাঙ্গাইলে এক কর্মী সম্মেলনে বক্তৃতা করছিলাম। এই সময় টাঙ্গাইলের এসডিও জানালেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে ঢাকায় যেতে অনুরােধ করে রেডিওগ্রাম পাঠিয়েছেন। মওলানা সাহেব বললেন, ‘দরকার হলে তােমাকে মন্ত্রিসভায় যােগদান করতে হবে। তবে শহীদ সাহেবের সাথে পরামর্শ করে নিও বােধহয় হক সাহেবের দল কোনাে মুশকিলে পড়েছে, তাই ডাক পড়েছে” (৯/২৬২)। বঙ্গবন্ধু ঢাকা থেকে টেলিফোনে আলােচনা করলে 

  সােহরাওয়ার্দী সম্মতি দিয়েছিলেন। সেদিনই মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু, আতাউর রহমান খানসহ কয়েকজন নেতা এবং মাহবুব মাের্শেদ জিপে টাঙ্গাইল গিয়ে মওলানা ভাসানীরও সম্মতি নিয়েছিলেন। কিন্তু তখন শেরে বাংলা মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত (১৫ মে,  ৫৪ খ্রি.) করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। 

 পাকিস্তান সরকারের সহযােগিতায় তখন এগিয়ে এসেছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিলড্ৰেথ। “নির্বাচনের পরে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ 

 সরকারের পদত্যাগের যে জোর দাবি উঠেছিল, সে সম্পর্কে হিলড্রেথ প্রকাশ্য বিবৃতিতে বলেছিলেন যে, পূর্ব বঙ্গের নির্বাচন ছিল নেহাৎ একটা প্রাদেশিক ব্যাপার। এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের পদত্যাগের কোন প্রশ্নই ছিল না। ঐ নির্বাচনে পূর্ববঙ্গের জনগণ পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির বিরুদ্ধেও কোন রায় দেয় নাই । হিলড্রেথের ঐ বিবৃতি ছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদীদের নগ্ন হস্তক্ষেপ” (২০/১৩৫)। উল্লেখ্য যে, যুক্তফ্রন্ট সংসদীয় দলের প্রথম সভাতেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ইতােপূর্বে গঠিত গণপরিষদ থেকে পূর্ববঙ্গের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণকে পদত্যাগ করতে হবে। কিন্তু হক সাহেবকে করাচিতে পূর্ব বাংলার সদস্যরা যখন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “তারা পদত্যাগ করবেন কিনা, তিনি উত্তরে বলেছিলেন, তিনি নিজেই পদত্যাগ করেন নাই, আর তাদের করতে হবে কেন?” (৯/২৬১)। এতকাল পরেও মনে হয়, সেদিন গণপরিষদ সদস্যরা পদত্যাগ করলে, গণ-পরিষদের অবর্তমানে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের টিকে থাকা সম্ভব হতাে না এবং সরকারের ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডগুলি অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে পড়তাে। 

 “On 15 May, as the United Front Ministry was expended to include the Awami League and other Front members, pre-planned riots between Bengali and non-Bengali workers broke out at the Adamjee Jute Mills Bengalis who had voted for the Front suffered most of the casualties.” (১৭/৫৮)। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “আমরা যখন শপথ নিচ্ছি ঠিক সেই মুহূর্তে দাঙ্গা শুরু হওয়ার কারণ কি? বুঝতে বাকি রইল না, এ এক অশুভ লক্ষণ ! হক সাহেব আমাদের নিয়ে সােজা রওনা করলেন আদমজী জুট মিলে।  দাঙ্গা। তখন অল্প অল্প চলছিল। রাস্তায় বস্তিতে মরা মানুষের লাশ পড়ে আছে। অনেকগুলি লােক চিৎকার করছে, সাহায্য করার কেউই নাই। ইপিআর পাহারা দিতেছে, বাঙালি ও অবাঙালিদের আলাদা আলাদা করে দিয়েছে। কিছু সংখ্যক লােক পাওয়া গেল, তাদের সাহায্যে আহত লােকগুলিকে এক জায়গায় করে পানি দিতে শুরু করলাম। মােহন মিয়া ও আমি সকাল এগারটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় তিনশতের মত আহত লােককে হাসপাতালে পাঠাতে পেরেছিলাম। বিভিন্ন জায়গা থেকে বাঙালি জনসাধারণ জমা হচ্ছিল তাদের শান্ত করলাম। যদি তারা সঠিক 

  খবর পেত তাহা হলে আমার কথা শুনত কিনা সন্দেহ ছিল। পাঁচশতের উপর লাশ আমি স্বচক্ষে দেখলাম। আরও শ খানেক পুকুরের মধ্যে আছে, ” (৯/২৬৩-২৬৪)। 

 বঙ্গবন্ধু আরাে লিখেছেন, আদমজী মিল থেকে সােজা চিফ মিনিস্টারের বাড়িতে যেয়ে শুনতে পারলাম তিনি আমার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। আমি তার কাছে গেলে তিনি আমাকে খুব আদর করলেন। আমাকে বললেন, ক্যাবিনেট মিটিং এখনই শুরু হবে, তুমি যেও না । রাত সাড়ে দশটায় ক্যাবিনেট মিটিং বসল। এরপর আলােচনা শুরু হল সে কথা আমার পক্ষে বলা উচিত না, কারণ ক্যাবিনেট মিটিংয়ের খবর বাইরে বলা উচিত না। মিটিং শেষ হবার পর যখন বাইরে এলাম, তখন রাত প্রায় একটা। অনেক অবাঙালি নেতা দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন এখনই ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় বের হতে। খবর রটে গেছে যে বাঙালিদের (আদমজীতে) অবাঙালিরা হত্য করেছে। যেকোনাে সময় অবাঙালিদের ওপর আক্রমণ হতে পারে। কয়েকজনকে নিয়ে আমি বেড়িয়ে পড়লাম। রাস্তার মােড়ে মােড়ে ভিড় জমে আছে বক্তৃতা করে সকলকে বুঝাতে লাগলাম এবং অনেকটা শান্ত করতে সক্ষম হলাম। এই দাঙ্গা যে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এবং দুনিয়াকে নতুন সরকারের অক্ষমতা দেখাবার জন্য বিরাট এক ষড়যন্ত্রের অংশ সে সম্বন্ধে আমার মনে কোনাে সন্দেহ নাই। কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার মােহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে ও পশ্চিমা শিল্পপতিদের যােগসাজশে যুক্তফ্রন্টকে ভাঙতে চেষ্টা করছিল, আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভায় যােগদান করায় তা সফল হল না। এ সুযােগ (কেন্দ্রীয় সরকার) সৃষ্টি করতে পারত না, যদি প্রথম দিনই যুক্তফ্রন্ট পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠন করে শাসন ব্যবস্থাকে কন্ট্রোল করতে চেষ্টা করত” (৯/২৬৫-২৬৬)। 

 আদমজী-দাঙ্গার দু’সপ্তাহ পরে এবং ‘পাক-মার্কিন অস্ত্র চুক্তি স্বাক্ষরের দশ দিনের মাথায় “১৯৫৪ সালের ২৯শে মে তারিখে পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল (গােলাম মােহম্মদ) যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করেন। প্রদেশে জারি হয় ৯২-ক’ ধারা। সাম্রাজ্যবাদের দালাল ইসকান্দর মীর্জা বাংলাদেশের গভর্নর নিযুক্ত হন। বাংলাদেশে পদার্পণ করেই তিনি নেতাদের গুলি করে হত্যা করার সংকল্প প্রকাশ করেন এবং বলেন যে, যেখানে পারাে ভাগাে,  Go while going is good’। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সন্তুষ্ট করার জন্যই যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করা হয়েছিল। গ্রেপ্তার করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের অসংখ্য কর্মী ও নেতাকে। বিরানব্বই-ক ধারা প্রবর্তনের পর কিছুদিন বাংলার রাজনীতি স্তব্ধ হয়ে যায়। বাঙালিকে সন্তুষ্ট করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত বগুড়ার মােহাম্মদ আলীকে” তড়িঘড়ি ফিরিয়ে এনে প্রধানমন্ত্রী বানানাে হয়। 

  প্রধানমন্ত্রী হয়েই তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ইংরেজি ভাষায় দেয়া বক্তৃতায় বলেছিলেন, “Fazlul Huq is a traitor” এই দম্ভপূর্ণ উক্তি শুনে যতটা না বিস্মিত হয়েছিলাম, তার চেয়ে বেশি হয়েছিলাম ক্ষুব্ধ। ফজলুল হক বয়সে তাঁর পিতৃতুল্য। দু’জনের বিদ্যাবুদ্ধির কোনাে তুলনা হয় না। সেই লােকের এই দম্ভ” (৮/২৭৪-২৭৬)। 

 পাকিস্তানের সেনা-আমলা-রাজনীতিক ষড়যন্ত্রকারীদের দিক থেকে চন্দ্রঘােনা এবং আদমজীতে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা ঘটানাের প্রয়ােজনও ছিল। তারা জানতাে, আওয়ামী লীগসহ যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতায় রেখে অনেক চক্রান্তই বাস্তবায়িত করা যাবে না। ১৯মে তারিখে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হককে করাচিতে ডেকে পাঠালাে কেন্দ্রীয় সরকার। একই দিনে করাচিতে স্বাক্ষরিত হলাে ‘পাক-ইউএস আর্মস্ প্যাক্ট’ (পাক-মার্কিন অস্ত্র চুক্তি)। অতঃপর ২৩শে মে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় পাকিস্তান থেকে প্রেরিত জন. পি. কালাহান নামক এক সাংবাদিকের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলা হয় যে, ফজলুল হক, তার প্রদেশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করছেন। শেরে বাংলা অবশ্য ঐ রিপাের্টটিকে ‘Perversion of truth   সত্যের বিকৃতি  বলে ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু কালাহানের রিপাের্টটিরই প্রয়ােজন ছিল পাকিস্তানি চক্রান্তকারীদের, এটার সত্য-মিথ্যা বিচারের প্রয়ােজন ছিল না। “পূর্ব-বাংলার প্রধানমন্ত্রীর আনুগত্য যাচাই করা হইল একজন বিদেশী রিপাের্টারের উক্তির দ্বারা। হক সাহেব ও তাঁর সহকর্মী মন্ত্রীরা করাচি হইতে ঢাকায় ফিরিবার আগেই খুব বিশ্রী ও অভদ্রভাবে ৯২-ক ধারা (গভর্নরের শাসনসহ) জারি করা হইয়াছিল। অন্যতম মন্ত্রী আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি শেখ মুজিবুর রহমানকে সরকারী মন্ত্রী-ভবন হইতে গেরেফতার করা হইল। আমাদের বাড়ি হইতে সরকারি গাড়ি, টেলিফোন, পিয়ন চাপরাশী গার্ড সবই তুলিয়া নেওয়া হইল। পরদিন যুক্তফ্রন্ট পার্টির এক সভা ডাকা হইল। একজন অফিসার আসিয়া আমাদিগকে জানাইলেন : যুক্তফ্রন্ট আফিস তালাবদ্ধ করা হইয়াছে। এখানে কোনও সভা করিতে দেওয়া হইবে না”(৪/৩৩৬-৩৩৮)। 

 ১৯ মে, ১৯৫৪ খ্রি. মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক কেন্দ্রীয় সরকারের ডাকে করাচি যাবার সময় শেখ মুজিবসহ বেশ ক জন মন্ত্রীকেও সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “মােহম্মদ আলী বেয়াদবের মত হক সাহেবের সাথে কথা বলতে আরম্ভ করলেন। আমার সহ্যের সীমা অতিক্রম করছিল। এমন সময় মুহম্মদ আলী আমাকে বললেন, কি মুজিবর রহমান, তােমার বিরুদ্ধে বিরাট ফাইল আছে আমার কাছে। এই কথা বলে, ইয়াংকিদের মত ভাব করে পিছন থেকে ফাইল এনে টেবিলে রাখলেন। আমি বললাম, ফাইল তাে থাকবেই, আপনাদের বদৌলতে আমাকে তাে অনেক জেল খাটতে হয়েছে। আপনার বিরুদ্ধেও একটা ফাইল প্রাদেশিক সরকারের কাছে আছে। তিনি বললেন, ‘এর অর্থ’। আমি বললাম,  যখন খাজা নাজিমুদ্দিন 

  সাহেব ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী হয়ে আপনাকে মন্ত্রী করেন নাই। আমরা যখন ১৯৪৮সালে প্রথম ভাষা আন্দোলন করি, তখন আপনি গােপনে দুইশত টাকা চান্দা দিয়েছিলেন, মনে আছে আপনার? পুরানা কথা অনেকেই ভুলে যায়’। হক সাহেবের সাথে যে সে বেয়াদবের মত কথা বলেছিল, সে সম্বন্ধেও দু এক কথা শুনিয়ে দিয়েছিলাম”(৯/২৬৭-২৬৮)। 

 মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক করাচিতে ২৮ মে, ১৯৫৪, প্রাদেশিক মন্ত্রীদেরকে নিয়ে গভর্নর জেনারেল গােলাম মােহম্মদের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। গভর্নর জেনারেল “যে কামরায় শুয়ে দেশ শাসন করতেন, আমাদের নিয়ে যাওয়া হল। তিনি খুবই অসুস্থ,হাত-পা সকল সময়ই কাঁপে। তিনি হক সাহেবের সাথে আলাপ করলেন। আমার নাম ধরে জিজ্ঞাসা করলেন, উপস্থিত আছি কিনা !  আমি আদাব করলাম। তিনি আমাকে কাছে নিয়ে বসালেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, ‘লােকে বলে, আপনি কমিউনিস্ট, এ কথা সত্য কি না? আমি তাকে বললাম, “যদি শহীদ সাহেব কমিউনিস্ট হন, তাহলে আমিও কমিউনিস্ট । তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন, আপনি এখনও যুবক, দেশের কাজ করতে পারবেন। আমি আপনাকে দোয়া করছি। আপনাকে দেখে আমি খুশি হলাম। তিনি পরিষ্কার বলতে পারেন না। আল্লাহ সমস্ত বুদ্ধি আর মাথাটা ঠিক রেখে দিয়েছেন” (৯/২৬৮-২৬৯)। 

 গােলাম মােহম্মদের ষড়যন্ত্র আগেই শুরু হয়েছিল। করাচিতে পরের দিনই শেখ মুজিব এবং আতাউর রহমান জেনেছিলেন, মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে পূর্ব বাংলায় জরুরি আইনে গভর্নর শাসন জারি করা হবে। পূর্ব বাংলার বাঙালি আইজি দোহাও তখন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গী হিসেবে করাচিতেই ছিলেন। শেখ মুজিবের পর্যবেক্ষণ, আইজি দোহা কেন্দ্রীয় ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত ছিলেন। 

  পূর্ব বাংলার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বরখাস্ত : 

 ‘৯২-ক ধারা  জারি, যুক্তফ্রন্টে ভাঙ্গন 

  ২৯মে, ১৯৫৪ তারিখে রাতে করাচি থেকে দিল্লি-কলকাতা হয়ে ৩০ তারিখ দুপুরে হক সাহেব ঢাকায় ফিরলেন আর সেদিনই বিকাল চারটায় যুক্তফ্রন্ট সরকারকে উচ্ছেদ করে পূর্ব বাংলায় জারি করা হলাে (৯২-ক ধারা) গভর্নরের শাসন। কেন্দ্রীয় ডিফেন্স সেক্রেটারি ইস্কান্দর মির্জা জরুরি ক্ষমতার অধিকারী নতুন গভর্নর এবং এন. এম খান চিফ সেক্রেটারি হিসেবে, হক-মুজিবের আগেই মিলিটারি বিমানে ঢাকায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। “Mirza lost no time ..Under Public Safety Act, which allowed preventive detention and arrest of people without trial, more than 1600 people were rounded up within the first twenty four hours. Most of them belonged to the Awami Muslim League  Among those arrested were Mujib and forty other legislators. Fazlul Huq was interned in his home. Section 144 .was imposed throughout the province. Pro-Awami League Ittefaq was subjected to pre-censorship” (১৭/৬০)। 

 করাচি থেকে বিমানে ঢাকায় ফেরার সময়ের একটি কৌতুহলােদ্দীপক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু, “কলকাতা পৌঁছাবার কিছু সময় পূর্বে জনাব দোহা (আই.জি) হক সাহেবকে যেয়ে বললেন, স্যার আমার মনে হয় আপনার আজ কলকাতা থাকা উচিত। কি হয় বলা যায় না,..রাতেই ইস্কান্দর মির্জা এবং এন. এম. খান ঢাকায় মিলিটারি প্লেনে রওয়ানা হয়ে গেছেন। যদি কোনাে কিছু না হয়, তবে আগামী কাল প্লেন পাঠিয়ে আপনাদের নেওয়ার বন্দোবস্ত করব । আমার কাছে দোহা সাহেব এসে ঐ একই কথা বললেন। আমি বলে দিলাম, কেন কলকাতায় নামব? কলকাতা আজ আলাদা দেশ। যা হয় ঢাকায়ই হবে । নান্না মিয়াও একই জবাব দিলেন। আমার বুঝতে বাকি থাকল না পাকিস্তানি শাসকচক্র দুনিয়াকে দেখাতে চায়, হক সাহেব দুই বাংলাকে এক করতে চান, তিনি পাকিস্তানের দুশমন, 

  রাষ্ট্রদ্রোহী। আর আমরা তাঁর এই রাষ্ট্রদ্রোহী কাজের সাথী। কলকাতা এয়ারপাের্টে আবার দোহা সাহেব এসে বললেন, ‘টেলিফোন করে খবর পেলাম, সমস্ত ঢাকা এয়ারপাের্ট মিলিটারি ঘিরে রেখেছে। চিন্তা করে দেখেন, কি করবেন?  বললাম, আমাদের তাতে কি, আমরা ঢাকায়ই যাব। ভাবলাম, দোহা। সাহেব পুলিশে চাকরি করেন, তাই নিজেকে খুব বুদ্ধিমান মনে করেন। আমরা রাজনীতি করি, তাই এই সামান্য চালাকিটাও বুঝতে পারি না! ঢাকায় এসে দেখলাম, বিরাট জনতা আমাদের অভ্যর্থনা করার জন্য অপেক্ষা করছে” (৯/২৬৯২৭০)। 

 আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, আবু হােসেন সরকারের সরকারি বাড়িতে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রীবর্গ এবং প্রায় দেড় শত এমএলএ র এক ‘ইনফরমাল’ সভায় (৬জুন, ১৯৬৫৪ খ্রি.)“কেন্দ্রীয় সরকারের এই অনিয়মতান্ত্রিক ৯২-ক ধারা প্রবর্তনের নিন্দা করিয়া, পার্টি লিডারকে নজরবন্দি ও অন্যতম মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে গেরেফতার করার তীব্র প্রতিবাদ করিয়া সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হইল। অতঃপর সমবেতভাবে কারাবরণ করার কর্ম-পন্থায় অধিকাংশের সমর্থন দেখা গেল। এখানেও পুলিশের হামলা হইল। আমরা বেশ কয়েকজন তখন হক সাহেবের সঙ্গে দেখা করিয়া সমস্ত অবস্থা ও আমাদের সিদ্ধান্তের কথা জানাইলাম এবং আইন অমান্যে আমাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করিতে অনুরােধ করিলাম। হক সাহেব আমাদিগকে এলাকায় গিয়া জনগণকে বিপ্লবী বেআইনি ধবংসাত্মক কাজে নিয়ােগ করিবার .পরামর্শ দিলেন।..বুঝিয়া আসিলাম শেরে বাংলা বেশ একটু ভয় পাইয়াছেন। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে একটা আপস করিবার জন্য চেষ্টা তলেতলে করিতেছেন। হক সাহেব ও যুক্তফ্রন্টের এই দুর্বলতার পূর্ণ সুযােগ কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ করিলেন (৪/৩৩৮-৩৪০)। 

 আরাে কিছু ঐতিহাসিক তথ্য, বঙ্গবন্ধুর লেখা থেকে : ৩০মে তারিখে ঢাকায় পৌঁছানাের কিছু পরেই “আমি তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে আতাউর রহমানের বাড়িতে এসে তাঁকে নিয়ে হক সাহেবের বাড়িতে গেলাম এবং তাঁকে অনুরােধ করলাম ক্যাবিনেট মিটিং ডাকতে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই অন্যায় আদেশ আমাদের মানা উচিত হবে না। তিনি বললেন, কি হবে বুঝতে পারছি না, অন্যদের সাথে পরামর্শ কর। মনে হল সকলেই ভয় পেয়ে গেছেন। আতাউর রহমান সাহেব রাজি ছিলেন, যদি সকলে একমত হতে পারতাম। মন্ত্রীদের পাওয়া গেল না, হক সাহেব দোতলায় বসে রইলেন। আওয়ামী লীগ অফিসে যেয়ে দরকারি কাগজপত্র সরিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথে অন্য পথ দিয়ে পুলিশ অফিসে এসে পাহারা দিতে আরম্ভ করল। বাড়িতে ফোন করে জানলাম সেখানেও গিয়েছিল। বিদায় (নান্না মিয়ার বাড়ি থেকে) নেওয়ার সময় অনেককে বললাম, আপনারা এই অন্যায় আদেশ মাথা 

  পেতে নেবেন না। দেশবাসী প্রস্তুত আছে, শুধু নেতৃত্ব দিতে হবে আপনাদের। জেলে অনেকের যেতে হবে, তবে প্রতিবাদ করে জেল খাটা উচিত” (৯/২৭০২৭১)। 

 “পূর্ব বাংলায় গভর্নর শাসন জারি করার দিন প্রধানমন্ত্রী জনাব মােহাম্মদ আলী (বগুড়া) যে বক্তৃতা রেডিও মারফত করেন, তাতে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেবকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ এবং আমাকে ‘দাঙ্গাকারী’ বলে আক্রমণ করেন। আমাদের নেতারা যারা বাইরে রইলেন, তাঁরা এর প্রতিবাদ করারও দরকার মনে করলেন না। দেশবাসী ৬ই জুনের (যুক্তফ্রন্ট পার্লামেন্টারি পার্টির সভা) দিকে চেয়েছিল, যদি নেতারা সাহস করে প্রােগ্রাম দিত তবে দেশবাসী তা পালন করত। অনেক কর্মীই চেষ্টা করে গ্রেফতার হয়েছিল। যদি সেইদিন নেতারা জনগণকে আহ্বান করত তবে এতবড় আন্দোলন হত যে কোনদিন আর ষড়যন্ত্রকারীরা সাহস করত না বাংলাদেশের উপর অত্যাচার করতে। একমাত্র আতাউর রহমান খান কয়েকদিন পরে একটা বিবৃতি দিয়েছিলেন। দেড় ডজন মন্ত্রীর মধ্যে আমিই একমাত্র কারাগারে বন্দি। যদি ৬ই জুন সরকারের অন্যায় হুকুম অমান্য করে (হক সাহেব ছাড়া) অন্য মন্ত্রীরা গ্রেফতার হতেন তা হলেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন শুরু হয়ে যেত। দুঃখের বিষয়, একটা লােকও প্রতিবাদ করল না। ষড়যন্ত্রকারীরা বুঝতে পারল যে, যতই হৈচৈ বাঙালিরা করুক যতই জনসমর্থন থাকুক এদের দাবিয়ে রাখতে কষ্ট হবে না। পুলিশের বন্দুক ও লাঠি দেখলে এরা পালিয়ে গর্তে লুকাবে” (৯/২৭৩)। 

 পাকিস্তানের প্রাসাদ চক্রান্তের তখন প্রধান কৃৎ-কুশলীরা ছিলেন গভর্নর জেনারেল গােলাম মােহম্মদ, প্রধানমন্ত্রী মােহম্মদ আলী বগুড়া, চৌধুরী মােহম্মদ আলী, সেনাপ্রধান আয়ুব খান এবং পূর্ব-বাংলার গভর্নর ইস্কান্দর মির্জা প্রমুখ। তারা রাজনীতির ক্ষেত্রে সরাসরি মিথ্যা বলেছেন, কথা দিয়ে কথা রাখেননি, আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে। বরখেলাফ করেছেন, এমনকি কোরান-ছুঁয়ে শপথ করেও প্রয়ােজনমত ভুলে গেছেন। গণ-পরিষদ বাতিল করে দেয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে গণপরিষদের প্রেসিডেন্ট তমিজুদ্দিন খান এবিষয়ে গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করে লাহাের ‘চিফ কোর্ট’এ একটি আপিল-মামলা করেছিলেন। ষড়যন্ত্রকারীদের ভয় ছিল, আপিলের রায় সরকারের বিপক্ষে গেলে, স্থগিদ’ আইন পরিষদ পুনর্বহাল হবে এবং আবার যুক্তফ্রন্ট তথা আওয়ামী লীগেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রসঙ্গতই বলা দরকার যে, তদানীন্তন বাঙালি রাজনীতির তিন-প্রধান হক-ভাসানী-সােহরাওয়ার্দী বিভিন্ন সময়ে, কখনাে ষড়যন্ত্রী পাওয়ার-ক্লিক’ দ্বারা চরম অপমানিত হয়েছেন, আবার কখনাে তাদের ষড়যন্ত্রের জালে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় জড়িয়ে পড়েছেন। বঙ্গবন্ধু মুজিবের দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্য-বলিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক একাকীতু  উপলব্ধি 

  করার জন্যই ১৯৫৪ পরবর্তী ষড়যন্ত্রমূলক পাক-রাজনীতির বস্তুনিষ্ঠ আলােচনা করা দরকার, সংক্ষেপে হলেও। 

 ১৯৫৪ সালের ৩০ মে সন্ধ্যায় পূর্ব বাংলার মন্ত্রী শেখ মুজিবকে ঢাকায় তাঁর সরকারি বাসা থেকে গ্রেফতার করে দাঙ্গা বাঁধানাে, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি বেশ কয়েকটি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু ধারাগুলি খুব যুৎসই বা মজবুত নয় এবং আদলত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে যেতে পারেন, এমন আশঙ্কায়, দু’তিন দিন পরেই তাঁকে নিরাপত্তা বন্দী’ ঘােষণা করা হয়। তখন নিরাপত্তা আইনে, যেকোনাে ব্যক্তিকে বিনা বিচারে অনির্দিষ্টকাল বন্দি করে রাখার ‘আইনগত সুযােগ ছিল। এ-যাত্রায় মুজিব বন্দি ছিলেন ১৯৫৪ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিক পর্যন্ত। মুজিবের বন্দিত্বকালেই ‘মুক্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ’   বিশেষত, হক সাহেব এবং সােহরাওয়ার্দী প্রমুখ এমন কিছু কাজ করেছিলেন, যাতে মুজিবের পক্ষে হতাশ এবং ক্ষুব্ধ হওয়া ছাড়া কিছুই করার ছিল না। 

 “Fearful of being charged of treason unless he apologized, Fazlul Huq issued a statement on 30 May ending with these lines :  I sincerely regret having made utterances which reflected on my loyality to Pakistan. On account of my old age, I am retiring from public life” (39/40) দেখা যাচ্ছে, পূর্ব বাংলায় গভর্নরের শাসন জারি করে হক সাহেবকে গৃহবন্দি করার দিনই তিনি অমন ‘মুচলেকা দিয়েছিলেন এবং রাজনৈতিক সহকর্মীদের সাথে আলােচনাও করেননি। আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ হক সাহেবের সাথে প্রতিবাদ সংগঠনের জন্য আলােচনা করতে গেলেও তিনি তাঁর আবেদনের কথা গােপন রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “গৃহবন্দী হক সাহেবকে দিয়ে তাঁর সমর্থকেরা এক বিবৃতি দিয়েছিলেন। তাতে তিনি অন্যায় স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করলেন। তিনি যুক্তফ্রন্টের নেতা, তার এই কথায় আমাদের সকলের মাথা নত হয়ে পড়ল। তিনি বৃদ্ধ হয়ে গেছেন, তাঁর মনে দুর্বলতা আসতে পারে। যারা বাইরে ছিলেন তাঁরা কি করলেন! স্থির করলাম এই কৃষক শ্রমিক দলের সাথে আর রাজনীতি করা যায় না। খবর পেতে লাগলাম যে, কৃষক শ্রমিক দলের কয়েকজন নামকরা নেতা। গােপনে মােহাম্মদ আলীর (পাক প্রধানমন্ত্রী) সাথে আলােচনা চালিয়েছেন কিভাবে আবার মন্ত্রিত্ব পেতে পারেন। দরকার হলে আওয়ামী লীগের সাথে কোনাে সম্পর্ক তাঁরা রাখবেন না”(৯/২৭৭-২৭৮)। 

 অচল-অসুস্থ অবস্থাতেও গভর্নর জেনারেল গােলাম মােহম্মদের ষড়যন্ত্র-পরিকল্পনা অব্যাহত ছিল। তিনি ভাবলেন, ফজলুল হক রাজনীতি থেকে বিদায় নিলে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ প্রবল হয়ে উঠবে, পাকিস্তানের শক্তি-কাঠামাে তাতে অধিকতর হুমকিতে পড়তে পারে। সুতরাং ফজলুল হকের মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় 

  একটা অবস্থান-সমর্থনের ভিত্তি রাখা দরকার, সেই সাথে দরকার আওয়ামী লীগকে যুক্তফ্রন্ট থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফজলুল হকের মাধ্যমেই সােহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা। গােলাম মােহম্মদেরা এটাও জানতেন যে, শেরে বাংলার সবটুকু রাজনৈতিক শক্তিই পূর্ব বাংলায় আর সােহরাওয়ার্দী হচ্ছেন একমাত্র রাজনীতিবিদ, যিনি পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তানে প্রায় সমভাবেই প্রভাবশালী। সুতরাং কাউকেই হারানাে চলবে না। তাই, পূর্ব বাংলার রাজনীতির বিভেদ-ষড়যন্ত্রের | খেলায় যখন যাকে প্রয়ােজন কাজে লাগাবার পরিকল্পনাগুলি গােলাম মােহম্মদ যথেষ্ট ভেবেচিন্তেই শুরু করেছিলেন। 

 ‘ভারত শাসন আইন,১৯৩৫  তখনাে পাকিস্তানের শাসন-ভিত্তি। তাতেই উল্লেখ ছিল, ‘গভর্নর জেনারেল প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য পরিচালনা করবেন। সেই ‘সাংবিধানিক আতঙ্ক’ দূর করতেই ২৪ অক্টোবর, ১৯৫৪ গভর্নর জেনারেল সারা পাকিস্তানে জরুরি অবস্থা জারি করে গণ-পরিষদ ভেঙ্গে দিলেন। অতঃপর যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রধানমন্ত্রী মােহাম্মদ আলী বগুড়া এবং সেনাপ্রধান আয়ুব খানকে দ্রুত করাচিতে ফিরিয়ে এনে নতুন ছক সাজিয়ে ‘Ministry of Talents - ‘প্রতিভাধরদের মন্ত্রিসভা গঠন করে বলা হলাে, দল-পরিচয় নয়, মন্ত্রীদের দক্ষতা-প্রতিভাই বিবেচ্য বিষয়। গভর্নর জেনারেল অতঃপর চৌধুরী মুহম্মদ আলীকে অপসারণ করে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসালেন মােহম্মদ আলী বগুড়াকে, দেশরক্ষা মন্ত্রী জেনারেল আয়ুব খান, পূর্ব বাংলার গভর্নরের পদ ছেড়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন ইস্কান্দর মির্জা। গােলাম মােহম্মদের অনুরােধে’ জুরিখে চিকিৎসা গ্রহণ শেষে দেশে ফিরে, সাংবিধানিক সংকট মােকাবিলার দায়িত্ব নিয়ে ২১ ডিসেম্বর, ১৯৫৪ আইনমন্ত্রী হলেন সােহরাওয়ার্দী। 

 গােলাম মােহম্মদ এবং জুরিখে চিকিৎসাধীন সােহরাওয়ার্দীর মধ্যে সমঝােতার দূত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম ভাইস প্রেসিডেন্ট আতাউর রহমান খান। অপরদিকে মন্ত্রিসভা গঠনের আগেই মােহম্মদ আলী নভেম্বর মাসে ঢাকা সফরে এসে শেরে বাংলার সাথে আপােষ রফা করে রেখেছিলেন। মােহম্মদ আলী এবং ফজলুল হকের সমঝােতার শর্ত ছিল, “Huq would be rehabilitated politically provided he co-operated with the power structure in West Pakistan and their Bengali henchman Mohammad Ali Bogra. In fact, Bogra had secretly made a deal with Fazlul Huq to make his nominee Chief Minister of East Bengal in exchange for Huq s promise to challenge Suhrawardy s credentials to represent the people of East Bengal” (১৭/৬২)। 

 বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, কারাবন্দি অবস্থায় “খবরের কাগজে দেখলাম, করাচিতে 

  আতাউর রহমান সাহেব গােলাম মােহম্মদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আতাউর রহমান সাহেব জুরিখ থেকে ফিরে আসলেন। এমএলএ’রা ও কর্মীরা জেলে। আওয়ামী লীগের সভাপতি (মওলানা ভাসানী) বিলাতে, জেনারেল সেক্রেটারি কারাগারে বন্দি। অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরােয়ানা ঝুলছে। এই অবস্থায় কি করে গােলাম মােহম্মদকে রাজকীয় সংবর্ধনা দেবার বন্দোবস্ত করার জন্য একটা ফুলের মালা নিয়ে আতাউর রহমান সাহেব, আরেকটা মালা নিয়ে হক সাহেব তেজগা এয়ারপাের্টে দাঁড়িয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত গােলাম মােহম্মদ সাহেবের গলায় দুইজনই মালা দিলেন। আওয়ামী লীগ একটা সংগ্রামী প্রতিষ্ঠান সেই প্রতিষ্ঠানের নেতারা কি করে এই অগণতান্ত্রিক ভদ্রলােককে অভ্যর্থনা করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আমি ও আমার সহবন্দিরা খুবই মর্মপীড়ায় ভুগছিলাম। শহীদ সাহেব ভুল করলেন, লাহাের ও ঢাকায় না যেয়ে, দেশের অবস্থা না বুঝে মন্ত্রিত্বে যােগদান করে। ঢাকায় এসে যদি যুক্তফ্রন্ট পার্টির সভা ডাকতেন এবং সদস্যদের সাথে পরামর্শ করে কিছু করতেন তাহলে কারও কিছু বলার থাকত না। আমি নিজে কিছুতেই তার আইনমন্ত্রী হওয়া সমর্থন করতে পারলাম না” (৯/ ২৮১-২৮৩)। 

 এস. এ. করিম জানিয়েছেন, জুরিখ থেকে করাচি ফেরার পর, “Following faceto-face talks with Ghulam Mohammed, Suhrawardy accepted the offer only after Ghulam Mohammed swore on the Holy Koran that promises made to him would be kept. Still Suhrawardy wanted to go to Dhaka for consultations with his colleagues before joining the Cabinet. Ghulam Mohammed requested him not to do so because it could complicate matters” (১৭/৬২)। ২১ ডিসেম্বর সােহরাওয়ার্দী আইনমন্ত্রী হিসেবে ‘মিনিস্ট্রি অব ট্যালেন্ট’এ যােগ দিয়েছিলেন। অর্থাৎ গােলাম মােহম্মদের কথা মেনেই সােহরাওয়ার্দী যুক্তফ্রন্টের প্রাতিষ্ঠানিক প্রধান হিসেবে ঢাকায় এসে দলীয় এবং ফ্রন্টভুক্ত নেতৃবৃন্দের সাথে আলােচনার দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়েছিলেন। 

 ১৯৫৪’র ২৪ডিসেম্বর (মতান্তরে ২৫) কারামুক্তি পেয়ে মুজিব সােহরাওয়ার্দীর সাথে। সাক্ষাৎ-আলােচনার জন্য ১ বা ২ জানুয়ারি করাচি পৌঁছেছিলেন। এবার করাচিতে মুজিব-সােহরাওয়ার্দী সাক্ষাৎকার খুব প্রীতিকর হয়নি। করাচিতে পৌঁছানাের রাতে তিনি নেতার সাথে সাক্ষাৎ করতে যাননি, মুজিবের দুশ্চিন্তা ছিল: “দেখা হলে কি। অবস্থা হয়, বলা যায় না ! আমি তার সাথে বেয়াদবি করে বসতে পারি”। পরের দিন সকালে শহীদ সাহেব “আমাকে দেখে বললেন, “গত রাতে এসেছ শুনলাম, রাতেই দেখা করা উচিত ছিল। আমি বললাম, ক্লান্ত ছিলাম, আর এসেই বা কি করব, আপনি তাে এখন মােহম্মদ আলী সাহেবের আইনমন্ত্রী। তিনি বললেন, ‘রাগ করেছ, বােধ হয়। বললাম, “রাগ করব কেন স্যার, ভাবছি সারা জীবন আপনাকে 

  নেতা মেনে ভুলই করেছি কি না?  তিনি বললেন,  বুঝেছি, আর বলতে হবে না, কাল,এস, অনেক কথা আছে” (৯/২৮৬)। 

 পরের দিন সােহরাওয়ার্দী মন্ত্রিত্ব গ্রহণের ইতিবৃত্ত শােনালেন ‘প্রিয়-শিষ্য’ মুজিবকে। কিন্তু মুজিব বললেন, “পূর্ব বাংলায় যেয়ে সকলের সাথে পরামর্শ করে অন্য কাউকেও তাে মন্ত্রিত্ব দিতে পারতেন। আমার মনে হয় আপনাকে ট্র্যাপ করেছে। ফল খুব ভাল হবে না, যে জনপ্রিয়তা আপনি অর্জন করেছিলেন, তা শেষ করতে চলেছেন। তিনি আমাকে বােঝাতে চেষ্টা করলেন  ‘কিছু না করতে পারলে ছেড়ে দেব,, তাতে কি আসে যায় ! আমি বললাম, এই ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে আপনার যােগদান করা উচিত হয় নাই, আপনি বুঝতে পারবেন। তিনি আমাকে পূর্ব বাংলায় কখন যাবেন তার প্রােগ্রাম করতে বললেন। আমি বললাম, ভাসানী সাহেব দেশে না এলে এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি না দিয়ে আপনার ঢাকায় যাওয়া উচিত হবে না। তিনি রাগ করে বললেন, তার অর্থ তুমি আমাকে পূর্ব বাংলায় যেতে নিষেধ করছ । আমি বললাম, কিছুটা তাই। আমি থাকতে থাকতে দেখলাম, আবু হােসেন সরকার সাহেবকে হক সাহেবের নমিনি হিসেবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বে (স্বাস্থ্যমন্ত্রী, ৪ জানু, ১৯৫৫) গ্রহণ করা হয়েছে। শহীদ সাহেব কিছুই জানেন না। এবার তিনি কিছুটা বুঝতে পারলেন যে খেলা শুরু হয়েছে” (প্রাগুক্ত)। 

 আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, “১৯৫৪সালের ১১ই ডিসেম্বর সুহরাওয়ার্দী সাহেব বাড়ি ফিরিয়া আসিলেন। তিনি ইতিপূর্বেই করাচিতে ঐ তারিখে কেন্দ্রীয় আওয়ামী 

 লীগের একটি বৈঠক আহ্বান করিয়াছিলেন। যথাসময়ে আওয়ামী লীগের বর্ধিত ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক বসিল। শহীদ সাহেব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করিয়া মূল্যবান বক্তৃতা করিলেন। তিনি মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিবেন কিনা, সে সম্বন্ধে মেম্বরদের পরামর্শ জিজ্ঞাসা করিলেন। উভয় পাকিস্তান হইতে যাঁরা বক্তৃতা করিলেন, তাঁদের প্রায় সকলেই বলিলেন, শহীদ সাহেব একমাত্র প্রধানমন্ত্রী রূপেই মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিবেন, অন্যথায় নয়। তাছাড়া এ কথাও কেউ কেউ বলিলেন যে, মৌঃ তমিয়ুদ্দিন সাহেবের রিট দরখাস্ত তখনও সিন্ধুর চিফ কোর্টে বিচারাধীন রহিয়াছে। কাজেই অনিশ্চিত পরিবেশে শহীদ সাহেবে প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হইবে না। এইভাবে শহীদ সাহেব আওয়ামী নেতাদের মতামত জ্ঞাত হইয়া গভর্নর জেনারেলের সাথে দেখা করিতে গেলেন” (৪/৩৪৪-৩৪৫)। 

 পরের দিন সােহরাওয়ার্দী জানালেন: “বড়লাটের মতে শহীদ সাহেবকে সাধারণ মন্ত্রী হিসেবেই মােহম্মদ আলী-কেবিনেটে ঢুকিতে হইবে। তারপর অল্পদিন মধ্যেই শহীদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী করিয়া মন্ত্রিসভা পুনর্গঠিত হইবে। শহীদ সাহেব আমাদিগকে বুঝাইতে চাহিলেন যে, প্রধানমন্ত্রীত্বটা বড় কথা নয়, বড় কথা শাসনতন্ত্র রচনা। কিন্তু মেম্বররা শহীদ সাহেবের সহিত একমত হইলেন না। তখন 

  তিনি প্রস্তাব দিলেন যে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের.৪জন করিয়া নেতৃস্থানীয় আওয়ামী-নেতা লইয়া তিনি গােপন পরামর্শ করিবেন। আমরা তাতেই রাজিীহইলাম” (৪/৩৪৫-৩৪৬)। বৈঠকটি একটানা বেশ কয়েকদিন চলেছিল এবং সেটি অসমাপ্ত রেখেই আবুল মনসুর আহমদকে ময়মনসিংহে ফিরতে হয়েছিল। তখন সােহরাওয়ার্দীর নির্দেশে তিনি নিজস্ব ৮-দফা মতামত লিখে দিয়েছিলেন, ৪নং ক্রমিকে ছিল, “যুক্তফ্রন্টের একুশ দফার নির্বাচনী ওয়াদার ১৯নং দফা অনুসারে ৩ বিষয়ের কেন্দ্রীয় সরকারের বিধান শাসনতন্ত্রে লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে বড়লাট ও মন্ত্রিসভার সঙ্গে এখনই বােঝাপড়া করিতে হইবে”। আর ৮নং ছিল, “মন্ত্রিসভায় প্রবেশের আগেই শহীদ সাহেবকে একবার পূর্ব-বাংলা সফর করিতে এবং যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সাথে আলােচনা করিতে হইবে”(৪/৩৪৭)। কিন্তু সােহরাওয়ার্দী কেনাে পরামর্শই মানেননি। ততােধিক বিস্ময়কর ছিল, মন্ত্রিসভায় সােহরাওয়ার্দীর প্রবেশের পর শেখ মুজিব যখন করাচিতে দেখা করে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন, তখন সােহরাওয়ার্দী এসব কথা মুজিবকে জানাননি। 

 আগেই বলা হয়েছে, সােহরাওয়ার্দীকে না জানিয়েই আবু হােসেন সরকারকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় নেয়া হয়েছিল। “Mujib, however, was so angry at this deliberate insult of his leader that he left Karachi on 5 January .On arrival in Dhaka, Mujib accused Fazlul Huq of challenging the leadership of Suhrawardy. He proposed to the Awami Leaguers that Fazlul Huq should be removed from his position of leader of the Parliamentary Party of the United Front” (১৭/৬৩)। শেখ মুজিব করাচিতেই জেনেছিলেন, হক সাহেব নিজেই এক সাংবাদিকের কাছে বলেছেন, তিনিই যুক্তফ্রন্টের নেতা, সােহরাওয়ার্দী যুক্তফ্রন্টের কেউ নন। অথচ এ কথা কারােই অজানা ছিল না যে, যুক্তফ্রন্টে আওয়ামী লীগই ছিল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ, অন্য সকলে মিলেও তার সমান নয়। 

 শেখ মুজিব করাচিতেই আরাে জেনেছিলেন যে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের। নিকট থেকে “কৃষক-শ্রমিক দলের নেতারা কথা পেয়েছেন, পূর্ব বাংলায় সরকার তাদেরই দেওয়া হবে। আওয়ামী লীগ দল থেকে কিছু লােক তাঁরা পাবেন, এ আশ্বাসও তারা পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু আরাে লিখেছেন, “যদিও শহীদ সাহেবের সাথে। তাঁর মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করার ব্যাপার নিয়ে একমত হতে পারি নাই, তবু অন্য কেউ তাঁকে অপমান করুক এটা সহ্য করা আমার পক্ষে কষ্টকর ছিল। আমি শহীদ সাহেবকে বললাম, যখন হক সাহেব প্রকাশ্যে বলে দিয়েছেন, আপনি যুক্তফ্রন্টের কেউ নন, তখন বাধ্য হয়ে প্রমাণ করতে হবে, আপনিও যুক্তফ্রন্টের কেউ। আমরা অনাস্থা দিব হক সাহেবের বিরুদ্ধে। শহীদ সাহেব বললেন, যতদিন আওয়ামী লীগ যুক্তফ্রন্টে আছে ততদিন তাে সত্যই আমি কেউ নই। হক সাহেব যুক্তফ্রন্টের 

  নেতা, (সকল দলের) পক্ষে কথা বলতে পারেন” (৯/২৮৭)। অর্থাৎ সােহরাওয়ার্দী পরােক্ষভাবে হলেও মুজিবকে যুক্তফ্রন্ট ভাঙ্গার পরামর্শ দিয়েছিলেন। 

 ঢাকায় ফিরেই যুক্তফ্রন্ট ওয়ার্কিং কমিটির সভা ডেকে, হক সাহেবের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার উদ্যোগ গ্রহণ করলেন শেখ মুজিব। প্রথমেই আলােচনা আতাউর রহমান, আবুল মনসুর আহমদ এবং মানিক মিয়া প্রমুখের সাথে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, তিনজনই প্রথমে একটু অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। অনাস্থা সম্বন্ধে কোনাে আপত্তি নাই, তবে পারা যাবে কিনা আমি বললাম, না পারার কোনাে কারণ নাই। নীতি বলেও তাে একটা কথা আছে। আমি ওয়ার্কিং কমিটির সভা আহ্বান করলাম। ওয়ার্কিং কমিটির প্রায় সকলেই একমত, কেবল সালাম সাহেব ও হাশিমউদ্দিন সাহেব একমত হতে পারলেন না। তবে এ কথা জানালেন যে, তাঁরা ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই মানতে বাধ্য। হক সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে কে অনাস্থা প্রস্তাব প্রথমে পেশ করবে,  অনেকেই আপত্তি করতে লাগলেন, আমার নিজেরও লজ্জা করতে লাগল। তাকে তাে আমি সম্মান ও ভক্তি করি। কিন্তু এখন কয়েকজন নেতা তাঁকে ঘিরে রেখেছে। তাঁকে তাঁদের কাছ থেকে শত চেষ্টা করেও বের করতে পারলাম না। ঠিক হল, আমিই প্রস্তাব আনব আর জনাব আব্দুল গণি নার এট ল’ সমর্থন করবেন” (৯/২৮৭-২৮৮)। 

 আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, “আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি মুজিবুর রহমান সাহেব হক সাহেবের বিরুদ্ধে এক অনাস্থা প্রস্তাব আনিলেন। বলিলেন : ‘এ অনাস্থা প্রস্তাব আওয়ামী লীগের তরফ হইতে নয়, যুক্তফ্রন্টের তরফ হইতে।   ইত্তেফাক’ সম্পাদক মানিক মিয়া সাহেব ও আমি এই অনাস্থা প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করিলাম। ১৯৫৫ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি যুক্তফ্রন্টের এই ঐতিহাসিক (ওয়ার্কিং কমিটির) বৈঠক বসিল” (৪/৩৫০-৩৫১)। আওয়ামী মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যদের সর্বাত্মক সমর্থন না পেলেও মুজিব আশাবাদী ছিলেন, দলের বাইরে কেএসপি এবং নেজামে ইসলামের কিছু সদস্যের সমর্থন পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল বিপরীত। 

 “As many as thirty five members of the Awami League, led by Abdus Salam Khan of Faridpur, did not vote in support of the motion; worse still, some of them, enticed by various inducements deserted the party to join the KSP. Mujib did not despair. To him the defection of a few self-seeking opportunists would not amount to any tangible loss for Awami League. Quite the contrary, he argued, the party would emerge out of this seemingly disheartening experience as a more determined, ideologically cohesive body (১৭/৬৩) 

 অনাস্থা প্রস্তাবের ব্যর্থতার অল্প দিনের মধ্যেই আওয়ামী মুসলিম লীগ যুক্তফ্রন্ট থেকে 

  বেরিয়ে এসেছিল। হক-সােহরাওয়ার্দীর মধ্যে বিভেদ-বিরােধ সৃষ্টির ব্যাপারে গােলাম মােহম্মদ-মির্জা-মােহম্মদ আলীরা সফল হলেন। আবু জাফর শামসুদ্দিনের প্রণিধানযােগ্য মন্তব্য, “ষড়যন্ত্রের রাজনীতি বড় নােংরা জিনিস। কুকুরের মত উদগীর্ণ খাদ্যও পুনরায় গিলতে হয়। বাংলায় আওয়ামী লীগকে একঘরে করার প্রয়ােজন ছিল। তাই ‘ট্রেটর’ ফজলুল হককে কিছুকাল পরেই পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত করার প্রয়ােজন হলাে। এ সময়ে ষড়যন্ত্রের রাজনীতির আবর্তের মধ্যে পথ হারালেন পূর্ব বঙ্গের অনেক নেতা। প্রাদেশিক আইন পরিষদে কৃষক-প্রজা পার্টির (কৃষক-শ্রমিক পার্টি) নেতা আবু হােসেন সরকার নিজামে ইসলামীর সহযােগিতায় মন্ত্রিসভা গঠন করেন” (৮/২৭৬)। “যুক্তফ্রন্ট ভাংগিয়া গেল। কিন্তু যুক্তফ্রন্টের বড় শরিক আওয়ামী লীগ কোনাে সুবিধা উপভােগ করিতে পারিল না। বরঞ্চ ছােট শরিক কেএসপি দৃশ্যত এবং স্পষ্টত সব সুবিধা লুটিতে লাগিল। শহীদ সাহেব কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকার দরুন আওয়ামী লীগের কোনও সুবিধা ত হইলই না, বরঞ্চ প্রতিপদে বেকায়দা হইতে লাগিল” (৪/৩৫২)। 

 আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, গভর্নর জেনারেল কর্তৃক গণ-পরিষদ ভেঙ্গে দেবার প্রতিবাদে গণ-পরিষদের প্রেসিডেন্ট তমিজউদ্দিন খান লাহাের চিফ কোর্টে ৯ নভেম্বর, ১৯৫৪ একটি মামলা করেছিলেন। ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৫ চিফ কোর্টের প্রদত্ত রায়ে গভর্নর জেনারেলের কাজটি আইনবহির্ভূত এবং অবৈধ ঘােষিত হয়েছিল। তখন আইনমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে উচ্চতর আদালতে আপিল করায় গভর্নর জেনারেলের সিদ্ধান্তটিই বৈধতা পেয়েছিল। অতঃপর গভর্নর জেনারেল জরুরি অবস্থা জারি করে নিজেকেই সংবিধান প্রণয়নের সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী ঘােষণা করলেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট অন্য এক মামলার রায়ে গভর্নর জেনারেলের সর্বময় কর্তৃত্ব গ্রহণকেও বেআইনি বলে ঘােষণা করলেন। তখন আইনের পথে চলা ছাড়া গভর্নর জেনারেলের আর কোনাে উপায় রইলাে না। ২৮ মে, ১৯৫৫ গভর্নর জেনারেল ঘােষণা করলেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে প্যারিটি  মেনে ৪০জন। করে নির্বাচিত সদস্য নিয়ে সংবিধান প্রণয়নের জন্য গণ-পরিষদ গঠন করা হবে। 

 জুন ১৯৫৫, পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের ভােটে শেখ মুজিব গণ-পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। “Mujib was now a member of both the East Bengal Assembly and the Constituent Assembly he was quick to learn the rules and conventions of the parliamentary system. His long association with Suhrawardy was no doubt of great help to him in his new role” (১৭/৬৬)। পৃথক নির্বাচন বিধান অনুসারে গণ-পরিষদে পূর্ব বাংলার মুসলিম আসন ছিল ৩১টি, তার মধ্যে যুক্তফ্রন্টের বিজয় হয়েছিল ১৬ আসনে, যুক্তফ্রন্ট ছেড়ে বেরিয়ে-আসা আওয়ামী মুসলিম লীগ পেয়েছিল ১২টি আসন আর 

  ১০২ 

  একটি করে আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন মুসলিম লীগ, কম্যুনিস্ট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। বাকি নয়টি অ-মুসলিম আসনে কংগ্রেস পেয়েছিল পাঁচটি এবং তফশিলী ফেডারেশন চারটি। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের ৪০টি মুসলিম আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ বিজয়ী হয়েছিল ২৬টি আসনে। সব মিলিয়ে মােট ৮০টি আসনের ২৭টি পেয়েছিল মুসলিম লীগ, অর্থাৎ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও, মুসলিম লীগই গণ-পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। গণ-পরিষদ নির্বাচনের দল-ভিত্তিক ফলাফলে মুসলিম লীগকেএসপি’র মধ্যে ঐক্য-বােঝাপড়া দৃশ্যতই বেড়ে গিয়েছিল। পূর্ব বাংলায় কেএসপি-দলীয় আবু হােসেন সরকার প্রধানমন্ত্রী, অথচ ফজলুল হক স্বায়ত্তশাসনসহ যুক্তফ্রন্টের ২১-দফা দাবিগুলি এড়িয়ে চলছিলেন। অপরদিকে পূর্ব ও পশ্চিম। পাকিস্তানের জনগণ এবং নেতৃবৃন্দের সমঝােতার লক্ষ্যে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ‘প্যারিটি’ প্রবর্তনের উদ্যোগটি আইনমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দীই শুরু করেছিলেন। 

 এমন পরিস্থিতিতেই শাসনতন্ত্র প্রণয়নের আলােচনার জন্য গণ-পরিষদের প্রথম বৈঠক ৭-১৪ জুলাই ১৯৫৫, পশ্চিম পাকিস্তানের মারি শৈল-শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু তার আগে অনানুষ্ঠানিক আলােচনাতেই ‘প্যারিটি’র প্রশ্নে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতভেদের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তবে মারিতে প্রথম দু’দিনের আনুষ্ঠানিক আলােচনার পর শাসনতন্ত্রের পাঁচ-দফাভিত্তিক সমঝােতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সমঝােতামূলক দফাগুলি ছিল : ১. পশ্চিম পাকিস্তানে ‘এক ইউনিট’, ২. ‘পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন’, ৩. সকল ব্যাপারে দুই অঞ্চলের মধ্যে সংখ্যা-সাম্য’ (প্যারিটি ), ৪. ‘যুক্ত নির্বাচন এবং ৫. বাংলা-উর্দু রাষ্ট্রভাষা  (৪/৩৬৪)। 

 উক্ত চুক্তিনামায় “প্রধানমন্ত্রী মােহম্মদ আলী, নবাব গুরমানী (পশ্চিম পাকিস্তানের গভর্নর) ও জনাব শহীদ সােহরাওয়ার্দীর দস্তখত হওয়ার পর হক সাহেব দস্তখত করিতে অস্বীকার করিয়াছেন। হক সাহেব শহীদ সাহেবকে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি মনে করেন না। কাজেই তার সাথে তিনি পূর্ব বাংলার পক্ষে দস্তখত করতে রাজি নন। হক সাহেব শহীদ সাহেবকে অপদস্থ করিবার মতলবেই এ কথা বলিয়াছেন, এতে আমাদের কোনও সন্দেহ রহিল না” (৪/৩৬৫)। সােহরাওয়ার্দী তখন। বিচক্ষণভাবেই পরিস্থিতি সামাল দিয়ে পূর্ব বাংলার পক্ষে আতাউর রহমান ও আবুল। মনসুর আহমদকে দিয়ে চুক্তিটি স্বাক্ষর করিয়েছিলেন এবং অতঃপর স্বাক্ষর। করেছিলেন ফজলুল হক। চক্রান্তের রাজনীতিতে জড়িয়ে শেরে বাংলা ফজলুল হক পূর্ব বাংলার প্রতনিধিত্বকারী হিসেবে সােহরাওয়ার্দীকে অস্বীকার করেছিলেন, অথচ অল্পদিনের মধ্যেই তিনি ইস্কান্দর মির্জাকে ‘রাজকীয় বংশােদ্ভূত বাঙালি  বলে ঘােষণা করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, সিরাজউদদৌলার আত্মীয় এবং প্রধান সেনাপতি মীরজাফরের সরাসরি উত্তরপুরুষ ছিলেন ইস্কান্দর মির্জা। 

  ১০৩ 

  ‘মারী চুক্তিটি অবশ্য শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়নি। কারণ, গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দর মির্জা চূড়ান্ত পর্যায়ে আলােচনার জন্য ঐ চুক্তির‘ট্র কপি হিসেবে যা উপস্থাপন করেছিলেন, তাতে প্রকৃতপক্ষে অনেক কিছুই তিনি বদলে ফেলেছিলেন। যাহােক, ‘মারী চুক্তির পরিবর্তনের কথা বর্তমান আলােচনায় তেমন প্রাসঙ্গিক নয়। তবে উল্লেখযােগ্য হচ্ছে, ইস্কান্দর মির্জার গভর্নর জেনারেল হওয়ার প্রসঙ্গটি। ১৯৫৫সালের আগস্ট মাসের প্রথম দিকেই ষড়যন্ত্রীরা গােলাম মােহম্মদকে তাঁর স্বাস্থ্যগত অক্ষমতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। গভর্নর জেনারেল হলেন ইস্কান্দর মির্জা নিজে। আর নিজের ছেড়ে আসা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে বসালেন ফজলুল হককে। ফজলুল হকের পছন্দে ক মাস আগে নিয়ােজিত কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, কেএসপি’র আবু হােসেন সরকারকে বানানাে হলাে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। এখানে পূর্বোল্লিখিত মির্জা-হক ‘গােপন-সমঝােতার বিষয়টি স্মরণ করা যেতে পারে। এ পরিবর্তনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল সােহরাওয়ার্দীর, কিন্তু ডিফেন্স মিনিস্টার আইয়ুব খানের আপত্তির কারণে মন্ত্রিসভাতেই তিনি স্থান পেলেন না। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে ফিরে এলেন চৌধুরী মােহম্মদ আলী। কেএসপিকংগ্রেস-তফশিলীদের সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় নতুন মন্ত্রিসভা ১০ আগস্ট, ১৯৫৫ শপথ গ্রহণ করেছিল। 

 তখন পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি, অপশাসন এবং খাদ্যাভাবের কারণে যথার্থই নাজুক হয়ে পড়ছিল। “Abu Hossain Sarker as Chief Minister of East Pakistan  did not have a majority in the legislature and he refused to call it into session. To shore up his position, Fazlul Huq was sent as Governor in March (1956) and the two of them,  did their best to prolong the life of the Sarker Ministry. In order to buy the support of the legislators, Sarker restored to the practice of issuing permits for them to get rice from government godowns cheaply, which could then be sold in the open market at an exorbitant price. This officially sanctioned profiteering by legislators supporting the Sarker Ministry made the already grave food situation worse” (১৭/৭২-৭৩)। 

 খাদ্য-পরিস্থিতি দ্রুতই অসহনীয় হয়ে ওঠায় আবু হােসেন মন্ত্রিসভার জনপ্রিয়তা। বলতে কিছুই বাকি থাকলাে না। সরকারের দুঃশাসন এবং খাদ্য-সঙ্কটের প্রতিবাদে ভাসানী অনশন শুরু করলেন। মুজিব ঢাকার রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল করলেন। মুজিবের দাবি ছিল দু’টি : চরম খাদ্য-সঙ্কটাপন্ন জেলাগুলিকে দুর্ভিক্ষ-এলাকা বলে ঘােষণা করতে হবে আর প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। জরুরি ত্রাণ-সহায়তা প্রেরণের আহ্বান জানাতে হবে। মুজিব এবং তার সহযােগীরা 

  ১০৪ 

  জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের পাশে এসে দাঁড়ালেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার পর, সােহরাওয়ার্দী পূর্ব বাংলায় এসে বিভিন্ন এলাকায় জরুরি পরিদর্শন করে সঙ্কটজনক খাদ্য-পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ জানিয়ে গভর্নর জেনারেল মির্জাকে চিঠি লিখলেন : “Unconstitutional conduct on the part of the rulers breeds unconstitutional reaction on the part of the people”। সােহরাওয়ার্দী প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে হুঁশিয়ারি জানালেন, গণ-বিরােধী কেএসপিসরকারের পতনের জন্য শিগগিরই আইন-অমান্য আন্দোলন শুরু করা হবে। 

 আবু জাফর শামসুদ্দিন তখনকার পরিস্থিতির কয়েকদিনের বিবরণে লিখেছেন : “আজ ৩রা সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬। ভুখ মিছিল এলাে নদীর ওপারের এবং মাতুয়াইল অঞ্চলের কাছারিতে হাজার হাজার লােক জমায়েত হলাে। পুলিশ কাছারির বারান্দায় মিছিলকারীদের ওপর লাঠি চালাল। কয়েকজন আহত হলাে। সংবাদ পেয়ে শেখ মুজিবুর রহমান, মহিউদ্দিন এমএলএ, ইয়ার মােহম্মদ খান এমএলএ, আতাউর রহমান খান এমএলএ, আবুল মনসুর আহমদ এবং আমিও ঘটনাস্থলে গেলাম। মিছিলকারীরা ধ্বনি তুলছে : চাউল চাই, রেশনিং ব্যবস্থা চাই। ৪ঠা সেপ্টেম্বর গতকাল সন্ধ্যায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ১৪৪ ধারা জারি করেছে ভুখ মিছিলের ভয়ে। বেলা সাড়ে এগারােটা খবর এলাে পুলিশ মিছিলকারীদের ওপর গুলি ছুড়েছে। কাজী ইদরিসকে নিয়ে ঘটনাস্থলে চকবাজারে গেলাম। তিনজনকে খুন করেছে পুলিশ। একজনের লাশ পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছে স্থানীয় জনসাধারণ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান আসতেই জনতা সেই লাশ নিয়ে মিছিল করল। ১৫ হাজারের মিছিল। শেখ মুজিব, ইয়ার মুহম্মদ খান লাশসহ মিছিলের পুরােভাগে। মিছিল সদরঘাটে পৌঁছতেই আবার গুলি চললাে   নিহত হলাে একজন এবং কয়েকজন আহত। মানুষ তবু দমে না, মিছিল তবু চলে। ৫সেপ্টেম্বর গতকাল জনতার মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রতিজ্ঞার ভাব দেখেছি   করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে। সােয়ারিঘাটে একটি সাধারণ লােক, পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে ঘেরাও লােকদের দিকে গুলি চলার পর সে বলছিল, ভাত চান, তবে যান না এগিয়ে এমনিতে মরতে হবে তার চেয়ে গুলি খেয়ে মরাে। সে নিজেও যাচ্ছিল। সারাদিন তুমুল বিক্ষোভ মিছিল চললাে। বিকেলে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে বিরাট জনসভা হলাে। শেখ মুজিবও বক্তৃতা করলেন। ৬-৯-৫৬ আবু হােসেন সরকার পদত্যাগ করেছেন”(৮/২৭৬-২৭৮)। 

  ১০৫ 

  পূর্ববঙ্গ ও কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সরকার : 

 পূর্ববঙ্গের খাদ্য-সঙ্কটের সফল মােকাবিলা 

  খাদ্য-সঙ্কট সম্পর্কে সােহরাওয়ার্দীর চিঠি এবং প্রকাশ্য বিবৃতি গভর্নর জেনারেল মির্জাকে যথেষ্টই দুর্ভাবনায় ফেলেছিল। ঢাকার সেনা-সদরের মাধ্যমেও তিনি নাজুক পরিস্থিতির খবর পাচ্ছিলেন, বিষয়টা আর এড়িয়ে চলা সম্ভব ছিল না। আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে ইস্কান্দর মীর্জা পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি সম্পর্কে আলােচনার জন্য ফজলুল হক, আবু হােসেন সরকার এবং সােহরাওয়ার্দীকে করাচিতে ডেকে পাঠালেন। এ আলােচনাতেই স্পষ্ট হলাে গভর্নর “Fazlul Huq had no option but to ask the Awami League to form a government. He invited Ataur Rahman Khan to do so immediately” (১৭/৭৩)। 

 পূর্ব বাংলায় সঙ্কটাপন্ন খাদ্য পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের বিষয়ে আওয়ামী লীগের ভিতরে দুটি ভিন্ন মত ছিল। একপক্ষের মত ছিল, দেশজুড়ে দুর্ভিক্ষাবস্থায় সরকার গঠন করা হবে আত্মহত্যার শামিল, কারণ এমন কোনাে নিশ্চয়তা নেই যে, আওয়ামী লীগ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারবে। অপরদিকে শেখ মুজিবসহ অন্যরা চাইছিলেন, অবশ্যই দুঃসময়ের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সঙ্কটাপন্ন জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে, অনুকূলভাবে সরকার পরিচালনার সক্ষমতা আছে আওয়ামী লীগের। এঁদের সাহসী সিদ্ধান্তক্রমেই ৫সেপ্টেম্বর গভর্নর ফজলুল হকের সাথে সাক্ষাতের পরদিন, ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬ আতাউর রহমান খানের প্রধানমন্ত্রীত্বে আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছিল। নবগঠিত আতাউর রহমান মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, আবুল মনসুর আহমদ (আওয়ামী মুসলিম লীগ) মাহমুদ আলী (গণতন্ত্রী পার্টি) এবং কফিলউদ্দিন চৌধুরী (কেএসপি’র বিদ্রোহী সদস্য) প্রমুখ। সুতরাং এটা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে প্রকারান্তরে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাই ছিল। 

 তখন পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ ছিল সরকারি দল’ আর কেন্দ্রে বিরােধী দল। 

  ১০৬ 

  তবে এক সপ্তাহ পরেই শহীদ সােহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা গঠিত হয় এবং প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার সদস্য আবুল মনসুর আহমদ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যােগ দিয়েছিলেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ। সরকার গঠনের পরদিনই গভর্নর জেনারেল মির্জার কৌশলে প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মােহম্মদ আলী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তখন সােহরাওয়ার্দীকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান জানালে তিনি সম্মত হয়েছিলেন। ইস্কান্দর মির্জার পরােক্ষ উদ্যোগে-সমর্থনে গঠিত রিপাবলিকান পার্টির সহায়তায় ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫, সােহরাওয়ার্দী কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠন করেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ এটাকে দেখেছেন সােহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিত্বের প্রতি লােভ’ হিসেবে আবার কেউবা বলেছেন, ‘অস্বাভাবিক ঝুঁকি নেয়া। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্ভাব্য সকল ষড়যন্ত্রপ্রতিক্রিয়ার বিষয়েই সােহরাওয়ার্দী সচেতন ছিলেন এবং পাকিস্তানের গণতন্ত্রবিরােধী শক্তির প্রতিবন্ধকতার আশঙ্কাও তাঁর অজানা ছিল না। তবু পূর্ব বাংলার খাদ্য সঙ্কটের দ্রুত সমাধান এবং যথাশীঘ্র দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যেই, নানা দিক থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও সােহরাওয়ার্দী এ দায়িত্ব নিয়েছিলেন। 

 পূর্ব বাংলা সরকারের শিল্প, বাণিজ্য, পল্লী-উন্নয়ন মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব অক্লান্ত উদ্যোগে সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে দেশজুড়ে দলীয় নেতাকর্মীদেরকে রিলিফ কাজে সক্রিয় করে তুলেছিলেন। বার্মা থেকে দ্রুত চাল আমদানি এবং সকল দুর্গত এলাকাতে লঙ্গরখানা পরিচালনা করায় খাদ্য-পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি ঘটছিল। অনস্বীকার্য যে, যুক্তফ্রন্টের ভেতরে কেএসপি-আওয়ামী লীগ মতবিরােধ, যুক্তফ্রন্ট থেকে আওয়ামী লীগের বেরিয়ে যাওয়া, আওয়ামী-দলীয় বেশ ক’জন এমএলএ দলত্যাগ করে কেএসপি’র পক্ষাবলম্বন এবং দেশজুড়ে নানামুখী রাজনৈতিক টানাপড়েনের ফলে ইতােপূর্বে আওয়ামী লীগ ব্যাপক প্রতিকূলতার মুখে পড়েছিল। কিন্তু দেশের সঙ্কটের সময় সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার গঠন করে “The Awami League government faced the food crisis with great determination. Ataur Rahman, the Chief Minister, directed his ministers to treat the food emergency as a top priority . The Awami League had passed its first test in administration with flying colours” (১৭/৭৫)। ফলে হারানাে জনপ্রিয়তার পুনরুদ্ধার সম্ভব হওয়াতে পরবর্তী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাতটি আসনের উপ-নির্বাচনে ছ টিতেই জয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ। 

 পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণের তিনদিনের মাথায়, সােহরাওয়ার্দী পূর্ব বাংলায় এসে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে খাদ্য-সঙ্কট মােকাবিলার জন্য তিন কোটি টাকার বিশেষ তহবিল মঞ্জুর করায় প্রাদেশিক সরকারের পক্ষে সঙ্কট 

  ১০৭ 

  মােকাবিলা করা অনেকটাই সহজ হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দীর আরেকটি উল্লেখযােগ্য প্রশংসনীয় কাজ সম্পর্কে খােকা রায় লিখেছেন, “তিনি সংবিধান সংশােধন করে পৃথক নির্বাচন প্রথার বদলে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষেত্রে যুক্ত নির্বাচন প্রথার প্রবর্তন করেছিলেন” (২০/১৬১)। পূর্ব বাংলার আওয়ামী লীগ (সংখ্যাগরিষ্ঠ কোয়ালিশন) সরকার অতি দ্রুত সকল রাজবন্দির মুক্তির ব্যবস্থা করেছিল। আর কেন্দ্রের আওয়ামী লীগ (সংখ্যালঘু কোয়ালিশন) সরকার পূর্ব বাংলায় সাম্প্রদায়িক পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা বাতিল করে যুক্ত-নির্বাচন প্রবর্তন করেছিল। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উল্লেখযােগ্য উন্নতি ঘটেছিল। 

 প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে পূর্ব বাংলার চরম খাদ্য-সঙ্কটের দ্রুত নিরসন হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিরুদ্ধ-পক্ষীয় কেউই আওয়ামী লীগ সরকারের অদক্ষতা কিংবা অসততার কোনাে অভিযােগ আনতে পারেনি। কিন্তু অভিযােগ এনেছিলেন স্বয়ং আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানী। প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণের পরেই সােহরাওয়ার্দী পূর্ব বাংলার খাদ্য পরিস্থিতি সরজমিনে যাচাই করতে এসেছিলেন, সঙ্গে এনেছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী আমজাদ আলী এবং কয়েকজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দীর সম্বর্ধনা-সভায় সভাপতি ভাসানী প্রকাশ্যেই অশােভন অভিযােগের তীর ছুঁড়েছিলেন : “the people had expected the Prime Minister to bring a planeload of foodgrain – he has brought instead a plane load of women If he did not perform his job properly, he would be dragged down by the ear from his seat of power” (১৭/৭৫)। এখানেই শেষ নয়, প্রাদেশিক সরকারের প্রতিও তাঁর অভিযােগ ছিল, এখনাে জুয়া-খেলা, ঘােড়দৌর বন্ধ হয়নি, পতিতালয়গুলি কিভাবে বাধাহীন চালু রয়েছে? সােহরাওয়ার্দীর পররাষ্ট্রনীতির জন্যও তীব্র সমালােচনা করেছিলেন, যেক্ষেত্রে ভাসানীর কোনাে অভিজ্ঞতাই ছিল না। উল্লেখ্য যে, সে-সময় ভাসানীকে ঘিরে রাখতেন, “young leftist leaders with intellectual pretensions” (প্রাগুক্ত)। 

 “প্রধানমন্ত্রী হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী তাঁরই উপস্থিতিতে মওলানা ভাসানীর এমন বিরূপ সমালােচনায় খুবই ব্ৰিত এবং মর্মাহত হন। ঐ সভায় বসেই জনাব সােহরাওয়ার্দী বলেন যে, আমি পদত্যাগ করবাে। প্রকৃতপক্ষে এই সময় থেকেই ভাসানী ও সােহরাওয়ার্দীর বিরােধ দানা বেঁধে উঠে। সে সময় এই দুই নেতার বিরােধের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন মাত্র নেতা প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন যাতে সােহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানীকে এক সঙ্গে রাখা যায়। যাতে করে এই দুই প্রতিভাবান ব্যক্তিকে পূর্ব পাকিস্তানের নিপীড়িত বঞ্চিত জনতার মুখপাত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। সােহরাওয়ার্দী যে মুহূর্তে পদত্যাগের কথা উচ্চারণ 

  ১০৮ 

  করলেন, সেই মুহূর্তেই শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, স্যার আপনাকে আমরা ছাড়ব না, ছাড়তে পারি না” (১৯/৯৪)। সােহরাওয়ার্দী-ভাসানীর মনান্তরের “সুযােগ গ্রহণ করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক-শ্ৰেণী। প্রধানমন্ত্রী থাকতে হলে মওলানা ভাসানী এবং তাঁর পক্ষীয় লােকদেরকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। অপরদিকে মওলানা ভাসানীর কাছে বিভিন্ন সূত্র মারফত বার্তা পাঠানাে হয় যে, সােহরাওয়ার্দীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করা হলে মওলানা ভাসানীর জনহিতকর প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য বিপুল অর্থ সাহায্য করা হবে” (৮/২৮৩)। শেখ মুজিব কেমন জটিল পরিস্থিতির মাঝেও আপন অবস্থান এবং লক্ষ্য অবিচল রেখেছিলেন, তার উপলব্ধির জন্যই এসকল পার্শ্ব-প্রসঙ্গগুলি মনে রাখা দরকার। 

 শেখ মুজিব তখন প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় গণপরিষদের সদস্য। ‘এক ইউনিট’ ব্যবস্থার মূল প্রস্তাবক ছিলেন মুহম্মদ আলী বগুড়ার মন্ত্রিসভার আইনমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দী। কিন্তু ১৯৫৫ র ১০ আগস্ট গঠিত চৌধুরী মুহম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় তার স্থান হয়নি, অর্থাৎ গণ-পরিষদে আওয়ামী লীগ তখন বিরােধী দলে ছিল। ১৯৫৫ খ্রি. ২৫ আগস্ট গণ-পরিষদে প্রদত্ত প্রথম ভাষণেই মুজিব পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট  প্রবর্তনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলে দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন : “Sir, they want to place the word “East Pakistan  instead of ‘East Bengal  The word Bengal has a history, has a tradition of its own. You can change it only after the people have been consulted whether they accept it .the question of One Unit .can come into the constitution. Why do you want it to be taken up just now? What about the state language, Bengali? What about joint electorate? What about autonomy? The people of East Bengal will be prepared to consider One Unit with all these things. So I appeal allow the people to give their verdict in any way, in the form of referendum or in the form of plebiscite. Let the people of the frontier say that they want One Unit Similarly in Sind  If you will force it upon us we will have to adopt unconstitutional means. You must proceed constitutionally” (১৭/৬৮)। 

 পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক আইন সভায় পয়লা অক্টোবর ১৯৫৬, ‘যুক্ত নির্বাচনী বিল’এর সমর্থনে প্রদত্ত নীতি নির্ধারণী’ ভাষণে শেখ মুজিব বলেছিলেন “the opposition move to press for separate electorates on the basis of the two nation theory, would drive the minorities to a position from where they could justifiably demand a separate homeland within Pakistan. He also 

  ১০৯ 

  regretted that the post of the head of the state in Pakistan researved for Muslims only .such a communal provision in the constitution might have repercussions in India, where parties like Hindu Mahasabha might ..demand reservation of the post of President of India for Hindus only. Such a movement would not be a happy one for the forty millions of Indian Muslims” (১৯/৯৩)। মূলত তার বক্তৃতার ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার আইন পরিষদে যুক্ত নির্বাচন বিলটি “গৃহীত হওয়ার মাধ্যমেই রাজনীতি থেকে পাকিস্তানের জন্মলগ্নের প্রােথিত মৌল ভাবধারা কিছুটা হলেও অন্তর্হিত হয়ে নতুন এক ভাবধারা প্রবর্তিত হয়”(প্রাগুক্ত)। উল্লেখ্য যে, প্রধানমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দীর প্রচেষ্টায় ১১ অক্টোবর যুক্ত-নির্বাচন বিল জাতীয় পরিষদে উত্থাপিত হয় এবং ১২ অক্টোবর তা গৃহীত হয়েছিল। 

 চৌধুরী মুহম্মদ আলীর প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়, ১৯৫৬’র ফেব্রুয়ারি মাসে শাসনতন্ত্র বিল গণ-পরিষদে উত্থাপন করে ২৩ মার্চ সদস্যদের ভােটে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান’এর প্রথম শাসনতন্ত্র ‘পাস করা হলাে। শাসনতান্ত্রিক সাম্প্রদায়িকতা, পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট প্রবর্তন, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি না মানা এবং যুক্ত-নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন না করা ইত্যাদি বিবিধ কারণে অসন্তুষ্ট আওয়ামী লীগ সেদিন গণ-পরিষদ থেকে ওয়াক আউট করেছিল। শাসনতন্ত্র প্রবর্তনের দিনই গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দর মির্জা পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। “Fazlul Huq, who had cooperated with the power brokers in Pakistan was duly rewarded with the post of Governor of East Bengal .A big celebration was held in the Governor s house but the Awami League boycotted it” (১৭/৭০-৭১)। পূর্ব বাংলার ব্যবস্থাপক পরিষদে ৩ এপ্রিল, ১৯৫৭ স্বায়ত্তশাসনের দাবির পক্ষে প্রদত্ত ভাষণে শেখ মুজিব বলেছিলেন, “স্বায়ত্তশাসনের দাবি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দাবি। এই দাবির ভিত্তিতে আমরা গত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম। গত ৯ বছরের ইতিহাস পর্যালােচনা করলে বুঝা যাবে আমরা কেন স্বায়ত্তশাসন চাই। এই দাবি কেবল রাজনৈতিক নয়, এ আমাদের বাঁচা-মরার দাবি”(২১/২৯)। সেদিনই ব্যবস্থাপক পরিষদে স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি গৃহীত হয়েছিল। 

 আতাউর রহমানের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় মােটামুটি দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর, দলীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব সাংগঠনিক কার্যক্রমে পূর্ণ-সময় নিয়ােজিত থাকার প্রয়ােজন বােধ করে স্বেচ্ছায় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু মুজিবের সিদ্ধান্তকে মুখ্যমন্ত্রী এবং দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট আতাউর রহমান পছন্দ করেননি। আবুল মনসুর আহমদের পর্যবেক্ষণ : পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ 

  ১১০ 

  সরকারের বিবিধ সাফল্য এবং “সর্বাঙ্গীন সদাচারের মধ্যে চাঁদের কলঙ্কের মতই ছিল আতাউর রহমান-মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত বিরােধ। এই বিরােধের সবটুকুই ব্যক্তিগত ছিল না, অনেকখানিই ছিল নীতিগত। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয় নষ্ট করিয়া দেওয়ার জন্য অনেকেই দায়ী ছিলেন। কিন্তু সবার চেয়ে বেশি ও আশু দায়ী ছিল মুজিবুর রহমানের একগুঁয়েমি। যুক্তফ্রন্ট ভাঙ্গিয়া দেওয়ার মূলেও ছিল মুজিবুর রহমানের কার্যকলাপ। মুজিবুর রহমানের নিজের কথা ছিল পাঁচমিশালী আদর্শহীন ম্যারেজ-অব-কনভিনিয়েন্স’ যুক্তফ্রন্ট ভাংগিয়া আওয়ামী লীগকে প্রকৃত গণ-প্রতিষ্ঠান হিসাবে বাঁচাইয়া তিনি ভালই করিয়াছেন। পক্ষান্তরে অনেকের মত, আমার নিজেরও, যুক্তফ্রন্ট ভাংগিয়া তিনি পূর্ব-বাংলার বিপুল ক্ষতি করিয়াছেন। যুক্তফ্রন্ট ভাংগা যদি দোষের হইয়া থাকে তবে সে দোষের জন্য মুজিবুর রহমানই প্রধান দায়ী। যদি প্রশংসার কাজ হইয়া থাকে তবে সমস্ত প্রশংসা মুজিবুর রহমানের। তবু এর বিচারের জন্য ইতিহাসের রায়ের অপেক্ষা করিতে হইবে” (৪/৫৪৩-৫৪৪)। ইতিহাসের রায় অবশ্যই মুজিবের পক্ষে গেছে, বঙ্গবন্ধু মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। 

 উল্লেখ্য যে, ১৯৫৪ খ্রি. যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পর থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিভিন্ন পর্যায়েই বিরূপ সমালােচনার মুখে পড়েছেন। কারণ, তখন তিনি দ্রুতই অনেককে পেরিয়ে রাজনীতির মূল-মঞ্চে উঠে আসছিলেন এবং তার পরিচয় দাঁড়িয়েছিল একাধারেই সংগঠক এবং নীতি-নির্ধারকের। এস. এ. করিমের প্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ : “Mujib s prestige within the Awami League improved considerably because of his decision to quit the Cabinet in late May (1957) in order to continue to function as the General Secretary of the party . Chief Minister Ataur Rahman Khan was apparently not pleased with this decision of Mujib, which boosted his profile as the only Awami Leaguer in the Cabinet to to put the interest of the party above all other considerations” (১৭/৮০-৮১)। 

 এক বছর পরেই, ১৯৫৮ র আওয়ামী লীগ সম্মেলনেই আতাউর-মুজিব বিরােধটা প্রকাশ্য আলােচনায় উঠে এসেছিল। সাধারণ সম্পাদক মুজিব বলেছিলেন, প্রাদেশিক সরকার দল এবং জনগণের প্রত্যাশা মিটাতে পারছে না। ক্ষমতাসীন সরকার অতিমাত্রায় আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, মফস্বল এলাকার পার্টিকর্মীরা হতাশ হচ্ছে। আগামী নির্বাচনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে হবে। অপরদিকে আতাউর রহমান বলেছিলেন, দলীয় নেতাকর্মীদের চাপে সরকার চালাতে অসুবিধা ঘটছে। দলের প্রতি মুজিব অতিসংবেদনশীল হয়ে পড়েছেন। “Mujib resented the remarks and tendered his 

  resignation as the AL General Secretary. But he was persuaded by the party leaders to withdraw his letter of resignation” (১৭/৮৬-৮৭) 

 সােহরাওয়ার্দী বিশ্বাস করতেন, “So long as there was an ongoing confrontation with India over Kashmir, Pakistan could not efford the luxury of following a non-aligned course internationally” (১৭/৭৬)। কিন্তু নীতিগতভাবে আওয়ামী লীগ ছিল জোট-নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতির প্রতি আস্থাশীল। আবু জাফর শামসুদ্দিনের একটি মন্তব্য লক্ষণীয়, “আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের স্বার্থে সকল প্রকার সামরিক জোটের বিরােধী ছিল। ১৯৫৩, ১৯৫৫ এবং ১৯৫৬ সালে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কাউন্সিল সভায় সামরিক জোটভুক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে যথারীতি প্রস্তাব গৃহীত হয়” (৮/২৮১)। মনে রাখা দরকার, সােহরাওয়ার্দীর কোনােরকম ক্ষমতা অর্জনের পূর্বেই পাকিস্তান বিভিন্ন যুদ্ধজোটের শরিক হয়েছিল। “দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সামরিক জোটে (সিয়াটো) পাকিস্তান যােগ দিয়েছিল ১৯৫৪ সনের ৮ সেপ্টেম্বর, বাগদাদ চুক্তিতে সই করেছিল ১৯৫৫সনের ২৩ সেপ্টেম্বর। ঐ যুদ্ধজোটে পাকিস্তানের যােগদান কোন আকস্মিক ঘটনা ছিল। মুসলিম লীগ শাসকগােষ্ঠী বরাবরই সাম্রাজ্যবাদ ঘেঁষা ছিল। পাকিস্তান প্রথম। থেকেই ধনবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির সহিত বন্ধুত্বের নীতি এবং ভারতের বিরুদ্ধে ‘শক্তিশালী মিত্র’ লাভের জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে দহরম-মহরম শুরু করে” (২০/১৩৮)। তথাপি সােহরাওয়ার্দীর পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে মওলানা ভাসানীর সমালােচনা কখনাে থামেনি। 

 আবু জাফর শামসুদ্দিন লিখেছেন, “পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীরূপে শহীদ সােহরাওয়ার্দী সাহেব প্রথম ঢাকায় আসেন ১৯৫৬সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তারিখে। পল্টন মাঠে। এক বিরাট জনসভার আয়ােজন করা হয়। সভাপতি মওলানা ভাসানী। প্রধান বক্তা শহীদ সােহরাওয়ার্দী। সভাপতির বক্তৃতায় মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের ম্যান্ডেট পূরণ না করলে সােহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভাকে লাথি মেরে বিতারিত। করা হবে। সােহরাওয়ার্দী সাহেব তখন একই মঞ্চে পাশাপাশি বসা। অশালীন উক্তি আমার ভালাে লাগেনি। দেশের ভবিষ্যৎ ভেবে শঙ্কাবােধ করেছিলাম। সােহরাওয়ার্দী সাহেবের প্রতি শেখ মুজিবুর রহমানের আনুগত্য ছিল সন্দেহাতীত। দলে শেখ মুজিবুর রহমানের রিক্রুটদের সংখ্যাধিক্য হয়তাে ছিল। কিন্তু মওলানা ভাসানীর প্রতি অনুগত কর্মীদের সংখ্যাও ছিল যথেষ্ট। শেষােক্তদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী লােকজনও ছিলেন” (৫/২৮২)। প্রকাশ্য জনসভায় স্ব-দলীয় প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করে মওলানা ভাসানী কোন মহৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চেয়েছিলেন কিংবা পেরেছিলেন, এটা যথার্থই। রাজনৈতিক গবেষণার বিষয় হতে পারে। 

  কাগমারী আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি সম্মেলন : 

 ন্যাপের জন্ম এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির দ্বৈরথ 

  ১৯৫৬সালের ডিসেম্বরে মওলানা ভাসানী স্থির করেন যে, ফেব্রুয়ারি মাসে কাগমারীতে একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সম্মেলন আহ্বান করবেন। তার আগেই তিনি নির্ধারণ করেছিলেন, আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে ১৯৫৭ র ফেব্রুয়ারি মাসের ৭-৮ তারিখে, টাঙ্গাইলের সন্তোষের কাছে অবস্থিত কাগমারী গ্রামে। তদনুসারে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের পরেই ৮ ফেব্রুয়ারি বিকাল থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি সারা রাতব্যাপী সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রায় যােগাযােগ-বিচ্ছিন্ন একটি গ্রামে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী সাহিত্যিক-শিল্পী-সংস্কৃতিসেবীদের অংশগ্রহণের ফলে আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি সকলের সপ্রশংস মনােযােগ আকর্ষণ করেছিল। তবে অনস্বীকার্য যে, কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন পূর্ব বাংলার বিকাশমান জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক শিবিরে অনিবার্য বিভাজনের সূচনা করেছিল। 

 মওলানা ভাসানীর একান্ত নিজস্ব চিন্তাতেই কাগমারীতে সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। আবু জাফর শামসুদ্দিন তাঁর ‘আত্ম-স্মৃতি  (১ম খণ্ড) গ্রন্থে কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলনের প্রায় অনুপুঙ্খ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। “১৯৫৬ সালের শেষের দিকে কোনাে একদিন আমরা কিছু লােক ইয়ার মােহাম্মদ খানের বাড়িতে  মওলানা সাহেব একটি সাংস্কৃতিক সম্মেলন করার প্রস্তাব দিলেন। তিনি নিজেই আমাকে আহ্বায়ক করে একটি প্রস্তুতি কমিটি করে দেন। কমিটিতে অন্য সদস্যরা ছিলেন (১) কাজী মােহাম্মদ ইদরিস (২) খন্দকার মােহাম্মদ ইলিয়াস (৩) খায়রুল কবির (৪) ফকীর শাহাবুদ্দিন আহমদ (৫) ইয়ার। মােহাম্মদ খান এবং (৬) সদরি ইস্পাহানি। শেষােক্ত দু’জনকে করা হয় যুগ্ম। ট্রেজারার। আমরা মওলানা সাহেবকে কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার জন্যে অনুরােধ। জানালে তিনি রাজি হন। মওলানা সাহেব সম্মেলনকে একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সম্মেলনে পরিণত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন” (৮/২৮৭-২৮৮)। 

  পূর্ব বাংলার আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানী সর্বতভাবেই সুপরিচিত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদরকে এমনকি দলীয় অফিসটিকেও দূরে রেখেই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। “বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে যখন প্রবল মতবিরােধ চলছে, তখন উভয় পক্ষ চরম মীমাংসার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকেন। ইতিপূর্বেই সােহরাওয়ার্দী সাহেব প্রদত্ত টাকায়  তােফাজ্জল হােসেনের সম্পাদনায় দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশিত হয়েছিল। দৈনিক ইত্তেফাক মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করে। এসময় মুসলিম লীগার অ্যাডভােকেট তােফাজ্জল আলীর ছােট ভাই ইসকান্দর আলী ঢাকা হতে দৈনিক ইত্তেহাদ’ পুনরায় প্রকাশ শুরু করেন। কাজী মােহাম্মদ ইদরিস সম্পাদক নিযুক্ত হন।  ইত্তেহাদ’ মওলানা ভাসানীকে সমর্থন করতাে” (৮/২৮৩-২৮৪)। ইত্তেহাদ’ অফিসেই সাংস্কৃতিক সম্মেলনের প্রাথমিক অস্থায়ী কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল। 

 “সম্মেলন উপলক্ষে টাঙ্গাইল হতে কাগমারী পর্যন্ত অনেকগুলাে সংবর্ধনা তােরণ নির্মিত হয়। মওলানা মােহম্মদ আলী তােরণ, মহাত্মা গান্ধী সুভাষ বসু , চিত্তরঞ্জন দাশ , মওলানা শওকত আলী , সূর্যসেন , সিরাজদ্দৌলা , ক্ষুদিরাম , বিধান রায় .নামের তােরণগুলাের কথা এখনাে মনে পড়ে। মওলানা। আজাদ তােরণও সম্ভবত তৈরি হয়েছিল” (৮/২৯২)। তবে “Visitors coming to Kagmari could not have failed to notice that the first ceremonial gate was named after President Iskander Mirza who, as Governor of East Bengal in 1954, had publicly threatened to shoot Bhasani,  The man in charge of the Finance Committee was Sadri Ispahani, an industrialist friend of Iskander Mirza As an extremely crafty political operator, he (Mirza) could resort to any device to cause an internecine strife within the Awami League  Iskader Mirza s ultimate target was Suhrawardy” (১৭/৭৮)। 

 কাগমারী সম্মেলনের বিপুল ব্যয়ের বিভিন্ন উৎস সম্পর্কে আবু জাফর শামসুদ্দিন উল্লেখ করেছেন:“তিন দিনব্যাপী সম্মেলনে যােগদানকারী সকলের জন্যে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা মওলানা সাহেব নিজেই করেছিলেন। তাঁর মুরিদান এবং ভক্তগণ গরু খাসি চাল ডাল মরিচ মসলা নিয়ে এসেছিলেন। ইয়ার মােহাম্মদের কাছে। শুনেছি, সােহরাওয়ার্দী সাহেবের কেন্দ্রীয় সরকার কাগমারী সম্মেলনের জন্যে নাকি ৫০,০০০ টাকা দিয়েছিলেন। আতাউর রহমান তখন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী। টাকাটা নাকি তাঁর কাছে এসেছিল। প্রস্তুতি কমিটির কাছে সে টাকা আসেনি। যুগ্ম ট্রেজারার সদরি ইস্পাহানি এবং ইয়ার মােহাম্মদ খান সে টাকা পেয়েছিলেন কিনা অথবা সে টাকা প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা নিজেরাই সম্মেলনের জন্য ব্যয় করেছিলেন 

  ১১৪ 

  নাকি মওলানা সাহেবকে দেওয়া হয়েছিল কিছুই অবগত ছিলাম না। সদরি। ইস্পাহানি ৫০০০ টাকা ব্যক্তিগত চাঁদা দিয়েছিলেন খায়রুল কবির পরে আমাকে জানিয়েছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট ইসকান্দর মির্জা নাকি সম্মেলনের জন্য মওলানা সাহেবকে আলাদাভাবে ২৫০০০ টাকা পাঠিয়েছিলেন। আমার ধারণা, টাকাটা সদরি ইস্পাহানির মারফত এসে থাকবে। আমার কাছে যে দশ হাজার টাকা মওলানা সাহেব জমা রেখেছিলেন, সেটিও নাকি সদরি ইস্পাহানি দিয়েছিলেন” (৮/২৯২-২৯৩)। 

 উদ্যোগে-সফলতায় যথার্থই বিরাট কাগমারী সম্মেলনের মাধ্যমে অব্যবহিত পূর্বগামী আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশনের ওপর একটা প্রবল মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, এ-সত্য অনস্বীকার্য। অধিকতর বাড়তি চাপ সৃষ্টির জন্যই মাত্র একমাস আগে, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে “the left-wing elements both inside and outside the Awami League had organized a youth festival at Rangpur to rally support for a movement against the  imperialist pacts . But if Bhashani and his leftist adhearents had hoped that they would carry the day at the Kagmari conference, they were bitterly disappointed by the outcome” (১৭/৭৭)। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের “ভাড়াটে লােকজন আওয়ামী লীগ কাউন্সিলারদের ভিতর সােহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার প্রতিক্রিয়াশীল বিদেশনীতির পক্ষে নানাভাবে প্রচার চালিয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী সামরিক জোটে পাকিস্তানের যােগদানকে যুক্তিসঙ্গত বলে জাহির করার জন্য ঢাকাস্থ মার্কিন ইনফরমেশন সার্ভিস সােভিয়েত-বিরােধী কুৎসাপূর্ণ কয়েকটি চলচ্চিত্র কাগমারীতে প্রকাশ্যে প্রদর্শনের আয়ােজনও করেছিল” (২০/১৬২)। অর্থাৎ দৃশ্যতই জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রবল বাম-ডান চাপের মধ্যেই আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। 

 কাগমারীতে ৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভায় প্রায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছিল, পরের দিন কাউন্সিল সভার প্ল্যানারি সেসন’এ বিতর্কিত বৈদেশিক চুক্তিগুলির বিষয় আলােচনায় তােলা হবে না। অথচ কাউন্সিল-সভার উদ্বোধনী অধিবেশনেই “Bhashani denounced the pacts and warned that if the central government failed to ensure autonomy to the eastern wing East Pakistan would be obliged to say Assalamu Alaikum .” “good-bye  to Pakistan. Rhetoric aside, Bhashani took no steps to raise formally the issue of Pakistan s membership of the military pacts (১৭/৭৭)। প্রদেশে এবং কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সরকারের যথেষ্ট জনপ্রিয়তা সম্পর্কে ভাসানী অবহিত ছিলেন বলেই হয়তাে আওয়ামী লীগের মূল-ধারা থেকে 

  ১১৫ 

  বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার সরাসরি ঝুঁকি তিনি নিতে চাননি। স্মরণযােগ্য যে, কাগমারীতে (১৯৫৭) পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে ‘আস্ সালামু আলায়কুম’ বললেও ১৯৬৩ সালে। সেনা-শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত জনগণকে তিনিই বলেছিলেন, “ডােন্ট ডিস্টার্ব আয়ুব’। 

 খােকা রায় লিখেছেন, কাউন্সিল বৈঠকে “মওলানা ভাসানী বিদেশ নীতি সম্পর্কে কোন প্রস্তাব বা বক্তব্য পেশ করেন নাই। বৈঠকে সােহরাওয়ার্দী সাহেবের বিদেশ নীতির পক্ষে বা বিপক্ষে কোন সিদ্ধান্ত হয় নাই”(২০/১৬৩)। তবে কাউন্সিল বৈঠকে রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতার বাইরে গিয়েই প্রধানমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দীর প্রতি নির্দেশ করে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সমবেত প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “আপনারা যারা দলের মেরুদণ্ড, গরিবের রক্ত জল করে যারা দল গড়েছেন, তারা বড় না এই ভদ্রলােকটি বড়? আপনারা শহীদকে প্রধানমন্ত্রী করেছেন, তাই শহীদ আজ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। আপনারা পেছন থেকে সরে গেলে এ ভদ্রলােককেও সরে যেতে হবে। তাই আপনাদের নির্দেশ, পার্টির সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে মানতেই হবে”(১৯/৯৫)। অর্থাৎ বিদেশ-নীতি সংক্রান্ত কোনাে প্রস্তাব না তুললেও দলীয় নেতৃত্বের অন্তর্দ্বন্দ্বের বিষয়টাকে ভাসানী প্রকটভাবেই সামনে এনেছিলেন। 

 কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলনে পাকিস্তান, ভারত, ব্রিটেন, আমেরিকা, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশেরই জ্ঞানী-গুণী-সংস্কৃতিজনেরা এসেছিলেন। অথচ সম্মেলনের পরেই, করাচির ‘ডন’ এবং ঢাকার ‘আজাদ  পত্রিকায় “মওলানা ভাসানী এবং সম্মেলনের বিরুদ্ধে দ্বিখণ্ডিত বাংলাকে যুক্ত বাংলা করার অভিযােগ উত্থাপিত হলাে সােহরাওয়ার্দী সাহেব করাচি ফিরে ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে এক সুদীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযােগ খণ্ডন করলেন। দৈনিক ‘ইত্তেহাদ  পত্রিকায় ১৯৫৭সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি পূর্ণ বিবৃতিটি ছাপা হয়” (৮/২৯৬)। সােহরাওয়ার্দীর মূল কথাটি ছিল “মওলানা ভাসানী কখনই পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি প্রদান করেন নাই”। একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, বারবার স্থূলভাবেই রাজনৈতিক কটাক্ষ-অপমানের শিকার হলেও সােহরাওয়ার্দী কখনাে ভাসানীর প্রতি রাজনৈতিক দায়িত্ব এবং সৌজন্য-শােভনতা এড়িয়ে যাননি। 

 কাগমারী সম্মেলনের আহ্বায়ক আবু জাফর শামসুদ্দিন অনেক বছর পরে একটি তাৎপর্যবহ মন্তব্য করেছিলেন, “সম্মেলন শেষ হওয়ার পর বিষয়টা নিয়ে ভেবেছি। নানা সূত্র থেকে অনেক তথ্য কানে এসেছে। সম্মেলন পরবর্তী ঘটনাবলীও দেখেছি। আজ নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, ভাসানী সােহরাওয়ার্দী উভয় গ্রুপের মধ্যে শত্রুপক্ষের এজেন্ট ছিল। ওরা ডবল এজেন্টের কাজ করেছিল। অবশ্য কিছু কিছু সৎ অতি-উৎসাহী কর্মীও ছিলেন। যারা কোন সময় কতটা অগ্রসর হওয়া উচিত তদ্বিষয়ে সজাগ ছিলেন না” (৮/২৯৭)। কাগমারী সম্মেলনের ব্যর্থতা’ ভাসানীকে 

  ১১৬ 

  যথার্থই ত্যক্ত-বিরক্ত করেছিল, উপলব্ধি করেই মুজিব ভেবেছিলেন, ভাসানী এমন কিছু করে বা বলে ফেলতে পারেন, যাতে পরিণামে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এমনকি আসন্ন ২১শে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচিও বিঘ্নিত হতে পারে। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুজিব ১৬ ফেব্রুয়ারি ভাসানীর সাথে সাক্ষাৎ করতে তাঁর সন্তোষের বাড়িতে গিয়ে, হুজুর সম্বােধন করে বিস্তারিত আলােচনা করেন। কিন্তু বিশেষ সুফল মেলেনি। 

 শহীদ দিবসের (২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৮) পরেই অলি আহাদ তৎপর হয়ে ভাসানীকে বুঝাতে পেরেছিকেন যে, “It was Mujib s control of the party apparatus as General Secretary that was largely to blame for the rout of the Bhashani camp at Kagmari. Once Mujib was removed from his position as General Secretary, the Bhashani faction would be able to regain the initiative and fight with renewed strength for their objectives” (১৭/৭৯)। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের বিধান ছিল, এক সাথে দলের নির্বাহী কমিটি এবং মন্ত্রিসভার সদস্য থাকা যাবে না। কিন্তু আতাউর রহমান এবং শেখ মুজিবসহ অনেকেই উভয় পদে নিয়ােজিত ছিলেন। অলি আহাদ নিঃসংশয় ছিলেন, এবিষয়ে প্রশ্ন তুললে মুজিব সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়েই মন্ত্রিত্ব করবেন। সেই পদটি তখন সহজেই অলি আহাদ পেয়ে যাবেন। ভাসানীকে নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে অলি আহাদ ৬-১৭মার্চ,১৯৫৭, দেশের বিভিন্ন এলাকায় দলীয় সভা করে ফিরে এসেই জানলেন যে, ভাসানী ইতােমধ্যে দলীয় সভাপতি হিসেবে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। 

 কাগমারী সম্মেলনের পরে “আতাউর রহমান মন্ত্রিসভার প্রতিও মওলানা সাহেব বিরূপ হইয়া উঠেন। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে তিনি প্রকাশ্যভাবে বলিতেন যে, আতাউর রহমান মন্ত্রিসভা ২১-দফার খেলাফ কাজ করিতেছেন। কথাটা সত্য ছিল না। মওলানা সাহেব স্বভাবতই সরকার-বিরােধী মনােভাবের লােক বলিয়া মাত্রাছাড়াভাবে তিনি নিজের দলের সরকারের নিন্দা করিতেন। তাতে আতাউর রহমান সাহেব ত অসন্তুষ্ট হইতেনই শহীদ সাহেবও হইতেন। এই বিরােধে ইন্ধন যােগাইবার লােকেরও অভাব ছিল না” (৪/৪৮৭-৪৮৮)। 

 আওয়ামী লীগে চূড়ান্ত বিভেদ-ভাঙ্গন সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট মির্জা কোনাে যুক্তিগ্রাহ্য কারণ ছাড়াই মওলানা ভাসানীকে গ্রেফতার করার জন্য প্রধানমন্ত্রী সােহরাওয়ার্দীর ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু “শহীদ সাহেবকে দিয়া মওলানাকে আক্রমণ করাইতে পারিলেন না। কাজেই তিনি (মির্জা) মওলানাকে দিয়া শহীদ সাহেবকে আক্রমণ করাইবার আয়ােজন করিলেন। হঠাৎ মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতির পদে ইস্তফা দিলেন। মওলানা সাহেবের ঘনিষ্ঠ বলিয়া পরিচিত দুইজন আওয়ামী-নেতা একজন পূর্ব-পাকিস্তানি শিল্পপতিসহ ইতােমধ্যে #সিডেন্টের (সভাপতি, মওলানা ভাসানী) সাথে দেখা করিয়া গিয়াছেন। মওলানা 

  ১১৭ 

  সাহব মনে মনে এইরূপ সিদ্ধান্ত করিয়াই ফেলিয়াছিলেন যে, হয় তিনি সােহরাওয়ার্দী-হীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব করিবেন, নয় ত তিনি আলাদা পার্টি করিবেন। এটা আমি বুঝিতে পারি হাসপাতালে তাঁর (ভাসানী) সাথে আলাপ করিয়া” (৪/৪৯০-৪৯১)। 

 মওলানা ভাসানী “পদত্যাগের ঘােষণাটি করিয়াছিলেন নজিরবিহীন গােপনীয়তার সাথে। আতাউর রহমান-মুজিবুর রহমান কাউকে না দেখাইয়া বামপন্থী খবরের কাগজে ( সংবাদ’ সম্পাদক জহুর হােসেন চৌধুরীর কাছে) পৌঁছাইয়া দিবার ওয়াদা করাইয়া তিনি উহা মি. অলি আহাদের হাতে দেন। মি. অলি আহাদ সরল বিশ্বস্ততার সাথে অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করেন। একাজে তিনি মওলানা সাহেবের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য দেখাইয়া থাকিলেও প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্য ভঙ্গ করিয়াছেন,.. মওলানা সাহব তখন হাসপাতালে। আমিও। প্রধানত আমারই প্রস্তাবে মওলানা সাহেবকে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করিতে অনুরােধ করিয়া (ওয়ার্কিং ও পার্লামেন্টারি কমিটির যৌথ বৈঠকে) সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। কখনাে আমি ও মুজিবুর রহমান একত্রে, কখনাে আমি একা মওলানা সাহেবকে ইস্তফা প্রত্যাহারের অনুরােধ-উপরােধ করি। কিন্তু মওলানা অটল। যা হয় কাউন্সিল মিটিংএ হইবে, এই তাঁর শেষ কথা” (৪/৪৯১-৪৯২)। 

 “কাউন্সিল মিটিং-এ তিনি (ভাসানী) জয়লাভ করিবেন, এটা তিনি আশা করিলেও নিশ্চিত ছিলেন না। সেজন্য আগেই তিনি মিয়া ইফতিখারুদ্দিন ও জি এম সৈয়দ প্রভৃতি পশ্চিম পাকিস্তানি বামপন্থী নেতৃবৃন্দ ও শহীদ সাহেব কর্তৃক বিতাড়িত সাবেক আওয়ামী লীগ (নিখিল পাকিস্তান) সেক্রেটারি মি. মাহমুদুল হক ওসমানীর সাথে গােপন পরামর্শ করিতে থাকেন। একদিন হাসপাতালে ফিরিয়া আসিয়া শুনিলাম, ইতােমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা মওলানা সাহেবের সাথে পরামর্শ করিয়া গিয়াছেন। এটা চলে পর-পর কয়দিন” (৪/৪৯২)। “At this special conference, held in Dhaka in mid-June (13-14h) 1957, both Suhrwardy and Bhashani spoke at length about their ideas on foreign policy. The conference approved Suhrwardy s foreign policy by an overwhelming majority.This did not satisfy Bhashani and he insisted upon another vote. This time Surhwardy won by a much greater margin of votes : 800 to 35”(17/80) 

 তারপরেও “কাউন্সিল মওলানাকে ইস্তফা প্রত্যাহারের অনুরােধ করেন। মওলানা তদুত্তরে ন্যাপ গঠন করেন। ন্যাপ গঠনে প্রেসিডেন্ট মির্জার হাত ছিল, এতে আমার কোনও সন্দেহ নাই” (৪/৪৯২)। ভাসানী অনুগত অলি আহাদও পরবর্তী সময়ে মন্তব্য করেছেন, “Around that time he was so full of rage against Suhrwardy that it blotted out all reason and he succumbed to an amorous 

  ১১৮ 

  embrace with Iskander Mirza. And because of this he did not hesitate to take one disastrous step after another. This is how the split in the Awami League was brought about” (১৭/৭৮-৭৯)। বিভক্ত দলটির মূল-ধারা রইলাে আওয়ামী লীগ নামেই আর মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে বিচ্ছিন্ন অংশটি সংগঠিত হলাে ‘ন্যাপ’ (National Awami Party) নামে। ইতিহাসের ধারাপথ বেয়ে আওয়ামী লীগ এখনাে এ দেশের মূলধারার প্রধান রাজনৈতিক শক্তি আর ক্রমাগত বিভক্তি-বিচ্ছিন্নতায় ‘ন্যাপ’ কার্যত হারিয়েই গেছে। আওয়ামী লীগের ভিতরে “মওলানা ভাসানীর সঙ্গে ছিলেন সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যাদর্শে বিশ্বাসী কিছু যুবকর্মী। অবশ্য ভণ্ড সমাজতন্ত্রীদেরও অনেকে স্থান করে নিয়েছিলেন। সােহরাওয়ার্দী সাহেব ছিলেন ব্রিটিশ-টাইপ পুঁজিবাদী পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী।  আওয়ামী লীগের ভাঙ্গন এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির উদ্ভবের মধ্যে ছদ্মবেশী মােনাফেকদেরও বড় রকমের ভূমিকা ছিল। মত ও পথের মেরুকরণ ১৯৪৮সালেই শুরু হয়” (৮/২৯৭-২৯৮)। বামপন্থী রাজনীতির দোহাই দিয়ে গঠিত ‘ন্যাপ’ (জুন, ১৯৫৭) এক বছর পরেই ডানপন্থীদের সাথে মিলে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার পতন ঘটায়। প্রকৃতপক্ষে এটাই ছিল আওয়ামী লীগ ভাঙ্গনের পরােক্ষ কুশলী আর প্রত্যক্ষ কুশিলবদের প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য। 

 “১৯৫৮সনের জুন মাসে কে.এস.পি. নেতা আবু হােসেন সরকার পূর্ব পাকিস্তান আইন সভায় আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে এক অনাস্থা প্রস্তাবের নােটিশ দিয়েছিলেন। সেই সময় ঢাকাতে মওলানা ভাসানী, খান আব্দুল গফফার খান, জি.এম. সৈয়দ প্রমুখদের উপস্থিতিতে ন্যাপের বৈঠক হতে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে ভােট দেওয়ার জন্য আইন সভার ন্যাপ সদস্যদের প্রতি এক নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। কেএসপি, নেজামে ইসলাম, মুসলিম লীগ জোট এবং তার সাথে আইনসভার ন্যাপ সদস্যদের ভােটে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়েছিল। ইস্কান্দর মির্জার চক্রান্তে (পূর্ব বাংলায়) আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার পতন ঘটেছিল। ১৯৫৮ সালের ১৯শে জুন পূর্ব পাকিস্তানে আবার গণ-বিরােধী আবু হােসেন সরকার মন্ত্রিসভা ক্ষমতায় বসেছিল” (২০/১৬৮)। উল্লেখ্য যে অনাস্থা প্রস্তাবের ভােটাভুটিতে আতাউর রহমান মন্ত্রিসভার পক্ষে ছিল ১২৪টি ভােট আর বিপক্ষে ১৩৬টি, অর্থাৎ ১২টি ভােটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার পতন ঘটেছিল। 

 গােপনে পরিচালিত ক্যুনিস্ট পার্টি তখনই উপলব্ধি করেছিল যে, আওয়ামীরাজনীতির কিছু নেতিবাচকতা থাকা সত্ত্বেও ইতিবাচক অবদান অনস্বীকার্য। “আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারী শাসন-প্রতিষ্ঠা ও নির্বাচন বানচাল করার জন্য (উদ্যোগী) প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জার চক্রান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে, ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রসার করেছিল এবং সারা পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের পক্ষে 

  ১১৯ 

  দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল। আওয়ামী লীগ বস্তুনিষ্ঠভাবে জনস্বার্থের অনুকূল ছিল। কমুনিস্ট পার্টি তখন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা কায়েম থাকা একান্ত প্রয়ােজন বলে মনে করেছিল। তাই মন্ত্রিসভার পতনের পরেই কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের সাথে এক বৈঠকে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভাকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সে সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর ২১জুন তারিখে প্রাদেশিক আইনসভায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আবু হােসেন মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে এক অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে প্রাদেশিক আইনসভার ২১/২২জন কমুনিস্ট সদস্যদের ভােটেই আবু হােসেন মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে পাল্লাটা ভারী হয়ে গিয়েছিল। আবার আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা কায়েম হয়েছিল”(২০/১৬৯-১৭০)। অর্থাৎ মাত্র দু দিনের মাথায় কেএসপি-ন্যাপমুসলিম লীগ-নেজামে ইসলামীর ষড়যন্ত্রের উদ্যোগটা বুমেরাং হয়ে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, এবার শেরে বাংলাকেও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছিল। কেএসপি’র উদ্যোগে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার পতন ঘটার সঙ্গেসঙ্গেই ক্ষুব্ধ সােহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরােজ খান নুনের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের চাপ প্রয়ােগ করায়, নুন পূর্ব বাংলার গভর্নর পদ থেকে ফজলুল হককে সরিয়ে হামিদ আলীকে গভর্নর বানিয়েছিলেন। 

 আওয়ামী লীগ-ন্যাপ বিভাজন সম্পর্কে কেউ বলেন, এটা ছিল ভিন্নমুখী রাজনৈতিক আদর্শের সংঘাত, আর কেউ এজন্য দায়ী করেন মুজিবকেই। যদিও “Mujib had always kept his line of communication open with Maulana Bhashani, for whom he had considerable respect.  Mujib felt that Bhashani s heart was in the right place, on the side of the oppressed peasantry and workers, and if he occasionally slipped into a wrong track, it was mostly due to the counsel from his young advisers. Mujib called them ‘Theoriticians  Mujib s initiative paid off. In mid-September not only Bhashani, on be half of NAP, but Mahmud Ali of the leftist Ganatantri Dal, announced that they were in accord with the Awami League on all basic issues” (১৭/৮৮)। 

  ১২০ 

  পূর্ব বাংলার আইন পরিষদে-গােলযােগে নিহত ডেপুটি স্পিকার : 

 পাকিস্তানে সেনা-শাসনের উদ্যোগ-পর্ব 

  পূর্ব বাংলার আইন পরিষদের হট্টগােল-গােলযােগে আহত (২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৮)। ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীর মৃত্যুর ঘটনাটিকেই পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির প্রধান অজুহাত হিসেবে কাজে লাগানাে হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগ তখন পূর্ব বাংলায় ক্ষমতাসীন দল। প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ-বিরােধী উদ্যোগে ঘটনাটি যারা সংঘটিত করেছিলেন, তাঁরাই একে আওয়ামী লীগ এবং মুজিব-বিরােধী অপপ্রচারের অজুহাত হিসেবে কাজে লাগিয়েছিলেন। 

 “১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছিল। আইনসভার সে অধিবেশনকে বানচাল করার জন্য ইস্কান্দর মির্জার। সমর্থনপুষ্ট কে.এস.পি ও মুসলিম লীগ দল আইনসভার ভিতরেই মারপিট ও হাঙ্গামা বাঁধিয়ে দিয়েছিল। ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী গুরুতররূপে আহত। হয়েছিলেন। তিনি হাসপাতালে মারা গিয়েছিলেন। ইস্কান্দরী চক্রান্তে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা আবার জটিল আকার ধারণ করেছিল” (২০/১৭১)। পূর্ব বাংলার আইন পরিষদে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী হত্যা এবং কেন্দ্রীয় জোট সরকার থেকে আওয়ামী লীগ দলভুক্ত মন্ত্রীদের পদত্যাগের বিষয় দু’টিকে কাজে লাগিয়েই পাকিস্তানে প্রথম সামরিক শাসন-১৯৫৮  জারি করা হয়েছিল। এ দু’টি। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ বর্তমান আলােচনায় অপ্রাসঙ্গিক। তবে, হক-ভাসানীসােহরাওয়ার্দী-মুজিব’ সংশ্লিষ্ট ইতিহাসের তথ্য এবং সেনা-আমলা-চক্র প্রভাবিত ষড়যন্ত্রের রাজনীতি উপলব্ধির জন্যই সংক্ষেপে কিছু উল্লেখ করা যেতে পারে। আলােচ্য ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন ইস্কান্দর মির্জা আর সহযােগী ছিলেন বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে রাজনীতির ভেতরের এবং বাইরের অনেকেই। 

 ২০শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৮ স্পিকার আব্দুল হাকিম স্বাভাবিকভাবেই পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরু করেছিলেন। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই “সভাকক্ষে তুমুল হৈ চৈ 

  ১২১ 

  শুরু হলাে। প্রবল উত্তেজনাকর মুহূর্তে দেওয়ান মাহাবুব আলী (ন্যাপ) অকস্মাৎ স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব তুললেন। একদল ক্রুদ্ধ সদস্য স্পিকারের আসনের দিকে ধাবিত হলেন। তারা বললেন,  তাঁকে এই মুহূর্তে চলে যেতে হবে। আতাউর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমান এবং ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীসহ। অনেক সদস্য স্পিকারকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন।  বিশৃঙ্খল অবস্থা আয়ত্তে আনতে না পেরে স্পিকার .সভাকক্ষ ছেড়ে চলে গেলেন।  ডেপুটি স্পিকার (শাহেদ আলী)  অধিবেশন মুলতবি ঘােষণা করলেন।  ২৩শে সেপ্টেম্বর পার্লামেন্ট হাউসে রাইফেলস্ ও পুলিশের কড়া প্রহরা বসানাে হয়। বেলা তিনটায় অধিবেশন শুরু হলে ডেপুটি স্পিকার জনাব শাহেদ আলী আসন গ্রহণ করেন। সরকারি দল আওয়ামী লীগ তাকে স্বাগত জানায়। বিরােধী দলের সদস্যরা কেএসপি’র প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আবু হােসেন সরকার উত্তেজিতভাবে চিৎকার করে এ সময় বলেন, আপনি যদি এই মুহূর্তে বেরিয়ে না যান তবে আমরা আপনাকে খুন করে ফেলব। আপনার বিবি ও বাচ্চারা এবং আপনার সারা পরিবার ধংস হয়ে যাবে। কিন্তু শাহেদ আলী বিচলিত হলেন না। পরিষদে হাঙ্গামা বেঁধে গেল। হঠাৎ সবেগে নিক্ষিপ্ত কোন বস্তু তাঁকে আঘাত করলাে। তার ক্ষতস্থান থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হলাে। তিনি জ্ঞান হারিয়ে স্পিকারের আসনে লুটিয়ে পড়লেন”(১৯/১০১-১০২)। 

 ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন : ২৩ সেপ্টেম্বর “ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে হাউস শুরু হইল। মানে অপজিশন দলের হট্টগােল শুরু হইল। শুধু মৌখিক নয়, কায়িক।  অপজিশনের কেউ কেউ মঞ্চের দিকে ছুটিলেন। তাঁদেরে বাধা দিতে আমাদের পক্ষেরও স্বাস্থ্যবান শক্তিশালী দু-চারজন আগ বাড়িলেন। বসিয়া-বসিয়া এই মারাত্মক খেলা দেখিতে লাগিলাম। আমার হাতে রিভলভার থাকিলে আমি নিজের আসনে বসিয়া আক্রমণকারীদেরে গুলি করিয়া মারিতে পারিতাম। দেহরক্ষীরা চেয়ারের উপর চেয়ার খাড়া করিয়া ডেপুটি স্পিকারের সামনে প্রাচীর খাড়া করিয়া ফেলিয়াছিলেন। সে প্রাচীরটা ভেদ করিয়া হামলাকারীদের পাটকেল ডেপুটি স্পিকারের মাথায়-নাকে-মুখে লাগিতেছিল। পরের দিন (মতান্তরে, তিন দিন পরে) হাসপাতালে তিনি মারা যান। এই হত্যাকাণ্ডের আদালতী বিচার হয় নাই। আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করিতে গিয়া শাহেদ আলী নিহত হইল অপজিশনের ঢিল-পাটকেলে। অথচ পূর্ব বাংলার দুশমনরা তখনও বলিলেন এবং আজও বলেন ও আওয়ামী লীগই শাহেদ আলীকে হত্যা করিয়াছে। কোন্ পাপে এই মিথ্যা তহমত! (৪/৫৫৬-৫৫৮)। 

  ১২২ 

  ডেপুটি স্পিকার নিহত হওয়ার পরবর্তী দু’সপ্তাহে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিস্থিতিও জটিল হয়ে উঠেছিল। “সেই সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার আসনবন্টন (‘পাের্টফোলিও ) নিয়ে ফিরােজ খান নুনের সাথে আওয়ামী লীগ নেতাদের মতবিরােধ হয়েছিল। ১৯৫৮ সালের ২রা অক্টোবর আওয়ামী লীগ মন্ত্রীরা ফিরােজ খান নুনের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। ঐ অবস্থার সুযােগ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জা ‘দেশের রাজনৈতিক অবস্থার বিশৃঙ্খলা প্রতিরােধের অজুহাত দেখিয়ে ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর (প্রকৃতপক্ষে ৮ই অক্টোবর) দেশে সামরিক শাসন জারি করেছিলেন” (২০/১৭৩)। পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত ছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৯ খ্রি.। তবে মির্জা এবং সহযােগীরা ঠিকই বুঝতে পারছিলেন, জাতীয় নির্বাচনে, বিশেষত পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগের প্রবল প্রধান্য কমানাে যাবে না বরং বৃদ্ধি পেতে পারে। সুতরাং তাদের দিক থেকে নির্বাচন বন্ধ করাই জরুরি ছিল। পূর্ব বাংলায় ডেপুটি স্পিকারের হত্যাকাণ্ডের পর দরকার হলাে কেন্দ্রেও একটা অজুহাত তৈরি করা। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জা “সরল-সােজা আয়েশী প্রধানমন্ত্রী ফিরােজ নুনকে দিয়া বলাইলেন, আওয়ামীদের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ঢুকিতে হইবে। দায়িত্ব বহন করিতে হইবে”। আবুল মনসুর আহমদ আরাে লিখেছেন, “এসব কথায় আওয়ামী লীগনেতাদের কান না দেওয়া উচিত ছিল।  আওয়ামী লীগ মন্ত্রিত্বে অংশ না নিয়াই নুন-মন্ত্রিসভার সমর্থন দিবে এই চুক্তি হইয়াছিল। এই ত্যাগের বদলা, যুক্ত-নির্বাচন প্রথায় আগামী সনের ১৫ই ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হইয়াছে। আতাউর রহমান, মানিক মিয়া ও আমি বিরােধিতা করিলাম। যতদূর জানি লিডারও (সােহরাওয়ার্দী) এসময় মন্ত্রিত্বে যাওয়ার বিরােধী ছিলেন। মুজিবুর রহমানও আমার সাথে একমত ছিলেন। কিন্তু কেন জানি না,..মুজিবুর রহমান আমাদের কাউকে না জানাইয়া কয়েকজন হবু মন্ত্রী লইয়া হঠাৎ করাচি চলিয়া গেলেন। মন্ত্রিত্বের শপথ নিলেন। ভাল পাের্টফলিও পাওয়া গেল না বলিয়া চার-পাঁচ দিন পরে পদত্যাগ করিলেন। সেই রাত্রেই মার্শাল ল। প্ল্যানটা ছিল সুস্পষ্ট” (৪/৫৫৯-৫৬০)। 

 সম্পূর্ণ ভিন্ন বিবরণ মেলে এস.এ. করিমের লেখায় : “Chief Minister Ataur Rahman was also of the view that Awami League should also be there Suhrawardy was in quandary. But with elections only a few months away he thought it would be better for some Awami Leaguers to join the Noon Cabinet to prop it up against Mirza s manifest desire to bring it down. So, Suhrawardy directed Mujib to come to Karachi 

  ১২৩ 

  urgently to discuss Awami League participation in the Noon Ministry and election matters. Mujib arrived in Karachi with six Awami League aspirants  Chief Minister Ataur Rahman Khan and Manik Mian joined them the next day” (১৭/৯২)। দু টি উদ্ধৃতির তথ্য-সত্যের প্রকট ফারাক নজর এড়াবার নয়। তবে এবিষয়ে বিতর্কে না গিয়েও বলা চলে, ইস্কান্দর মির্জা কুশলী পরিকল্পনায় পূর্ব বাংলায় এবং কেন্দ্রে গণতান্ত্রিক শাসন অবসানের ‘অজুহাত সৃষ্টি করেছিলেন। পূর্ব বাংলায় ডেপুটি স্পিকার নিহত হওয়ার দু’সপ্তাহ পরেই ৭ অক্টোবর, ১৯৫৮ খ্রি. অর্থাৎ নুন-মন্ত্রিসভা থেকে আওয়ামী লীগ সদস্যদের পদত্যাগের দিনই রাত সােয়া দু টায় (৮ অক্টোবর) পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করা হয়েছিল। 

  ১২৪ 

  পাকিস্তানে সামরিক স্বৈরশাসন : 

 দমন-পীড়নের প্রধান টার্গেট’ মুজিব 

  “১৯৫৮ সালের ৮ অক্টোবর ইস্কান্দার মির্জা  পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র বাতিল ঘােষণা করে দেশে মার্শাল ল জারি করেছেন।  এজন্যই পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। এর শেষ কোথায়। ঢাকার জনসাধারণের মধ্যে কোনাে চাঞ্চল্য দেখলাম না। নেতারাও কেউ এর সঙ্গে যুক্ত আছেন কিনা কে জানে, শহীদ সােহরাওয়ার্দী, কাইয়ুম খান, ফিরােজ খান নুন সব কোথায়। মুজিব ! কি কোনাে কথা নেই-ত তাদের মুখে। মওলানা ভাসানী সম্ভবত হাসপাতালে চিকিৎসারত। ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়া ১২ই অক্টোবর তারিখের সম্পাদকীয় নিবন্ধে সামরিক শাসন সমর্থন করেছিলেন। আতাউর রহমান খান করাচিতে ইস্কান্দার মির্জার সাথে দেখা করেছেন কাল (১২ অক্টোবর, ১৯৫৮), কেন, কি কথা হলাে?” (৮/৩২৯-৩৩২)। 

 সাত অক্টোবর রাতে করাচি থেকে যাত্রা করে ৮ অক্টোবর সকালে ঢাকায় নেমেই শেখ মুজিব সামরিক শাসন জারির কথা জেনেছিলেন। স্বভাবতই তিনি আশঙ্কা করলেন, তাকে আবার অনির্দিষ্ট কালের জন্য কারাগারে যেতে হবে। তাই তিনি পিতামাতার সাথে সাক্ষাতের জন্য অবিলম্বে গােপালগঞ্জে রওনা হয়ে যান। ১২ অক্টোবর তারিখে পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে শেখ মুজিবকে গােপালগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করে ঢাকায় আনা হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, হামিদুল হক চৌধুরী, আবুল মনসুর আহমদ এবং আব্দুল খালেককে আলাদা আলাদাভাবে নির্জন প্রকোষ্ঠে বন্দি রাখা হয়। ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, আব্দুল হামিদ চৌধুরী, কোরবান আলী এবং নুরুদ্দিন আহমদও এসময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন” (১৯/১০৫)। সামরিক আইন প্রশাসক (এবং প্রধানমন্ত্রীও) আয়ুব খান ঢাকায় এসে ২২ অক্টোবর। বিকালে স্টেডিয়াম মাঠে জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। আইয়ুব খান প্রেস কনফারেন্সও করেন। মওলানা ভাসানী সম্বন্ধে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে 

  ১২৫ 

  গিয়ে আয়ুব খান বলেন, যদি তিনি কোন অপরাধ করে থাকেন তবে প্রাদেশিক সরকার তার বিচার করবে। ব্যাপার কি ! ভাসানী সম্বন্ধে কি তার ধারণা তাহলে ভালাে? ..আশ্চর্যের বিষয়, ২৭শে অক্টোবর তারিখে রাত্রে এক জায়গায় কয়েকজন নেতৃস্থানীয় আওয়ামী লীগারের সঙ্গে দেখা হয়। ১৯৭০-৭১ সালেও তাদের অধিকাংশ আওয়ামী লীগার ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায়ও তাদের গৌরবজনক ভূমিকা ছিল। সেদিন রাতে তারা মার্শাল ল’র জন্যে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকেই দায়ী করেছিলেন। হয়তাে সেটি ছিল আত্মসমালােচনা (৮/৩৩৪-৩৩৫)। 

 যুক্তফন্ট মন্ত্রিত্বকালীন সময়ের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযােগ এনে মুজিবের বিরুদ্ধে এসময় ৮টি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এর মধ্যে সাতটি মামলায় তিনি নিরপরাধ প্রমাণিত হয়েছিলেন। কিন্তু স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত একটি মামলায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত তাকে দু বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার শাস্তি প্রদান (সেপ্টেম্বর, ১৯৬০) করে। এ-সংক্রান্ত আপিল মামলায় হাইকোর্টে শেখ মুজিবের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী। জুন, ১৯৬১ মামলাটিতে জেলা-কোর্টের রায় খারিজ হয়ে যায়। উল্লেখ্য যে, এর আগেই সাতটি মামলায় নিরপরাধ প্রমাণিত হয়ে ডিসেম্বর, ১৯৫৮ মুজিব কারামুক্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে গােয়েন্দা এবং পুলিশের নিবিড় নজরদারিতে রেখে ঢাকার বাইরে যাবার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরােপ করা হয়েছিল। 

 “Mujib could have secured his release earlier had he agreed to sign a bond renouncing political activity as a number of detainees had done, but politics was in his blood and he had no intention of giving it up” (১৭/৯৭)। সেনা-শাসনের শুরুতেই শেখ মুজিব ছাড়াও মামলা হয়েছিল অনেক আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধেও। আবুল মনসুর আহমদের ক্ষুব্ধ মন্তব্য : “আমরা আসামিরা সবাই আওয়ামী লীগার। আওয়ামী লীগাররাই দুর্নীতিবাজ এটা দেখানােই এই সব কেসের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। শেষ পর্যন্ত আদালতের বিচারে কারাে বিরুদ্ধেই কোনাে মামলা টিকে নাই। কথায় বলে, ভালরূপ কাদা ছুড়িতে পারিলে, কাদা গেলেও দাগ থাকে” (৪/৫৭২)। এক্ষত্রে পাকিস্তানি সেনা-আমলা চক্র সাময়িক সফলতাও পেয়েছিল। সেনা-শাসন জারি করে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা প্রধান সেনাপতি আয়ুব খানকে বানিয়েছিলেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং প্রধানমন্ত্রীও। এই আয়ুব খানই মাত্র ২০দিনের মাথায় ২৭ অক্টোবর মধ্য রাতে তিনজন জেনারেলকে পাঠিয়ে অস্ত্রের মুখে ইস্কান্দার মির্জাকে পদত্যাগ করে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিলেন। এক্ষেত্রে আইয়ুবের মূল সহায়ক ছিলেন আজম খান এবং পরামর্শদাতা ইয়াহিয়া খান। ২৭ 

  ১২৬ 

  অক্টোবর প্রধান সেনাপতি আইয়ুব খান নিজেকেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘােষণা করে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করেছিলেন। মির্জার মন্ত্রিসভার সকল সদস্যকে বহাল রেখেই তিনজন নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে আইয়ুবের মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছিল। তবে আইয়ুবের মন্ত্রিসভায় কোনাে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। 

 আইয়ুব খান পূর্ব বাংলায় একে একে গভর্নর বানিয়েছিলেন জেনারেল আজম খান(জুন, ১৯৬০), অতঃপর পশ্চিম পাকিস্তানি আমলা গােলাম ফারুক (মে, ১৯৬২) এবং সবশেষে (অক্টোবর, ১৯৬২) ময়মনসিংহের উকিল আব্দুল মােনায়েম খানকে। “Monem Khan s principal characteristick was his unabashed servility toward Ayub Khan  In spite of black marks on his records, or perhaps because of them, he was considered a suitable Governor for East Pakistan” (১৭/১০৫)। পূর্ব বাংলায় তদানীন্তন সময়টা মূলত ‘আইয়ুব-মােনায়েম আমল’ পরিচয়েই কুখ্যাত হয়ে আছে। গভর্নর মােনায়েম খান চরম শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন শেখ মুজিবকে “In him (Mujib) Monem Khan saw his principal political antagonist in East Pakistan. Mujib could not be tempted by inducements of office or material rewards to give up his opposition to the Ayub rgime (১৭/১০৬)। মােনায়েম ভেবেছিলেন, প্রচণ্ড ভয় দেখিয়েই মুজিবকে সামলাতে হবে। ১৯৬০-দশকের মধ্যভাগ থেকে শেখ মুজিব সামরিক শাসন-বিরােধী কর্মকাণ্ড জোরদার করায় মােনায়েমও তাঁকে সম্ভাব্য সকল প্রকার অত্যাচার-অপমানের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিলেন। 

  ১২৭ 

  সহযােগী শক্তির সন্ধান শেখ মুজিব : 

 নতুন রাজনৈতিক চিন্তা  স্বাধীন বাংলাদেশ  

  ১৯৬১ সালের জুন মাসে কারামুক্তির পর থেকেই শেখ মুজিব পাঞ্জাব-প্রভাবিত পাকিস্তান এবং সেনা-শাসক আইয়ুবের গণতন্ত্রের কথাবার্তা সম্পর্কে আস্থা হারিয়ে ফেলতে থাকেন। “He felt that the situation cried out for a radical approach. For the first time in his life he began to entertain seriously the thought of secession from Pakistan and the establishment of an independent government in East Pakistan  So he needed like-minded allies outside his party to advance toward his objective. He decided to sound out the Communists to find out whether they were inclined to his way of thinking” (17/97)। এক্ষেত্রে তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তার সমর্থন-সহায়তার জন্য কম্যুনিস্ট পার্টির কথাই ভেবেছিলেন। কিন্তু কেন? 

 শেখ মুজিব জানতেন, বিভাগ-পূর্বকালে কম্যুনিস্ট পার্টিই ছিল একমাত্র সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল, যারা মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে সবার আগেই তাদের মােহভঙ্গ ঘটেছিল। ব্রিটিশ আমলে এবং পাকিস্তানের শুরুতেও সরকারি রােষের কারণে ‘আন্ডার গ্রাউন্ড দল পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকায়, দল হিসেবে ছােটোবড় যা-ই হােক না কেন, জনসাধারণের মধ্যে, বিশেষত, পল্লী-অঞ্চলে কম্যুনিস্ট পার্টির প্রসারিত গণ-ভিত্তি ছিল। শেখ মুজিব রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই শহর-গ্রামের ব্যাপক জনগােষ্ঠীর সাথে সংযােগ প্রতিষ্ঠা এবং রক্ষায় অভ্যস্ত ছিলেন বলে কম্যুনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক ভিত্তি, এবং তৎপরতার বিষয়গুলি ভালােভাবেই অবহিত ছিলেন। ভাষাআন্দোলনে ‘গােপন ক্যুনিস্ট পার্টির প্রভূত অবদান ছিল। আওয়ামী লীগ  নামে সংগঠিত ধর্ম-নিরপেক্ষ দল হিসেবে সকলের জন্যই সদস্য পদ উন্মুক্ত করে দেবার পর থেকে নানাভাবেই আওয়ামী লীগ এবং ক্যুনিস্ট পার্টির যােগাযােগও বৃদ্ধি পেয়েছিল। সর্বশেষ, কেএসপি-ন্যাপ সদস্যদের সম্মিলিত অনাস্থা ভােটে আওয়ামী 

  ১২৮ 

  লীগ মন্ত্রিসভার পতনের (১৯৫৭) পরে সংসদে আওয়ামী লীগের পক্ষে কম্যুনিস্ট সদস্যদের ভােট দেবার সিদ্ধান্ত নেয়াতে দু’দিনের মধ্যেই আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা পুনর্বহাল হয়েছিল। 

 অপরদিকে, কম্যুনিস্ট পার্টির পর্যবেক্ষণ ছিল : “সামরিক শাসনাধীনে ব্যক্তিস্বাধীনতা পদদলিত হয়ে যে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শ্রেণীর জনগণের ভিতর স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে। বিক্ষোভ জমে উঠেছিল। সামরিক শাসন জারির পর সাধারণ মানুষের মনে যে মােহ দেখা গিয়েছিল, সে মােহ ক্রমে ক্রমে ভেঙ্গে যাচ্ছিল। ক্যুনিস্ট পার্টি এটাও উপলব্ধি করেছিল যে, বাস্তব অবস্থা আন্দোলনের অনুকূল হলেও পার্টির একার প্রচেষ্টায় তখন কোন আন্দোলন গড়ে তােলা সম্ভব ছিল না। আন্দোলন গড়ে তােলার জন্য কম্যুনিস্ট পার্টিসহ পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের ঐক্য, অন্তত আওয়ামী লীগ ও ক্যুনিস্ট পার্টির ভিতর ঐক্য বা সমঝােতা একান্ত প্রয়ােজন ছিল” (২০/১৮১)। সব মিলিয়ে কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতি শেখ মুজিবের আগ্রহ এবং পার্টির দিক থেকে আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থা-মনােযােগ ইত্যাদি কারণেই উভয়পক্ষের যােগাযােগ প্রতিষ্ঠার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চার-পাঁচটি গােপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। 

 ১৯৬১ সালের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত “সে সব বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ও মানিক মিয়া। কম্যুনিস্ট পার্টির পক্ষে উপস্থিত ছিলাম মণি সিংহ ও আমি। প্রতিক্রিয়াশীল আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন গড়ে তােলা একান্ত দরকার আমরা প্রথম বৈঠকেই একমত হয়েছিলাম। আন্দোলনের দাবি কি হবে, এবং আন্দোলন কিভাবে শুরু হবে, সে সম্পর্কে পরবর্তী ৩/৪টি বৈঠকে আলােচনার সময় শেখ মুজিবুর রহমান বারবার বলছিলেন যে, পাঞ্জাবের ‘বিগ বিজনেস’ যে ভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে শােষণ করছিল ও দাবিয়ে রাখছিল তাতে ‘ওদের সাথে আমাদের থাকা চলবে না। তাই এখন থেকেই স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে; তখন আমরা শেখ মুজিবকে বুঝিয়েছিলাম যে, কমুনিস্ট পার্টি নীতিগতভাবে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের দাবি সমর্থন। করে, কিন্তু সে দাবি নিয়ে প্রত্যক্ষ আন্দোলনের পরিস্থিতি তখনও ছিল না। মুজিব আমাদের জানিয়েছিলেন, ‘ভাই এবার আপনাদের কথা মেনে নিলাম। কিন্তু আমার কথাটা থাকলাে। বঙ্গবন্ধু ১৯৬১ সাল থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছিলেন” (২০/১৮২-১৮৩)। 

 পরবর্তী সময়ের সংবাদ’-সম্পাদক বজলুর রহমান উক্ত ‘সিরিজ’ সংলাপের প্রেক্ষাপট বর্ণনায় লিখেছেন, “শেখ মুজিব তখনাে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগের মুখ্য সংগঠক, বলতে গেলে প্রাণপুরুষ। শহীদ সােহরাওয়ার্দী তখনাে 

  ১২৯ 

  আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা। শেখ মুজিব তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন, মানতেন; তার কথা ছিল তখনাে আওয়ামী রাজনীতির শেষ কথা। তবু তরুণ প্রজন্মের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ছিল লক্ষণীয়। সােহরাওয়ার্দী সাহেব তখনাে ছিলেন সারা পাকিস্তানভিত্তিক আন্দোলনের মারফত ‘গণতান্ত্রিক পাকিস্তানের চিন্তায় মােহাবিষ্ট। শেখ মুজিবুর রহমান কিন্তু তখনই বুঝে নিয়েছিলেন স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালির মুক্তি নেই এবং সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই রাজনীতির ধারা ঠিক করতে হবে। তােফাজ্জল হােসেন মানিক মিয়া ছিলেন দুয়ের মাঝামাঝি। সােহরাওয়ার্দী সাহেবের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও আনুগত্য ছিল নিঃশর্ত ও প্রশ্নহীন; কিন্তু গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের জন্য বাঙালির সংগ্রামকে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার পথেই যেতে হবে, এ কথা শেখ মুজিবের মত তিনিও মনে করতেন” (১(৩)/১২৭৪- ১২৭৫)। 

 কম্যুনিস্ট পার্টির সাথে আলােচনায় শেখ মুজিব আস্থার সাথেই উপলব্ধি করেছিলেন, নতুন রাজনৈতিক চিন্তায় তিনি নিঃসঙ্গ নন এবং আন্দোলন শুরু করলে একটি নির্ভরযােগ্য রাজনৈতিক শক্তির সহযােগিতা নিশ্চিতই পাওয়া যাবে। উভয় পক্ষের ঐকমত্যের ভিত্তিতে “১৯৬২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্রদের ভিতর থেকে আন্দোলন শুরু করার জন্য চেষ্টা করার সিদ্ধান্তও হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ও পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির ভিতর ঐ সমঝােতার কথা সারা প্রদেশে ঐ দুটি দলের কর্মীদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল” (২০/১৮৩)। “There were at this time two main student bodies at loggerheads with each other : the Students League which supported the Awami League and the Students Union, a left-wing organization. Both sides agreed to do their best to end the bickering between them to ensure the successful agitation  (১৭/১০০)। ২১ফেব্রুয়ারি, ১৯৬২ থেকে ছাত্র আন্দোলনের জন্য সক্রিয় ঐক্যের ভিত্তিতে প্রস্তুতি শুরু করা হলেও জানুয়ারি মাসেই সােহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করায় সমগ্র পরিস্থিতি পাল্টে যায়। 

  ১৩০ 

  সােহরাওয়ার্দী গ্রেফতার : 

 পূর্ব বাংলায় প্রবল ছাত্র-গণঅন্দোলন 

  আইয়ুবের ‘মৌলিক-গণতন্ত্রী সংবিধান’ জারির সময় যতই এগিয়ে আসছিল, সােহরাওয়ার্দী ততই ১৯৫৬ খ্রি. সংবিধান পুনর্বহালের মাধ্যমে পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রবর্তনের লক্ষ্যে জোরেশােরে প্রস্তুতি শুরু করছিলেন। তাঁর জানা ছিল, আইয়ুববিরােধী বিক্ষোভের সম্ভাবনা পূর্ব বাংলাতেই বেশি, কারণ, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এখানকার জনগণই সমধিক ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। আইয়ুব-বিরােধী আন্দোলনের বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই এবং পথ-পদ্ধতি নির্ধারণের জন্যই সােহরাওয়ার্দী ১৯৬২ র। জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি ঢাকায় এসেছিলেন। ২৪ জানুয়ারি তারিখে আতাউর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমান, মানিক মিয়া, হামিদুল হক চৌধুরী, মাহমুদ আলী, আবু হােসেন সরকার প্রমুখ বিভিন্ন দলীয় নেতৃবৃন্দের সাথে সােহরাওয়ার্দী এক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। “They agreed to submerge their political differences and work for a common goal : the restoration of 1956 constitution. They all agreed to intensify their opposition to the Ayub Constitution expected to be promulgated soon” (১৭/১০৩)। ঢাকা থেকে করাচিতে ফেরার পরই, সােহরাওয়ার্দীকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযােগে ২৯ জানুয়ারি (মতান্তরে ৩০ জানুয়ারি) গ্রেফতার করা হয়। তিন-চারদিন পরেই ২ জানুয়ারি ঢাকাতে গ্রেফতার করা হয় শেখ মুজিবুর রহমান, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ। নেতৃবৃন্দকে। আওয়ামী লীগ-কম্যুনিস্ট পার্টির পূর্বোল্লিখিত গােপন সংলাপসমঝােতায় ছাত্র আন্দোলন শুরুর নির্ধারিত তারিখ ছিল ১৯৬২ র ২১ফেব্রুয়ারি কিন্তু সােহরাওয়ার্দীর গ্রেফতারের খবরে সেটি শুরু হয়ে গিয়েছিল ৩১ জানুয়ারি তারিখেই, সেদিনই ঢাকায় এসেছিলেন আইয়ুব খান। 

 “বিশ্ববিদ্যালয়ে কতকটা আপনা-আপনি ধর্মঘট হয়ে গেল। জগন্নাথ কলেজ, মেডিকেল কলেজ ইত্যাদিতে ষােলআনা ধর্মঘট হয়েছে। ভাল লক্ষণ নয় বলে মনে 

  ১৩১ 

  হয়। আইয়ুব খাঁর মুখমণ্ডলে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট দেখেছি তাকে অভ্যর্থনা বা দর্শন করার জন্যেও পূর্বের মত লােকজন কোথাও জমায়েত হয়নি”(৮/৩৫৯)। প্রেস সেন্সরশিপ থাকায় ধর্মঘটের কোনাে খবর ১ ফেব্রুয়ারির পত্রিকায় প্রকাশ করা যায়নি। ছাত্রেরা সেদিন ঢাকায় পত্রিকা পুড়িয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে পড়েছিল যে, পাকিস্তান সপ্তাহ উপলক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ‘ডি-লিট ডিগ্রি গ্রহণের জন্য আইয়ুবের রাজশাহী যাওয়ার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিও। বাতিল করতে হয়েছিল। আইয়ুবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঞ্জুর কাদের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের কাছে প্রশ্নোত্তর বক্তৃতা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ছাত্রদের প্রশ্নগুলি পত্রিকায় প্রকাশের নিশ্চয়তা দিতে না পারায় বক্তৃতা না করেই চরম অপমানিত হয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল। ৮ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান করাচি ফিরে গেলেন। 

 আনুষ্ঠানিকভাবে আইয়ুব প্রণীত শাসনতন্ত্র জারি করা হয় ১ মার্চ, ১৯৬২। শাসনতন্ত্র জারির আগে থেকেই করাচিতে বন্দি ছিলেন সােহরাওয়ার্দী আর পূর্ব বাংলায় শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। এমন পরিস্থিতিতেই ১৬ই এপ্রিল থেকে ছাত্ররা তিনদিনের ছাত্র-ধর্মঘট ঘােষণা দিয়ে প্রথমবারের মত স্লোগান তুলেছিল আইয়ুবের রক্ত চাই । ১৭ই এপ্রিল থেকে কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্ট কালের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছিল। “২১শে এপ্রিলের সংবাদপত্রে শহীদ সােহরাওয়ার্দীর একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। বিবৃতিটি জেলখানা হতে প্রেরণ করা হয়েছিল। এটি ছিল তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সরকারি অভিযােগের জবাব। সরকারি অভিযােগ যে কত দুর্বল ও হাস্যকর তার প্রমাণ জবাবে ছিল। পূর্বে যারা পাকিস্তানের বন্ধু ছিল শহীদ সােহরাওয়ার্দী নাকি সে-সব রাষ্ট্রকে শক্ত করে তুলেছেন”(৮/৩৬৪)। 

 ২৭ এপ্রিল, ১৯৬২ ঢাকায় শেরে বাংলা ফজলুল হকের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুতে শােকাহত আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ জেলের ভিতরেই, কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সপ্তাহাধিক কাল কালাে-ব্যাজ ধারণ করেছিলেন। “আমাদের সাথে অন্যান্য ওয়ার্ডের রাজবন্দিরা সাধারণ বন্দিরাও কালাে ব্যাজ পরিলেন” (৪/৫৭৮)। ২৮এপ্রিল পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত শেরে বাংলার জানাজায় “দুই লাখের বেশি লােক সমবেত হয়েছিলেন। গভর্নর আজম খান জানাজাতে শামিল হয়েছিলেন। এত বড় জনসমুদ্র আমার জীবনে আমি আর কখনও দেখিনি। তিনি বাংলার লােকের আসল চরিত্র জানতেন এবং সকল প্রকার স্ববিরােধিতা সত্ত্বেও ফজলুল হকের সত্যিকার রূপটিও সম্ভবত বাংলার লােক জানতাে   এবং ভালােবাসতাে”(৮/৩৬৪-৩৬৫)। 

 “আইয়ুব খানের সংবিধান ঘােষিত (১ মার্চ, ১৯৬২) হওয়ার পরে এপ্রিল মাসে বুনিয়াদী: গণতন্ত্রীদের ভােটে জাতীয় পরিষদ ও মে মাসে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের 

  ১৩২ 

  প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের এক প্রহসন করা হয়েছিল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তি ঐসব নির্বাচন বয়কট করেছিল। ১৯৬২ সালের ৮ই জুন রাওয়ালপিন্ডিতে তথাকথিত জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল। সেই দিন থেকেই দেশ থেকে সামরিক আইন উঠে গিয়েছিল”(২০/১৮৫১৮৬)। পূর্ব পাকিস্তানের ৯জন নেতা আইয়ুবের জারিকৃত সংবিধানকে “অগ্রহণযােগ্য আখ্যায়িত করে এক যৌথ বিবৃতি দেন। এই বিবৃতিতে সার্বজনীন। ভােটাধিকারের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গণপরিষদ গঠনের দাবি জানানাে হয়। কারামুক্তির পর শহীদ সােহরাওয়ার্দী ৯ নেতার বিবৃতির সাথে একাত্মতা ঘােষণা করেন”(২১/৩১-৩২)। বিভিন্ন সূত্রের তথ্যানুসারে নয় নেতা’র মধ্যে মওলানা ভাসানী, মওলানা তর্কবাগীশ, আবুল মনসুর আহমদ, আতাউর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমান, মাহমুদ আলী, নুরুল আমিন এবং আবু হােসেন সরকার প্রমুখের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯৬২ সালের ৮ই জুলাই তারিখে প্রায় সাড়ে তিন বছর (সামরিক শাসন জারির) পরে পুরানা পল্টন মাঠে পুনরায় এক বিরাট জনসভা হয়। পরদিন সংবাদপত্রের রিপাের্টে জনসংখ্যার পরিমাণ দু’লাখ বলা হয়। এ জনসভার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল, একই রঙ্গমঞ্চে .মুসলিম লীগের নুরুল আমিন সভাপতি, বক্তা আবু হােসেন সরকার (কেএসপি), আতাউর রহমান, মুজিবুর রহমান (আওয়ামী লীগ), মাহমুদ আলী (ন্যাপ) প্রমুখ। সকলেরই দাবি বর্তমানConstitution বদলাও, রাজবন্দিদের ছাড়াে   ইত্যাদি” (৮/৩৬৬-৩৬৭)। 

 ছাত্রসমাজের স্বার্থবিরােধী দু’টি সরকারি উদ্যোগ সেপ্টেম্বর মাসে ছাত্র আন্দোলনকে তুঙ্গস্পর্শী করে তুলেছিল। পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ আগে থেকেই সেনা-শাসকের নিয়ােজিত ‘বিচারপতি হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন’এর রিপাের্টটির তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছিল, কিন্তু সরকার অর্ডিন্যান্স দ্বারা রিপাের্টটি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং প্রায় একই সময়ে আরেকটি সরকারি হুকুমে ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘােষিত হয়। সােহরাওয়ার্দী এক বিবৃতিতে প্রস্তাব করেছিলেন, সমগ্র বিষয়টি জাতীয় সংসদে আলােচনা করা হােক। কিন্তু তাঁর নরম কথা’য় সরকার কর্ণপাত করেনি। উল্লেখ্য যে, ছ মাসের অধিক কারাবন্দি রাখার পর, পূর্ব বাংলার “ছাত্রজনতার আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ১৯৬২ সালের ১৯শে আগস্ট শহীদ সােহরাওয়ার্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। ৮ই সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকা আগমন করেন। বিমানবন্দরে লাখ লাখ লােকের সমাগম হয়” (২১/৩২)। 

 ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৬২ “ঢাকাতে সেনাবাহিনী মােতায়েন সত্ত্বেও ছাত্রজনতার বিশাল শােভাযাত্রায় টঙ্গী, তেজগাঁ ও ডেমরা অঞ্চলের বহু শ্রমিক যােগদান 

  ১৩৩ 

  করেছিলেন। টঙ্গীতে এক শ্রমিক মিছিলের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণে সুন্দর আলী নামে একজন শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন।  ৬২ সালের ঐ ছাত্র আন্দোলন সামরিক শাসন সম্পর্কে জনগণের ভয়ভীতি ভেঙ্গে দিয়ে আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণআন্দোলনের দরজা খুলে দিয়েছিল। ইহাই ছিল  ৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনের বিশেষ তাৎপর্য” (২১/১৮৪-১৮৫)। বাষট্টির শিক্ষা কমিশন বিরােধী “হরতাল চলাকালীন পুলিশের গুলিতে তিনজন ছাত্র শহীদ হন। ২৯শে সেপ্টেম্বর পল্টন ময়দানে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে এক জনসভায় তৎকালীন সময়ে বাঙালি জাতির কণ্ঠস্বর  বলে অভিহিত আওয়ামী লীগের কর্ণধার শেখ মুজিবুর রহমান বক্তৃতা করেন”(১৯/১১৫)। 

 “শহীদ সােহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশব্যাপী ঝটিকা সফরের মাধ্যমে সামরিক শাসন বিরােধী আন্দোলন গড়ে তােলেন। শহীদ সােহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট(National Democratic Front-NDF) গঠিত হয়” (৮/৩২)। আইয়ুব বিরােধী আন্দোলনের প্লাটফর্ম হিসেবে ‘এনডিএফ’ গঠনের পর সােহরাওয়ার্দী করাচি ফিরে গেলেন। কিছুদিন আগের কারাবন্দিত্ব তাঁর দারুণ স্বাস্থ্যহানি ঘটিয়েছিল। ১৯৬৩ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি পরপর দু বার হৃদরােগে আক্রান্ত হলেন। এ সময়েই আইয়ুব খান মুসলিম লীগের একাংশের সহযােগিতায় নিজস্ব কনভেনশন মুসলিম লীগ গঠনের ব্যবস্থা পাকা করে, সকল রাজনৈতিক দল পুনরুজ্জীবনের সুযােগ সৃষ্টি করলেন। আইয়ুব খানের ‘রাজনৈতিক দল পুনরুজ্জীবন’এর ঘােষণায় বাস্তব পরিস্থিতি সােহরাওয়ার্দীর জন্য যথার্থই ব্রিতকর হয়ে পড়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক দল পুনরুজ্জীবনে তিনি বাধা দিতে পারছিলেন না, আবার পূর্ব পাকিস্তানে এনডিএফ ভেঙ্গে যাক বা দুর্বল হয়ে পড়ক, এটাও মানতে পারছিলেন না। অপরদিকে, শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের তরুণ নেতাকর্মীরা দলের পুনরুজ্জীবনে একান্ত আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। তখন সােহরাওয়ার্দীর স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটায় চিকিৎসার জন্য বৈরুত হয়ে লন্ডনে চলে গেলেন। তার অনুপস্থিতিতে নানা মত-পথের নেতাদের ‘এনডিএফ’ ক্রমশই উদ্যমহীন এবং দুর্বল হয়ে পড়ছিল। সংগঠনটিকে সুসংগঠিত করার মত ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক দক্ষতা নুরুল আমিনের ছিল না। অপরদিকে মওলানা ভাসানী এনডিএফ’এর অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও সংগঠনটিকে জোরদার করার বদলে প্রকাশ্যেই নাথিং ডুয়িং ফ্রন্ট’ বলে পরিহাস করতেন। ততদিনে তার সাথে আইয়ুবের ‘চীন-কেন্দ্রিক যােগাযােগ শুরু হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবনের ব্যাপারে সােহরাওয়ার্দীর সাথে আলােচনার জন্য। 

  ১৩৪ 

  ১৯৬৩’র আগস্ট মাসে শেখ মুজিব লন্ডনে গেলেন। কিন্তু সােহরাওয়ার্দী বললেন, তিনি পূর্ব পাকিস্তানের এনডিএফ-নেতৃবৃন্দকে কথা দিয়েছেন, তাঁদের সাথে আলােচনা না করে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত করা হবে না। সুতরাং মুজিবকে ব্যর্থ হয়েই ফিরে আসতে হলাে। কিছুদিন পরেই, দল পুনর্গঠনে একান্ত আগ্রহী নেতাকর্মীরা শেখ মুজিবকে অনুরােধ করেছিলেন, তিনি যেন আবার লন্ডনে গিয়ে নেতার সম্মতি অর্জনের চেষ্টা করেন। তবে তার আগেই, ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৬৩ বৈরুতের হােটেলে রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে শহীদ সােহরাওয়ার্দীর। উল্লেখ্য যে, ১৯৬৪ খ্রি. জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তার পাকিস্তানে ফেরা নির্ধারিত ছিল। “The timing and circumstances of Suhrawardy s death left no doubt in Mujib s mind that his leader s death was not natural. Who would benefit from his death? Only Ayub Khan. Mujib was therefore convinced that it was another case of political murder  engineered by the Ayub regime.” (১৭/১১৫)। 

  ১৩৫ 

  আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন : 

 অভ্যন্তরীণ মতভেদ সত্ত্বেও বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত 

  শেরে বাংলা ফজলুল হকের মৃত্যু এপ্রিল ১৯৬২, আর সােহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হয় ১৯৬৩’র ডিসেম্বরে। “সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই দুই প্রবীণ নেতার মৃত্যুতে (পূর্ব বাংলার) রাজনৈতিক অঙ্গনে শূন্যতার সৃষ্টি হয়। শেখ মুজিব হয়ত-বা কিছুটা নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব অনুভব করেন। উপলব্ধি করেন যে, বাঙালির স্বার্থরক্ষা এবং অধিকার আদায়ের কঠিন সংগ্রামে এখন থেকে তাঁকেই আরাে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে এবং তিনিই হবেন পশ্চিমা শাসকদের প্রধান শত্রু   মূল টার্গেট। দলকে সুসংগঠিত করতে হবে আগামী দিনের কঠিন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য” (১(১)/১৩৭) “He (Mujib) had to overcome the objections of old-time senior leaders of the party who argued that Suhrawardy s wishes (about NDF) should not be disregarded so soon But Mujib had his support among the young party workers, Like Mujib, they wanted the struggle for the rights of Bengalis in various spheres to be continued simultaneously with the campaign for the restoration of democracy” (১৭/১১৭)। 

 বাংলার রাজনীতির চালচিত্রে অতঃপর সার্বক্ষণিক এবং প্রধানতম ভূমিকা বঙ্গবন্ধু মুজিবের। মওলানা ভাসানী তখনাে সক্রিয় রাজনীতিবিদ, কিন্তু তাঁর কর্মকাণ্ডে অব্যাহত ধারাবাহিকতা ছিল না। মওলানা কখনাে রাজনীতির ময়দানে সােচ্চারসংগ্রামী কখনােবা নীরব-নিষ্ক্রিয় দূরবাসী। সাধারণভাবে জনমনে ভাসানীর প্রতি যতটা বিপুল সম্মান-শ্রদ্ধা ছিল, রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি কখনাে ততটা সুস্থির-সক্রিয় ছিলেন না। রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং করণীয় নির্ধারণ সম্পর্কে প্রবল বৈপরীত্ব এবং দোদুল্যমানতা ছিল তাঁর। সুতরাং ঐতিহাসিক অনিবার্যতার কারণেই আমাদের চলমান আলােচনার পরবর্তী সময়-খণ্ডের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে মুজিব প্রায় আক্ষরিক অর্থেই স্থির-লক্ষ্য এবং উজ্জ্বলতম একক ব্যক্তিত্ব, সেখানে ভাসানী যেন ঘটনাপ্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণহীন এক অনিশ্চিত-অস্থির রাজনৈতিক চরিত্র। 

  ১৩৬ 

  ১৯৬৪সালে রাজনৈতিক আন্দোলন, বিশেষত গণতন্ত্রের আন্দোলনকে ব্যর্থ করার লক্ষ্যে আইয়ুব-মােনায়েম চক্র পেশাদার অবাঙালি খুনিদের দিয়ে পূর্ব বাংলায়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করলে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দাঙ্গা প্রতিরােধ কমিটি গঠন করেন। ১৬ই জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও শীর্ষক দাঙ্গা-বিরােধী প্রচারপত্র বিলি করা হয়। এই অভিযােগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিন আহমদকে গ্রেফতার করলেও পরে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। উক্ত প্রচারপত্রের মূল বক্তব্য ছিল : “পূর্ব বাংলার মানুষের জীবনের উপর এই পরিকল্পিত হামলার বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইতে আমি পূর্ব বাংলার সকল মানুষকে আহ্বান জানাইতেছি। প্রতি মহল্লায় দাঙ্গা প্রতিরােধ কমিটি গঠন করুন। খাদেম শেখ মুজিবুর রহমান”(১৯/১১৮)। দৈনিক ইত্তেফাক প্রথম পৃষ্ঠায় বিশাল হরফে লিখেছিল : “দিকে দিকে নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস”। সরকারি চক্রান্তের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে “ঢাকার সমস্ত জাতীয় দৈনিক বাঙালি রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরােনামে একযােগে যে সম্পাদকীয় প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিল, তার ফলে বাঙালি জনগণের ভিতর দাঙ্গার বিরুদ্ধে এক মনােভাব জেগে উঠেছিল। ফলে দাঙ্গা ছড়াতে পারেনি” (২১/১৮৭)। 

 পূর্ব বাংলায় দাঙ্গা প্রশমনের পর, ২৫ জানুয়ারি, ১৯৬৪ মওলানা তর্কবাগীশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ সভায় আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সম্পাদকবৃন্দ এবং জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। উক্ত সভায় মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তী ৫ জুন ওয়ার্কিং কমিটির জরুরি সভায় দলীয় ১১-দফা দাবিনামা প্রণয়ন করা হয়। অবজারভার’-এর রিপাের্ট (৬ জুন,  ৬৪ খ্রি.) থেকে উক্ত ১১-দফা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় : The East Pakistan Awami League announced its 11 point draft manifesto for a long term planning based on two economy theory to remove the economic dispariry between the wings aimed at building up a happy and prosporous society, free from exploitation of the people by a few and ensure practice of unfattered democracy” (২৩/৩৯)। 

 প্রাক্তন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ভ্যালেরি জিসকার্ড ডেস্টাংয়ের একটি রাজনৈতিক তত্ত্বকথা এখানে প্রসঙ্গতই উদ্ধৃতিযােগ্য বিবেচনা করা চলে : অতীতের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকা কোনাে রাজনৈতিক নেতা বা দলের কাজ হতে পারে না। একজন সত্যিকার জননেতা বা দেশপ্রেমিক গণমুখী রাজনৈতিক দলের কর্তব্য হবে স্বপ্নময় সােনালী ভবিষ্যতের পানে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। নিঃসন্দেহে সেদিন আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবন এবং ১১-দফা ঘােষণার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একটি লক্ষ্যের দিকেই জাতিকে অগ্রসর করে নিতে চেয়েছিলেন। 

  ১৩৭ 

  ‘প্রেসিডেন্ট নির্বাচন  ১৯৬৫ : 

 আইয়ুবের বিরুদ্ধে কপ’এর প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহ 

  আইয়ুব খানের নিজস্ব রাজনৈতিক দল কনভেনশন মুসলিম লীগ  গঠন করা হয়ে গেছে, পাকিস্তানের উভয় অংশে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। তখন সেনাপতি-প্রেসিডেন্ট আইয়ুব বেসামরিক বা ‘সিভিল প্রেসিডেন্ট হতে আগ্রহী। হলেন। মৌলিক গণতন্ত্রী সংবিধান’,১৯৬২ অনুসারে ভােটাধিকারী কেবল উভয় প্রদেশে মােট ৮০ হাজার বি.ডি. মেম্বার। সুতরাং আস্থাশীল আইয়ুব খান সেপ্টেম্বর, ১৯৬৪ ঘােষণা দিলেন, ২ জানুয়ারি,১৯৬৫ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। শেখ মুজিব কিছুকাল আগেই বলেছিলেন, “কিসের মৌলিক গণতন্ত্র? প্রাপ্তবয়স্কদের ভােটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন চাই”(১৯/১১৯)। কিন্তু দ্রুতই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঠেকানাে যাবে না, বরং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে দলীয় লক্ষ্য এবং আইয়ুব-বিরােধী বক্তব্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়াটাই সঠিক হবে। তাই আইয়ুবের বিরুদ্ধে একজন সর্বদলীয় প্রার্থী দাঁড় করাতে আওয়ামী লীগ সবার আগেই উদ্যোগী হয়েছিল। ঢাকাতেই অবসর-ভােগী খাজা নাজিমুদ্দিনকে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য সরকার-বিরােধী দলগুলির সমন্বয়ের দায়িত্ব নিতে অনুরােধ করা হয়। তিনি রাজি হলেও আপত্তি করেছিলেন দুজন নেতা সম্পর্কে। একজন মওলানা ভাসানী, যিনি আইয়ুবের সাথে ভেতরে-বাইরে দ্বিমুখী ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। দ্বিতীয় জন শেখ মুজিব, নাজিমুদ্দিনের দৃষ্টিতে একজন ‘Street leader , গণতন্ত্রের সংগ্রামে অপরাপর নেতৃবৃন্দের পাশে চলার যােগ্য নন। তথাপি ১৯৬৪ র ২৬ জুলাই নাজিমুদ্দিনের সভাপতিত্বে ঢাকায় পাকিস্তানের বিরােধীদলীয় নেতৃবৃন্দের সম্মেলনে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সমবেতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য গঠন করা হয়েছিলCombined Opposition Party – COP’ বা সম্মিলিত বিরােধী দল। 

  ১৩৮ 

  “অতঃপর‘COP’-এর প্রধান নেতৃবৃন্দ মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, চৌধুরী মােহাম্মদ আলী এবং নবাবজাদা নসরুল্লাহ খানের অনুরােধে মিস ফাতেমা জিন্নাহ(জিন্নাহর বােন) প্রার্থী হিসেবে তার সম্মতি প্রদান করেন”(১৯/১১৯)। ১৭ সেপ্টেম্বর মিস জিন্নাহর মনােনয়ন ঘােষণা করা হয়। দৃশ্যত সবকিছুই আইয়ুবের জন্য ব্রিতকর হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে “The regime had to resort to administrative pressure on the BDs and had to buy support whenever possible, using funds reserved for the works programme . Having failed to brand Mujib and Abdul Gaffer Khan (‘Frontier Gandhi ) as Indian agents in the eyes of general public, Governor Monem Khan targeted Mujib especially for harassment in order to reduce his campaign appearances.” (১৭/১২২)। কপ’এর জনসভায় উত্তেজনামূলক বক্তৃতা করার অভিযােগে মুজিবকে প্রথম গ্রেফতার করা হয় ৭ নভেম্বর, ১৯৬৪তারিখে, জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি মিস জিন্নাহর সাথে আলােচনার জন্য করাচি চলে গেলেন এবং ঢাকায় ফিরে আসার পর ৩ ডিসেম্বর তারিখে আবার গ্রেফতার করা হয়। মুজিব এবারও জামিনে মুক্তি পেলেন। 

 “সম্মিলিত বিরােধী দলের প্রার্থী মিস ফাতেমা জিন্নাহর সমর্থনে সারা পূর্ব পাকিস্তানে এক ব্যাপক গণ-জাগরণ দেখা দিয়ছিল।   মুষ্টিমেয় বুনিয়াদী গণতন্ত্রীদের ভােটে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে সম্মিলিত বিরােধী দলের প্রার্থী মিস জিন্নাহ পরাজিত হয়েছিলেন বটে কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে প্রবল জনমত সৃষ্টি হয়েছিল”(২০/১৮৮)। ফলাফলে দেখা গেল, “পাকিস্তানের দুই অংশের ৮০,০০০ ভােটারের মধ্যে ৭৯,৭০০জন ভােট প্রদান করেন। মােহতারেমা জিন্নাহ ২৮, ৬৯১ ভােট পেয়ে পরাজিত হন এবং আইয়ুব খান ৪৯,৯৫১ ভােট পেয়ে জয়যুক্ত”(১৯/১১৯) হন। পূর্ব বাংলায় ৪০,০০০ ভােটের মধ্যে আইয়ুব পেয়েছিলেন ২১,০১২ ভােট আর মিস জিন্নাহ ১৮,৪৩৪ ভােট, আইয়ুবের চেয়ে মাত্র ২,৫৭৮ ভােট কম। উল্লেখ্য যে, উত্তরাঞ্চলের অর্থাৎ যেসব এলাকায় মওলানা ভাসানীর প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে। বিবেচিত হতাে, সেসব এলাকায় আইয়ুব খান তুলনামূলকভাবে বেশি ভােট লাভ করেছেন। পরবর্তী সময়ে প্রকাশ পেয়েছে, আরাে আগে থেকেই মওলানা ভাসানী। মহাচীনের চেয়ারম্যান মাও সেতুংয়ের পরামর্শ অনুসারে আইয়ুবের সহযােগিতা শুরু করেছিলেন। 

 বিশিষ্ট রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন, “বিরােধী শিবির মিস জিন্নাহর পরাজয়ের জন্য ন্যাপ ও মওলানা ভাসানীকে দোষারােপ করে। সকল দক্ষিণপন্থী বিরােধী দল একমাত্র বামপন্থী ন্যাপকে সমালােচনা করার কারণ, ন্যাপ‘ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বিশ্বাসী এবং ইসলামী সমাজ 

  ১৩৯ 

  প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে, সুতরাং ন্যাপ-নেতারা সর্বাত্মক প্রচার চালায়নি। কোন কোন মহল এ অভিযােগও করে যে, নির্বাচনের ঠিক আগে মওলানা ভাসানী নিস্পৃহ হয়ে পড়েন এবং সেজন্য উত্তরাঞ্চলের জেলাসমূহে আইয়ুব বেশি ভােট পেয়েছেন। এই দোষারােপ একেবারে সত্যি না হলেও মিথ্যাও নয়” (১৯/১২০)। অন্তত দু টি প্রশ্ন আবুল মকসুদের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে করা যেতেই পারে : কপ ম্যানিফেস্টোতে কি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বা ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল অথবা কোনাে কপ নেতা এমন কথা বলেছিলেন? ভাসানী নিজেই কি  ইসলামী সমাজতন্ত্র’এর কথা বলতেন না? 

 জহুর হােসেন চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ: “মওলানা সাহেবের রাজনীতিতে দুটো পরস্পরবিরােধী ধারা সবসময়েই বিরাজ করেছে। তাঁকে দেশের যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়ােজন নেতৃত্ব দেবার জন্য, ঠিক তখনই তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের সঙ্গে মিস জিন্নাহ’র নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় মওলানা সাহেব সফর করা ছেড়ে দিয়ে টাঙ্গাইলের বিন্নাফৈর যেয়ে বসে। রয়েছেন। আমরা চারজন (জহুর হােসেন চৌধুরী, মানিক মিয়া, শহীদুল্লাহ কায়সার এবং ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল হক)বিন্নাফৈর পৌঁছে মওলানা সাহেবকে বহু অনুনয় করা সত্ত্বেও তিনি অসুস্থতার কারণে নির্বাচনী প্রচারে নামতে রাজি হলেন না। ইলেকশনের ফলাফল বেরােবার পর দেখা গেল, মিস জিন্নাহ পূর্ব বাংলায়। শতকরা ঊনপঞ্চাশটি ভােট পেয়েছেন আর পশ্চিম পাকিস্তানে শতকরা ঊনত্রিশটি। এতে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। যদি মওলানা ভাসানী একটু চেষ্টা করতেন তাহলে হয়ত অন্তত পূর্ব বাংলার রায় প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের বিরুদ্ধে যেত” (১৫/৪৩-৪৪)। 

  ১৪০ 

  পাক-ভারত যুদ্ধ, সেপ্টেম্বর ১৯৬৫: 

 বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনিবার্য পরিবর্তন 

  পূর্ব বাংলা থেকে সহস্রাধিক মাইল দূরে সংঘটিত মাত্র ১৭ দিন স্থায়ী ভারতপাকিস্তান যুদ্ধ পাকিস্তানের চলমান রাজনীতির গতিমুখ পাল্টে দিয়েছিল, বলা চলে, অপরিবর্তনীয়ভাবেই। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট স্বঘােষিত ফিল্ড মার্শাল এবং স্তাবকদের কথিত ‘লৌহ মানব’ আইয়ুব খান স্বতঃপ্রণােদিত পরিকল্পনায় কাশ্মিরকেন্দ্রিক যুদ্ধটি শুরু করেছিলেন এবং যুদ্ধের পরে হয়ে পড়েছিলেন যথার্থই ‘পরাজিত সৈনিক । কারণ যুদ্ধের “দশ-পনেরাে দিনের মধ্যে পাকিস্তানের আত্মরক্ষা ব্যবস্থা। সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে পড়ে। আইয়ুব খান প্রমাদ গুনেন। নিরাপত্তা পরিষদ কাশ্মিরের রাজনৈতিক সমস্যা এড়িয়ে গিয়ে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণ করে”(৮/৪০৪-৪০৫)। সােভিয়েত-মধ্যস্থতায় তাসখন্দে ১০জানুয়ারি, ১৯৬৬ খ্রি. প্রেসিডেন্ট আইয়ুব এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মধ্যে স্বাক্ষরিত (যুদ্ধবিরতি) চুক্তিটি ‘তাসখন্দ চুক্তি’ নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। 

 প্রকৃতপক্ষেই ১৯৬৫’র কাশ্মীর-কেন্দ্রিক যুদ্ধে পাকিস্তানের শুধু সামরিক পরাজয়ই ঘটেনি রাজনৈতিক মর্যাদাহানিও ঘটেছিল। তখন পশ্চিম পাকিস্তানে রাজনীতির ‘হিরাে’ হয়ে উঠলেন আইয়ুবেরই অনুগ্রহপুষ্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। অপরদিকে উক্ত যুদ্ধ সম্পর্কে বাঙালি-স্বার্থ সংক্রান্ত সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করায়, পূর্ব বাংলায় শেখ মুজিবুর রহমানের জনসমর্থন এবং বক্তব্যের গ্রহণযােগ্যতাও সংশয়াতীতভাবে বেড়ে চলেছিল। আবু জাফর শামসুদ্দিনের পর্যবেক্ষণ : “কাশ্মির প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানি মুসলমান সমাজের দুর্বলতা ছিল। ভারতকেই আক্রমণকারীরূপে প্রতিপন্ন করার জন্যে ক্রমাগত প্রচার চালিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সাধারণ মানুষ যতটা না বিভ্রান্ত হয়েছিল তার চেয়ে বেশি বিভ্রান্ত হয়েছিল। বুদ্ধিজীবী শ্ৰেণী। মওলানা ভাসানীসহ প্রায় সকল নেতা ভারতের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘােষণা করেন। একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমান প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করতে 

  ১৪১ 

  পেরেছিলেন। তিনি যুদ্ধটাকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেননি। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করার পরামর্শদাতাদের মধ্যে নাকি ভুট্টো ছিলেন শীর্ষস্থানে। আমার বিবেচনায়, ১৯৬৫সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমান ব্যতীত পূর্ব পাকিস্তানের সকল শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক এবং বুদ্ধিজীবী ‘simpleton এর আচরণ করেছিলেন”(৮/৪০৫-৪০৬)। 

 যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলার নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে শেখ মুজিব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে নিয়ে আসেন। তাঁর বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক দাবির মূল কথাগুলি ছিল : “পূর্ব পাকিস্তানকে ১৭দিন যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এতিমের মতাে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। ভারতীয় সৈন্যরা যদি দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত লেফট রাইট  করে হেঁটে যেতাে, তবুও তাদের বাধা দেয়ার মত অস্ত্র বা লােকবল কিছুই পূর্ব বাংলার ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানও যেমন পাকিস্তানের একটি প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তানও তেমনি একটি প্রদেশ। বরং পূর্ব পাকিস্তান লােক-সংখ্যাগরিষ্ঠ, একচোখা নীতির ফল ভালাে হবে না। আমাদের ন্যায্য অধিকার আমাদের দিতে হবে” (১৯/১২১)। পরিস্থিতি সম্পর্কে আলােচনার জন্য ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৬৫ আইয়ুব খান ঢাকায় এসেছিলেন। স্থানীয় নেতৃবৃন্দ আইয়ুবের সাথে আলােচনায় অধিকতর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি জানালেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। “Mujib complained about the neglect of the defence of East Pakistan. He also faulted the government for inadequate economic development of the eastern wing as well as for repression of Bengali culture as evidenced by the ban imposed on Tagore Songs by the Radio Pakistan since the outbreak of the war. By this audacity and outspokenness he became a marked man. Hitherto he had been a subject of surveillance the Inter-Services Intelligence (ISI) began to take a close interest in his activities and started to assemble materials about him for possible use against him in future” (১৭/১২৯)। 

  ১৪২ 

  মুজিবের ঐতিহাসিক ছ’দফা : 

 ‘স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার সাঁকো  

  পাক-ভারত যুদ্ধের গ্লানিকর পরাজয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি জনমনে সৃষ্ট তীব্র আইয়ুববিরােধী ক্ষোভকে কাজে লাগাতে সমবেত উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন দল-মতের নেতৃবৃন্দ। পরিস্থিতি পর্যালােচনার জন্য আহুত ‘অল পাকিস্তান ন্যাশনাল কনফারেন্স’এর আহ্বায়কগণ আশা করেছিলেন, ১৯৬৬’র ৫ফেব্রুয়ারি লাহােরে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিপুল সংখ্যায় অংশগ্রহণ করবেন। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ ঢাকায় এসে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সাথে আলােচনা করে সম্মেলনে যােগদানের বিষয়টি নিশ্চিত করলেন। 

 পূর্ব বাংলার স্বার্থ বা কল্যাণ সংশ্লিষ্ট বক্তব্যে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দ কখনাে মনােযােগ দেন না বলেই খােলামেলা বক্তব্য উপস্থাপনের সুযােগ পাওয়া যাবে না আশঙ্কায় মুজিব লাহাের সম্মেলনে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু মানিক মিয়া বলেছিলেন, “This will give you a chance to say whatever is on your mind. Jot down your thoughts on paper. It does not matter if they don t want to listen to you. Something good will come out of it anyway” (১৭/১৩৪)। 

 মানিক মিয়ার পরামর্শটি মুজিবের পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু লাহােরে চৌধুরী মােহম্মদ আলীর বাসভবনে ৫-৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সম্মেলনের ‘সাবজেক্ট কমিটির সভায় শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ছ’-দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করলে সমবেত সকলে এতটাই রুষ্ট হয়েছিলেন যে, প্রস্তাবটি সম্মেলনের মূল আলােচ্য-সূচিতেই গ্রহণ করা হলাে না। শেখ মুজিব এবং তাজউদ্দিন প্রমুখ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সভা থেকে বেরিয়ে গেলেন। 

 বঙ্গবন্ধু যখন লাহােরে ৬-দফা উপস্থাপন করেন তখন নিশ্চিত জানতেন এর পরিণতি কী হবে। “যে লাহােরে ১৯৪০সালে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল জিন্নাহর দ্বিজাতি-তত্ত্বের ভিত্তিতে, সেই লাহােরেই ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ঘােষণা করলেন 

  ১৪৩ 

  ছয়-দফা, যা আর কিছুই নয়, দ্বিজাতি-তত্ত্বকে মিথ্যা প্রমাণিত করার তলােয়ার মাত্র” (১(১)/৪৬৯)। আইয়ুব-বিরােধী সর্বদলীয় রাজনৈতিক সম্মেলনে উপস্থিত ন্যাপসহ কোনাে রাজনৈতিক দলেরই সমর্থন না পাওয়াতে, ছ’-দফা কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে আলােচনাও করা গেল না। অতীতে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখে ক্ষুব্ধ হলেও মুজিব হতাশায় ভেঙ্গে পড়েননি, কখনাে বদলে ফেলেননি প্রতিজ্ঞা-প্রস্তুতি। আর এবার তাে সবকিছু জেনে-বুঝে মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই লাহাের সম্মেলনে গিয়েছিলেন। ১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ শেখ মুজিব লাহাের বিমানবন্দরে এক অনির্ধারিত সংবাদ। সম্মেলনে ছয়-দফা আমাদের বাঁচার দাবি’ এই শিরােনামে প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। 

 বঙ্গবন্ধু প্রায়শ বলতেন, “ছয় দফার সাঁকো দিলাম স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য” (২২/৮১)। প্রকৃতপক্ষেই ১৯৬৬ সালে ঘােষিত ৬-দফা প্রস্তাব শেষ। পর্যন্ত এক-দফা অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক ভিত্তি রচনা করেছিল। তেমনি সত্য হচ্ছে, ৬-দফা ঘােষণার অব্যবহিত পরবর্তী সময়টাতে শেখ মুজিবকে প্রচণ্ড প্রতিকূল তিনটি ধারার মােকাবিলা করতে হয়েছে : নিজস্ব রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের একাংশ, অপরাপর রাজনৈতিক দল এবং সরকার। আপন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রতিজ্ঞা এবং দলের বৃহদংশের, বলা চলে, তরুণতর অংশের নিঃশর্ত সহযােগিতা আর সর্বোপরি দেশের সাধারণ মানুষের প্রাণঢালা সমর্থনের জোরেই মুজিব সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন। ছয়-দফা  শীর্ষক প্রচার-পুস্তিকায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,“পূর্ব পাকিস্তানিরা মেজরিটি বলিয়াই পাকিস্তান শুধু পূর্ব পাকিস্তানিদের নয়, ছােটো বড় নির্বিশেষে তা সকল পাকিস্তানির। এমনি উদারতা, এমন নিরপেক্ষতা, ইনসাফবােধই পাকিস্তানি দেশপ্রেমের বুনিয়াদ, এটা যার মধ্যে আছে, কেবল তিনিই দেশপ্রেমিক।..দুইটি অঞ্চল আসলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের দেহের দুই চোখ,..দুই হাত, যে নেতা বিশ্বাস করেন পাকিস্তানকে শক্তিশালী করিতে হইলে দুইটিকেই সমান সুস্থ ও শক্তিশালী করিতে হইবে, তিনিই পাকিস্তানের জাতীয় নেতা হইবার অধিকারী। পাকিস্তানের মত বিশাল ও অসাধারণ রাষ্ট্রের নায়ক হইতে হইলে অন্তরও হইতে হইবে বিশাল অসাধারণ। আশা করি, আমার পশ্চিম পাকিস্তানি ভাইয়েরা এই মাপকাঠিতে আমার ছয় দফা কর্মসূচির বিচার করবেন। দেখিতে পাইবেন, ছয় দফা শুধু পূর্ব পাকিস্তানের নয়, গােটা পাকিস্তানেরই বাঁচার দাবি”(১৯/১৩৮-১৩৯)। দলের প্রাদেশিক ওয়ার্কিং কমিটি ১৯৬৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বৈঠকে ছয় দফাকে দলীয় কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধু স্পষ্টতই ঘােষণা করেন : “ছয় দফা দাবি রাজনৈতিক দরকষাকষি বা স্ট্যান্টবাজির লক্ষ্যে দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যেই প্রদত্ত হয়েছে” (২১/৩৫)। উল্লেখ্য যে, দলীয় সভাপতি মওলানা তর্কবাগীশ প্রমুখ কয়েকজন মুজিবের বক্তব্য 

  ১৪৪ 

  এবং অবস্থানের প্রতিবাদে বৈঠক থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এ অধিবেশনেই শেখ মুজিবুর রহমান দলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং তাজউদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক। অতঃপর শেখ মুজিবের প্রতি দলীয় আস্থা এবং জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। যারা অসন্তুষ্ট ছিলেন, তারা একটা বিদ্রোহী’ কাউন্সিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই কার্যকর রাজনীতি থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ততদিনে জন-মনেও ছ’-দফার প্রতি আবেগ এবং আস্থা বেড়ে চলেছে। মার্কিন গবেষক লরেন্স জিরিংয়ের প্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ : “The West Pakistani opposition leaders rejected Mujib s plan interpreting it was secessionist and hence outside the purview of their deliberation ..the Awami League programme pointed up the semi-independent character of East Pakistan and the Six-Point demand was judged fundamental to a healthy relationship within and between the provinces.But Ayub Government joined with the politicians in condemning the proposal” (১(৩)/১২৯০)। 

 ২০মার্চ, ১৯৬৬ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ঢাকায় এসেই হুমকি দিলেন, “দেশের অখণ্ডতার বিরােধী কোনাে প্রচেষ্টা সমর্থন করা হবে না। প্রয়ােজন বােধে অস্ত্রের মুখে এর জবাব দেয়া হবে। আর সেদিনই বিকালে পল্টন ময়দানে লাখাে লােকের সমাবেশে মুজিব বলেছিলেন, “৬ দফা দাড়ি, কমা, সেমিকোলনসহ মেনে নিতে হবে। আমরা অনেক রক্তচক্ষু দেখেছি, আর নয়।  দেশের উভয় অংশকে সমান শক্তিশালী করতে হবে। পাক-ভারত যুদ্ধের সময় শক্তিশালী কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তান নিতান্ত অসহায় এতিমের মত পড়েছিল। কেন সঙ্কটের সময় পূর্ব পাকিস্তানকে নিরাপত্তা দিয়ে আশ্বস্ত করা যায়নি? কেন জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলতে হয়, চীনের জন্যই পূর্ব পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে? কেন আমরা অন্যের অনুগ্রহে বেঁচে থাকবাে? অথচ বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ আমরাই আয় করে থাকি” (১৯/১৪৮)। প্রদেশজুড়ে ৬-দফার প্রচার এবং জনমত গঠনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু যখন জেলায় জেলায় বক্তৃতা করে ফিরছেন আর মােনায়েম খান মামলার পর মামলা দিয়ে তাঁকে বিপর্যস্ত করছেন, তখন আইয়ুবের ‘বিরাগভাজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভুট্টো ঢাকায় এসে আইয়ুবকে খুশি করার বাসনায় ভুট্টো বলেছিলেন, ‘৬-দফা বিচ্ছিন্নতাবাদের দলিল। তিনি ৬-দফার ওপর প্রকাশ্য বিতর্কের চ্যালেঞ্জ দিলেন মুজিবকে। দেশজুড়ে সভা-সমাবেশ আর মামলা সামলানোেয় ব্যস্ত মুজিব সেই চ্যালেঞ্জ মােকাবিলার দায়িত্ব দিলেন ঘনিষ্ঠতম সহযােগী তাজউদ্দিনকে। তাজউদ্দিন বলেছিলেন, ভুট্টো যেদিন যেখানে বলবেন সেখানেই ছ’-দফার ওপর বিতর্ক করতে তিনি প্রস্তুত আছেন। কিন্ত বিতর্কের নির্ধারিত দিনে জরুরি কাজের উছিলায় ভুট্টো ঢাকা ছেড়ে গিয়েছিলেন। 

  ১৪৫ 

  পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা-আমলা-রাজনীতিকেরা তাে বটেই, পূর্ব বাংলাতেও বিভিন্ন বাম-ডান দলই ছ’দফার অযৌক্তিক সমালােচনা করেছিল। “দুঃখজনক হলেও ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, ভাসানী এবং তার দল এই ‘৬-দফা’র বিরুদ্ধাচরণ করলেন প্রবলভাবে। মওলানা ভাসানী ‘৬৬-র ৭ এপ্রিলের জনসভায় প্রকাশ্যে মন্তব্য করলেন  ৬ দফা দাবির মধ্যে মার্কিনিদের কাজ হাসিলের চেষ্টা করা হচ্ছে। ৬দফার মধ্যে সমাজতন্ত্রের কথা নাই, তাই ৬-দফা দাবির প্রতি মওলানা ভাসানী সমর্থন দিতে পারে না। ভাসানী ন্যাপের সম্পাদক কমরেড তােয়াহা বললেন ৬-দফা হচ্ছে সিআইএ প্রণীত দলিল । ধর্ম-ভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমূহও এই বলে ৬-দফার বিরােধিতা করেছিলেন যে, যেহেতু ৬-দফায় ইসলামী হুকমত’-এর কথা অনুপস্থিত; সেহেতু এর সমর্থন তাে করা যায়ই না বরং এর বিরােধিতাই করতে হবে” (১৯/১৪৮-১৫১)। 

 আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে, ৬-দফার পক্ষে জনমত গঠন এবং সরকারি দমন-নীতির প্রতিবাদে ৭ জুন প্রদেশব্যাপী আহুত সর্বাত্মক সফল হরতালের দিন “ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জে আইয়ুব সরকার গুলি চালিয়ে, সরকারি প্রেসনােট মতেই দশজন লোেক হত্যা করেছে। সংবাদপত্রগুলােকে (প্রেসনােট ছাড়া) মন্তব্য ছাপতে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ সত্য ঘটনা এবং তৎসম্বন্ধে মন্তব্য বরদাশত করতে চায় নাUsurper আইয়ুব খান। প্রদেশের সমস্ত যানবাহন এমন কি রেলগাড়িও বন্ধ ছিল”(৮/৪০৭)। উল্লেখ্য যে, সাত জুনের হরতাল-বিক্ষোভের ১১ দিন পরে ছ’-দফার বিরােধিতা করে ভাসানী বলেছিলেন “East Pakistan finds itself in the vortex of imperialist intrigues in South-East Asia . Many of Bhashani s followers were so disenchanted with his blatent pro-Ayub stance that they split to form a rival NAP under the leadership of Professor Muzaffar Ahmed in East Pakistan and that of Wali Khan in West Pakistan towards the end of 1966” (১৭/১৩৮)। 

 প্রসঙ্গতই উল্লেখ্য যে, যুক্তরাজ্য প্রবাসী পাকিস্তানি মার্কসিস্ট গবেষক তারেক আলীকে (১৯৬৯সালে) ভাসানী ঢাকায় বলেছিলেন, “মাও আমাকে বললেন, এখনও (১৯৬৩) পর্যন্ত পাকিস্তানের সাথে চীনের সম্পর্ক নাজুক স্তরে রয়েছে আপনি আমাদের বন্ধু এবং বর্তমান মুহুর্তে যদি আপনি আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন, তাহলে রাশিয়া, আমেরিকা আর ভারতের হাত শক্তিশালী হবে। আমরা আপনাদের। এই মর্মে পরামর্শ দেব যে, মন্থরভাবে এবং সাবধানতার সঙ্গে অগ্রসর হােন, আপনাদের সরকারের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিবিড় করার জন্য একটা সুযােগ দিন”(১৯/১৫০)। প্রশ্ন জাগতেই পারে, শুধু এটাই কি মওলানা ভাসানীর আইয়ুবের পক্ষে এবং ছ দফার বিপক্ষে অবস্থানের একমাত্র কারণ ছিল? 

 উল্লেখ্য যে, “৭ই জুনের হরতালের আগে ঢাকাতে ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির 

  ১৪৬ 

   বৈঠকে যাতে ৭ই জুনের হরতালের বিরুদ্ধে প্রস্তাব গৃহীত হয় সেজন্য আইয়ুব সরকার তৎপর হয়ে উঠেছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের তিনজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী তখন ঢাকাতে চলে এসেছিলেন। এদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করে কয়েকজন পিকিংপন্থী সদস্য হরতালের বিরােধিতা ৬-দফা আন্দোলনে বিরােধিতার শর্তে প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের সাথে একটা গােপন সমঝােতা করে মােহম্মদ তােয়াহা, অধ্যাপক আসহাব উদ্দিন ও আব্দুল হক .আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে প্রকাশ্যে বের হয়ে এসেছিলেন। ঐ বৈঠকে ৬ দফা কর্মসূচি তথা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের বিরুদ্ধে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল”(২০/১৯৭-১৯৮)। অবশ্য “১৯৬৯ সালে যখন ৬দফা বাঙালির একমাত্র মুক্তির সনদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল, সে সময় মওলানা ভাসানী ৬-দফার পক্ষে বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। কিন্তু যদি তিনি ১৯৬৬-তে ৬-দফার বিরােধিতা না করে শেখ মুজিবের পাশে এসে দাঁড়াতেন, যদি তিনি শেখ মুজিবের গ্রেফতারের পরবর্তীতেই আন্দোলনের নেতৃত্ব হাতে তুলে। নিতেন, তবে হয়তাে আজ ইতিহাস ভিন্ন সাক্ষ্যই বহন করত”(১৯/১৫০)। 

 ছ -দফার আলােচনা শেষ করার আগে একটি কৌতূহলােদ্দীপক প্রসঙ্গের উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের সুপরিচিত মানবাধিকার কর্মী এবং সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের ২০০১ সালে পাকিস্তান সফরের সময় উচ্চশিক্ষিত পশতুন যুবক এজাজ এবং পেশােয়ারের প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মাস্টার খান গুলের পুত্র, প্রায় ষাট বছর বয়সী মােস্তফা কামালের সাথে আলােচনা হয়েছিল। শাহরিয়ার এজাজকে প্রশ্ন করেছিলেন, “শেখ মুজিব সম্পর্কে তােমার কি ধারণা? (এজাজের জবাব) পাঞ্জাবীরা তাঁর সম্পর্কে যা-ই বলুক, আমরা পশতুনরা তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমাদের নেতা ওয়ালী খান তাঁর বিশেষ বন্ধু ছিলেন। শাহরিয়ারের প্রশ্ন : “ছয় দফাকে বলা হতাে বাঙালির মুক্তিসনদ। আপনারা কোন যুক্তিতে ছয় দফা সমর্থন করেছিলেন”? মােস্তফা কামাল জবাব দিয়েছিলেন : “আমরা ছয় দফাকে বিবেচনা করেছি পাঞ্জাবী শাসকচক্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত বাঙালি, পশতুন, বালুচি ও সিন্ধি জাতির মুক্তিসনদ হিসাবে। পাকিস্তানে তখন থেকেই ফেডারেল রাষ্ট্রীয় কাঠামাের আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। ছয় দফা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে পাকিস্তান একটি জাতি-রাষ্ট্র নয়। পাকিস্তানে অনেক জাতিসত্তা রয়েছে, যাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস সব ভিন্ন। এসব জাতিসত্তাকে এক রাষ্ট্রীয় কাঠামােয় ধরে রাখতে হলে ফেডারেল সরকার ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। পাঞ্জাবীরা বলে শেখ মুজিব বিশ্বাসঘাতক, পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য দায়ী। পাকিস্তানের অন্য সব জাতিসত্তার কাছে শেখ মুজিব একজন মহান নেতা, পাকিস্তানে ফেডারেল রাষ্ট্রীয় কাঠামাের শাসনব্যবস্থার রূপকার, যার জন্য পাকিস্তানের বিভিন্ন জাতিসত্তা এখনও সংগ্রাম করছে” (২৩/৬০-৬২)। 

  ১৪৭ 

  মিথ্যা মামলা  আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা  : 

 পরিণামে আইয়ুবের জন্য বুমেরাং 

  ‘দেশ রক্ষা আইন’এ প্রায় কুড়ি মাস যাবৎ বন্দি শেখ মুজিবকে হঠাৎ করেই ১৯৬৮ র ৭ জানুয়ারি মুক্তি দিয়ে জেলগেটেই পুনরায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরবর্তী প্রায় চারমাস কাল একান্ত সঙ্গোপনে বন্দি রেখে আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবকে নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে স্থাপিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ১৯শে জুন তারিখ বিচার শুরু করেছিল। সরকারি নথিপত্রে নতুন মামলাটির নাম ছিল “রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য” কিন্তু সরকারি প্রচারযন্ত্রের প্রভাবে মানুষের মুখে মুখে মামলাটির নাম হয়ে গিয়েছিল “আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা”। তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রহসনমূলক বিচার এবং পূর্ব বাংলায় ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড নির্যাতনের প্রতিবাদে আন্দোলনের প্রস্তুতি চলতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানত ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে ৫ জানুয়ারি, ১৯৬৯ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ (Students Action Committee – SAC) গঠন করে প্রবল ছাত্র-গণআন্দোলন পরিচালনা করে কার্যতই আইয়ুব শাহীর ভিত ভেঙ্গে ফেলেছিল। ১১-দফা আন্দোলন  নামে খ্যাত সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২৪ জানুয়ারি (১৯৬৯) সংঘটিত হয়েছিল অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান। অতঃপর নিঃশর্ত মুক্তি পেয়েছিলেন বাংলার প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। 

 ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সরকারি অভিযােগনামার ৬নং অনুচ্ছেদে (২৪/১৭৮-১৭৯) বলা হয়েছিল :“১৯৬৪ সালের ১৫ থেকে ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেখ মুজিব (অভিযুক্ত-১) করাচি ভ্রমণ করেন। ওই সময় কোনাে একদিন করাচিতে কামাল উদ্দিন আহমদের (সাক্ষী-২) বাসভবনে একটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ক) শেখ মুজিবুর রহমান (অভিযুক্ত-১), খ) মােয়াজ্জেম (অভিযুক্ত-২), গ) স্টুয়ার্ড মুজিব (অভিযুক্ত-৩), ঘ) সুলতান (অভিযুক্ত-৪), ঙ) নুর মােহাম্মদ (অভিযুক্ত-৫), চ) 

  ১৪৮ 

  আহমেদ ফজলুর রহমান, সিএসপি, (অভিযুক্ত-৬) এবং ছ) মােজাম্মেল (সাক্ষী১)। বৈঠকে মােয়াজ্জেম (অভিযুক্ত-২) বলেন, নৌবাহিনীর পূর্ব পাকিস্তানি সদস্যরা পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে একটি বিপ্লবী সংস্থা গঠন করেছে। এই সংস্থায় সেনা ও বিমানবাহিনীর পূর্ব পাকিস্তানি সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনিক সমর্থন ও সহযােগিতার প্রযােজনীয়তাও তিনি উল্লেখ করেন। শেখ মুজিবুর রহমান (অভিযুক্ত-১) শুধু একমতই পােষণ করেননি বরং বলেছিলেন, তাঁর নিজের ধারণার সঙ্গে বিপ্লবী সংস্থার পরিকল্পনার মিল রয়েছে। তিনি পূর্ণ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন এবং প্রয়ােজনীয় তহবিল প্রদানের। দায়িত্ব নেন। তিনি ধীরে চল নীতি অবলম্বন করতে বলেন। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরােধী দল জয়লাভ করলে এর দরকার হবে না”। ৭নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে : “শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর পুনরায় করাচিতে যান এবং ১৯৬৫ সালের ১৫ থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। এই তারিখের ভেতর কোনাে একদিন মােয়াজ্জেমের পূর্বোল্লিখিত বাসায় একটি বৈঠক হয়। শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, শুধু পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার মাধ্যমেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবে। তিনি পূর্ণ সমর্থন ও আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেন এবং মােয়াজ্জেমকে তাঁর সদর দপ্তর পূর্ব পাকিস্তানে স্থানান্তর করতে এবং বিপ্লবী সংস্থার কাজ ত্বরান্বিত করতে অনুরােধ করেন”। 

 মামলার অভিযােগে উল্লিখিত সাক্ষাতের ঘটনার সত্যতা থাকলেও অন্যসূত্রের বর্ণনা সম্পূর্ণ ভিন্নতর। “Muazzem established contact with Mujib in Karachi in October 1964. There were two more meetings between Muazzem and the nucleus of his group and Mujib in the next four months. Mujib appears to have listened with sympathy to their grievances but did not commit himself to their plan of action” (১৭/১৪০)। দেখা যাচ্ছে, লে.ক. মােয়াজ্জেম গ্রুপের বক্তব্য এবং তৎপরতা সম্পর্কে অবহিত হলেও একজন পােড়-খাওয়া অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে শেখ মুজিব অমন ষড়যন্ত্রে যুক্ত হতে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ বােধ করেননি। অপরদিকে দেখা যায়, আবেগ-নির্ভর বিপ্লবী মােয়াজ্জেম যখন জানলেন, ১৯৬৬’র ফেব্রুয়ারি মাসে মুজিব লাহােরে স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত রাজনৈতিক প্রস্তাব উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন, তখন মােয়াজ্জেমের মনে হয়েছিল, মুজিবের রাজনৈতিক উদ্যোগ “would upset his (Muazzem s) plans for direct action”, অর্থাৎ এ কথা পরিষ্কার যে, উভয়েই নিজের মত করে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখলেও, মুজিব-মােয়াজ্জেম আদৌ এক পথের অনুসারী ছিলেন না। 

  ১৪৯ 

  এমন পরিস্থিতিতে শেখ মুজিবের লাহাের যাবার উদ্যোগটি প্রতিহত করতে মােয়াজ্জেম একটি বার্তা পাঠিয়ে আব্দুল গাফফার চৌধুরীকে অনুরােধ করেছিলেন : “Please request Sheikh Mujib not to reveal his demand at the Lahore conference because it will put the Ayub regime on its guard. Please beg him to remain silent for a while. Our preparations are almost complete. As soon as we are in possession of needed arms we will stage revolt .If Sheikh Mujib starts his movement now Ayub will be alerted and all our plans will be frustrated” (১৭/১৪১)। গাফফার চৌধুরী এ বিষয়ে আলােচনা করতে গেলে শেখ মুজিব বলেছিলেন : “I know him. I also know about his proposal. He has recently been hobnobbing with Manik Choudhury. I have told Manik not to have anything to do with this madness. I would also advise you not to get involved in it. Our struggle is for the establishment of democracy and the realization of autonomy for the people of Bangladesh. I have always faught against the Pakistani military junta. It is not the purpose of my movement to replace it with Bengali military junta” (১৭/১৪১-১৪২)। 

 সুতরাং মানতেই হয়, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তা এবং অবস্থানগত বিবেচনায় ‘আগরতলা মামলা’টি যথার্থই একটি মিথ্যা মামলা ছিল। তবে প্রসঙ্গতই উল্লেখ করা দরকার, চীন-ভারত যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে আলােচনার জন্য বঙ্গবন্ধু নিজেই একবার আগরতলায় গিয়েছিলেন। তাঁর সে উদ্যোগ সফল হয়নি, কার্যত অব্যাহতও থাকেনি। সর্বোপরি এটা পাকিস্তানি গােয়েন্দাদেরও অজানাই থেকেছিল। তাই বাস্তব ক্ষেত্রে, রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য মামলাটিতে প্রসঙ্গটির উল্লেখই নেই। অর্থাৎ উক্ত মামলাটিতে সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রমূলকভাবেই বঙ্গবন্ধুকে জড়ানাে হয়েছিল। এবার আলােচ্য মামলাটিকে ‘আগরতল ষড়যন্ত্র মামলা  হিসেবে চিহ্নিত করার পাকিস্তানি সামরিক চক্রের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু আলােচনা করা যেতে পারে। 

 প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে মামলাটির পরিকল্পনাকারী হিসেবে সাধারণভাবে উল্লেখ করা হলেও, ভিন্নতর সূত্রে বলা হয়, প্রধান সেনাপতি আগা মােহাম্মদ ইয়াহিয়া ছিলেন মূল পরিকল্পনাকারী। “Yahya Khan, the new C.-in-C had justifiable grounds to take suitable legal action against the conspirators. Even so, he was not satisfied with the notion of punishing the guilty alone. He sensed a chance. If the arrested conspirators could be induced or pressed to 

  ১৫০ 

  testify falsely that the plot had backing of.India and that Mujib was  involved in it. The popular support behind Six Points would vanish. Extreme punishment for Mujib by a tribunal composed of handpicked judges would silence the clamour for autonomy, perhaps for ever” (১৭/১৪২)। 

 মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর আগেই আলতাফ গওহর, আইয়ুবকে জানিয়েছিলেন, যথেষ্ট নির্ভরযােগ্য প্রমাণ ছাড়াই শেখ মুজিবকে মামলায় জড়ানাে হচ্ছে। তাই আইয়ুবের হস্তক্ষেপে শেখ মুজিবের নাম বাদ দেয়া হয়েছিল। তবু “Yahya had been able to persuade Ayub to place the name of Mujib high on the list of accused. No decision of Ayub had such fateful consequence for him as this one. Far from isolating Mujib from the masses, the conspiracy trial served to popularize him (Mujib) as the heroic embodiment of Bengali nationalism  There could be little doubt now that it had failed as a propaganda exercise to influence opinion at home and abroad even before the commencement of the trial.” (১৭/১৪৫১৪৬)। 

 ঢাকা সেনানিবাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারের জন্য স্থাপিত বিশেষ আদালতের প্রধান ছিলেন পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এস. এ. রহমান এবং অপর দু’জন সদস্য ছিলেন ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি এম. আর. খান এবং বিচারপতি মকসুমুল হাকিম। সরকার পক্ষের উকিল ছিলেন পাকিস্তানের বিশিষ্ট আইনজীবী, প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঞ্জুর কাদের। বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ মােট ৩৫জন অভিযুক্ত এবং সরকার পক্ষে রাজসাক্ষীর তালিকায় ছিলেন ১১ জন। পৃথকভাবে ২১২জন সাধারণ সাক্ষীর একটি তালিকাও যুক্ত করা হয়েছিল। অভিযুক্তদের পক্ষে, প্রধান কৌঁসুলি ছিলেন ফৌজদারী আইন বিশেষজ্ঞ ঢাকার বিখ্যাত আইনজীবী আব্দুস সালাম। ইউরােপের প্রবাসী বাঙালিরা রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের আইন-উপদেষ্টা টমাস উইলিয়াম ‘কিউ.সি’কেও এ মামলার আইনজীবী হিসেবে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। ধারণা করা চলে, স্বাভাবিক নিয়মেই মামলাটি অকার্যকর হয়ে পড়তাে, কারণ সেনা-নির্যাতনে বাধ্য হয়ে যে যা-ই বলে থাকুন না কেন, আদালতে দাড়িয়ে অনেকেই যথার্থ সত্য কথা প্রকাশ করে দিচ্ছিলেন। সুতরাং আইনের ভিত্তিতে সংশয়াতীতভাবে মামলাটি প্রমাণ করা সম্ভব ছিল না। 

 “আমাদের আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ ছিল, মামলার বিরুদ্ধে শুধু আদালতেই লড়াই করা হবে না, লড়াই করতে হবে রাজনৈতিকভাবে দেশে-বিদেশে।  বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন,..মামলাকে কেন্দ্র করে একটি গণ 

  ১৫১ 

  আন্দোলন গড়ে তুলতে। হয়েছিলও তা-ই” (২৪/১৩২)। কর্নেল শওকত আলী উল্লেখ করেছেন, “ট্রাইব্যুনাল কক্ষেই একদিন একান্তে বঙ্গবন্ধুকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযােগ সত্য কিনা। এর উত্তরে বঙ্গবন্ধু আমাকে কানে কানে বলেছিলেন,  হ্যা । আমি আনন্দে উৎফুল্ল হয়েছিলাম এবং গর্বে আমার বুক ভরে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, আমি জানি, তােমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযােগও সত্য। আমিও তােমার জন্য গর্বিত (২৪/১৩৫-১৩৭)। বিশেষ আদালতের তথ্য-প্রমাণে অবশ্যই প্রতীয়মান হয় যে, মামলাটির আদৌ কোনাে সত্যতা ছিল না। তবে ধারণা করা যেতে পারে, দেশের পরিস্থিতি এবং দেশে-বিদেশে মামলাটির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের গুরুত্বের দিকটি পরিপূর্ণ রূপে উপলব্ধি করেই বঙ্গবন্ধু তাঁর সহবন্দিদেরকে মানসিকভাবে উজ্জীবিত রাখতে চেয়েছিলেন। 

 ১৯ জুন,১৯৬৮ সামরিক ট্রাইব্যুনালে মামলাটি শুরুর দিন সাদা প্যান্ট-শার্ট পরিহিত মুজিব বসেছিলেন অ্যাকিউজড় ডক’এ, পরিচিত কাউকে দেখা যায় কিনা, সেজন্য তিনি চারদিকে তাকাচ্ছিলেন। “Faiz Ahmed, the Chief Reporter of the Bengali daily Azad, was sitting behind him in the press gallery. He was sturtled to be addressed and proded by Mujib with his unlit pipe :  Faiz, Faiz, Hey Faiz  ! Faiz whispered : Mujib Bhai, it is absolutely forbidden for us to speak. I can t even turn my head around. Or else, I ll be expelled. Mujib said aloud, “If you have to live in Bangladesh you ll have to talk to Mujib . The tribunal chose to ignore this rude interruption in its proceedings.Mujib s courage was undimmed and he behaved with a | great sense of dignity throughout the trial” (৭/১৪৯-১৫০)। 

 আরেকটি ঘটনা ২৯ জুলাই তারিখের। মামলাটিতে সরকার পক্ষের প্রথম সাক্ষী ছিলেন লে. মােজাম্মেল হােসেন। মােজাম্মেল আদালতে বলেছিলেন, “It had been decided in January 1964 that Muazzem should contact Sheikh Mujib to bring him into the circle of conspirators  Then pointing at Mujib he said,  Would you kindly raise your hand, sir?  Visibly annoyed, Mujib stood up and said :  I am here ! Everybody knows me. It is for the court to ask me He is an approver and he is talking all lies and nonsense. I have lever seen-him” (৭/১৫০)। আজ এতকাল পরেও আমরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করবাে 

 যে, বঙ্গবন্ধু মুজিব একান্ত সাহসী এবং ব্যক্তিত্বপূর্ণ অবস্থান থেকেই ট্রাব্যুনাল কক্ষের বিভিন্ন পরিস্থিতির মােকাবিলা করেছিলেন। 

 ১৯৬৯-এর ৬ জানুয়ারি সকাল ৯টায় শেখ মুজিবুর রহমান জবানবন্দি উপস্থাপনের 

  ১৫২ 

  আগে, “ধীর লয়ে তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় উচ্চারণ করলেন, পূর্ব বাংলা শােষিত হচ্ছে, এ কথা বলা কি অপরাধ? চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নয়ন, অর্থনীতি এমনকি দেশরক্ষা খাতেও বৈষম্য চলছে। এ কথা বলা কি দেশদ্রোহিতা? ডিকটেটরের কাছে তা হতে পারে। কিন্তু জনতার আদালতে আমি শেখ মুজিবুর রহমান সম্পূর্ণ নির্দোষ । এই বলে তিনি তাঁর লিখিত জবানবন্দি আদালতের অনুমতিক্রমে পাঠ করা শুরু করলেন” (১৯/১৭৮) শেখ মুজিবের জবানবন্দিটি সম্যকরূপেই তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, পূর্ব বাংলার জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে আপােষহীনতা এবং অকুতােভয় চারিত্র্য-পরিচয় বহন করে, তাই কিছুটা দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেয়া আবশ্যক। “স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতীয় ও বঙ্গীয় মুসলিম লীগের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে আমার বিদ্যালয় জীবনের সূচনা হইতেই আমি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করিয়াছি। স্বাধীনতা লাভের পর মুসলিম লীগ পাকিস্তানের জনগণের আশাআকাঙ্ক্ষার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে। ১৯৪৯ সালে আমরা আওয়ামী লীগ গঠন করি। আওয়ামী লীগ একটি নিয়মতান্ত্রিকতার পথানুসারী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদ্যমান। ১৯৫৪সালে আমি প্রথম প্রাদেশিক পরিষদে এবং পরে জাতীয় সভায় নির্বাচিত হই। আমি দুইবার পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রিত্ব লাভ করি। জনসাধারণের কল্যাণার্থে একটি নিয়মতান্ত্রিক বিরােধী দল গঠন করার জন্য আমাকে ইতােমধ্যেই কয়েক বৎসর কারা-নির্যাতন ভােগ করিতে হইয়াছিল। সামরিক শাসন প্রবর্তনের পর হইতেই বর্তমান সরকার আমার উপর নির্যাতন চালাইতে থাকে। ১৯৫৮সালের ১২ই অক্টোবর  আমাকে গ্রেফতার করে দেড় বৎসরকাল বিনা বিচারে আটক রাখে। আমার বিরুদ্ধে ছয়টি ফৌজদারী মামলা দায়ের করে, কিন্তু  সকল অভিযােগ হইতে সসম্মানে অব্যাহতি লাভ করি। মুক্তিলাভের পর আমার উপর কিছু কিছু বিধি-নিষেধ জারি করা হয়। ..গােয়েন্দা বিভাগের লােকেরা ..ছায়ার মত আমার পিছু লাগিয়া থাকিত”। 

 “১৯৬২সালে বর্তমান শাসনতন্ত্র জারির প্রাক্কালে  সােহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করা হয় তখন আমাকেও জননিরাপত্তা অর্ডিন্যান্স বলে ছয় মাস বিনা বিচারে আটক রাখা হয়। ১৯৬৪ সালে দেশের উভয় অংশে আওয়ামী লীগকে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্জীবিত করা হয় সম্মিলিত বিরােধী দল প্রেসিডেন্ট পদে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ফাতেমা জিন্নাহকে মনােনয়ন দান করে। সরকারি কর্তৃপক্ষও পুনরায় আমার বক্তৃতা সম্পর্কে কয়েকটি মামলা দায়ের করিয়া আমাকে মিথ্যা বিরক্ত ও লাঞ্ছিত করিতে থাকে। ১৯৬৫ সালে ভারতের সাথে যুদ্ধ চলাকালে যে সকল রাজনীতিবিদ ভারতীয় আক্রমণের তীব্র নিন্দা করেন, আমি তাঁদের অন্যতম। যুদ্ধাবসানে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের প্রদেশ ভ্রমণকালে আমিও 

  ১৫৩ 

  অন্যান্য রাজনীতিবিদগণ আমন্ত্রিত হইয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করি। সেই সময় আমি পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান ও যুদ্ধকালে আমাদের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রদেশকে সামরিক প্রতিরক্ষার ব্যাপারে স্বয়ংসম্পূর্ণ করিয়া তুলিবার জন্য প্রেসিডেন্টের নিকট আবেদন জানাই”। 

 “আমি তাসখন্দ ঘােষণাকেও সমর্থন করিয়াছিলাম। ১৯৬৬ সালের গােড়ার দিকে লাহােরে আমি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমস্যাবলীর নিয়মতান্ত্রিক সমাধান, ছয়দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করি। ছয়দফা কর্মসূচিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান   উভয় অংশের জন্যই পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি করা হইয়াছে। ইহাতে প্রেসিডেন্টসহ সরকারি প্রশাসন যন্ত্র আমাকে অস্ত্রের ভাষায় গৃহযুদ্ধ ইত্যাদি হুমকি প্রদান করে এবং একযােগে এক ডজনেরও অধিক মামলা দায়ের করিয়া আমাকে হয়রানি করিতে শুরু করে। ১৯৬৬ সালের আটই মে রাত একটার সময় পুলিশ ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস-এর ৩২ধারায় আমাকে গ্রেফতার করে। একই সঙ্গে আমার প্রতিষ্ঠানের বহুসংখ্যক নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে। পূর্ব পাকিস্তানের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় বাংলা দৈনিক ইত্তেফাককেও নিষিদ্ধ ঘােষণা করে। ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত করে সম্পাদক জনাব তফাজ্জল হােসেন মানিক। মিয়াকে দীর্ঘকালের জন্য কারারুদ্ধ রাখিয়া বেশ কয়েকটি ফৌজদারী মামলা দায়ের করে”। 

 “আমাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে আমার প্রতিষ্ঠান ১৯৬৬ সালের ৭ইজুন সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করে। হরতালের দিন পুলিশের গুলিতে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে ১১ব্যক্তি নিহত হয়। পুলিশ প্রায় ৮০০ লােককে গ্রেফতার করে । গভর্নর জনাব মােনেম খান প্রায়শই বলিয়া থাকেন যে যতদিন তিনি গদিতে আছেন, ততদিন শেখ মুজিবকে শৃঙ্খলিত থাকিতে হইবে। প্রায় ২১মাস আটক রাখিবার পর | ১৯৬৮সালের ১৭/১৮ তারিখ রাত একটার সময় আমাকে তথাকথিত মুক্তি দেওয়া হয় এবং কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক হইতে কতিপয় সামরিক ব্যক্তি দৈহিক বল। প্রয়ােগ করিয়া আমাকে ঢাকা সেনানিবাসে লইয়া আসে এবং বহিঃজগৎ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া নির্জনে রাখা হয় বিশ্ব হইতে যােগাযােগবিহীন অবস্থায় এইভাবে আমাকে দীর্ঘ পাঁচ মাসকাল আটক থাকিতে হয়। এই মানসিক অত্যাচার সম্বন্ধে যত অল্প প্রকাশ করিতে হয়,ততই উত্তম”। 

 “আমার উপর নির্যাতন চালাইবার জন্য এবং আমার দলকে লাঞ্ছিত, অপমানিত ও আমাদিগকে কুখ্যাত করিবার জঘন্য মনােবৃত্তি লইয়া আমাকে এই তথাকথিত ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত করা হইয়াছে। ছয়দফার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিসহ সমতার ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করা ও নিষ্পেষণ করাই ইহার মূল উদ্দেশ্য। এই আদালতে আসিবার পূর্বে আমি লে. ক. 

  ১৫৪ 

  মােয়াজ্জেম হােসেন ও এই মামলায় জড়িত অন্যান্য স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনী কর্মচারীদের কখনও দেখি নাই। জনাব আহমদ ফজলুর রহমান, জনাব রুহুল কুদ্স ও জনাব শামসুর রহমান- এই তিনজন সিএসপি আমি মন্ত্রী হিসেবে কার্যসম্পাদনকালে তাহাদিগকে জানিবার সুযােগ পাইয়াছিলাম কিন্তু আমি তাহাদের সঙ্গে কখনাে কোন ষড়যন্ত্রেও ব্যাপৃত হই নাই। আমি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি। আমি অনিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে কদাপি আস্থাশীল নই। আমি দেশের উভয় অংশের জন্য ন্যায়বিচার চাহিয়াছিলাম দেশের জন্য যাহাই মঙ্গলকর ভাবিয়াছি সর্বদাই তাহা নিয়মতান্ত্রিক গণ্ডির ভেতর জনসমক্ষে প্রকাশ করিয়াছি তাহারা আমাকে ও আমার প্রতিষ্ঠানকে দমন করিয়া পাকিস্তানের বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানিদের উপর শােষণ ও নিষ্পেষণ অব্যাহত রাখিতে চায়”। 

 “আমাকে প্রতিহিংসাবশত মিথ্যা এই মামলায় জড়িত করা হইয়াছে। পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্র বিভাগ কর্তৃক ১৯৬৮সালের ৬ই জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রচারপত্রে অভিযুক্ত বলিয়া ২৮ব্যক্তির নাম লিপিবদ্ধ ছিল এবং উহার মধ্যে আমার নাম ছিল না। উক্ত প্রচারপত্রে ইহাও উল্লেখ করা হইয়াছিল যে, সকল অভিযুক্তই অভিযােগ স্বীকার করিয়াছে   তদন্ত প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে-শীঘ্রই বিচারার্থে আদালতে প্রেরণ করা হইবে। একজন প্রাক্তন মন্ত্রী হিসেবে অর্জিত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা জানাইতে চাই যে এইরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্ষেত্রে কোন প্রচারপত্র প্রকাশ করিতে হইলে প্রধানমন্ত্রী অথবা প্রেসিডেন্টের অনুমােদন লাভ আবশ্যক (অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী/প্রেসিডেন্টের অনুমােদনক্রমে প্রকাশিত প্রচারপত্রে তাঁর নাম ছিল না, এটাই প্রতিপাদ্য)। আমি নির্দোষ এবং এ ব্যাপারে পরিপূর্ণরূপে অজ্ঞ। তথাকথিত ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। ইতি স্বাক্ষর ও শেখ মুজিবুর রহমান” (১৯/১৭৯-১৮৬)। 

  ১৫৫ 

  অপ্রতিরােধ্য গণ-অভ্যুত্থানে মুজিবের মুক্তি : 

 জনতার প্রিয়নাম  বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান 

  শেখ মুজিব যেদিন ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তার আগের দিনই, ৫ জানুয়ারি, ১৯৬৯ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হয়েছিল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। অপরদিকে ক্যান্টনমেন্টে সেনা-প্রহরীর গুলিতে আগরতলা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হকের মৃত্যু (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯) গণমানুষের ক্ষুব্ধতাকে তুঙ্গস্পর্শী করে তুলেছিল। ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবেই উল্লেখ্য যে, ১৯৪৭ খ্রি. থেকে এযাবৎ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যে কাজটি পারেননি, তা-ই সম্ভব করেছিলেন বিভিন্ন দল-মত-বিশ্বাসের অনুসারী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ। দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানের উর্ধ্বে উঠেই ছাত্র নেতৃবৃন্দ সেদিন যৌথ নেতৃত্ব ছাত্রগণআন্দোলনকে অপ্রতিরােধ্য করে তুলতে পেরেছিলেন এবং আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে মূল দাবি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা  বাতিল এবং শেখ মুজিবের মুক্তি আদায়েও সফল হয়েছিলেন। 

 মওলানা ভাসানী কয়েক বছর যাবতই আইয়ুব-বিরােধী আন্দোলন এবং সকল প্রকার প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরেছিলেন। এসময় শেখ মুজিব ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত একজন বিশ্বাসী সাংবাদিকেরে মাধ্যমে আন্দোলন শুরু করার অনুরােধ জানিয়ে মওলানা ভাসানীর সাথে যােগাযােগ করেছিলেন। “The timing was perfect.   Of late, the Chinese had quietly let it be known that they were not averse to an alternative government in Pakistan so long it follows a pro-Chinese policy. Bhashani was now ready to make an about-turn in his attitude toward Ayub without any pangs of conscience. When he received Mujib s message his immediate reaction was : ‘Sheikh Mujib said this ! I know I must act.  So Bhashani left his village home ..He held a big meeting at Paltan Maidan lambashing the Ayub regime for its misdeeds” (৭/১৫১)। 

  ১৫৬ 

  মুজিবের বার্তা পেয়েই আতাউস সামাদ (বার্তাবাহী) এবং তাঁর সহকর্মী আব্দুর রহিম দেখা করেছিলেন মওলানা ভাসানীর সাথে। পরবর্তী বর্ণনা এ.বি.এম মূসার ‘মুজিব ভাই’ থেকে : “হুজুর, শেখ সাহেব জানিয়েছেন আপনাকে তার মুক্তির জন্য আন্দোলনে যেতে হবে । মওলানা বললেন, ‘আন্দোলন করব। তবে আইয়ুবের গােল টেবিলের পর’। সামাদ বলল, হুজুর, শেখ সাহেব বলেছেন, তিনি এগার বছর আপনার জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। বলেছেন, এ দেশে রাজনীতি করতে হলে তার আমাকে প্রয়ােজন হবে, আমারও তাকে নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। মওলানা বলে উঠলেন, ‘মজিবর একথা বলেছে? ঠিক আছে, তাকে মুক্ত করে ছাড়ব । তার পরদিনই (১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯) পল্টন ময়দানে মওলানা আঙুল তুলে হুংকার দিয়ে উঠলেন লক্ষ জনতার সমাবেশে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নতুন স্লোগান যােগ হলাে, ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’। শুরু হলাে মওলানার সুখ্যাত বা কুখ্যাত সেই জ্বালাও পােড়াও আন্দোলন” (২৫/৫১-৫২)। পল্টনের সমাবেশে ভাসানী আরাে বলেছিলেন, “আমার তিনটি সন্তানের চাইতেও মজিবর উত্তম, মজিবর মিয়ার যদি কিছু হয় তবে পাকিস্তান বল আর যাই বল কিছুই থাকবে না। সরকারকে মাত্র দুই মাসের সময় ধরে দিয়ে মওলানা ভাসানী বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ছাত্রদের ১১ দফা দাবি মেনে না নিলে খাজনা-ট্যাক্স সব বন্ধ করে দেয়া হবে। তিনি আইয়ুব খানের গােলটেবিল বৈঠকের তীব্র বিরােধিতা করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি দাবি করে মওলানা সাহেব মঞ্চ থেকেই এই স্লোগান তুলেন, চলাে চলাে .সমবেত জনতা সমস্বরে স্লোগানের শেষ অংশ কণ্ঠে তুলে নিল ক্যান্টনমেন্ট চলাে” (১৯/২০৩)। 

 এবার ২৪ফেব্রুয়ারির প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের কথা। ৫ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পর ১৭জানুয়ারি থেকে আন্দোলনের মাত্রা ক্রমশ তীব্রতর হয়ে উঠতে থাকে। এবং শেখ মুজিবের মুক্তি পর্যন্ত অপ্রতিরােধ্য ধারায় চলতেই থাকে। ২০ জানুয়ারি “পুরনাে কলাভবনের উল্টো দিকে..প্রগতিশীল ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামানকে রিভলবারের গুলিতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। হাজার হাজার ছাত্র মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লাশ পাহারা দিয়ে রাখে। পক্ষান্তরে পুলিশের আইজিপি’র নেতৃত্বে ইপিআর ও সশস্ত্র পুলিশের বারংবার হামলায় লাশ দখলের চেষ্টা চালানাে হয়। তােফায়েল আহমদের সভাপতিত্বে এক শােকসভা অনুষ্ঠিত হয় এবং শােক। মিছিল নগরীর রাস্তায় নেমে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একটি নগ্নপদ মিছিল এই হত্যার প্রতিবাদে বের হয়। চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় পুলিশ ও ছাত্রদের মধ্যে কয়েক দফায় সংঘর্ষ  .রাজশাহীসহ প্রদেশের অন্যান্য শহরে ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষুব্ধ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়” (১৯/২০০)। 

 “সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১দফা দাবিতে ১৯৬৯-এর ২৪জানুয়ারি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা, ছাত্র 

  ১৫৭ 

  ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শাসুদ্দোহার বর্ণনা : “শহীদ মতিয়ুর শহীদ আসাদসহ অনেক শহীদের আত্মত্যাগে সৃষ্ট এই মহান গণঅভ্যুত্থান।  ক্ষুব্ধ জনতার মিছিল ক্যান্টনমেন্টে যেতে চায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ক্যান্টনমেন্টে বন্দি, জনতা সেই ক্যান্টনমেন্ট থেকে তাদের প্রিয় নেতাকে বের করে আনতে চায়, ঢাকা শহরের নানা স্থানে আগুন মিছিল, গণ-সংগ্রামকে সঠিক পথে পরিচালনাই ছিল আমাদের কর্তব্য।  মিছিলকে ইকবাল হলের মাঠে নিয়ে গিযে পরদিন বেলা দুইটায় পল্টনের জনসভা ঘােষণা করা হয় মুক্তিপাগল মানুষকে ক্ষণিকের জন্য শান্ত করা গেলেও সেই রাতেই কারফিউ ভেঙ্গে জনতার মিছিল রাতের ঢাকাকে আবারাে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তােলে। ৬৯-এর ২৪ জানুয়ারি সারাদিন এবং কারফিউর মধ্যে সারারাতের গণসংগ্রাম ঐতিহাসিক মহান গণঅভ্যুত্থানের দিন বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে অমর”(২৬/২৮৫-২৮৭)। 

 আইয়ুব খানের আহুত রাওয়ালপিন্ডি গােলটেবিল বৈঠকে (১৯ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯) যােগদানের জন্য মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিব আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। “An advance team of Awami Leaguers led by Tajuddin and Mushtaque Ahmed went to Islamabad to explore the possibility of getting Mujib released so that he could attend the RTC. They made it clear that the Awami League would not take part in the RTC while Mujib was in detention. But there was no ..provision for bail under the Ordinance to try the Agartala case” (১৭/১৫২)। কিন্তু আইয়ুব জানতেন, আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ এবং সম্মতি ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানে কোনাে সিদ্ধান্তই কার্যকর করা যাবে না। তাছাড়া, ভাসানী এবং ভুট্টো গােলটেবিল বৈঠক বয়কটের ঘােষণা দেওয়ায় আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। 

 “আওয়ামী লীগের অনেক কর্তাব্যক্তি, জাতীয় দৈনিক পত্রিকার বাঘা বাঘা সম্পাদক, সবাই প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের প্রস্তাব অনুযায়ী প্যারােলে (মুজিবকে) মুক্তি নিয়ে গােলটেবিল বৈঠকে যােগদানের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ এবং তরুণ নেতৃবৃন্দ প্যারােলে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিরােধিতা করেন” (১(২)/৯১৮)। “ফেব্রুয়ারির ১৭ বা ১৮ তারিখ থেকে বিভিন্ন মহল শেখ সাহেবকে প্যারােলে যাওয়ার প্রস্তাব দিতে থাকে। এনডিএফের নেতা মৌলবী ফরিদ আহমদ সরাসরি তাঁর সঙ্গে যােগাযােগ করে অনুরােধ জানান প্যারােলে মুক্তি নিতে। তার (শেখ মুজিবের) অন্তরঙ্গ দুজন প্রভাবশালী সম্পাদক জেলে দেখা করে তাকে একই অনুরােধ জানান। ঢাকায় তখন তার মুক্তির দাবিতে কারফিউ ভেঙ্গে রােজ রাতে মানুষের ঢল নামছে রাস্তায়। তারা প্রাণ দিচ্ছে, রক্ত দিচ্ছে প্রিয় নেতাকে মুক্ত করে আনার জন্য, মুচলেকা দিয়ে আইয়ুবের দরবারে 

  ১৫৮ 

  যাওয়ার জন্য নয়। কিন্তু এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন যিনি, তিনিও ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত”(২৫/৩৭)। 

 প্রাসঙ্গিক একটি বিশেষ তথ্য জানিয়েছেন কর্নেল শওকত আলী : “১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বন্দিশালার বারান্দায় আমরা যখন তাঁর সঙ্গে চা পান করছিলাম, তখন রেডিও পাকিস্তানের সংবাদ বলা হয়, মওলানা ভাসানী গােলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। বুলেটিন শেষ হতেই বঙ্গবন্ধু আমাদের বললেন, মামলা প্রত্যাহার হবে এবং শিগগিরই আমরা সকলে মুক্তি লাভ করব।  যেহেতু মওলানা ভাসানী বৈঠকে যােগদান না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেহেতু আমার উপস্থিতির নিশ্চয়তা বিধানের প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া আর কোনাে বিকল্প থাকবে না। যার অর্থ দাঁড়ায়, আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করা এবং আমিসহ আমার সব সহযােগী আসামিকে আটকাদেশ থেকে অব্যাহতি প্রদান। শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়” (২৭/১৪৭-১৪৮)। তবে এ কথাও ঠিক যে, মওলানা ভাসানী নিজে যেমন বৈঠকের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তেমনি চেয়েছিলেন মুজিবও সেখানে যাবেন না। এবিষয়ে ভাসানী-মুজিবের প্রত্যক্ষ কথােপকথন ছিল যথার্থই কৌতূহলােদ্দীপক। 

 ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বন্দিশালার প্রতিটি কক্ষে এসে আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে জানান যে, মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং সকালেই সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিছুক্ষণ পর ব্রিগেডিয়ার রাও ফরমান আলী একটি জীপ নিয়ে আসেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে তাঁর ধানমন্ডির বাড়িতে পৌঁছে দেন। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ তাদের নিজস্ব রায় প্রদান করে”(২৪/১৪৮)। ২২ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ খ্রি. ঢাকার রাজপথে লক্ষকণ্ঠের গগণ বিদারী বিজয় উল্লাস : ‘জেলের তালা ভেঙ্গেছি   শেখ মুজিবকে এনেছি  ‘জেগেছে জেগেছে বাঙালি জেগেছে। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ২৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে “ষড়যন্ত্রের আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিব মুক্ত’ শিরােনামে প্রথম পৃষ্ঠার প্রধান খবরে বলা হয়েছিল : “পূর্ব বাংলার মাটিতে অবশেষে বাস্তিলের কারাগার ধ্বসিয়া পড়িয়াছে। জনতার জয় হইয়াছে। গণদাবির নিকট নতি স্বীকার করিয়া দোর্দণ্ড প্রতাপ সরকার আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানসহ এই মামলায় অভিযুক্ত সকলকে গতকল্য মধ্যাহ্নে বিনাশর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হইয়াছে” (২২/৬৫)। 

 ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে পূর্ব বাংলার ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে ‘ডাকসু শেখ মুজিবের সংবর্ধনার আয়ােজন করে।  দূর দূর অঞ্চল থেকেও অনেকেই শেখ মুজিবকে দেখতে এবং তার কথা শুনতে রেসকোর্স মাঠে হাজির হয়েছিলেন। সভা পরিচালনাকারী তােফায়েল আহমেদ সমাবেশে উপস্থিত লক্ষ লক্ষ ছাত্র-জনতার অনুমতি নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু’ নামে অভিহিত করলেন। সমবেত জনতার মুখরিত স্লোগান : বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু -বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু 

  ১৫৯ 

  বললেন, “আমি শেখ মুজিবুর রহমান গােলটেবিল বৈঠকে যােগ দিতে যাবাে। আমার ৬-দফার সাথে আমার জনগণ এবং দল আছে। আমি যদি এ দেশের মুক্তি আনতে এবং জনগণের দাবি আদায় করতে না পারি, তবে আন্দোলন করে আবার আমি কারাগারে চলে যাবাে। বাংলার মাটিকে আমি ভালােবাসি আর বাংলার মাটিও আমাকে ভালােবাসে” (১৯/২১৭)। 

 সংবর্ধনা সভাশেষে রেসকোর্স ময়দান থেকে বেরিয়ে এলেন জনগণের প্রীতি-শ্রদ্ধায়। অভিষিক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এখানে একটি অনালােচিত তথ্য উদ্ধৃত করছি অধ্যাপক ড. মােহম্মদ আসলাম ভূঁইয়া’র ‘বঙ্গ-শার্দুল থেকে বঙ্গবন্ধু শিরােনামের নিবন্ধ থেকে। “১৯৬২ সালে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় একটি স্লোগান দেয়া হতাে, বঙ্গ-শার্দুল শেখ মুজিবের মুক্তি চাই। আমি তার মুক্তির জন্য রাজপথে মিছিল-শােভাযাত্রা করেছি। কিন্তু শার্দুল’ শব্দের অর্থ আমার জানা ছিল না। তাই সিনিয়র একজন ছাত্রনেতাকে জিজ্ঞাসা করলাম, বললেন,  ‘শার্দুল অর্থ হচ্ছে বাঘ। তার মানে শেখ মুজিব বাংলার বাঘ’। যেহেতু এ.কে. ফজলুল হককে শেরে বাংলা বলা হতাে, তাই শেখ মুজিবকে বঙ্গ-শার্দুল বলা হতাে এবং এই উপাধি শেরে বাংলা নিজেই তাকে দিয়েছিলেন”(১(২)/১০০৫-১০০৭)। 

 অতঃপর ভাসানী-মুজিব সাক্ষাৎকারের একটি নাটকীয়’ বর্ণনা এম.আর. আখতার মুকুলের লেখা ‘আব্বা হুজুরের দেশে’ বইটি থেকে। ২৩ ফেব্রুয়ারি, রেসকোর্সে গণ সম্বর্ধনার পরই বঙ্গবন্ধু গিয়েছিলেন মওলানা ভাসানীর সাথে সাক্ষাৎ করতে। “শেখ সাহেব কদমবুচি করতে গেলে, মওলানা সাহেব বহুদিন পরে তাঁর ‘মুজিবুর মিঞা’কে বুকে জড়িয়ে আশীর্বাদ করলেন।  

 মওলানা : মুজিবুর মিঞা, তুমি আর.টি.সি.তে (গােলটেবিল বৈঠক) যাইয়াে না। 

 শেখ মুজিব : হুজুর, আমি তাে কথা দিছি, মামলা উঠাইয়া নিলে রাওয়ালপিন্ডি যাব। 

 মওলানা : ভুট্টো যাইবাে না। আমিও বয়কট করছি। তুমি না গেলেই আ.টি.সি. শ্যাষ। 

 শেখ মুজিব : তবু ওয়াদা রাখতে দোষটা কি? 

 মওলানা : মুজিবর মিঞা, রাওয়ালপিন্ডি যাইয়া তুমি আর.টি.সি. ভাংবা? কেমন? 

 শেখ মুজিব : কিসের জন্য? আমি আমার ৬-দফার দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলন সবকিছু দুই হাতে জড়াইয়া রাখব। হুজুর, তাহলে তাে গােলটেবিল শ্যাষ। 

 মওলানা : আর পিন্ডি যাইয়া লাভ আছে? প্রেসিডেন্ট আইয়ুব তাে এখন মরা লাশ। 

 শেখ মুজিব : হুজুর সেই মরা লাশের জানাজা পড়তে দোষ কি? আমারে দোয়া করবেন”(২৭/২১৯-২২০)। 

  ১৬০ 

  বঙ্গবন্ধু ২৪ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে লাহাের হয়ে রাওয়ালপিন্ডি পৌঁছেই আইয়ুবের সাথে প্রথমবারের মত একান্ত সাক্ষাৎকারে মিলিত হয়েছিলেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন ঘােষণার পরই গােলটেবিল বৈঠক ১০মার্চ পর্যন্ত মূলতবি করা হয়েছিল। প্রকাশ্য কারণ ছিল আসন্ন ঈদ উদযাপন আর অপ্রকাশ্য কারণ, নেতাদের নিজেদের মধ্যে একটা বােঝাপড়ার সময়-সুযােগ তৈরি করা। বঙ্গবন্ধু সেদিনই ঢাকায় ফিরে দু দিন পরেই পিতা-মাতার সাথে ঈদ উৎসব পালনের জন্য টুঙ্গিপাড়া চলে গেলেন। ঈদের আগেই একদিন আইয়ুব খানের প্রতিনিধি হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের অতি ধনাঢ্য পরিবারের ইউসুফ হারুণ ঢাকা থেকে সামরিক হেলিকপ্টারে টুঙ্গিপাড়ায় এলেন। উদ্দেশ্য, পিন্ডি গােলটেবিল আলােচনায় বঙ্গবন্ধু যেন ৬-দফার প্রশ্নে নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেন। কিন্তু হারুণ পরিবারের সাথে পূর্বাবধি সৌজন্য-সৌহার্দের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু হারুণের প্রস্তাবে অসম্মতি প্রকাশ করলেন। অনস্বীকার্য যে, সকল পর্যায়ে তার অনড় অবস্থানই ৬-দফাকে শেষপর্যন্ত এক-দফা’য় পরিণত করেছিল। 

 ১০মার্চ, ১৯৬৯ খ্রি. গােলটেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধু তাঁর ৬-দফা এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১-দফার উল্লেখ করে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনসহ ফেডারেল পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার, এক লােক এক-ভােট ভিত্তিক সার্বজনীন প্রত্যক্ষ ভােটাধিকার এবং পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট বাতিলের দাবি উপস্থাপন করলেন। বৈঠকে সমবেত নেতৃবৃন্দ সামগ্রিকভাবে বঙ্গবন্ধুর সাথে একমত হতে পারেননি। প্রেসিডেন্ট আইয়ুবও প্রস্তাবগুলি গ্রহণ করতে পারলেন না, তার ধারণা ছিল, এগুলি কেন্দ্রীয় শাসন এবং সমগ্র সেনাবাহিনীকেও দুর্বল করে ফেলবে। বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তব্যে অবিচল থাকলেন, “৬-দফা আমার বাঙালির বাঁচার দাবি। এতে কোনােরূপ রদবদল করা আমার বাঙালি জাতির প্রতি বেইমানী করার শামিল। আমি কোন অবস্থায়ই বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে আপােষ করতে পারবাে না”(৩/২২৩)। একপর্যায়ে আইয়ুব খান বলেছিলেন, পরবর্তী জাতীয় সংসদই হবে এসব বিষয় আলােচনার উপযুক্ত স্থান। কিন্তু তাতেও বৈঠকে অগ্রগতি বা ঐকমত্য 

 হওয়াতে কোনাে সিদ্ধান্ত, এমনকি, পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠানের কোনাে উল্লেখ ছাড়াই গােলটেবিল বৈঠক শ্যাষ হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব বৈঠকের সমাপনী অধিবেশনে বলেছিলেন, শুধুমাত্র পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং নির্বাচিত সংসদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া আর কোনাে বিষয়েই তার আগ্রহ নেই। কিন্তু প্রত্যাশিত এ দু’টি কাজও তিনি করতে পারেননি। স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৫৮সালে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জার নিকট থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁকে দেশান্তরী করার ব্যাপারে আইয়ুবের প্রধান সহায়ক ছিলেন ইয়াহিয়া খান, এবার ইয়াহিয়া খানই বিদায় করলেন আইয়ুবকে। 

  ১৬১ 

  সামরিক শাসন এবং ইয়াহিয়া-ভুট্টোর চক্রান্ত : 

 ১৯৭০সালের নির্বাচনে ছয়-দফার পক্ষে অভাবনীয়  ম্যান্ডেট  

  ২৬ মার্চ, ১৯৬৯ প্রধান সেনাপতি ইয়াহিয়া খান রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করে পাকিস্তানে দ্বিতীয় বারের মত সামরিক শাসন জারি করেন। সেদিনই বেতার-ভাষণে জাতির উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, কেবল সাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠার উপযােগী যথাযথ পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর অভিপ্রায়। উল্লেখ্য যে, প্রায় তিন বৎসর (৮মে ১৯৬৬ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ পর্যন্ত) বন্দি থাকায় বঙ্গবন্ধু স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে দূরে ছিলেন। এবার সেনা-শাসক ইয়াহিয়া খান প্রকাশ্য সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করলেও ঘরােয়া রাজনীতি’ চালানাের অনুমতি দেয়াতে বঙ্গবন্ধু তাঁর তৎপরতা শুরু করেন। জেলায় জেলায় ঘরােয়া সভা করে দলীয় নেতা-কর্মীদের বৈঠকে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করার তাগিদ দেন। সােহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে (৫ ডিসেম্বর, ১৯৬৯) বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমি ঘােষণা করিতেছি, আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম হইবে পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধুমাত্র বাংলাদেশ’ (১(১)/৯৩)। অতঃপর ১৯৭০সালের ৬ জানুয়ারি (কাউন্সিল সভার মাধ্যমে) বঙ্গবন্ধু পুনরায় আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। 

 নির্বাচন এবং নির্বাচনােত্তর রাষ্ট্র-রাজনৈতিক কার্যক্রম সুবিধামত নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে “লিগেল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার’ (LFO-1969) জারি করে সেনা-শাসক ইয়াহিয়া ঘােষণা দিলেন, ১৯৭০ সালের প্রথম দিন থেকেই রাজনৈতিক কার্যকলাপের ওপর কোনাে বাধানিষেধ থাকবে না এবং বছরের শেষ দিকে এক লােক এক ভােট’ ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এল.এফ.ও-১৯৬৯  এর আওতায় ঘােষণা করা হলাে : “Pakistan would be known as the Islamic Republic of Pakistan; the Islamic ideology, the basis for the creation of Pakistan would be preserved, and the Head of State must be a Muslim (Section 20). The Constitution Bill as passed by the National Aasembly within 120days of its first meeting, would be presented to the President for authentication. The National Aasembly would be disolved if it failed to produce the 

  ১৬২ 

  Constitution or if the authentication was refused (Section 23). Only the President was empowered to resolve any question or doubt as to the interpretation of any provisions of the Order. Such decisions would be final and not liable to be questioned by any court (Section 27). (১৭/১৬৪-১৬৫)। 

 ইয়াহিয়া‘এল.এফ.ও’তে নির্দিষ্ট করেছিলেন যে, যে-কোনাে সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বৈধতা পাবে এবং দৃশ্যতই এবিষয়ে কারাে আপত্তির সুযােগ ছিল না। অপরদিকে, ইয়াহিয়া নিশ্চিত ছিলেন, মুজিব-ভুট্টো সমঝােতা অসম্ভব বিধায়, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কোনাে সিদ্ধান্ত গ্রহণেরই সম্ভাবনা থাকবে না। এল.এফ.ও-১৯৬৯  ঘােষণার সঙ্গে সঙ্গেই ন্যাপ(পিকিংপন্থী) এবং ন্যাপ (মস্কোপন্থী) উভয় পক্ষই প্রত্যাখ্যান করেছিল। আওয়ামী লীগের দিক থেকে প্রবল আপত্তির কারণ ছিল দু টি, প্রথমত এল.এফ.ও’তে আওয়ামী লীগের অনুসৃত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির বিষয়টি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়া হয়েছিল, এবং দ্বিতীয়ত, প্রেসিডেন্টের হাতে সময় ‘ভেটো ক্ষমতা ন্যস্ত করে, কার্যতই ভবিষ্যতের সংবিধানকে প্রেসিডেন্টের খেয়াল-খুশির বিষয় করে তােলা হয়েছিল। কিন্তু নিজস্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং বাস্তবতাবােধের নিরিখে শেখ মুজিব বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করেছিলেন।“He (Mujib) told them (Party collegues) his sole aim was to win the elections by capturing 99 per cent of the Bengali seats. Who would then ignore his plan for Bangladeh?” (১৭/১৬৫)। 

 মুজিবের চিন্তায় এটাও ছিল যে, প্রকৃতপক্ষে কোনাে দলই ছ’-দফা’র প্রতি সমর্থন জানায়নি। সুতরাং তার সিদ্ধান্ত ছিল, আওয়ামী লীগের একক শক্তি-সামর্থ্যের ভিত্তিতেই আসন্ন নির্বাচন মােকাবিলা করতে হবে। কার্যত তাঁর এমন সিদ্ধান্তের ফলেই আওয়ামী লীগ এককভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পেরেছিল। অপরদিকে মওলানা ভাসানীর দুর্ভাবনা ছিল, “Mujib s vast popularity was mainly due to his uncompromising demand for complete autonomy. He felt that Mujib could be thwarted from gaining outright majority in the polls, if Yahya could be induced to grant some measure of autonomy before the election, to deny Mujib the opportunity to exploit the issue. He made an appeal to Yahya in January (1970) to do so” (১৭/১৬৮)। কিন্তু‘এল.এফ.ও-৬৯ র সর্বময় কর্তৃত্ব হাতে থাকায় ইয়াহিয়ার কাছে মওলানা ভাসানীর পরামর্শটি আদৌ গ্রহণযােগ্য হয়নি। 

 ৭ জুন (ছ’-দফা বার্ষিকী) ১৯৭০, রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক 

  ১৬৩ 

  সম্মেলনে, সভাপতি বঙ্গবন্ধু মুজিব ঘােষণা করলেন, আগামী নির্বাচন, পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন প্রকৃতপক্ষেই ছ’-দফার ওপর রেফারেন্ডাম’ বা গণভােট হিসেবে গণ্য হবে। সম্ভাব্য সকল পরিস্থিতি মােকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আপনারা বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনকে ছ’ পয়সার একটা পােস্টকার্ড পাঠান, তাতে লিখে দিন, বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য সবাই যেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে ভােট দেয়। আমার উপর যদি আপনাদের আস্থা ও বিশ্বাস থাকে আমি নেতা নই, আমি আপনাদের মতই কর্মী। সােহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা, তাঁরাই আমার নেতা। বক্তব্য শেষ করলেন জয় সিন্ধু, জয় পাঞ্জাব, জয় বেলুচিস্তান, জয় সীমান্ত প্রদেশ, জয় বাংলা ও জয় পাকিস্তান বলে”(১(৩)/১২৪০)। 

 বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আসন্ন নির্বাচন হবে ছয়-দফার পক্ষে গণভােট”- এর সমালােচনা করে পিডিএম-নেতা নুরুল আমিন বললেন, “যদি আসন্ন নির্বাচন ছয় দফার পক্ষে গণভােট হয় আর পশ্চিম পাকিস্তানে তা কোনও সমর্থন লাভ না করে, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় পশ্চিমের আর পূর্বের পৃথক হয়ে যাওয়া”। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “১৯৪৬ সালে আমরা গান্ধী, নেহরু ব্রিটিশদের বিরােধিতা সত্ত্বেও গণভােটে বিজয় লাভ করেছিলাম, এবারও আমরা নুরুল আমিন ও তার পাকিস্তানি প্রভুদের বিরােধিতা সত্ত্বেও জয়লাভ করবাে” (১(১)/৪৭১)। হামিদুল হক চৌধুরীর অবজারভার পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, “যখনই জয় বাংলা স্লোগান শুনি, তখনই মনে হয় কিছু স্বেচ্ছাসেবক লাঠিসােটা ও অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করতে আসছে” (১(৩)১২৪১)। 

 পূর্ব বাংলায় আগস্ট মাসে প্রবল বন্যার কারণে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ৫ অক্টোবর থেকে ৭ ডিসেম্বরে পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আবার ১২নভেম্বর নজিরবিহীন প্রবল সামুদ্রিক ঝড়-জলােচ্ছ্বাসে জান-মালের অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতি হলাে, দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলবর্তী গ্রাম-জনপদে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সব রকমের স্বাভাবিক যােগাযােগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় হেলিকপ্টার ছাড়া দুর্গত অঞ্চলে রিলিফ সামগ্রী পৌঁছানাের কোনাে উপায় ছিল না। কিন্তু “No helicopter was made available for this purpose . although as many as 59 were sitting idle in West Pakistan” (১৭/১৬৯)। আওয়ামী লীগ তখন নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিদ রেখে দুর্গতদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজে নেমে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু নিজেও দুর্গত এলাকায় ব্যাপক সফর করে বিপন্ন মানুষের অবস্থা এবং ত্রাণ কাজ পরিদর্শন শেষে ঢাকায় ফিরে সাংবাদিক সম্মেলনে বাঙালির প্রতি অবহেলা-বঞ্চনার কঠোর সমালােচনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের দুর্গত মানুষের জন্য সাহায্য সংগ্রহ এবং প্রেরণ করছে, কিন্তু পাকিস্তানের শাসকরা এগিয়ে আসেননি, নীরব-নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন পাকিস্তানের 

  ১৬৪ 

  ‘২২ পরিবার’এর সম্পদশালী মানুষেরাও। পাকিস্তানের  স্বঘােষিত ইসলামের জিম্মাদার’ মওদুদি-কাইয়ুম-দৌলতানা-নসরুল্লাহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দেরও তীব্র সমালােচনা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ক্ষুব্ধ মন্তব্য ছিল : “Power must be won by the people, whether it is through election, or if the elections are aborted, through the strength of an awakened people” (প্রাগুক্ত)। 

 প্রবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণ দেখিয়ে ভাসানীসহ পূর্ব বাংলার অনেক নেতাই। স্লোগান তুলেছিলেন, ভােটের আগে ভাত চাই’ এবং ব্যালট বাক্সে লাথি মার// বাংলাদেশ স্বাধীন কর  ইত্যাদি। তাতে সামরিক শাসন প্রলম্বিত হবে জেনেও তারা উদ্বিগ্ন হননি। প্রকৃতপক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা-না-করা নিয়ে ভাসানী তখন বেশ কিছুকাল যাবৎই দোটানায় ছিলেন। বিশেষত তাঁর ‘অতি-বাম’ অনুসারীরা নির্বাচন সম্পর্কে আদৌ আগ্রহী ছিলেন না। দলের ভেতরেও চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থাকায় ন্যাপের পক্ষে নির্বাচনী কার্যক্রমের পরিকল্পনা করাই সম্ভব হয়নি। সর্বোপরি আশঙ্কা ছিল, ন্যাপ-প্রার্থীরা আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের কাছে বিপুলভাবেই পরাজিত হবে। সব মিলিয়ে, “Bhashani was probably looking for a graceful exit, and the cyclone provided him .excuse to withdraw from the electoral race” (১৭/১৭০)। নির্বাচনের মাত্র একসপ্তাহ আগে তিনি সাইক্লোন রিলিফ’ কাজের জন্য ন্যাপ-প্রার্থীদেরকে নির্বাচন থেকে প্রত্যাহার করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। 

 রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং আস্থার ভিত্তিতেই বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার জন্য নির্ধারিত কেন্দ্রীয় পরিষদের আসনগুলিতে এবং প্রাদেশিক পরিষদের আসনগুলিতেও বিপুল। বিজয়ের আশা করছিলেন। কিন্তু তখনাে পর্যবেক্ষকরা কেউ সে সম্ভাব্য বিপুল বিজয়ের মাত্রাটা আন্দাজও করতে পারেননি। পাকিস্তান গণ-পরিষদে (কেন্দ্রীয় পরিষদ) মােট ৩১৩ আসনের(সাধারণ আসন ৩০০ এবং সংরক্ষিত মহিলা আসন ১৩টি) মধ্যে পূর্ব বাংলার জন্য ছিল ১৬৯টি আর পশ্চিম পাকিস্তানের ১৪৪টি। পূর্ব। বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের আসন ছিল ৩০০টি। গণ পরিষদে পূর্ব বাংলার ১৬৯টি আসনের (সাধারণ আসন ১৬২ এবং সংরক্ষিত মহিলা আসন ৭টি) মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন ১৬৭টি আসনে (সাধারণ আসন ১৬০ এবং মহিলা আসন ৭টি)। পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ। উল্লেখ্য যে, ১৯৭০ খ্রি. নির্বাচন সম্পর্কে। কোনাে অভিযােগই উঠেনি জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। তবু একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্র’এ চরম মিথ্যাচার করে বলা হয়েছিল, “নির্বাচনে সন্ত্রাসবাদীদের কলা-কৌশলের সাফল্য শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর দলের সাহস বাড়িয়ে দিলাে” (২৮/৪০)। 

  ১৬৫ 

  পশ্চিম পাকিস্তানের সর্বমােট ১৪৬ আসনের মধ্যে ভুট্টোর পিপিপি পেয়েছিল মােট ৮৮টি আসন। এর মধ্যে একটি ছাড়া সবগুলি ছিল পাঞ্জাব এবং সিন্ধু প্রদেশে। পশ্চিম পাকিস্তানে নির্বাচন-জয়ী ভুট্টোকে অভিনন্দন-বার্তা প্রেরণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু কিন্তু ভুট্টোর এটা পছন্দ হয়নি, কারণ তাঁর মন তখন এক হঠকারী চিন্তায় আচ্ছন্ন ছিল। ২০ ডিসেম্বর ভুট্টো বলেছিলেন : “Punjab and Sind are the bastions of power in Pakistan. Majority alone does not count in national politics. No government at the centre could be run without the cooperation of the PPP which controlled these two provinces. I have the key of Punjab assembly in one pocket and that of the Sind in the other” (১৭/১৭১)। অর্থাৎ ভুট্টোর বক্তব্যের ঔদ্ধত্য আর হুমকিটাও আদৌ অস্পষ্ট ছিল না। 

 পরবর্তী ইতিহাস ভুট্টো-ইয়াহিয়ার ষড়যন্ত্রের বিপরীতে বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্যভেদী রাজনৈতিক দৃঢ়তার। ১৯৬৬ সাল থেকে তিনি বাংলার ও বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা ১৯৭০সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু কেন্দ্রে ও প্রদেশের বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে .সারা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিলেন যে, এই ভূখণ্ডের একমাত্র নৈতিক ও রাজনৈতিক মুখপাত্র তিনি ছাড়া আর কেউ নন। অনেকেই তাকে নির্বাচন পরিহারের কথা বলেছিলেন। তিনি তাঁর হুজুর মওলানা ভাসানীর কথাও শােনেননি। নিয়মতান্ত্রিক কিংবা সশস্ত্র পন্থায় বাংলাদেশ সৃষ্টি করতে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন জরুরি ছিল, যা তিনি শত বাধা-বিপত্তি বা প্রতিকূলতার মাঝে জয়ী হলেন”(১(৩)/১৫৯৮-১৫৯৯)। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি ঢাকার রেসকোর্সে নির্বাচনী বিজয় উদযাপন উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে আওয়ামী লীগ দলীয় | প্রাদেশিক ও গণ-পরিষদ সদস্যদের জন্য ছয়-দফা বাস্তবায়নের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে জনতাকে সাক্ষী করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আজ এদের আমি শপথ গ্রহণ করালাম। এদের কেউ যদি কোনদিন বাংলার মানুষের সাথে বেঈমানী করে, তাহলে তাদের জীবন্ত পুঁতে ফেলবেন। আমি আজ আপনাদের সেই ক্ষমতা | দিলাম”(১(৩)/১২৪৫)।বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ছয়-দফা এখন আর আওয়ামী লীগের নয়, জনগণের সম্পত্তি”। আরাে বলেছিলেন,“আমি নিজেও যদি এই ওয়াদা খেলাফ করি, তবে আপনারা নিজ হাতে আমাকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতিয়া ফেলিবেন”(১(১)/৪৭৩)। সেদিন ভাষণ-শেষে বলেছিলেন ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় পাকিস্তান । 

 ৪ জানুয়ারি, ১৯৭১ ছাত্রলীগের ২৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর বিশাল ছাত্র-জনসভা রমনা বটমূলে। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতেই ছাত্রলীগের ভিন্ন-বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী দু টি গ্রুপের একাংশের স্লোগান ছিল : বীর বাঙালি অস্ত্র ধরাে- বাংলাদেশ স্বাধীন করাে; মুক্তির একই পথ   সশস্ত্র বিপ্লব’, মুক্তি যদি পেতে চাও   হাতিয়ার তুলে নাও। ইত্যাদি। অপরাংশের শ্লোগান : ছয় দফা মানতে হবে   নইলে গদি ছাড়তে হবে, 

  ১৬৬ 

  শেখ মুজিবের মতবাদ   গণতান্ত্রিক সমাজবাদ, তােমার আমার ঠিকানা   পদ্মা মেঘনা যমুনা । বঙ্গবন্ধু সবকিছু লক্ষ্য করেই ভাষণে বললেন, “তােমরা তােমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরাে বেগবান করাে। তােমাদের কঠিন পরিস্থিতির মােকাবিলা করতে হবে। তােমাদের অবশ্যই জেগে উঠতে হবে। গণতান্ত্রিক সংগঠনে মতভেদ থাকবে, নেতৃত্বের প্রতিযােগিতা থাকবে, নতুন নতুন স্লোগান আসবে, এগুলি গণতান্ত্রিক রাজনীতিরই চলমান প্রক্রিয়া। বঙ্গবন্ধু বক্তব্য শেষ করলেন ‘জয় বাংলা  বলে, বললেন না ‘জয় পাকিস্তান। বঙ্গবন্ধু আর কোনােদিন ‘জয় পাকিস্তান’ উচ্চারণ করেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই ছাত্রদের স্লোগানই বাংলার নিপীড়িত-শােষিত জনতার (যথার্থ) কণ্ঠস্বর” (১(৩)১২৪৫-১২৪৬)। 

 বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছেন, তাও ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। “১৯৭১সালের একুশে ফেব্রুয়ারি জাতীয় শহীদ মিনারে বলেছিলেন, “বাংলার স্বাধীনতার ন্যায্য দাবিকে বানচাল করার ষড়যন্ত্র চলছে। এখনাে চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে, বাঙালিকে পায়ের নিচে দাবায়ে রাখার শক্তি পৃথিবীতে কারও নেই। আমরা আমাদের অধিকার আদায়ের প্রয়ােজনে আরও রক্ত দেব” (২৪/৮১)। সেদিন বঙ্গবন্ধু দৃঢ়ভাবেই বলেছিলেন, “আজ এই পবিত্র শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে ষড়যন্ত্রকারীদেরকে আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ১৯৫২ সালের বাঙালি আর ১৯৭১ সালের বাঙালি এক নয়’   এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই একাত্তরে মিয়ানওয়ালি কারাগারে যখন তাঁর কবর খোঁড়া হচ্ছে তখনও তিনি ইয়াহিয়ার সঙ্গে সমস্ত আপােস-প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন   নিজের কবর ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্যে তিনি শেষােক্তটিই বেছে নিয়েছেন” (১(১)/৪৬৮)। 

 প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১ এক ঘােষণা মারফত ৩মার্চ তারিখে ঢাকায় জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছিলেন। তখন ভুট্টো জানিয়ে দিলেন : “বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর দল কিছুতেই ঢাকায় আহুত পরিষদ অধিবেশনে যােগ দিতে পারে না। শুধু তাই নয়,  পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য নির্বাচিত প্রতিনিধিরা (৫৬ জন) অধিবেশনে যােগদানের জন্য ঢাকায় গেলে তাদের। দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না। পিপলস্ পার্টিকে ক্ষমতার অংশ দিতেই হবে আর পরিষদের বাইরে প্রস্তাবিত সংবিধান সম্পর্কে পিপলস পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগকে সমঝােতা করতে হবে। অন্যথায় তেসরা মার্চ (সংসদ অধিবেশনের নির্ধারিত দিন) পেশােয়ার থেকে করাচী পর্যন্ত ‘রক্ত-গঙ্গা প্রবাহিত হবে। জবাবে শেখ মুজিব। ২৮শে ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এক সমাবেশে বললেন, আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া শ্রেয় মনে করবাে তবু কোন অবস্থাতেও আত্মসমর্পণ করবাে না। গণতন্ত্রকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেই হবে” (২৭/১১৭)। 

  ১৬৭ 

  ইয়াহিয়া-ভুট্টোর লারকানা ষড়যন্ত্র : 

 পূর্ব বাংলা ছাঁটাই করার আগাম পরিকল্পনা এবং পরিণাম 

  ১৯৭০সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান গণ-পরিষদের ৩১৩টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭ আসনে জয়ী হয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় পাকিস্তানের শাসকশ্রেণী ভীত-বিস্মিত এবং ততােধিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়েছিল। পাকিস্তান সামরিক জান্তার প্রতিনিধিত্বশীল জনৈক জেনারেল ডিসেম্বর (১৯৭০) মাসে ঢাকায় এসে সেনাকর্মকর্তাদের কাছে বড় উকটভাবেই নিজেদের মনােভাব-পরিকল্পনা প্রকাশ করে বলেছিলেন : “Don t worry we will not allow these black bastards to rule over us” (১৭/১৭২)। আর সেনা-চক্রের সহযােগী ভুট্টো রক্তগঙ্গা বহাননার হুমকি দিয়েছিলেন। 

 শুধু সেনা-আমলা-ভুট্টো প্রমুখই নন, অনেক বিচক্ষণ রাজনীতিবিদও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাহরিক-ই-ইশতেকলাল’ পার্টির প্রধান এয়ার মার্শাল (অব) আসগর খান করাচিতে ১৯৭০সালে ঢাকার দৈনিক সংবাদ সম্পাদক জহুর হােসেন চৌধুরীকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, “একটা কথা আমাকে পরিষ্কার এবং সত্য করে বলুন, শেখ মুজিবুর রহমান কি পাকিস্তান ভাঙ্গতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ”? জহুর হােসেন চৌধুরী বলেছিলেন, “প্রশ্নটা ঠিক হল না। আপনি কি জানেন না, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাঞ্জাবি একটি চক্র, ব্যুরােক্রেসির একটি অংশ, ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের একটা অংশ এবং কিছু সংখ্যক রাজনীতিক সম্মিলিতভাবে পাকিস্তানে গণতন্ত্রের প্রহসনেরও কবর রচনা করে একচেটিয়া ক্ষমতা অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত কুক্ষিগত রাখার পরিকল্পনা করছে? পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক জীবনে তার ন্যায্য অধিকার পুরােপুরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে না দিলে শেখ মুজিবুর রহমান যদি চেষ্টাও করেন। পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানে রাখতে পারবেন না -সত্যটি আপনাকে উপলব্ধি করতে অনুরােধ করছি। শেখ মুজিব আজ পূর্ব বাংলার আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এর জন্য প্রধানত কি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরাই দায়ী নয়?”(১৫/১৮৯-১৯০)। 

  ১৬৮ 

  প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আলােচনার জন্য মুজিবকে রাওয়ালপিন্ডিতে আহ্বান জানালেন। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক সহকর্মীরা তার পিন্ডি যাবার ব্যাপারে আপত্তি করলেন এবং তাঁরও স্মরণ ছিল যে, করাচিতে একবার তার ওপর হামলা করা হয়েছিল, এমনকি সােহরাওয়ার্দীকেও হামলা করে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। ভুট্টোর সাম্প্রতিক হুমকির বাস্তবতাও উড়িয়ে দেবার মত ছিল না। সুতরাং মুজিব পিন্ডি না গিয়ে ইয়াহিয়াকেই আলােচনার জন্য ঢাকায় আসার অনুরােধ জানালেন। ১২ জানুয়ারি ইয়াহিয়া এলেন ঢাকায়, গভর্নর আহসানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমান ব্যাখ্যসহ ছয়-দফা ঘােষণাটি উপস্থাপন প্রেসিডেন্টের কাছে উপস্থাপন করেছিলেন। আলােচনার এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট স্পষ্টতই বলেছিলেন, “Sheikh sahib, I have no objection but you will have to carry the West Pakistan leaders with you” তখন বঙ্গবন্ধুও স্বাভাবিকভাবেই বলেছিলেন : “I am a democrat and the majority leader of all Pakistan. I can not ignore the interest of West Pakistan. I am not only responsible to the people of East and West Pakistan, but to the world opinion. I shall do everything on democratic principles” (১৭/ ১৭৪)। আলােচনা শেষে রাওয়ালপিন্ডি ফেরার সময় ঢাকা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সাথে আলােচনা প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তাঁর সন্তুষ্টির কথাই বলেছিলেন এবং শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের ভাবি প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও উল্লেখ করেছিলেন। 

 মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান লিখেছেন, গােটা পশ্চিম পাকিস্তান এবং সামরিক জান্তার ধারণা ছিল চাপ দিলে মুজিব ছয় দফা থেকে মৌলিকভাবেই সরে আসতে বাধ্য হবেন। অথবা সংঘাত অনিবার্য। ভুট্টো যদি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং দেশপ্রেমিক হতেন এবং পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা শেখ মুজিবের সাথে আলােচনার মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করতে প্রয়াস পেতেন, তবে পাঞ্জাবি সামরিক জান্তার পক্ষেও সে সমাধান মেনে নেয়া ছাড়া উপায় থাকতাে না। শেখ সাহেবও হয়তাে কোনাে প্রান্তিক ছাড় দিয়ে দেশ ও গণতন্ত্র দুটো বাঁচিয়ে একটি রাজনৈতিক সমাধানে উপনীত হতে পারতেন। ভুট্টো ছিলেন যেমনি বিবেকহীন হীন-চরিত্রের ব্যক্তি স্বার্থান্ধ মনের অধিকারী। অপরদিকে তিনি ছিলেন ক্ষুরধার মেধাশক্তির অধিকারী। তিনি দাওয়াত করেছেন সামরিক প্রশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে তার গ্রামের বাড়িতে পাখি শিকার করার জন্য। ইয়াহিয়া (ঢাকায়) বলেই দিয়েছিলেন যে, শেখই পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু লারকানায় শিকার সফরের পরে দেখা গেল ইয়াহিয়ার কণ্ঠে কিছুটা ভিন্ন সুর। মনে হলাে ভুট্টোর সাথে তাঁর আঁতাত হয়ে গেছে” (২৫/২১-২২)। 

 ভুট্টোর ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা রফি রাজা লিখেছেন, “He (Bhutto) at all times had a poor opinion of Mujibur Rahman as a coward and a rabble-rouser. Soon after the election, Bhutto had discussed with him (Rafi Raza) the 

  ১৬৯ 

  post-election situation in which each of the principals -Mujib, Bhutto, Yahya – appered  fixed in a triangle  with little room to maneuver .yet he (Bhutto) remarked,  I will ensure Yahya remains on my side.” (১৭/১৭৬)। অতঃপর ইয়াহিয়া আর কখনাে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের ‘ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী বলে উল্লেখ করেননি। 

 লারকানায় পাখি শিকার’এর সুযােগে ভুট্টো সঠিক লক্ষ্যভেদ করেছিলেন। এর পরেই ভুট্টো ২৭ জানুয়ারি ঢাকা এসে শেখ মুজিবের সাথে আলােচনায় বলেছিলেন, পশ্চিম পাকিস্তানি জনগণ ছয়-দফাকে বিচ্ছিন্নতার পরিকল্পনা মনে করলেও, তিনি ছয়-দফার যথাসম্ভব অনুকূলেই থাকবেন। তবে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের। সংশয়-ভীতি দূর করার জন্য অবশ্যই কিছুটা সময়ের প্রয়ােজন রয়েছে। তাই, সংসদ অধিবেশন কিছুকালের জন্য পিছিয়ে দেয়াই ভালাে হবে। “Mujib, suspicious from the start, turned the proposal down. He (Mujib) probably regarded the proposal as intended to give the vested interests of West Pakistan more time for their machinations against the Awami League Bhutto raised the question of power sharing as the Prime Minister would be from East Pakistan, the President must be from West Pakistan. Mujib had no objection to this. But when Bhutto suggested that as the majority leader of West Pakistan he would nominate the President, Mujib said, no.” (১৭/১৭৭)। ভুট্টোর চালাকিটা বঙ্গবন্ধু ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন। রাও ফরমান উল্লেখ করেছেন, বঙ্গবন্ধু তাকে বলেছিলেন, “what would have happened if I had allowed him to nominate the President? He would have nominated himself and dismissed me within ten days” (১৭/১৭৭-১৭৮)। 

 পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরেই ভুট্টো তাঁর পরিকল্পিত ‘রাজনৈতিক বােমা ফাটালেন। সারা পাকিস্তানের শাসন-কর্তৃত্বই গণতান্ত্রিক নিয়মে বাঙালির তথা মুজিবের প্রাপ্য ছিল, কিন্তু ভুট্টো বললেন, “We shall not sit in the opposition; we shall demand our due share in the government . We refuse to wait for five years to get an absolute majority” এবং এমন আচানক দাবির যুক্তি হিসেবে ভুট্টো বলেছিলেন, “the future constitution could not be formed by one wing of the country and by the Awami League । অপরদিকে, ১৯ ফেব্রুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে ফরমান আলী এবং জেনারেল পীরজাদার সাথে আলােচনাকালে বঙ্গবন্ধু মুজিব সম্পর্কে একটা চরম অশােভন উক্তি করে ইয়াহিয়া বলেছিলেন, ওকে শিগগিরই ঘেঁটে ফেলা হবে। “West Pakistan is my base. I have to look after it” (৭/১৮০)। অতঃপর ইয়াহিয়া ১ মার্চ প্রচারিত এক অনির্ধারিত বেতার-ঘােষণায় 

  ১৭০ 

  জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্যই স্থগিত করেছিলেন, এক্ষেত্রে ভুট্টোর পরামর্শ এবং প্রভাবই কার্যকর হয়েছিল। 

 ১ মার্চ, ১৯৭১ ঢাকা স্টেডিয়ামে বিশ্ব-একাদশ বনাম পাকিস্তানের ক্রিকেট টেস্ট, অফিস-আদালতে-রাজপথে-বাজারে স্বাভাবিক কর্মপ্রবাহ। মতিঝিলের পূর্বাণী হােটেলে চলছিল পাকিস্তানের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে নির্বাচিত আ.লীগ সংসদীয় দলের প্রস্তুতিমূলক সভা। দুপুরে ১টার পরে রেডিও-সংবাদে সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিদ’ সংক্রান্ত ঘােষণাটি প্রচারিত হলাে। সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা বন্ধ হয়ে গেলাে, ঢাকা শহর পরিণত হলাে প্রতিবাদী মিছিলের শহরে। সব মিছিলের গন্তব্য পূর্বাণী হােটল, যেখানে ছিলেন ‘তােমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব। মিছিলে মিছিলে স্লোগান : জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, পিন্ডি না ঢাকা -ঢাকা ঢাকা; তােমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা; বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর; এক নেতা এক দেশ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ। স্লোগানে-স্লোগানেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে বাঙলার জনমানস সংশয়হীন। নিরন্তর সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বঙ্গবন্ধুই জনমনে রাজনৈতিক সচেতনতার বীজ বুনেছিলেন, এবং তিনিই হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের আস্থা-আকাঙ্ক্ষার ব্যক্তি-প্রতীক। এযাবৎ যা ছিল ছ -দফার দাবি, ইয়াহিয়া-ভুট্টোর হঠকারী চক্রান্তের একটি ঘােষণাতেই সেটি আজ জনতার স্লোগানেই বদলে গেছে এক-দফায়, স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা। 

 একাত্তরের ১ মার্চ অপরাহ্নে পূর্বাণী হােটেলে সাংবাদিক-জনতার সামনে দাঁড়ালেন বিষন্ন-ক্ষুব্ধ জননেতা, কণ্ঠে অটল-গম্ভীর উচ্চারণ। একান্ত সংক্ষিপ্ত ভাষণে, প্রকৃতপক্ষে ভাষণ নয়, পথ-নির্দেশের ভঙ্গিতে শেখ মুজিব শুধু বলেছিলেন, বাঙালি আর কোনাে অন্যায়, গণতন্ত্র-বিরােধী কোনাে ষড়যন্ত্র মাথা পেতে নেবে না। যারা আমাদেরকে এখনাে দাবিয়ে রাখতে চায়, তারা রয়েছে বােকার স্বর্গে। বিক্ষুব্ধ জনতার প্রতি ধৈর্য এবং শৃঙ্খলার আহ্বান জানিয়ে বললেন, পরের দিন ঢাকায় হরতাল আর সংসদ অধিবেশনের পূর্বনির্ধারিত ৩ মার্চ তারিখে সারাদেশে হরতাল এবং জাতীয় শােকদিবস পালিত হবে। ৭ মার্চ রেসকোর্সে জনসভায় বিস্তারিত কর্মসূচি ঘােষণা করা হবে। পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ প্রমাণ করেছে, তখন থেকেই শেখ মুজিব সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অবিসম্বাদিত একক নেতা হয়ে গেলেন। কার্যত সেদিন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি শাসনের অবসান এবং বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অভ্যুদয়ের সূচনা ঘটেছিল। 

  ১৭১ 

  এমন অসহযােগ কখনাে দেখেনি কেউ : 

 ইতিহাসের পথ অনিবার্য স্বাধীনতার দিকে 

  “১৯৭১ সালের ১লা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ গণহত্যাযজ্ঞ শুরু হবার পূর্ব নাগাদ, বঙ্গবন্ধু ছিলেন এ দেশের মানুষের মুকুটহীন সম্রাট”। অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ : “সমগ্র জাতির ম্যান্ডেট পাওয়া, সর্বক্ষমতাপ্রাপ্ত, শেখ মুজিবের প্রতিটি নির্দেশ তখন সকল বাঙালি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল। প্রতিবাদী কোটি মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল, হাতে ছিল লাঠি, কোদাল, লাঙ্গল, বেলচা, মুখে ছিল ‘জয় বাংলা স্লোগান। কিন্তু একটি মানুষও উচ্ছঙ্খল হয়নি। বিশ্ব-ইতিহাসে এরকম ঘটনার নজির খুব বেশি নেই” (১(১)/৪৬)। বিশ্লেষণমূলক বক্তব্য অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের, বঙ্গবন্ধুর সমালােচকেরা বলেছিলেন, “এবারে মুজিব আপস করবেন। আপস তিনি করেননি, বরঞ্চ ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের চব্বিশ দিনে পৃথিবী দেখেছিল এক অবিস্মরণীয় অসহযােগ আন্দোলন   এক নেতার ডাকে মাথা তুলে দাঁড়ালাে পূর্ব বাংলা। এই সময়টা ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় সময়, আবার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষারও”(১(১)/২৪৪-২৪৫)। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদের কথা : “২-২৫ মার্চ, ১৯৭১ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সারা বাংলায় সর্বাত্মক অসহযােগ আন্দোলন চলে। পাকিস্তান সরকার বাংলায় সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন de facto বা কার্যত সরকার-প্রধান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অসহযােগ আন্দোলনই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপলাভ করে (১(১)/২৫৫)। 

 উল্লেখ্য যে, অসহযােগ আন্দোলনে পূর্ব বাংলার শাসন-কর্তৃত্ব যখন কার্যতই বঙ্গবন্ধুর নিয়ন্ত্রণে, তখনাে পাকিস্তানি সেনা-শাসক চক্রের বাঙালি-দমনের ‘পরিকল্পিত উদ্যোগ সম্পন্ন হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা ছিল আধুনিক ভারী অস্ত্রের অধিকারী এবং দক্ষ, তথাপি বিমানে করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় বেসামরিক পােশাকধারী অতিরিক্ত সেনা পরিবহন শুরু করা হয়েছিল। ৩ মার্চ ভুট্টোর সাথে আলােচনা করেই ইয়াহিয়া ঢাকায় ১০মার্চ সর্বদলীয় নেতৃবৃন্দের বৈঠক আহ্বান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ঘােষণা করেন, ঢাকা ও বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানে যখন নিরস্ত্র জনসাধারণকে ব্যাপকভাবে হত্যা করা হচ্ছে, শহীদের তাজা খুন যখন রাজপথে শুকিয়ে যায়নি, ঠিক সেই সময় এ আমন্ত্রণের প্রস্তাব নির্দয় তামাসা ছাড়া আর কিছুই নয়। যখন সামরিক প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে,  সেই অবস্থায় এই 

  ১৭২ 

  সম্মেলনের আমন্ত্রণ জানানাে বন্দুকের নল উঁচিয়ে আমন্ত্রণ জানানাের শামিল। এ ধরনের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার কোন প্রশ্নই ওঠে না”(৩০/১৬-১৭)। 

 “২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। ৩মার্চ পল্টনে বিরাট ছাত্র-জনসমাবেশে বঙ্গবন্ধু বললেন, “অবিলম্বে বাংলার গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে। পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব অফিস-আদালত বন্ধ থাকবে। টিভি ও বেতারে আন্দোলনের খবর প্রচার না করলে বাঙালিরা তা বর্জন করে রাস্তায় নেমে আসবেন। আন্দোলনরতদের ওপর গুলি করে কাপুরুষের মত যা করা হচ্ছে, তা আর বরদাশত করা হবে না। আন্দোলনের ফাঁকে দুষ্কৃতিকারী কর্তৃক লুটতরাজ, আন্দোলনকে বানচাল করার ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়াতে হবে। নিরস্ত্র জনতার উপর গুলি করার এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করার ভাষা আমার জানা নেই” (১(৩)/১২৪৭-১২৪৯)। এদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভায় “উপাচার্য ড. মােজাফফর আহমদ চৌধুরী বলেন, জাতীয় জীবনের এই সঙ্কটময় মুহূর্তে আমরা জনগণের সাথে একাত্ম হওয়ার ঘােষণা করছি। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বের প্রতি শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে গভীর আস্থা জ্ঞাপন করে। বলেন, বাংলার ভাগ্য আজ নির্ধারিত, নতুন দিনের সূর্য উঠবেই” (৩০/১৬)। 

 ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্রের ‘বাঙালি-দমন  পরিকল্পনায় একমত হতে না পেরে, ৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল ইয়াকুব পদত্যাগ করলে তাঁর স্থলাভিষিক্তি করা হয়েছিল ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ টিক্কা খানকে। ঢাকায় এসেই টিক্কা সারা শহরে ট্যাঙ্ক নামালেন এবং বড় বড় ভবনের ছাদে বসালেন মেশিন গান। ৮মার্চ (মতান্তরে ৯মার্চ) পূর্ব পাকিস্তানের নতুন গভর্নর পদে টিক্কা খানকে শপথ গ্রহণ করাতে রাজি হননি ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী। “বারবার মিলিটারি পাঠিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতিকে লাট ভবনে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু সেদিন শেখ মুজিবের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন বি এ সিদ্দিকী, অস্বীকার করেছিলেন লাট ভবনে যেতে। শপথ বাক্য পড়াননি তিনি টিক্কা খানকে” (১৭/২৫)। বঙ্গবন্ধুর অসহযােগ আন্দোলন চলা কালে তার পক্ষে বিধিসম্মত গভর্নর হওয়া সম্ভব হয়নি। 

 “শেখ মুজিবের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী  (৫ মার্চ পর্যন্ত) কেবল ঢাকা ও তার আশপাশে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে ৩০০জন এবং আহত হয়েছে। ২০০০” (৩০/২০)। ৩মার্চ তারিখে কেবল চট্টগ্রামই নিহত হয়েছিল ৭৯জন। অসহযােগ এবং আইন অমান্য আন্দোলন(Civil disobedience) সমগ্র পরিস্থিতিকে এক অপরিবর্তনীয় গতিমুখে ঠেলে দিচ্ছিল। বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানের পতাকা আর কায়েদে আজমের ছবি পুড়িয়ে দেয়া হলাে। সিনেমা হলে প্রদর্শনীর শেষে 

  ১৭৩ 

  পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত বাজানাে বন্ধ করে অধিকাংশ হলেই বাজানাে হতে লাগলাে: ‘জয় বাংলা, বাংলার জয় । “In his speech (6_March), widely believed to be written by Bhutto, Yahya announced a new date | for inaugaral session of the National Assembly : 25 March” (১৭/১৮৫)। 

 মওলানা ভাসানী পল্টন ময়দানে ৯মার্চ স্বাধীন বাংলা সমন্বয় কমিটি আয়ােজিত বিশাল জনসভায় বলেছিলেন, ২৫ মার্চের আগেই শেখ মুজিবের শর্তগুলি পূরণ করা না হলে তিনি শেখ মুজিবের সাথে মিলিতভাবে ১৯৫২ সালের মত গণ-আন্দোলন গড়ে তুলবেন। সভায় উপস্থিত শ্রোতা-জনতাকে উদ্দেশ্য করে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন : “কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছে শেখ মুজিবুর রহমান আপােস করতে পারেন। খামােখা মুজিবকে অবিশ্বাস করবেন না।  আমার রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সংগঠনের সভাপতি হিসেবে ৩১জন জেনারেল সেক্রেটারির সঙ্গে কাজ করেছি। তাদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানই ছিল শ্রেষ্ঠ সেক্রেটারি। তিনি ইয়াহিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হবে। পাকিস্তান অখণ্ড থাকবে না। অখণ্ড রাখবােও না”(‘অগ্নিঝরা মার্চ , ভােরের কাগজ, ৯মার্চ ২০১৩)। ১২ মার্চ ১৯৭১ মওলানা ভাসানী “ময়মনসিংহে এক জনসভায় পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়াশীল নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা বাঙালিদের ব্যাপারে নাক গলাবেন না” (‘অগ্নিঝরা মার্চ’, ভােরের কাগজ, ১২মার্চ, ২০১৩)। 

 সুধীজন শামসুজ্জামান খানের পর্যবেক্ষণ : “ইংরেজ আমলে মহাত্মা গান্ধী অসহযােগ আন্দোলন করেছিলেন। সে আন্দোলন জনসমর্থন পেলেও প্রকৃতিতে ছিল নিষ্ক্রিয় সাফল্য ছিল পরােক্ষ ও আংশিক, এর তুলনায় বঙ্গবন্ধুর অসহযােগ পাকিস্তানি শাসকচক্রের দীর্ঘ ধারাবাহিকতার শােষণ-বঞ্চনার অবসানের লক্ষ্যে ছিল এক চূড়ান্ত ও সফল পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধুর অসহযােগের পেছনে জনগণের ম্যান্ডেট ছিল। মহাত্মা গান্ধীর তা ছিল না” (১(২)/৬৬৯)। বঙ্গবন্ধুর অসহযােগ আন্দোলন সম্পর্কে পাখতুন নেতা ওয়ালি খানের মন্তব্য: “Even Gandhi would | have marveled” (৭/১৮৮)। ভারতের সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ ১২ মার্চ এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, “শেখ মুজিবের তুলণা চলে মহাত্মা গান্ধীর সাথে” (৩০/২৯)। ঢাকা থেকে মার্কিন কূটনীতিক আর্চার ব্লাড মার্কিন সরকারকে এক গােপন বার্তায় জানিয়েছিলেন, “It would be difficult, perhaps impossible, for the movement toward independence to be checked now” (১(২)/৬৪৩)। 

 ‘বাঙালি যেখান হইতে আজ নির্দেশ গ্রহণ করে’ শীর্ষক সম্পাদকীয় কলামে ‘দৈনিক আজাদ’ লিখেছিল : “বিশ্ববাসীর কাছে আজ দিবালােকের মত স্পষ্ট যে, বাংলার শাসনক্ষমতা এখন আর সামরিক কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারে নাই, বরং সাত কোটি 

  ১৭৪ 

  মানুষের ভালােবাসার শক্তিতে ধানমন্ডির ৩২নং সড়ক এখন বাংলার শাসনক্ষমতার একমাত্র উৎস হইয়া পড়িয়াছে। আর যাহার নির্দেশে জনগণ পরম শ্রদ্ধায় ও চূড়ান্ত ত্যাগের বিনিময়ে কার্যকরী করে, তিনি হইতেছেন বাংলার মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিবুর রহমান এখন বাংলার মুক্তি সংগ্রামের জীবন্ত প্রতীক। শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন একটি অঘােষিত সরকারি দপ্তরে পরিণত হইয়াছে। হােয়াইট হাউস বা ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের মত এই বাড়িটির কোনও সরকারি মর্যাদা নাই বটে কিন্তু বাংলার সাত কোটি মানুষের ভালােবাসার রাজ্যে এই বাড়ি এক অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত”(১(১)/৪৭৬)। লন্ডনের ‘দ্য ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড’ লিখেছিল: “Sheikh Mujibur Rahman now appears to be the real boss of East Pakistan, with complete support of the population. Rahman s home in Dhanmondi, already known as Number 10, Downing Street in imitation of the British Prime Minister s residence,..” (১(২)/৬৫৫)। 

  ১৭৫ 

  ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর অনবদ্য ভাষণ : 

 ‘স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের হলাে  

  “বঙ্গবন্ধু কেন ৭ মার্চ স্বাধীনতা ঘােষণা করলেন না? এ প্রশ্নটিই মুজিব-বিরােধীদের প্রধানতম অস্ত্র। কিন্তু শেখ মুজিব ৭ মার্চ স্বাধীনতা ঘােষণার কিছু বাকি রেখেছিলেন কিনা, তা সেই সব জ্ঞানপাপীদের বােঝাবে কে? সাংবাদিক-সাহিত্যিক মাসুদা ভাট্টি উত্তর খুঁজেছেন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণেই। বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন, “এরপর যদি একটা গুলি চলে, এরপর যদি আমার লােকদের হত্যা করা হয়  প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তােল। তােমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মােকাবেলা করতে হবে সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আর আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরাে দেবাে। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বাে ইনশাল্লাহ” (১(১)/৪৭৫-৪৭৬)। ইতিহাসের অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দিন আহমদের পর্যবেক্ষণ : “১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তার বিখ্যাত ভাষণে বাংলার জনগণকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। দেশবাসীকে ডাক দিয়ে তিনি ঘােষণা করেছিলেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। পাকিস্তানের জাঁদরেল শাসকদের নাকের ডগায় বাস করে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার সপক্ষে এরচেয়ে বলিষ্ঠ ও পরিষ্কার আহ্বান আর কি হতে পারতাে সে সময়”? (১(১)/৫৪)। 

 প্রবীণ সাংবাদিক এ. বি. এম. মূসা ‘সাতই মার্চের যুদ্ধ ঘােষণা’ শিরােনামের নিবন্ধে লিখেছেন : “সাতই মার্চের ভাষণ শুধু একটি ঘােষণা নয়, ছিল স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ ঘােষণা। ডিক্লারেশন অব ওয়্যার। তিনি বলেছিলেন, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তােল । আর বলেছিলেন, “তােমাদের যার যা আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মােকাবেলা করতে হবে। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন, যে যুদ্ধ ছিল মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য। ভবিষ্যতের দৃঢ় প্রত্যয়ের ঘােষণা, ‘জয় বাংলা” (২৫/৬৫-৬৯)। অধ্যাপক 

  ১৭৬ 

  কবীর চৌধুরী লিখেছেন, “তিনি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তােলার যে অতুলনীয় আহ্বান জানিয়েছিলেন তার মধ্যে ছিল সাহস, প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি ও দেশবাসীর প্রতি গেরিলা যুদ্ধ পদ্ধতিতে মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ হবার দিক নির্দেশনা। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ হিসেবে সার্বজনীন স্বীকৃতি পেয়েছে। ভালােবাসা, শ্রদ্ধা ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অবিচল আস্থার কারণে মানুষ তাঁর প্রতিটি নির্দেশ আক্ষরিকভাবে পালন করেছে” (১(১)/৪৬-৪৭)। 

 সাত মার্চের অমন বিস্ময়কর ভাষণটি কিন্তু পূর্বপ্রস্তুতকৃত নয়, তাৎক্ষণিকভাবে উচ্চারিত হয়েছিল। কিন্তু কোনাে দ্বিধা-জড়তা ছিল না, একান্ত প্রয়ােজনের কথাগুলি উচ্চারিত হয়েছে সুস্পষ্ট কণ্ঠে, প্রাণের গভীর থেকে। এখানে প্রসঙ্গতই উল্লেখ করতে হয় বঙ্গবন্ধু-পত্নী বেগম ফজিলতুন্নেসার কথা। দুপুরে খাবার পর, সভায় রওনা হবার আগে, স্ত্রীর পরামর্শে বঙ্গবন্ধু স্বল্পক্ষণের বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, পাশে উপস্থিত স্ত্রী, কাছে কন্যা শেখ হাসিনা। বেগম মুজিব বললেন, আজ “তােমার সামনে লাখ লাখ মানুষ, তাঁদের হাতে বাঁশের লাঠি। তােমার পেছনে বন্দুক। এই লাখ লাখ মানুষ যেন হতাশ না হন। কারও পরামর্শ শােনার দরকার নাই। তােমার বিবেকের দিকে তাকাও। মন যা চায় তা-ই বলবে” (২২/৮৩)। ভাষণের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আপনারা সবই জানেন এবং বােঝেন’ অথচ কী সাবলীল দক্ষতায় দ্রুতই ‘তুমি’ সম্বােধনে বলেছিলেন, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তােল, তােমাদের যা কিছু আছে, প্রস্তুত থাকবে ইত্যাদি। নেতায়-জনতায় কোনাে দূরত্বই নেই। যেন ‘হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা , বঙ্গবন্ধু সেদিন শ্রোতৃ-জনতাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেই আকর্ষণ করেছিলেন আসন্ন মুক্তিযুদ্ধের দিকে। 

 শামসুজ্জামান খান লিখেছেন: “উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-ভয়-ত্রাস এবং আশা ও সম্ভাবনায় উদ্বেল সাড়ে সাত কোটি মানুষকে মাত্র ১৯ মিনিটের (মতান্তরে ২২ মিনিট) এক জাদুকরী ভাষণে রাজনৈতিক চেতনার একই স্তরে এনে স্বাধীনতার জন্য মরণপণ অঙ্গীকারে দীপ্ত মুক্তিসেনানীতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির মেলা ভার। তিনি অনেক ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে (ইয়াহিয়ার উদ্দেশ্যে) বলেন, ‘অ্যাসেম্বলি কল করেছেন, আমাদের দাবি মানতে হবে। প্রথমে সামরিক আইন মার্শাল ল  withdraw করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লােকদেরকে ব্যারাকে ফেরত যেতে হবে। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার তদন্ত করতে হবে, আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখবাে, আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসতে পারবাে কি পারবাে না। বঙ্গবন্ধুর এই চারটি শর্তকে বিচক্ষণ রণ-কৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়”। 

  ১৭৭ 

  “এই চারটি শর্তে তিনটি উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে : এক. স্বাধীনতা ঘােষণা শােনার জন্য পাগলপারা উত্তাল জনসমুদ্র একটু থমকে গেছে, তবে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেনি,  বুঝতে শুরু করেছে বঙ্গবন্ধু অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যই এই চারটি কঠিন শর্তকে সামনে নিয়ে এসেছেন। দুই. দৃশ্যত নেতা গণতন্ত্রসম্মত ও নিয়মতান্ত্রিক পথেই আছেন বহির্বিশ্বকে এমন ধারণা দেয়া। না হলে, তার এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম  -এই বাক্যকে একতরফা স্বাধীনতা ঘােষণা বলে গণ্য করা হত। তাতে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিযুক্ত হতেন। তাই রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা ও মেধাবী কৌশলবিদ হিসেবে স্বাধীনতার ঘােষণা দিয়েও তার কার্যকারিতাকে তিনি শর্তসাপেক্ষ রাখলেন। তিন .বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে সরাসরি স্বাধীনতা ঘােষণা করলে পাকিস্তানি শাসকচক্র ট্যাঙ্ক, মেশিনগান ও বিমান আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। স্বাধীনতা ঘােষণার শর্তযুক্ত বাতাবরণ পাকশাসকদের সেই পরিকল্পনা বানচাল করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর ক্ষুরধার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে পরাজিত হয়ে ইয়াহিয়া-ভুট্টোরা .একতরফা গণহত্যা শুরু করায় বঙ্গবন্ধুর চার শর্ত বাতিল হয়ে গিয়ে ২৬ মার্চ থেকে তাঁর ঘােষণা কার্যকর হয়। ২৬ মার্চ মধ্যরাতে তাঁর স্বাধীনতার নতুন ঘােষণাটি ছিল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র” (১(২)/৬৬৯-৬৭৫)। 

 প্রশাসনিক দায়িত্ব সূত্রেই রেসকোর্সে উপস্থিত শাহরিয়ার ইকবাল প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে লিখেছেন : “রেসকোর্সের ম্যানেজারের বাসা ছিল একটি টিলার উপর।  আমরা টিলার ওপর অবস্থান নিয়েছিলাম। নিচে বিশাল জনতার ঢল। বঙ্গবন্ধু মঞ্চ থেকে বক্তৃতা দেবার জন্য উপস্থিত হবেন। কিছুক্ষণ পর দেখলাম একটি খােলা। জিপে একজন আর্মি অফিসার আসলেন। পাকিস্তান আর্মির সর্বাধিনায়ক, জেনারেল হামিদ। তিনিও এসে বসলেন একটি কাঠের চেয়ারে। বঙ্গবন্ধু সেদিন ঘােষণা। দিলেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম । বঙ্গবন্ধু সেদিন অন্য কোনােভাবে স্বাধীনতা ঘােষণা করলে উপর থেকে এয়ার ফোর্সের বিমান গুলিবর্ষণ করে লক্ষ জনতাকে নিহত করতাে। তিনি বাঙালি জাতিকে এমনভাবে স্বাধীনতার কথা শােনালেন যে জনতা ঠিকই বুঝল, কিন্তু পাকিস্তানি জেনারেল সাহেব কিছুই করতে পারলেন না” (১(১)/২১৫)। 

 প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাবেক মন্ত্রী জি ডব্লিউ চৌধুরী তাঁর ‘লাস্ট ডেজ অব। ইউনাইটেড পাকিস্তান নামক বইতে উল্লেখ করেছেন, “১৯৭১ সালের ৬ মার্চ গভীর রাতে ইয়াহিয়া খান মুজিবকে ফোন করে দীর্ঘ সময় কথা বলেছিলেন।  অনুরােধ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু যেন পরদিন ৭ মার্চ কোন কঠিন সিদ্ধান্ত না নেন” (১(১)/২১৫)। “Mujib was under immense pressure not to take a precipitous course by declaring independence . The US Ambassador 

  ১৭৮ 

  Farland called on Mujib to urge moderation   There was universal agreement among Awami League leaders that it would be unwise to declare independence unilaterally at this time” (১৭/১৮৭)। মুজিব জানতেন, ‘হঠকারী’ আঘাতটা পাকিস্তানি শাসকচক্রই করবে, তার বেশি বাকিও নেই, তখন বিশ্ব-সমাজকে জানিয়েই বাঙালি নিজের পথে চলতে পারবে। বঙ্গবন্ধু সেই নির্ভুল পথের দিশা দিয়েছেন বাঙালিকে, প্রাণে প্রাণে জাগিয়েছেন সেই অনিবার্য সংগ্রামের অজেয় সাহস। 

 কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতার কথায় : “শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতাে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে // অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।// তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল// হৃদয়ে লাগিল দোলা// জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খােলা// কে রােধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?// এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম // এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার। সংগ্রাম // সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের” (১(২)/৭৮৭-৭৮৮)। 

  ১৭৯ 

  বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া আলােচনা, মার্চ ১৯৭১ : 

 প্রতিজ্ঞা আর প্রতারণা যখন মুখােমুখি 

  বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পরে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দই বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য সমর্থন করে ইয়াহিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। ইয়াহিয়ার। জন্যও পরিস্থিতি ছিল যথার্থই নাজুক। পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি। সুতরাং তিনি দৃশ্যত নমনীয় হয়েই শেখ মুজিবের। কাছে একটি ‘টেলেক্স’ বার্তা পাঠালেন, “Please do not take any hasty decision. I will soon come to Dacca and discuss the details with you. I assure you, your aspirations and commitments to the people can be fully honoured.” (১৭/১৮৯)। 

 ভারতের দৈনিক স্টেটম্যান’(১৬ মার্চ, ১৯৭১) লিখেছিল, “মিস্টার মুজিবুর রহমান বলেছেন, প্রেসিডেন্ট আমাদের অতিথি হবেন। ঢাকায় পর্যবেক্ষকরা এর এই অর্থ নিয়েছেন যে, পূর্ব পাকিস্তান নিজেকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে স্বতন্ত্র একটি এলাকা বলে মনে করে” (২৮/৪৭)। “প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যকার আলােচনা এদিন (১৬ মার্চ) সকাল ১১টায় শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু কালাে পতাকা শােভিত গাড়িতে প্রেসিডেন্ট ভবনে যান। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে স্বাধীন বাংলার পতাকা এবং আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীক নৌকা উত্তীর্ণ। ছিল। বঙ্গবন্ধুর গাড়ি এসে পৌঁছলে প্রেসিডেন্ট এসে তাঁকে স্বাগত জানিয়ে মূল আলােচনার কক্ষে নিয়ে যান” (“অগ্নিঝরা মার্চ ; ভােরের কাগজ, ১৬ মার্চ, ২০১৩)। 

 মুজিব-ইয়াহিয়া আলােচনার গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে পর্যবেক্ষকরা দু টি ভিন্ন অভিমত প্রকাশ করেছেন। কারাে অভিমত, ইয়াহিয়া এবং তাঁর সহযােগী আলােচকরা শেখ মুজিবসহ সহযােগী আলােচকদেরকে ‘ভুলিয়ে-ভালিয়ে বিশ্বাস করাতে(Lulled into belief) পারছিলেন যে, অলােচনায় ধীরে হলেও অগ্রগতি হচ্ছে। ভিন্নতর অভিমত : “সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে মুজিব অপেক্ষা করতে থাকেন। সামরিক জান্তার 

  ১৮০ 

  আগে তিনি কোনও প্রকার হঠকারি সিদ্ধান্ত নেবেন না। তিনি বল ঠেলে দেন ইয়াহিয়ার কোর্টে। মূল আলােচ্য ছিল সামরিক আইন প্রত্যাহার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি। মুজিব বললেন, নতুন একটি সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বাষট্টির সংবিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হবে এবং ছয় দফার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তান পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ভােগ করবে। পশ্চিম পাকিস্তান তাদের ইচ্ছানুসারে শাসিত হবে। ইয়াহিয়া খান রাষ্ট্রপতি হিসেবে বর্তমান অবস্থানে থেকেই ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর সঙ্গে পরামর্শ করার কথা বললেন, সে অনুযায়ী ভুট্টো ঢাকায় আসেন ২১ মার্চ” (১(১)/৪৭৮)। 

 “ইয়াহিয়া এবং ভুট্টো দু’জনেই (আলােচনায় বসে) টের পেলেন যে, এই মুজিব যেন একেবারেই অন্য রকম, আগের মুজিবের সঙ্গে এর পার্থক্য যােজন যােজন। মুজিব একটি স্বাধীন দেশের নেতার মতই আলােচনার টেবিলে” যােগ দিয়েছিলেন (১(১)/৪৭৭)। এ তথ্যটিও বিশেষ উল্লেখ্য যে, ভুট্টো তার ‘দ্য গ্রেট চ্যালেঞ্জ  নামের To f1631699, “Mujib had cautioned him (Bhutto) against the military and told him not to trust them : If they destroyed him (Mujib) first, they would also destroy Bhutto later” (১৭/১৯০)। বঙ্গবন্ধুর এ ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতাই তাে প্রমাণ করে যে, তিনি সামরিক চক্রান্তের পূর্বাপর পরিস্থিতি ভুট্টোর চেয়েও গভীরতর দক্ষতায় উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। 

 “২০ মার্চ ইয়াহিয়া সােয়া দুই ঘণ্টার আলােচনায় বঙ্গবন্ধুর ছয়-দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র রচনার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। ২১ মার্চ ভুট্টো দু ঘণ্টাব্যাপী ইয়াহিয়ার সাথে বৈঠক করে এসে বলেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সাথে ৭৫ মিনিটের একটি বিশেষ বৈঠক হয় ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টোর। শাসনতন্ত্রের প্রশ্নে মুজিব-ভুট্টোর একমত হবার লক্ষ্যে আবারও ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিদ করেন। এদিন ভুট্টো, ওয়ালী খান, এয়ার-মার্শাল আসগর খানসহ পাকিস্তানি নেতারা দফায় দফায় বৈঠকে মিলিত হন। দেশের প্রতিটি সংবাদপত্রে ছয়-দফার আলােকে শাসনতন্ত্রের রূপরেখা ছাপা হয়। ২৩ মার্চ ইয়াহিয়ার নির্ধারিত জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়ার কর্মসূচি বাতিল হয়ে যায়। ভুট্টোর মন্তব্য, শেখ মুজিবের দাবির প্রশ্নে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের মধ্যে একটা মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অচলাবস্থা কেটে যাবে” (১(৩)/১২৫৩-১২৫৪)। ২৩ মার্চ, ঐতিহাসিক ‘পাকিস্তান দিবস’, এবার পূর্ব বাংলায় দিনটি পালিত হলাে ‘প্রতিরােধ দিবস  হিসেবে। “ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর উপস্থিতিতে গােটা বাংলার কোথাও পাকিস্তানি পতাকা উড়ল না, উড়ল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। শুধুমাত্র রাষ্ট্রপতি ভবন ও সামরিক শাসকের কার্যালয়ে পাকিস্তানের পতাকা উড়েছিল; রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারিত হলাে আমার সােনার বাংলা, আমি 

  ১৮১ 

  তােমায় ভালােবাসি  গানটি। এই গানের সঙ্গে সঙ্গে শেখ মুজিবের বাসভবনে ওড়ানাে হলাে বাংলাদেশের পতাকা এবং শেখ মুজিব একটি ছাত্র র্যালির ‘স্যালুট’ নিলেন”(১(১)/৪৭৮-৪৭৯)। 

 “২৪ মার্চ আওয়ামী লীগ আলােচনার টেবিলে নতুন প্রস্তাব পেশ করলাে।  কনস্টিটিউশন কমিটি’ নয় কনস্টিটিউশন কনভেনশন গঠিত হােক; এই কনভেনশন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দু’টি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করবে এবং জাতীয় পরিষদে এই শাসনতন্ত্র দু টি এক করে কিনফেডারেশন অব পাকিস্তান’ গঠন করা হবে। এরপর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক (তাজউদ্দিন আহমদ) বললেন, “আমার আর কিছু বলার নেই । সত্যসত্যই এরপর আর কিছুই তাে বলার থাকে না”(১(১)/৪৭৯)। “But the Yahya team persisted in their delatory tactics and no conclusions were reached.  time for a further meeting need not be fixed and this could be done over the telephone  Throughout the 25th, Kamal Hossain waited for the call but it never came.” (১৭/১৯৩)। 

  ১৮২ 

  ২৫ মার্চ রাতে ইয়াহিয়ার আক্রমণ, পলায়ন, পাকবাহিনীর গণ-হত্যা : 

 ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘােষণা 

  রহস্যজনক গােপনীয়তায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ঢাকা ছেড়ে যাবার খবরটি সঙ্গে সঙ্গে উইং কমান্ডার এ. কে. খন্দকার জানিয়ে দেন বঙ্গবন্ধুকে। তাছাড়া, রাত আটটায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে একটি রিক্সা একটি চিরকুট নিয়ে এসেছিল তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) বাসভবনে। তাতে লেখা ছিল : ‘আজ (২৫ মার্চ) রাতে আপনার বাড়িতে হামলা হবে” (২০/৭৫)। সুতরাং স্পষ্ট যে, সম্ভাব্য ঘটনার গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু অবহিত ছিলেন এবং নিজের পরিকল্পনামতই সবাইকে পালিয়ে যুদ্ধ শুরুর পরামর্শ দিয়েছিলেন। সন্ধ্যার পরই স্বাধীনতার ঘােষণা রেকর্ড এবং লিখিতভাবেও নানাজনের কাছে প্রেরণ করছিলেন। 

 পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থ-সূত্রে জানা যায়, “প্রথম দিনের বৈঠকের (১৬ মার্চ) পরই ইয়াহিয়া টের পেলেন মুজিব কি চাইছেন। সেদিনের বৈঠক শেষে নৈশভােজই ইয়াহিয়া টিক্কা খানকে জানিয়ে দিলেন, ‘দিস বাস্টার্ড ইজ নট বিহেভিং। ইউ গেট রেডি’। টিক্কা খান সঙ্গে সঙ্গেই জিওসি খাদিমকে বললেন, ‘খাদিম ইউ ক্যান গাে অ্যাহেড । এরপরেই অপারেশন সার্চ লাইট’এর নীল নক্সা মাত্র ষােলটি প্যারাগ্রাফের এই অপারেশন সার্চলাইট’ হিটলারের নাৎসি-বাহিনীর ইহুদি নিধনের পরিকল্পনার সাথে তুলনীয়। এই পরিকল্পনাটি পূর্ব পাকিস্তানে বসেই ইয়াহিয়া, ভুট্টো, টিক্কা খান ও তার অন্যান্য উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাগণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং ‘গাে এ্যাহেড -এর নির্দেশ দিয়ে (২৫ মার্চ রাতে) ইয়াহিয়া পাকিস্তানের উদেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন” (১(১)/৪৭৭-৪৭৮)। 

 ‘বঙ্গবন্ধুর নিকট-বন্ধুদের একজন বিশিষ্ট লেখক খন্দকার মােহাম্মদ ইলিয়াসের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণ : “২৫ মার্চের কালরাত্রি। রাত সাড়ে আটটা-নয়টা নাগাদ। বৈঠক ঘরে তখন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন 

  ১৮৩ 

  মনসুর আলী, কর্নেল ওসমানী, ড. কামাল হােসেন, আব্দুল মান্নান, আমিরুল ইসলাম (ব্যারিস্টার) প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। বঙ্গবন্ধু একজন করে নেতাকে ডেকে নিচ্ছেন। আমার যখন ডাক পড়লাে, তিনি বললেন -আজ রাতেই ইন্দোনেশিয়ার মত সেই হত্যাকাণ্ড হতে চলেছে বাংলাদেশে। দেশবাসীকে জানাও সেকথা। আর তুমি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাও। প্রতিরােধ গড়ে তুলতে চেষ্টা কর। যদি পাকবাহিনী আক্রমণ করে বসে তবে নির্দেশ পাঠিয়েছি স্বাধীনতা ঘােষণার জন্য। যে জাতি রক্ত দিতে জানে তার মৃত্যু নেই। জয় আমাদের নিশ্চিত”(১(১)/৩৪১)। এখানে ইন্দোনেশিয়ার মত সেই হত্যাকাণ্ড হতে চলেছে বাংলাদেশে’   বলার মধ্যেই স্পষ্ট যে, বঙ্গবন্ধু এবং সহযােগীবৃন্দ ইয়াহিয়া-ভুট্টোর সাথে আলােচনার পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বিষয়গুলিও নিজেদের সন্ধানে রাখছিলেন। আর | দ্বিতীয়ত,  যদি পাকবাহিনী আক্রমণ করে বসে তবে নির্দেশ পাঠিয়েছি স্বাধীনতা ঘােষণার জন্য   কথাটিই জানিয়ে দেয়, সম্ভাব্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং প্রস্তুতিও বঙ্গবন্ধু আগে থেকেই নিয়েছিলেন। 

 ২৫ মার্চ রাত এগারােটার দিকে শেখ হাসিনা নিচের বসার ঘরে এসে বললেন, চারদিকে অবস্থা খুব খারাপ, ‘আপনিও আসুন বাবা, আমাদের যেতে হবে। রাত সাড়ে এগারােটার দিকে বাইরে থেকে কয়েকজন এসে বললেন, ‘মুজিব ভাই, পাকিস্তানি আর্মির কয়েকটি বহর এগিয়ে আসছে। আপনি সবাইকে নিয়ে সরে যান। ওরা আপনাকে মেরে ফেলবে। বঙ্গবন্ধু এক মুহূর্ত কি যেন ভাবলেন; বললেন, পাকসেনারা যদি তাকে মেরেও ফেলে তবু তিনি বাসা ছেড়ে যাবেন না। জামাতা ড. ওয়াজেদ মিয়াকে বললেন, তুমি যে বাসা ভাড়া করেছ, সেখানে হাসিনা ও রেহানাকে নিয়ে এখুনি চলে যাও । কামাল ও জামালকে বললেন, “তােমাদের কাজ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা। রাত ১২টার দিকে ওয়াজেদ মিয়া হাসিনা ও রেহানাকে নিয়ে চলে যান। রাত সােয়া ১২টায় বঙ্গবন্ধু দুই শিট কাগজ নিয়ে তাতে দেশের স্বাধীনতার ঘােষণা লিখে স্বাক্ষর করেন। আর তখনই ইপিআর-এর ওয়ারলেসে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতা ঘােষণা রেকর্ড করা হয়” (১(৩)/১২৫৬)। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মােযহারুল ইসলাম ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব  গ্রন্থে লিখেছেন, “২৫ মার্চ রাতে  বঙ্গবন্ধুর স্বকণ্ঠে স্বাধীনতা। ঘােষণার টেপটি জনৈক ছাত্র (শামসুল আলম মিলন) ১১টার কিছু সময় পূর্বে পিলখানায়  সুবেদার মেজর শওকত আলীর নিকট হস্তান্তর করেন। বেতারের মাধ্যমে মেসেজটি ট্রান্সমিটরত অবস্থায় শওকত সাহেব পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন” (১(২)/৬৬১-৬৬২) এবং চরম নির্যাতন সহ্য করে শহীদ হন। 

  ১৮৪ 

  নয়ীম গহর ‘দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় (১৯ জুলাই, ২০০৪ খ্রি.) প্রসঙ্গ : ২৫ মার্চে বঙ্গবন্ধুর চট্টগ্রামে পাঠানাে নির্দেশ’ শিরােনামের নিবন্ধে লিখেছেন, “রাত ৮ থেকে ১১ পর্যন্ত এই তিন ঘণ্টার মধ্যে আমাকে চারবার বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আসা-যাওয়া করতে হয়েছে। তার কারণ ছিল, বঙ্গবন্ধুর তরফ থেকে এম. আর. সিদ্দিকীর কাছে বার্তা ও নির্দেশ পাঠানাে। এম. আর. সিদ্দিকীর ওপর দায়িত্ব ছিল বঙ্গবন্ধুর নতুন নির্দেশগুলাে কার্যকর করা। নির্দেশগুলাে এরকম : 

 (1) Talk has failed, (2) Don t surrender arms (E.P.R, E.B.R, Police, Ansar, general public), (3) Let the people and other start , (4) Liberate Chittagong, (5) Proceed towards Comilla, (6) Carry out my earlier orders, even if I am not available (dead or captive), (7) Confirm me back that Chittagong understood me clearly”. 

 (১(২)/৬৫৬-৬৫৭)। 

 দেখা যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু মানসিক বা প্রয়ােজনীয় বাস্তব কর্ম-সম্পাদনের দিক থেকে আদৌ উদভ্রান্ত বা অপ্রস্তুত ছিলেন না, চরম অনিশ্চিত এবং শঙ্কাকুল সময়েও পরিকল্পিত প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায় সব কাজ সম্পন্ন করছিলেন। তিনি যেন সবকিছু ভেবেচিন্তে আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন। ২৫ মার্চ গভীর রাতে (ঘড়ির কাঁটার হিসেবে তখন ২৬ মার্চ) বাঙালির ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর অমানবিক আক্রমণ, ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হওয়ার পরই “পাকিস্তান রেডিওর কাছাকাছি কোনও ওয়েভলেংথ থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘােষণাটি’ ভেসে আসে। বঙ্গবন্ধুর এ ঘােষণাটি সম্পর্কে মাসুদা ভাট্টি সংরক্ষিত ব্রিটিশ দলিলপত্র’এর সূত্রোল্লেখ করেছেন। 

 “এটা হয়তাে আমার শেষ বার্তা। আমি সকল বাঙালির কাছে আবেদন করছি শরীরের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত দেশকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যান” (১(১)/৪৭৯-৪৮০)। 

 মার্কিন লেখক রবার্ট পেইন তাঁর  ম্যাসাকার  নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “মাঝরাত নাগাদ তিনি (বঙ্গবন্ধু) বুঝতে পারলেন যে ঘটনা প্রবাহ দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। তাঁর টেলিফোন অনবরত বেজে চলেছে, কামানের গােলার শব্দ শােনা যাচ্ছে, আর দূর থেকে চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসছে। তিনি জানতেন যে, পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস্ -এর ব্যারাকগুলি ও রাজারবাগ পুলিশ দপ্তর আক্রান্ত হয়েছে। তাই সে-রাতেই, ২৬শে মার্চে, সর্বত্র বেতারযােগে পাঠাবার জন্য তিনি নিম্নোক্ত বাণীটি সেন্ট্রাল টেলিফোন অফিসে জনৈক বন্ধুকে ডিক্টেশন দেন”(১(১)/৪৭) : 

  ১৮৫ 

  ‘পাকিস্তান সামরিক বাহিনী মাঝরাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানার পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস্-এ হেডকোয়ার্টার আক্রমণ করেছে। প্রতিরােধ করবার জন্য এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য শক্তি সঞ্চয় করুন । 

 উপরােক্ত বার্তাগুলিতে বর্ণিত পরিস্থিতি এবং সময়ের ব্যবধান নজর এড়াবার নয়। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু একাধিক সময়ে একাধিক মাধ্যমে সময়ােপযােগী বার্তাগুলি প্রেরণ করেছিলেন, কোনােটি স্বকণ্ঠে, কোনােটি স্বলিখিত আবার কোনােটি তার ‘ডিক্টেশন’ -অন্য কেউ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তাই মূল বক্তব্যে মিল থাকলেও ভাষা ও শব্দের তারতম্য ঘটেছে স্বাভাবিকভাবেই। 

 সরদার সিরাজুল ইসলাম (বঙ্গবন্ধুর অসহযােগ আন্দোলন ও স্বাধীনতা ঘােষণা (নিবন্ধ-সিরিজ) জনকণ্ঠ, ১২-০৩- ১৩) বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র : তৃতীয় খণ্ড, পৃঃ ১  তথ্য-সূত্রের বরাতে উল্লেখ করেছেন, “বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘােষণাটি ছিল ইংরেজিতে   ওয়ারলেস/ টিঅ্যান্ডটি বিভাগের মাধ্যমে প্রেরণের সুবিধার জন্য। ঘােষণাটিতে বলা হয়েছিল : 

 This may be my last message. From today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan Army is expelled from the soil of Bangladesh and 

 final victory is achieved. Joy Bangla”| 

 অধ্যাপক এ.কে. আজাদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি। অপারেশন্যাল ইন্টেলিজেন্স ডিভিশন : ২৬ মার্চ ১৯৭১ : ইএসটি ১৪৩০ (অর্থাৎ দিন ২-৩০মি.) সূত্র থেকে উদ্ধৃত করেছেন, 

 “Civil War in Pakistan : 

 Pakistan was thurst into civil war to-day when Sheikh Mujibur Rahman proclaimed the East Wing of two-part country, the soverign independent People s Republic of Bangladesh. Fighting is reported heavy in Dacca and other eastern cities where 10,000 men paramilitary Pakistan Rifles has joined police and private citizen in conflict with an estimated 23,000 West Pakistani regular army troops” ১(২)/৬৫৯-৬৬০)। 

  ১৮৬ 

  অসহযােগ আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধুর অন্যতম ঘনিষ্ট ছাত্রনেতা, পরবর্তী সময়ে জাসদ নেতা, কাজী আরেফ আহমেদ জানিয়েছেন, “স্বাধীনতার ঘােষণাটি বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে টেপ করা হয়েছিল। রাত বারােটার পর ঘােষণাটি ই.পি.আর. ও টি.এন.টি. ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে সারারাত ধরে সম্প্রচারিত হয় এবং গন্তব্যস্থলে পৌঁছামাত্রই কর্তব্যরত কর্মচারীরা তা টেলিগ্রাম আকারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের কাছে পৌঁছে দেন”(১(২)/৯৭০)। চট্টগ্রামে ইত্তেফাক করেসপন্ডেন্ট মইনুল আলম ওয়্যারলেস অপারেটরের মাধ্যমে পাওয়া বঙ্গবন্ধুর একটি বার্তা ২৬মার্চ ভােরে আওয়ামী লীগ নেতা এম. আর. সিদ্দিকীর স্ত্রীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন (৭/২০৪)। বার্তাটি আব্দুল হান্নান বেলা ২:৩০মিনিটে বেতারে পাঠ করেছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র  বইটির লেখক বেলাল মহম্মদ উল্লেখ করেছেন, বেতারে ঘােষণাটি পাঠের আগে, আব্দুল হান্নান সকাল থেকেই মাইকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘােষণার বার্তাটি চট্টগ্রাম শহরে প্রচার করেছিলেন। 

 উপরােল্লিখিত বিভিন্ন তথ্যেই স্পষ্ট যে, বঙ্গবন্ধুর ২৬ মার্চের স্বাধীনতার বার্তাটি যথা সময়েই পেয়েছিলেন দেশের বিভিন্ন এলাকার আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এবং তা পৌঁছে গিয়েছিল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং কূটনৈতিক কর্তৃপক্ষের কাছেও। 

  ১৮৭ 

  ‘সব সংশয় হােক অবসান  : 

 বঙ্গবন্ধু কি স্বাধীনতা ঘােষণা করেছিলেন? 

  বিচারপতি হাবিবুর রহমান লিখেছেন : “জিয়ার অনুরাগীরা বঙ্গবন্ধুর ঘােষণার কথা অস্বীকার করতে চান। বঙ্গবন্ধু নিজে ঘােষণা লিখে গিয়েছিলেন, না তার নাম ঐ ঘােষণা প্রচার করা হয়েছিল   এ সম্পর্কে আলােচনা গবেষণা চলতে পারে। কিন্তু ঘােষণা যে প্রচারিত হয়েছিল এবং জিয়াউর রহমানের ঘােষণার আগেই, তা অস্বীকার করার উপায় নেই” (১(১)/৯৪-৯৫)। জিয়া নিজে লিখেছেন, তিনি ২৭মার্চ সন্ধ্যায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে এসে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘােষণাটি পাঠ করেন। অথচ জিয়া-ভক্তরা তারিখটি বানিয়েছেন ২৬ মার্চ, আরাে এগিয়ে বেগম জিয়া একবার জাতীয় সংসদেই বলেছিলেন, জিয়া ২৫ মার্চ রাতেই বেতারে স্বাধীনতার ঘােষণা দিয়েছিলেন। 

 বামপন্থী বুদ্ধিজীবী এবং গবেষক বদরুদ্দিন উমর ‘সাপ্তাহিক ২০০০ এর ১৫ জানুয়ারি, ১৯৯৯ খ্রি. সংখ্যায় লিখেছেন, “শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে স্বাধীনতার ঘােষণা দিয়েছিলেন, এটা এখন অতি উচ্চৈঃস্বরে প্রচারিত হলেও এর চাইতে বড় মিথ্যা আর কিছুই হতে পারে না। এ রকম কে কবে শুনেছে যে, স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘােষণা দিয়ে এবং জনগণকে সেই যুদ্ধে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে কোনাে সেনানায়ক কিংবা মহান রাজনৈতিক নেতা নিজে বাড়িতে বসে থেকে শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং এটা করেন যখন তাঁর নিজের দেশের হাজার হাজার মানুষ সামরিক বাহিনীর হাতে মারা পড়ছেন। তবে বদরুদ্দিন উমরের তাে জানার কথা যে, “লেনিন বসে ছিলেন সূদূর জার্মানিতে, রাশিয়া জার শাসনমুক্ত হলাে। নেলসন ম্যান্ডেলা একটি নির্জন দ্বীপে বন্দি, দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেত-শাসনের অবসান ঘটাল তাঁর অনুসারীরা। জেমাে কেনিয়াত্তা দূর থেকে কেনিয়ার ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন।  ইরানের শাহের পতন ঘটিয়েছিলেন খােমেনির অনুসারীরা। যিনি স্বয়ং তখন প্যারিসে বসবাস করছিলেন। তাঁর ক্যাসেট-বদ্ধ বাণী শুধু ইরানের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। একইভাবে  একটি 

  ১৮৮ 

  মুজিবের কণ্ঠ লক্ষ মুজিবের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে বিস্তৃত রণক্ষেত্র আর অবরুদ্ধ বাংলাদেশ জুড়ে” (২৫/৭০)। 

 গােলাম মুরশিদ মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর : একটি নির্দলীয় ইতিহাস  বইটিতে ‘মুক্তিযুদ্ধের ঘােষণা  শিরােনামে লিখেছেন, “২৫ মার্চ রাতেও হামলার আশঙ্কা করলেও, অথবা একাধিক সূত্র থেকে খবর পেলেও, সেই রাতেই সেনা-হামলা হবে -এবিষয়ে তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারেননি। তাই তিনি স্বাধীনতার কোনাে আনুষ্ঠানিক ঘােষণা দেননি। অথবা কোনাে ঘােষণা রেকর্ড করে রাখেননি। সেদিন সন্ধ্যের পরেও বেতার-টেলিভিশনের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ছিল। ইচ্ছে করলে তিনি তা ব্যবহার করতে পারতেন। শেখ মুজিব নিজেও দাবি করেছেন যে, ঝটিকা আক্রমণ আরম্ভ হওয়ার পরে তিনি প্রতিরােধের ঘােষণা দিয়েছিলেন (মুজিব, ‘শাষিতের গণতন্ত্র চাই’ ২৬ মার্চ ১৯৭৫ তারিখের বক্তৃতা)। মনে হয়, সত্যি সত্যি তিনি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বার্তা পাঠানাের পরই টেলিগ্রাফ সংযােগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেজন্য বার্তাটি কোথাও পাঠানাে যায়নি” (২/৮৬)। সংশয়াকীর্ণ মন্তব্যে একটি মাত্র অনুকূল অনুমান, মনে হয়, সত্যি সত্যি তিনি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। 

 ব্রিটিশ নাগরিক, ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার সংবাদদাতা ডেভিড লােশাক, তাঁর ‘পাকিস্তান ক্রাইসিস’ শিরানামের বইতে উল্লেখ করেছেন : “Soon after darkness fell on March 25, the voice of Sheikh Mujibur Rahman came faintly through a wavelength close to the official Pakistan radio. In what must have been, and sounded like, a pre-recorded message, the Sheikh proclaimed East Pakistan to be the People s Republic of Bangladesh.” (১(২)৮৫৯)। মি. লােশাকের বক্তব্য প্রসঙ্গে এস.এ. করিমের সংশয়-মন্তব্য, অন্য কোনাে সূত্রে বক্তব্যটি সমর্থিত কিংবা বিদেশী সংবাদ মাধ্যমেও প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু লােশাকের বক্তব্যেরই লক্ষণীয় সমর্থন মেলে ঢাকায় নিযুক্ত প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ‘অপারেশন সার্চ লাইট’এর অন্যতম পরিকল্পনাকারী, জেনারেল টিক্কার কথায়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সংবাদদাতা’ মুসা সাদিককে ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল টিক্কা খান বলেছিলেন, “মাইনে খােদ শেখ সাব কো রেডিও পর  Independence কা এলান করতে হুয়া সুনা য়ে শেখ সাব কি আওয়াজ আচ্ছি তেরা পেহছান তা থা  And I had no option but to arrest him  ” (জনকণ্ঠ, ৪-০৩-০২)। বিচারপতি কে.এম সােবহান লিখেছেন, ২৬ মার্চ  ৭১ ইয়াহিয়ার প্রচারিত বেতার ভাষণে বলা হয়েছিল, “শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রদ্রোহী। সে পাকিস্তানের পতাকার অবমাননা 

  ১৮৯ 

  করেছে। এবার তাকে শাস্তি পেতেই হবে” (১(১)/১০৬)। বঙ্গবন্ধুর প্রতি ইয়াহিয়ার এত ক্ষোভ-অভিযােগের কারণটা জানা যায় টিক্কা খানের কথা এবং বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদপত্রের সূত্রে। 

 লন্ডনের দৈনিক  দ্য টাইমস ২৭ মার্চ, ৭১ প্রথম পৃষ্ঠায় বড় হেডলাইনে ছেপেছিল, “Heavy fighting as Sheikh Mujibur declares E Pakistan independent” আর  দ্য গার্ডিয়ান লিখেছিল, “Shortly before his arrest,Mujib had issued a proclamation to his people, which informed them : you are citizens of a free country”. ‘টাইম’ ৫ এপ্রিল, ১৯৭১ লিখেছিল, “The army ordered a strict 24hour curfew in Dacca (Dhaka), with violators shot on sight. But soon the free Bengal revolutionary radio center, probably somewhere in Chittagong cracked in life. Over the clandestine station, Mujib proclaimrd the creation of the  soverign independent Bengal nation” (১(২)/৮৫২)। আরাে অনেক বিদেশী পত্র-পত্রিকাতেই এমন বহু খবর প্রকাশিত হয়েছিল। সব মিলিয়েই লক্ষণীয় যে, আক্রান্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা এবং ঘােষণা প্রদানকারীর কথা প্রধানত বিদেশীরাই প্রচার করেছিল বিশ্বময়। 

 একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে শেষ পর্যন্ত যারা বঙ্গবন্ধুর বাসায় উপস্থিত ছিলেন, তাদেরই একজন ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম। সে রাতের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি  গ্রন্থে লিখেছেন, ২৪ মার্চ বিকাল থেকে ২৫ মার্চ রাত ১০টা সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সকলকে মুজিব ঢাকা ছেড়ে যাবার নির্দেশ দেন। অনেকেই তাকে আত্মগােপনের অনুরােধ করেছিলেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর একটিই জবাব ছিল, “আমাকে নিয়ে তােরা কোথায় রাখবি? বাংলাদেশে আত্মগােপন করা সম্ভব নয়। আমার হয়তাে মৃত্যু হবে, কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই”। পরামর্শদাতা শুভানুধ্যায়ীদেরকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “If I leave my house, raiders।(Pakistani) are going to massacre the people of Dacca. I don t want my people to be killed on my account . Death held no terror to him personally. But he thought that many innocent lives would be lost if he went underground ” (১৭/১৯৪)। 

 পূর্বোল্লিখিত সাক্ষাৎকারে টিক্কা খান স্পষ্টভাবেই মুসা সাদিককে বলেছিলেন, “ম্যায় আচ্ছি তেরা জানতা থে মুজিব য্যায়সা লিডার, আপনি আওয়াম কো ছােড়কে নেহি যায়েঙ্গি। আমি শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করার জন্য ঢাকার প্রতিটি জায়গায় প্রতিটি বাড়িঘরে তল্লাশি চালাতাম”। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে পূর্বোল্লিখিত  গার্ডিয়ান’এর হিজ পিপল’ আর টিক্কা খানের  য্যায়সা লিডার’এবং  আপনি আওয়াম  ইত্যাদি অর্থবহ শব্দগুলি লক্ষ্য করলে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত চেতনা এবং রাজনৈতিক চিন্তার তাৎপর্যও 

  ১৯০ 

  সহজেই উপলব্ধি করা যায়। গােলাম মুরশিদ লিখেছেন, “মুজিব আগে থেকে অন্য নেতাদের গা ঢাকা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিশেষ করে তাজউদ্দিনকে সে রাতেই তিনি শহরতলীতে পালিয়ে থাকার কথা বলেছিলেন। পালিয়ে গিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর নিজের পালানাের কোনাে উপায় ছিলাে না। তাঁর মত একজন নেতাকে কোথাও লুকিয়ে রাখা যায় না। বড়াে কথা, পালানাের মত মনােবৃত্তিই তার ছিলাে না”(২/৭৮)। বঙ্গবন্ধু “বাংলাদেশ স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন একটি মর্যাদাব্যঞ্জক যুদ্ধ বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। বনেজঙ্গলে ঘুরে বিচ্ছিন্নতাবাদীর অপবাদ নিয়ে তিনি স্বাধীনতার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে চাননি”(১(১)/৩৭৪)। 

 অসহযােগ আন্দোলন শুরুর প্রথম দিকেই “আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ কর্মসূচি গ্রহণের জন্য মুজিবকে ‘সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হয়। নীতিনির্ধারণী বিষয়াদি ঠিক করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী, খন্দকার মােশতাক আহমেদ, তাজউদ্দিন আহমদ ও এ.এইচ.এম কামারুজ্জামানকে নিয়ে দলীয় হাই কমান্ড’ গঠন করা হয়। তাজউদ্দিন আহমদকে। কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় এবং ড. কামাল হােসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে করা হয় তার সাহায্যকারী”(৩১/১৩)। এ হাই-কমান্ডের তাজউদ্দিন-আমীর-উলের পরিকল্পিত উদ্যোগে-নির্দেশেই অনুপস্থিত বঙ্গবন্ধুর নামে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। সুতরাং বঙ্গবন্ধু মানসিকভাবে অপ্রস্তুত অবস্থায় কিংবা দলীয় দায়িত্বের ‘লাইন আপ ঠিক না করেই গ্রেফতার বরণ করেছিলেন, এমন সংশয়-কথা ইতিহাস সমর্থন করে না। “মুজিবের বন্দিত্ব মুক্তিযুদ্ধ ঘােষণার থেকেও অনেক বড় ঘটনা”, অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেই লিখেছিলেন, “মুজিব যদি ধরা না দিয়ে পালিয়ে গিয়ে কোনাে ভাঙ্গা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘােষণা করতেন তাহলে কি তিনি মুজিব হতেন?  মুজিব পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ঘােষণা দিলে মুক্তিযুদ্ধ হতাে না, তিনি হতেন সামান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী; এবং আমরা একটি বিশাল। রাজনৈতিক ভাবপ্রতিমাকে হারাতাম, মুক্তিযুদ্ধে আমরা এত অনুপ্রাণিত বােধ করতাম না। যােদ্ধা মুজিবের চেয়ে বন্দি মুজিব ছিলেন অনেক শক্তিশালী ও প্রেরণাদায়ক; তিনি তখন হয়ে উঠেছিলেন মহানায়ক; মুক্তিযুদ্ধের সময়টি ভরে তিনিই ছিলেন নিয়ন্ত্রক ও প্রেরণা প্রতিটি বাঙালি মুক্তিযােদ্ধাই ছিল মুজিবের দ্বিতীয় সত্তা”। 

 প্রসঙ্গটির ইতি টানবার আগে প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণমূলক দু টি উদ্ধৃতি দিতে চাই। প্রথমটি সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হােসেনের সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘােষক ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিবন্ধ থেকে আর দ্বিতীয়টি সাংবাদিক-লেখক এবং  আওয়ামী লীগ-বিরােধী বাম নেতা’ নির্মল সেনের  মা জন্মভূমি  শিরােনামের বইটি থেকে। 

  ১৯১ 

  “THE PROCLAMATION OF INDEPENDENCE 

 Mujibnagar, Bangladesh, 

 Dated : 10th day of April, 1971 

 .   Whereas in the facts and circumstances  Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, the undisputed leader of the 75 millon people of Bangladesh, in due fulfilment of the legitimate right of self-determination of the people of Bangladesh, duly made a declaration of independence at Dacca on March 26, 1971 and urged the people of Bangladesh to defend the honour and integrity of Bangladesh. 

  We, the elected representatives of the people of Bangladesh, as honourbound by the mandate given to us by the people of Bangladesh whose will is supreme, duly constituted ourselves into a Constituent assembly, and having held mutual consultations .declare and constitute Bangladesh to be a soverign People s Republic and thereby confirm the declaration of inependence already made by Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman and that this proclamation of independence shall be deemed to have come into effect from 26″ day of March, 1971 বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বহু রায়ে এই স্বাধীনতার ঘােষণাপত্রকে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের একটি আকর দলিল বলে গণ্য করেছেন” (১(১)/১১২-১১৪)। উল্লিখিত ঘােষণাটিই বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক ভিত্তি এবং অনস্বীকার্যভাবেই অলঙ্নীয়। 

 নির্মল সেন লিখেছেন : “প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার ঘােষণা হয়েছিল ১৯৭১সালের ৭ই মার্চ আজকের সােহরাওয়ার্দী উদ্যানে। যদিও এই ঘােষণার আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। এছাড়া একটি ঘােষণা ২৬শে মার্চ রাত্রে শেখ সাহেব পাঠিয়েছিলেন বেতার মারফত। ঘােষণাটি ২৬শে মার্চ আমাদের থানার ডাকঘরে এসেছিল। আহ্বান এসেছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নামেই। আমি নিজের চোখে সে ঘােষণাটি দেখেছি। এ ব্যাপারে কারও ধার করা কথা বা তত্ত্ব শুনতে বা বুঝতে আমি রাজি নই। স্বীকার করতে হবেই যে, স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমান। এবং আওয়ামী লীগের নামে”। তিনি আরাে লিখেছেন, “আমরা বামপন্থীরা বাঙালি উঠতি শিক্ষিত মানুষের মনমানসিকতা বুঝতে পারিনি। আমরা ৬-দফাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দলিল বলে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম।  আমরা মেহনতি মানুষের কথা বলি। কিন্তু ১৯৭১সালে এদেশের মেহনতি মানুষের আস্থা আমাদের ওপর ছিল না। তাদেরও নেতা ছিল শেখ মুজিবুর রহমান” (তথ্যসূত্র : বঙ্গবন্ধুর অসহযােগ আন্দোলন ও স্বাধীনতা ঘােষণা’; সরদার সিরাজুল ইসলাম, জনকণ্ঠ, ১২ মার্চ, ২০১৩)। 

  ১৯২ 

  ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’: 

 বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের পূর্বাপর 

  ২৫ মার্চ রাতের প্রথম দিকেই “এই মুহূর্তে তােমরা আমার বাড়ি ছেড়ে চলে যাও। আর তােমরা তােমাদের দায়িত্ব পালন করবে’- বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশে “ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ও ড. কামাল হােসেন তাদের দলনেতা তাজউদ্দিনের বাসায় আসেন। পরনে লুঙ্গি, গায়ে পাঞ্জাবি, পায়ে কাপড়ের জুতাে, এক কাঁধে ঝােলানাে ব্যাগ ও অন্য কাঁধে একটি রাইফেল নিয়ে বেরিয়ে এলেন তাজউদ্দিন। শুরু হল অনিশ্চিত যাত্রা। তাজউদ্দিন ও আমীর-উল ইসলাম লালমাটিয়ায় ইঞ্জিনিয়ার গফুর সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় নেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয়ে যায়। ‘অপারেশন সার্চলাইট  এবং পরদিন কাফু। ২৭ মার্চ ‘পথই ঠিকানা, পথই গন্তব্যে। পৌঁছে দেবে’ ভেবে” (৩১/১৫)উভয়ের অজানিত যাত্রা শুরু হয়। আপাতত এ প্রসঙ্গ মুলতবি রেখে বলা যাক ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের কথা। 

 সেদিন রাতে “The hammer-blows of the tank-led forces fell on four main targets : the police lines at Rajarbagh, the East Pakistan Rifles barracks at Peelkhana, the Dacca University campus and the slums of old Dacca. .. The most important single target of the Army was the person of Sheikh Mujib. After all he was the embodiment of Bengali nationalism The Army did not want to kill him, give him aura of martyrdom. A specially selected commando unit was given the task of capturing him alive. They reached Mujib s house shotly after 1 a.m. 26 March” (১৭/১৯৯-২০০)। 

 “সিদ্দিক সালিকের মতে সৈন্যরা ছাউনি ছাড়ে সাড়ে এগারােটায়।  গ্রেফতারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল লে.ক. জহির আলম খানকে। মুজিব তৈরি ছিলেন আত্মসমর্পণের জন্য। গ্রেফতারের আগে মুজিবের বাসভবনের ওপর নানা দিক থেকে অসংখ্য গুলি ছোঁড়া হয়েছিল। তাকে মেগাফোনে নিচে নেমে আসার কথা বলা হয়েছিল। তিনি তখন কাপড়-চোপড়ের ছােট্ট একটা ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে আর মুখে 

  ১৯৩ 

  পাইপ দিয়ে নেমে এসেছিলেন” (২/৭৬-৭৮)। কিন্তু “The commandos shoot several darwans of the neighbouring houses. Dacca was already aglow with houses on fire Mujib looked at the skyline and asked the commanding officer, ‘Was it necessary to do all this ? He replied, “Sir, I am only carrying out orders.” (১৭/২০০)। অপরদিকে এমন তথ্যও মেলে যে, গ্রেফতারের আগে-পরে পাক-সেনারা বঙ্গবন্ধুর ওপর চরম অপমান-নির্যাতন চালিয়েছিল। গ্রেফতারকারী ইউনিটের পক্ষ থেকে অনতিবিলম্বে সেনা সদর দফতরকে বেতার-বার্তায় জানানাে হয়েছিল, “BIG BIRD IN THE CAGE” (১৭/২২৪)। সেনা-জিপে করে যথাশীঘ্র তাকে ঢাকা সেনা নিবাস এলাকার কাছে। অবস্থিত আদমজী ক্যান্টনমেন্ট হাই স্কুলে নিয়ে রাখা হয়। পরের দিনই নিয়ে যাওয়া হয় ক্যান্টনমেন্টের ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউসে, তিনদিন পরে পশ্চিম পাকিস্তানে, প্রথমে করাচিতে, তারপর লায়ালপুর জেলে। 

 বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের পর দু’সপ্তাহেরও অধিক কাল পরে খবরটি প্রথম প্রকাশ করা হয় ১০ এপ্রিল। ততদিনে ঢাকা থেকে করাচি হয়ে লায়ালপুর সেনা-কারগারে নিঃসঙ্গ-বন্দি করা হয়েছে মুজিবকে। তার আগে বঙ্গবন্ধুর অবস্থা এবং অবস্থান বিশ্ববাসীর সম্পূর্ণ অজানা ছিল। দিল্লিতে ৩ এপ্রিল তাজউদ্দিন সাক্ষাৎ করতে এলে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রথমেই প্রশ্ন করেছিলেন “How is Sheikh Mujib? Is he all rifght? Tajuddin repplied that he had not met Bangabandhu since the twenty-fifth of March but he was sure that he was continuing to provide leadership for the nation. Indeed it was his (Bangabandhu s) instructions that he (Tajuddin) was acting.” (১৭/২০৭)। হয়তাে নিতান্তই একটা ঐতিহাসিক কাকতালীয়’   পাকিস্তানের সেনাচক্র যেদিন (১০এপ্রিল, ১৯৭১) শেখ মুজিবের গ্রেফতারের কথা প্রকাশ করেছিল, সেদিনই প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘােষণায় বিশ্ববাসী জেনেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই ‘প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারে’এর রাষ্ট্রপতি। 

  ১৯৪ 

  বাংলাদেশের বৈধ রাষ্ট্রপতির ‘অবৈধ বিচার’ 

 পাকিস্তানে : সেনা-কারাগারে মৃত্যুভয়হীন মুজিব 

  “লায়ালপুর পাঞ্জাবের একটি জেলা শহর। উষর ও অত্যন্ত গরম আবহাওয়ার জন্য কুখ্যাত একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল। কয়েদির নিরাপত্তা ও তার ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টির বিবেচনায় উপযুক্ত স্থান” (২৯/৮৫)। “It was the worst imprisonment that he had ever experienced .Most likely his worst torture was not knowing how the liberation struggle was progressing in his absence Just before his arrest he had observed how pakistani soldiers were busy pillaging Dccca and killing thousands of innocent civilians” (১৭/২২৪-২২৫)। 

 ইয়াহিয়ার অভিপ্রায় ছিল, মুজিবকে হত্যা করা হবেই। “১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে সামরিক প্রশাসন স্থির করলাে, শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে চিরতরে ঠাণ্ডা করে দেয়া যাবে এবং এভাবেই বাঙালিদেরকে কজায় রাখতে হবে। সংখ্যাধিক্যের ভােট মারফত প্রদত্ত রায় তলিয়ে যাবে মুজিবের কবরে। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক সমস্যাও ছিল। পৃথিবীর সমস্ত অগ্রসর দেশের পক্ষ থেকে দাবি উঠতে লাগলাে, শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়া হােক সামরিক শাসক ভাবলাে, যতাে অবিশ্বাস্যই হােক, মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যায়িত করে যদি মৃত্যুদণ্ড দ্রুত কার্যকর করা যায়, তারপর আন্তর্জাতিক বিরােধিতাও ক্রমে স্তিমিত হয়ে পড়বে। কারণ যার জন্য এই দাবি, সেই ব্যক্তিই তাে মৃত। আরও বড় কথা, আমেরিকা ও চীন নিজেদের জাতীয় স্বার্থে পাকিস্তানকে সমর্থন যুগিয়ে যাবে” (২৯/৮৫-৮৬)।) 

 “It was judicial murder that he (Yahya) had in mind for Mujib. He (Mujib) should therefore, be in perfect health when he appeared before the military court. So Mujib was not physically maltreated in any way” (১৭/২২৫)। সেনা-চক্রের সিদ্ধান্তে বঙ্গবন্ধুর নিয়মিত স্বাস্থ্য-পরীক্ষার জন্য 

  ১৯৫ 

  ডাক্তারের ব্যবস্থা করা হলাে, পরিচিত এবং পছন্দের খাবার বেঁধে দেবার জন্য বাঙালি বাবুর্চি নিয়ােগ করা হলাে। শুধু তাই নয়, তার পছন্দসই ব্রান্ডের তামাক সরবরাহেরও ব্যবস্থা করা হলাে। অতঃপর ১১ আগস্ট, ১৯৭১ তারিখে সামরিক আদালতে মুজিবের বিচার শুরু হয়। পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট বিচারক প্যানেলের প্রধান ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার (রহিমউদ্দিন), দু’জন সেনা কর্মকর্তা, একজন নৌবাহিনীর কর্মকর্তা এবং অন্যজন পাঞ্জাবের জেলা আদালতের বিচারক। ১২-দফা অভিযােগ আনা হয়েছিল মুজিবের বিরুদ্ধে, এর মধ্যে ছ টিই ছিল মৃত্যুদণ্ড যােগ্য। সবচেয়ে বড় অভিযােগ : পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-ঘােষণা। 

 আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতই এ মামলার জন্যও একই পন্থায় সাক্ষী তৈরি করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষের জন্য উচ্চপদস্থ বাঙালি সেনা-কর্মকর্তাদের সাক্ষীর বিষয়টি ছিল একান্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসল সাক্ষী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পরিকল্পিতভাবে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে আসা হয়েছিল বাঙালি ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদার, লে. কর্নেল মুহাম্মদ ইয়াসিন এবং লে. কর্নেল মাসুদুল হােসেন খানকে। পাক-সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত “মামলাটি যতাে হাস্যকর হােক না কেন, এটি সাক্ষীদের জন্য ছিল বিধাতার দেয়া চরমতম দুর্ভাগ্যের ব্যাপার”(২৯/৮৭)। মামলার সাক্ষী তৈরি করার জন্য যে অমানবিক অত্যাচার করা হয়েছিল তার বর্ণনা এড়িয়ে কৌতূহলী পাঠকের জন্য উল্লেখ করা যেতে পারে, মে.জে. খলিলুর রহমান, ‘পূর্বাপর ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনা-গহ্বর থেকে দেখা  বইটিতে তার মর্মান্তিক বিবরণ বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। 

 বঙ্গবন্ধুকে নিজ-পছন্দের আইনজীবী নিয়ােগের সুযােগ দেয়া হলে তিনি চেয়েছিলেন, ড. কামাল হােসেন তার পক্ষে লড়বেন। কিন্তু সামরিক-জান্তা এটি অনুমােদন না করায় তিনি বেছে নিয়েছিলেন জাতিগতভাবে সিন্ধী, পাকিস্তানের বিশিষ্ট আইনজীবী এবং সংবিধান-বিশেষজ্ঞ এ. কে. ব্রোহিকে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের অভিযােগ উত্থাপনের পর্যায়েই মুজিব জানলেন ইয়াহিয়ার ২৬ মার্চের বেতার ভাষণে তাকে ‘Act of treason অর্থাৎ দেশদ্রোহের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাই ব্রোহির পরামর্শসহায়তা নিতে সরাসরি অস্বীকার করে বঙ্গবন্ধু তাচ্ছিল্যভরেই বলেছিলেন, তিনি “পাকিস্তানিদের এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রমূলক আদালতকে কোনাে আদালত বলে মানেন না। ইয়াহিয়া খানকে যেন বলা হয়, সে যা খুশি তাই করতে পারে, মুজিবকে যদি হত্যা করতে চায়   তা সে স্বচ্ছন্দে করতে পারে। বিচারের নামে কোনাে প্রহসন করতে হবে না। মুজিব এই প্রহসনের আদালতকে কোনােভাবে স্বীকৃতি দেয় না” (২৯/৮৬)। “With the knowledge that the proceedings of the trial was only farcical preliminaries to his grim execution, he (Sheikh Mujib) sat impassively as witness after witness were brought in to give evidence” 

  ১৯৬ 

  (১৭/২২৬)। বিচারালয়ে“নিশ্ৰুপ বসে থাকতেন বঙ্গবন্ধু। কয়েকদিন পর আদালতের বিবরণী দেখার জন্য দেওয়া হলে বিবরণী বইয়ের ওপর (বঙ্গবন্ধু) লেখেন‘সব মিথ্যা। কয়েকদিন পর আবার বিবরণী বই দেখতে দেওয়া হলে এবার লিখলেন, কাকে বলে রাষ্ট্রদ্রোহিতা?  (২২/১০০)। 

 বঙ্গবন্ধুর ‘গােপন বিচার’ চলার সময় “ইয়াহিয়া খানকে বিশ্বনেতৃবৃন্দ চাপ দিতে থাকেন, কোনােভাবেই যেন শেখ মুজিবের কোনাে ক্ষতি করা না হয়। ফাসি দেওয়া 

 হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক মানুষও তাদের প্রিয় ‘শেখ সাহাব’-এর কোনাে রকম ক্ষতি হােক, তা চাননি। ৫ নভেম্বর পাকিস্তানের বিভিন্ন স্তরের ৪২জন ব্যক্তি সম্মিলিতভাবে ইয়াহিয়া খানের কাছে শেখ মুজিবের দ্রুত এবং নিঃশর্ত মুক্তির আবেদন জানিয়েছেন। বিচার শুরুর আগে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশন্যাল (শেখ মুজিবকে) “বিবেকের বন্দী  বলে ঘােষণা করল। পাশ্চাত্যের ‘জুরি কমিশন’ও বিচারের বৈধতা সম্পর্কে প্রশ্ন তােলে।  দেশ-বিদেশে চাপ বাড়তে থাকলে ইয়াহিয়া সুর পাল্টান। ৮ নভেম্বর ১৯৭১, “নিউজ উইক  ম্যাগাজিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,  আমার মনে হয়, শেখ মুজিব যদি পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যান, তাহলে তাঁর নিজের জনগণই তাঁকে হত্যা করবে। কেন না তারা তাকেই তাদের দুঃখকষ্টের জন্য দায়ী করছে। কিন্তু জাতি যদি চায়, তাকে মুক্তি দিতে পারি। আমিও উদ্বিগ্ন” (২২/১০২-১০৩)। তবে মুজিবের বিচারের ব্যাপারে যুক্তিবুদ্ধি মেনে চলার সুযােগ ছিল না তার। সেনা-আমলা এবং ভুট্টোর চক্রান্তে ইয়াহিয়া তখন নিজের অপকর্মের জালেই জড়িয়ে পড়েছিলেন। 

 ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর, প্রহসনের বিচারে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত যখন মৃত্যুদণ্ড ঘােষণা করলেন, তখনাে বঙ্গবন্ধু শান্ত। বিচারের রায় ঘােষণার পর বঙ্গবন্ধুকে লায়ালপুর কারাগার থেকে মিয়ানওয়ালি কারাগারে স্থানান্তর করা হলাে। মিয়ানওয়ালি কারাগারের যে সেলে প্রথমে রাখা হয়েছিল, ওই ঘরটার সামনে কবর আকৃতির একটি গর্ত খোঁড়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু দেখলেন, এই আমার কবর’। সেনাকারাগারে কর্মরত জেলার হাবিব আলী প্রাসঙ্গিক স্মৃতিচারণে বলেছেন, “বন্দী থাকা অবস্থায় বিচারকাজ চলাকালীন অবস্থায় তােমাদের নেতার মুখ থেকে আমরা একটা কথাও বের করতে পারিনি। তােমরা মহা সৌভাগ্যবান এই জন্য যে, এমন একজন নেতা পেয়েছ, যিনি সত্যিই মহান। আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আত্মপক্ষ সমর্থন বা অন্তিম কোনাে ইচ্ছা তােমার আছে কি না? উত্তরে বলেছিলেন, আমার একমাত্র ইচ্ছা, আমার লাশটা যেন প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে পাঠানাে হয়” (২২/১০৮-১০৯)। “একবার নয়, তিনবার তাঁর জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিলাে। শেষবার কবর খোঁড়া হয়েছিলাে ১৫ই ডিসেম্বর, যেদিন তাঁকে ফাঁসি 

  ১৯৭ 

  দেওয়ার জন্যে ইয়াহিয়া আদেশ দিয়েছিলেন। (পূর্ব বাংলায় পাক-বাহিনীর) আত্মসমর্পণের দ্বিধাদ্বন্দ্বের সুযােগে দয়ালু জেলার মুজিবকে লুকিয়ে নিয়ে যান নিজের বাড়িতে। তিনি শুনেছিলেন যে, ইয়াহিয়া পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। জেলার তাঁকে নিজ বাড়িতে রাখেন দু’দিন এক কলােনিতে পাঁচ-ছ’ দিন। ১৯৭৪ সালে ভুট্টো যখন ঢাকায় আসেন, তখন মুজিব এই জেলারকেও আসার জন্য নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন” (২/১৬১)। 

 লায়ালপুর কারাগারে সেনা-টাইব্যুনালে বিচারের প্রেক্ষাপটে মুজিবের সাহসী ব্যক্তিত্ব এবং অবস্থান প্রসঙ্গে গােলাম মুরশিদের পর্যবেক্ষণ : “মুজিব ছিলেন সত্যিকার অর্থেই নির্ভীক এবং আপােষহীন। তিনি বিচারে ভয় পাননি, অথবা আপােষ করতেও রাজি হননি। যখন মুজিবের বিচার হচ্ছিলাে, ততাে দিনে মুক্তিযুদ্ধের বয়স প্রায় ছ মাস হয়ে গিয়েছিলাে।  তা সত্ত্বেও মুজিব যদি পাকিস্তানের চাপে আপােষ করতে রাজি হয়ে যেতেন, তা হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতাে কিনা, সন্দেহ আছে। কিন্তু তিনি তাঁর সাহস বজায় রেখেছিলেন বলেই বাংলাদেশ বাস্তবতায় পরিণত হতে পেরেছিলাে” (২/১৩০-১৩১)। 

  ১৯৮ 

  একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ : 

 অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুময় 

  ২৫ মার্চ রাতে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমত আত্মগােপন করে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ভারতে পৌঁছার পরই তাজউদ্দিন ভেবেছিলেন, যথাশীঘ্র প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আলােচনা করা দরকার। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তায় একটা কার্গো-বিমানে করে তাজউদ্দিন এবং আমীর-উল ইসলাম ১ এপ্রিল নয়া দিল্লি পৌঁছালেন। তাজউদ্দিনের স্বাভাবিক দুশ্চিন্তা ছিল, তিনি কোন পরিচয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করবেন? তবে “He was clear in his mind that he must project the image of Sheikh Mujib in a positive light” (১৭/২০৭)। 

 এপ্রিল ৩, ১৯৭১ প্রথম সাক্ষাতেই শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর প্রশ্নের উত্তরে তাজউদ্দিন নিজের জ্ঞান-বিশ্বাস মতই বলেছিলেন, ২৫ মার্চের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা হয়নি। তবে ধারণা করি তিনিই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং আমি তার নির্দেশিত কাজই করে চলেছি। তিনি এ কথাও ইন্দিরা গান্ধীকে জানিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে এবং স্বাধীনতা অর্জনের পূর্ব পর্যন্তই অব্যাহত থাকবে। “বাংলাদেশের নেতারা আশা করেছিলেন যে, ভারত প্রথমেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু তখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সরকার গঠিত হয়নি। সে জন্যে প্রথমে স্বাধীনতার সনদ ঘােষণা করা হয় ১০ই এপ্রিল। এতে বাংলাদেশের নাম দেওয়া হয় ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। সরকারও গঠিত হয় একই দিনে। এই ঘােষণায় শেখ মুজিবকে বলা হয় রাষ্ট্রপতি। কিন্তু অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে থাকেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দিন আহমদ। আর তাঁর সঙ্গে মন্ত্রী ছিলেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান এবং খন্দকার মােশতাক। এই ঘােষণার খবর প্রথমে আকাশবাণীশিলিগুড়ি তারপর প্রচারিত হয় আকাশবাণীর অন্যান্য কেন্দ্র থেকে। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশের মেহেরপুরের মুক্তাঞ্চলে   বৈদ্যনাথতলায় (ভবের পাড়া)- নির্বাসিত সরকার শপথ গ্রহণ করে। এই জায়গার নাম দেওয়া হয় 

  ১৯৯ 

 মুজিবনগর” (২/১০৪)। সে দিনই কর্নেল এম.এ.জি ওসমানীকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সেনাপ্রধান নিযুক্ত করা হয়েছিল। 

 বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠন সম্পর্কে প্রায় অনালােচিত কিন্তু ঐতিহাসিক কিছু তথ্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। ৪ এপ্রিল ১৯৭১ দিল্লিতে ইন্দিরাতাজউদ্দিন প্রথম বৈঠকটি অনুষ্ঠানের আগেই, ৩১ মার্চ ভারতীয় পার্লামেন্টে গৃহীত একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছিল “সরকার গঠিত হয়েছে জানতে পারলে পূর্ব বাংলার জনগণের সংগ্রামকে সাহায্য করার কথা বিবেচনা করা হবে”। তাই ইন্দিরাতাজউদ্দিন বৈঠকের পরই ‘প্রবাসী সরকার গঠনের প্রশ্নটি জরুরি হয়ে পড়েছিল। আ.লীগের নেতারা কে কোথায় আছেন জানা নেই। অথচ সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছে। ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম পরামর্শ দিলেন তাজউদ্দিনকেই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে হবে। উল্লেখ্য যে, অসহযােগ আন্দোলনের প্রথম দিকেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার। জন্য বঙ্গবন্ধু পাঁচ-সদস্য বিশিষ্ট ‘হাই কমান্ড’ (ইতােপূর্বে উল্লিখিত) গঠন করেছিলেন এবং “তাজউদ্দিন আহমদকে কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় এবং ড. কামাল হােসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে করা হয় তার সাহায্যকারী”(২০/১৩)। সুতরাং পরিস্থিতির প্রয়ােজন স্বীকার করলে, মানতেই হয়, এ-বিষয়ে যারা যতই বিরূপতা-বিতর্ক তুলুন না কেন, তাজউদ্দিন-আমীর কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্তটি ছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশানুযায়ী কর্তৃত্বশীল, সঠিক এবং সময়ােচিত। ৫ এপ্রিল তাজউদ্দিন-ইন্দিরা দ্বিতীয় বৈঠকে “বংলাদেশের গঠিতব্য সরকারকে ভারতের মাটিতে গােপন অবস্থানে ইন্দিরা সম্মতি দেন”(৩১/১৬-১৭)। 

 ৮ এপ্রিল কোলকাতায় ফিরেই তাজউদ্দিন এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল ‘ক্ষমতার দ্বন্দ্বের আভাস পেলেন। ইতােমধ্যে এ কথা রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল যে, তাজউদ্দিন নিজেকে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী পরিচয় দিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। অসন্তুষ্ট দলীয় নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের  সাধারণ অভিমত, ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্যই দিল্লি যাওয়া হয়েছে। এত তাড়াহুড়া করে দিল্লি না গিয়ে হাই কমান্ডের সদস্যদের আসার জন্য অপেক্ষা করা উচিত ছিল। তাজউদ্দিনের জন্য খুবই ব্রিতকর। রাতে লর্ড সিনহা রােডে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শেখ ফজলুল হক মণি বলেন : 

 ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শত্রু শিবিরে বন্দি, বাংলার যুবকেরা বুকের তাজা রক্ত দিচ্ছে, এখন কোনাে মন্ত্রিসভা গঠন করা চলবে না। মন্ত্রী মন্ত্রী খেলা এখন সাজে না। এখন যুদ্ধের সময়। সকলকে রণক্ষেত্রে যেতে হবে। রণক্ষেত্রে উঠে আসবে আসল নেতৃত্ব। এই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করতে হবে। উপস্থিত প্রায় সকলেই শেখ মণির বক্তব্য সমর্থন করেন” (৩১/১৭)। 

  ২০০ 

  তবে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যে উপস্থাপিত ব্যাখ্যাবিশ্লেষণের পর তাজউদ্দিনের প্রতি প্রবল বিরােধিতা, শেখ মণির প্রকাশ্য আপত্তি সত্ত্বেও বহুলাংশেই নমনীয় হয়ে আসে। এসব বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা এখানে নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক এবং বাহুল্য হবে। বহু প্রামাণ্য বই-পুস্তকেই এবিষয়ে আলােচনা করা হয়েছে, কৌতূহলী পাঠকদের জন্য তারই একটি মাত্র নাম উল্লেখ করছি : হালিম দাদ খানের বাংলাদেশের রাজনীতি ১৯৭২-১৯৭৫ । প্রবাসী সরকার গঠনের কিছুকাল পরে আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির পক্ষ থেকে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের জন্য প্রবল দাবি তােলা হয়। এ-সত্য অস্বীকার করা চলে না যে, তখন “মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ করা হলে আওয়ামী লীগের সুপ্ত উপদলগুলাে প্রকাশ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে এবং নেতারা মুক্তিযুদ্ধের বদলে রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আব্দুস সামাদ আজাদের প্রচেষ্টায় মওলানা (ভাসানী) সাহেব মধ্যস্থতা করতে রাজি হলেন”। এম আর আখতার মুকুল আমি বিজয় দেখেছি বইটিতে লিখেছেন : “সবকটা রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের বৈঠক আহ্বান করা হলাে। যৌথ বৈঠকে মওলানা ভাসানী যুক্তি দেখালেন যে, দখলীকৃত বাংলাদেশে তথাকথিত গভর্নর ডাক্তার মালেক মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও পিডিপি’র পরাজিত সদস্যদের নিয়ে একটা নামকাওয়াস্তে মন্ত্রিসভা বানিয়েছে বলে আমরা গণতন্ত্রের নামে তাঁদের যথার্থ সমালােচনা করেছি। একইভাবে সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে দুই ন্যাপ, ক্যুনিস্ট পার্টি ও জাতীয় কংগ্রেসের সমস্ত প্রার্থী শােচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে বলে তাদের মাঝ থেকে মন্ত্রিসভাকে (সম্প্রসারণের চাপ) থেকে রক্ষা করলেন। তবে একটা সর্বদলীয় (দুই ন্যাপ, ক্যুনিস্ট পার্টি এবং জাতীয় কংগ্রেস সমন্বয়ে) উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হলাে” (২৭/১২৭)। 

 প্রায়শ নানাসূত্রেই মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের অভ্যন্তরীণ নানা টানাপড়েনমতভেদের কথা উল্লেখ করা হয়। এটা কোনাে অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করেই বহুমুখী মত-পথের অনুসারী রাজনীতিবিদেরা আওয়ামী লীগে সমবেত হয়েছিলেন। তাঁদের কেউ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ অনুগামী ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদে আস্থাশীল, কারাে বিশ্বাস ছিল ধর্মাশ্রয়ী জাতিয়তাবাদে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসীরা যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন পুঁজিবাদের সমর্থকরাও। কেউ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ স্বজন, আবার কেউ ছিলেন সুযােগসন্ধানী প্রতিপক্ষও। তাছাড়া, মুক্তিযুদ্ধে যােগ দিয়েছিল আরাে কয়েকটি রাজনৈতিক দলও। এসব কথা মনে রাখলে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সংবেদনশীল মতভিন্নতার কারণগুলাে যেমন উপলব্ধি করা যাবে, তেমনি স্বাধীনতা-উত্তর নানামুখী সঙ্কট-সংঘাত-বিভ্রান্তির কারণগুলি উপলব্ধি করাও সহজ হবে। তবে এতকাল পরেও 

  ২০১ 

  বলা চলে, তাজউদ্দিন-আমীর-উল ইসলাম সেদিন সময়ােচিত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিলম্বিত, এমনকি বিঘ্নিতও হতে পারতাে। আর এ কথাও অনস্বীকার্য যে, প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের সঙ্কটময় সময়ে কখনাে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। 

 এবার মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের কথা। একদিকে যখন সেনাকারাগারে ইয়াহিয়ার নির্দেশিত বিচার চলছে মুজিবকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের লক্ষ্যে, আরেকদিকে তখন পাকিস্তান সরকারের সাথে বাংলাদেশের প্রবাসী-সরকারের সমঝােতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিকল্পিত মার্কিন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করা হয়েছিল। “George Griffith, a junior official in the American Consulate in Calcutta was put in charge of making contacts with Mushtaque Ahmed, the Bangladesh Foregn Minister, for this purpose. আমেরিকানদের ধারণা ছিল, রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে তাজউদ্দিনের বিরােধী হওয়ার কারণে মােশতাক পাকিস্তানের সাথে আপােষ করার ব্যাপারে মার্কিন প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে স্বভাবতই রাজি হবেন (১৭/২২৬-২২৭)। প্রকৃতপক্ষেই এবিষয়ে মার্কিনি ধারণায় কোনাে ভুল ছিল না। 

 মােশতাক বলতে শুরু করলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মুজিবের জীবন রক্ষার বিষয়টিই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি এ কথাও বললেন যে, মুজিবের জীবন আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্যে এখন যেকোনাে একটিকেই বেছে নিতে হবে। সৈয়দ নজরুল কিংবা তাজউদ্দিনের সাথে আলােচনা ছাড়াই মােশতাক এবং সহযােগীরা মার্কিন দূতাবাসের সাথে যােগাযােগ রাখছিলেন। মার্কিন কূটনীতিকরা সকলেই ভারতীয় গােয়েন্দা নজরদারিতে থাকায় এসব যােগাযােগের কথা ভারতীয় কর্তৃপক্ষও জেনে গিয়েছিলেন। “তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে যে সরকার গঠন করা হয়ছিল তারমধ্যে আওয়ামী লীগের নানা লবির লােক ছিল। মুক্তিযুদ্ধের নানা ধারাকে সমন্বিত করতে খুব বেগ পেতে হয়েছিল তাজউদ্দিনকে। মন্ত্রিসভায় এবং প্রশাসনে এমন কিছু লােক ছিল, তাদের আমেরিকার এজেন্ট বলাই সঙ্গত। নেতৃত্বে ছিলেন খন্দকার মােশতাক-মাহবুবুল আলম চাষী প্রমুখ  আমেরিকান লবির সঙ্গে নিয়মিত যােগাযােগ রাখতেন এবং পাকিস্তানের উভয় অংশের কনফেডারেশন করার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন। ভেতরে ভেতরে ভারতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন”(১(৩)/১৪২০-১৪২১)। 

 “ভারতীয় গােয়েন্দারা এ ব্যাপারে তাজউদ্দিনকে জানালে  মােশতাককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি না দিয়ে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিলেন এবং মাহবুবুল আলম চাষীর বিভিন্ন দলিলে সই করার ক্ষমতা তুলে নিয়ে পররাষ্টমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার 

  ২০২ 

  আবুল ফতেহকে প্রদান করেছিলেন। এ নিয়ে তাজউদ্দিন ও খন্দকার মােশতাকের মধ্যে শুরু হয় প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্ব। একদিন মন্ত্রিসভার বৈঠকে মােশতাক বলেন, আমরা যদি কনফেডারেশনে রাজি না হই, তাহলে বঙ্গবন্ধুকে দু চার দিনের মধ্যে হত্যা করা হবে। রাগত স্বরে তাজউদ্দিন বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবন যেমন আমাদের কাছে মূল্যবান, তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাও কম মূল্যবান নয় (১(৩)/১৪২১)। প্রসঙ্গতই স্মরণীয়, ২৫ মার্চ পাক-বাহিনী গণহত্যা শুরুর ঠিক আগেও বঙ্গবন্ধু স্বজনসহকর্মী সবাইকে বলেছেন, পাক-সেনারা যদি তাকে মেরেও ফেলে, তাহলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই। সেই বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি পর্যায়ে, নিজের জীবন বাঁচাতে পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন গঠনে সম্মত হতেন ভাবতে হলে, তার সাহস-ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক আপােষহীনতা সম্পর্কেই বিশ্বাস হারাতে হয়। 

 স্মরণ করা যেতে পারে, ৩১ মে, ১৯৭১ মওলানা ভাসানী এক সাংবাদিক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন : “পশ্চিম পাকিস্তানিদের অমানুষিক অত্যাচারের হাত থেকে বাঙালিদের রক্ষা করার একমাত্র উপায়ই হচ্ছে। বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা। বর্তমান মুহূর্তে দলমত নির্বিশেষে বাঙালি মাত্র সবারই কর্তব্য হচ্ছে জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে সর্বশক্তি নিয়ােগ করা”। ২ জুন তারিখে প্রদত্ত অপর একটি বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশের প্রশ্নে আর কোন মধ্যস্থতার প্রশ্ন উঠে না। যে হানাদাররা লাখ লাখ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে সমগ্র বাংলাদেশে ভয়াবহ রক্তের তাণ্ডবলীলা অব্যাহত রেখেছে, তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক কোন সমাধান করা অবান্তর । আমরা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করবাে। হয় আমরা জিতবাে- না হয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবাে”। এর কাছাকাছি সময়েই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন বলেছিলেন : “লাশের পাহাড়ের নিচে পাকিস্তান নামের দেশটার মৃত্যু হয়েছে” (২৭/১২৯)। 

 লায়ালপুর কারাগারের ট্রাইব্যুনালে ‘দেশদ্রোহিতার অভিযােগে বঙ্গবন্ধুর বিচার শুরুর প্রায় একমাস পরে, ১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের বিখ্যাত ‘লা ফিগারে’ পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাৎকারে ইয়াহিয়া বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব পাকিস্তানের শত্রু। নিক্সন সরকারের কাছে প্রেরিত এক বার্তায় পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন ‘দুর্যোগ সহায়তা কার্যক্রম’এর সমন্বয়কারী মরিস জে উইলিয়ামস্ বলেছিলেন, “ইয়াহিয়ার বিশ্বাস, মুজিব দোষী। (অপরদিকে) বাঙালি বন্ধুরা আমাদের বলেছেন, যদি মুজিবকে হত্যা করা হয়, তাহলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তুদের ঢল নামবে। এই মন্তব্য আমরা ইয়াহিয়াকে জানিয়ে দিয়েছি। ১১ সেপ্টেম্বর নিক্সন সরকার ইয়াহিয়াকে পাঠানাে গােপন বার্তায় লিখেছিল, ‘জীবিত মুজিবের চেয়ে মৃত মুজিব বেশি ভয়ঙ্কর । ১২ ডিসেম্বর, স্টেট ডিপার্টমেন্টের সচিব এল এলিয়ট কিসিঞ্জারের জন্য বড় আকারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করলেন, আমরা পাকিস্তান সরকারের কাছে এটা 

  ২০৩ 

  বলতে পারি যে, বিহারী-বিরােধী সহিংস মনােভাব ছড়িয়ে পড়ায় বাঙালি নেতাদের মধ্যে একজনই আছেন, যিনি তা থামাতে পারেন। তিনি শেখ মুজিব। পাকিস্তানিদের এটা বিবেচনায় নিতে হবে” (২২/১০০-১০১)। 

 মুজিবের প্রাণরক্ষা এবং মুক্তির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমাজের চাপ ক্রমশই বৃদ্ধি পেতে থাকে। “ইয়াহিয়া রাজনীতিক ছিলেন না। কিন্তু ভুট্টো ছিলেন। তিনিও বুঝতে পেরেছিলেন যে, মুজিবকে বিচার করে ফাঁসি দিলে ‘মৃত মুজিব জীবিত মুজিবের থেকেও বেশি প্রভাবশালী হবেন । বাঙালিরা তাহলে পাকিস্তানি সৈন্য ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের একজনকেও জীবিত অবস্থায় ফেরত দেবে না”(২২/১৩১১৩২)। মার্কিন আইনপ্রণেতাদের প্রবল চাপের কারণে ইয়াহিয়া বাধ্য হয়েই মুজিবের প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আভাস দিতে শুরু করেছিলেন। লা মিদ’ পত্রিকা (১৯ অক্টোবর) জানায়, ইয়াহিয়াকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় মুজিবের সাথে আলােচনা করবেন কিনা? ইয়াহিয়া বলেছিলেন, একজন বিদ্রোহীর বিচার শেষে তাকে নির্দোষ ঘােষণা করা না হলে, তিনি তার সাথে কোনাে আলােচনাই করতে পারেন না। বিচারে মুজিবের মৃত্যুদণ্ড হলে তিনি কি তাকে ক্ষমা করতে পারেন, জবাবে ইয়াহিয়া বলেছিলেন, জনগণ চাইলেই তাঁকে মার্জনা করা যেতে পারে। ইয়াহিয়ার বক্তব্যে উৎসাহিত হয়েই, আসগর খান এবং কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজসহ পাকিস্তানের বিশিষ্ট নাগরিকগণ এক যৌথ বিবৃতিতে মুজিবের দ্রুত মুক্তির আবেদন জানিয়েছিলেন। বিশিষ্ট নাগরিকদের আহ্বানকে পাকিস্তান পরিস্থিতির অনুকূল পরিবর্তনের সূচনা বলেই যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনা করেছিল। “What was unthinkable six months ago in West Pakistan, may have become acceptable today – regime could probably survive opening of negotiations with Sheikh Mujibur Rahman provided latter agreed to support united Pakistan” (১৭/২২৯)। 

 বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং এবাবদে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তা ছিল, সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেই এমন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে থাকবে না। এসময় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক রাষ্ট্রদূত প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সহকারী সচিব সিসকোকে বলেছিলেন, ‘মুজিবের সাথে আলােচনার মাধ্যমে এখনাে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংহতি রক্ষার করা যেতে পারে। কিন্তু আগা খান মুজিবের সাথে আলােচনার ব্যাপারে ইয়াহিয়াকে সম্মত করতে পারেননি। ইয়াহিয়ার আশঙ্কা ছিল, মুজিবের সাথে আলােচনার কোনাে উদ্যোগই সামরিক বাহিনী সমর্থন করবে না। মােটামুটি এসময়টাতেই ভারতের 

  ২০৪ 

  কূটনীতিবিদ ডি.পি. ধর মার্কিন সহ-সচিব সিসকোকে বলেছিলেন, মুজিবের সাথে আলােচনায় যদি কিছুমাত্র অগ্রগতিও হয়, “India might accept the UN Secretary General s good offices” (১৭/২২৯)। 

 “নভেম্বর মাসের শেষ দিক থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শুরু হয়েছিল অঘােষিত যুদ্ধ। এক দিকে পাকিস্তান যেমন একটা যুদ্ধ শুরু করতে চাইছিলাে, অন্যদিকে ভারতও বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্তে গােলাগুলি করে এবং মুক্তিবাহিনীর সাহায্যে হামলা করে পাকিস্তানকে যুদ্ধ শুরু করার জন্যে উস্কানি দিচ্ছিলাে। ভারতপাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তেও উত্তেজনা দেখা দিয়েছিলাে। তবে ভারত কিছুতেই আগে আক্রমণ করতে চাইছিলাে না। পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু করে তেসরা ডিসেম্বর। যুদ্ধ ঘােষণা না-করেই পাকিস্তান পশ্চিম সীমান্তে কয়েকটি বিমান ঘাঁটির ওপর হামলা চালায়। এদিন ইন্দিরা গান্ধী ভাষণ দিতে এসেছিলেন কলকাতায়। আক্রমণের সংবাদ শুনে তিনি দ্রুত ফিরে যান দিল্লিতে। রাত ১২টা ৪০মিনিটের সময় তিনি বেতার ভাষণ দেন। পাকিস্তানের আক্রমণের কথা উল্লেখ করেন। তারপর সরাসরি যুদ্ধ ঘােষণা না করেই বলেন যে, দেশকে তিনি যুদ্ধাবস্থায় রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। পরের দিন (৪ ডিসেম্বর) থেকে আরম্ভ হলাে ভারত-পকিস্তান। সম্মুখ যুদ্ধ, বাঙালিরা যার প্রতীক্ষা করছিল ন মাস ধরে”(২/১৪২-১৪৪)। 

 “পাকিস্তানি বাহিনী ছিলাে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। সৈন্যসংখ্যাও কম ছিলাে না। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানিরা যে হেরে যায়, তার অনেকগুলাে কারণ ছিলাে। যেমন, তারা ভেবেছিলাে যে, শুধুমাত্র গায়ের জোরে তারা বাঙালিদের শাসন করবে। ভেবেছিলাে কিছু বাঙালি দালাল থাকলেই চলবে। হাজার হাজার দালাল তারা জোটাতেও পেরেছিলাে। রাজাকার, আল-বদর এবং আল-শামস। অপর পক্ষে, মুক্তিযােদ্ধাদের আন্তরিক সমর্থন ও সাহায্য দিয়েছিলেন কোটি কোটি বাঙালি।  মিত্রবাহিনী যাতে ঢাকার দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে না পারে, তার জন্যে। অনেক জায়গায় সেতু উড়িয়ে দিয়েছিলাে পাকিস্তানিরা।  কিন্তু সব জায়গাতেই সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসেন যার যা কিছু আছে’ (বঙ্গবন্ধুর আহ্বান স্মরণীয়) তাই নিয়ে মিত্রবাহিনীকে সাহায্য করার জন্যে। এর উল্টো দৃষ্টান্ত  সিদ্দিক সালিক লিখেছেন যে, ময়মনসিংহ থেকে টাঙ্গাইল হয়ে যখন পাকিস্তানিরা ঢাকার দিকে যাত্রা করে, তখন গ্রামবাসীরা তাদের পানিও খেতে দেয়নি” (২/১৪৫-১৪৬)। 

 ৭ ডিসেম্বর,১৯৭১-এ মাইজদী কোর্ট এলাকার যুদ্ধ পরিস্থিতির বর্ণনায় জাপানি রেডক্রস কর্মী হুকিউরা লিখেছেন, “আমাদের অফিসের অদূরে রেলওয়ে স্টেশন। পাকিস্তানি সেনারা তাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছিল স্টেশনটি। মিত্রবাহিনীর আক্রমণের মুখে সেদিন দুপুরের আগে তার পতন ঘটল। ১২০জনের মত সেনা ও 

  ২০৫ 

  রাজাকার মাথায় হাত তুলে সারিবদ্ধ হয়ে ঘাঁটির বাইরে আসছে। মুক্তিযােদ্ধারা দুইপাশে দাঁড়িয়ে আত্মসমর্পণকারীদের দেহ তল্লাশি করছেন। একজন মুক্তিযােদ্ধা বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে সামনে এগিয়ে এলেন। সবাই একসঙ্গে গাইতে শুরু করলেন আমার সােনার বাংলা  কমান্ডার আকাশের দিকে মুঠো তুলে গলা উঁচিয়ে বলে উঠলেন ‘জয় বাংলা । তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সবাই বলে উঠলেন ‘জয় বাংলা’। তাঁরা যত চিৎকার করছেন সবাই তত উফুল্ল হয়ে উঠছেন। আমার দেশ, তােমার দেশ বাংলাদেশ, বাংলদেশ। কমান্ডারের পরবর্তী উচ্চারণ আমার নেতা, তােমার নেতা - সমবেত কণ্ঠে উত্তর ‘শেখ মুজিব, শেখ মুজিব”(৩২/১০২)। এটা একদিনের একটি স্থানের যুদ্ধের পরিস্থিতি হলেও এ কথাই সত্য যে, মুক্তিযুদ্ধের সারাটা সময়জুড়ে হাজার হাজার কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-যুবক মুক্তিযােদ্ধাদের প্রাণে প্রাণে আবেগে-শ্রদ্ধায়-ভালােবাসায় বঙ্গবন্ধু মুজিবই ছিলেন সকল বল-ভরসাসাহসের প্রধানতম উৎস। 

 প্রবাসী সরকার গঠিত হয়েছিল ‘মুজিব নগরে বঙ্গবন্ধুর নামে, তাঁকেই ‘অনুপস্থিত রাষ্ট্রপতি ঘােষণা করে। তাজউদ্দিনের প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিরােধিতা করছিলেন যে তরুণ ছাত্র-যুব নেতৃবৃন্দ, তাঁরাও নিজেদেরকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সবিশেষ অনুগত বলে দাবি করতেন। খন্দকার মােশতাক বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেয়ে বড় করে সামনে এনেছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রাণরক্ষার বিষয়টি। আর ভারত সরকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ব্যাখ্যায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বঙ্গবন্ধুকেই উপস্থাপন করছিলেন রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধ অধিকারী হিসেবে। বিশ্বশক্তিধর দেশগুলির যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নির্মোহ থাকেননি, আদর্শের প্রশ্নে কিংবা আপন রাষ্ট্রীয় স্বার্থ-চিন্তায় তারাও পরিকল্পনা সাজাতেন মুজিবকেই কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে। প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের ময়দানে মুক্তিযােদ্ধারা স্লোগান দিতেন, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে। অর্থাৎ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে জড়িত, দেশি-বিদেশি সকল পক্ষের কাছে বঙ্গবন্ধুই ছিলেন প্রধান বিবেচ্য বা মৌলিক প্রেরণা-পরিকল্পনার উৎস। আর এরকম বিভিন্ন দিক থেকেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর শারীরিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও, শুরু থেকে শেষ পর্যন্তই ছিল বঙ্গবন্ধুময়। 

  ২০৬ 

  মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী বাংলাদেশ : 

 বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন 

 “বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ২০শে ডিসেম্বর ভুট্টো হন প্রেসিডেন্ট। ২১শে ডিসেম্বর তিনি ঘােষণা করেন যে, শেখ মুজিবকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে গৃহবন্দি করা হবে। বাংলাদেশের লােকেরা তখনও জানতেন না,জাতির জনককে ছেড়ে দেওয়া হবে কিনা, যুদ্ধের শেষে দেশে যে-বিশৃঙ্খলা এবং আইনের প্রতি অবজ্ঞা দেখা দেয়, তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নেবার (জন্য) সত্যি সত্যি দরকার ছিলাে হয় একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের অথবা শেখ মুজিবের মতাে একজন প্রভাবশালী নেতা এবং ফাদার ফিগার’এর। অর্থাৎ এমন একজন নেতার, যাকে সবাই পিতার মত মেনে নেবে” (২/১৭৮-১৮০)। 

 ২৭ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর বন্দিশালায় ভুট্টো গােপনে দেখা করলেন। ভুট্টোকে দেখে আকস্মিক বিস্ময়ে বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন, “আরেকটা দুর্যোগ বােধ হয় নেমে এসেছে। বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে এলেন? ভুট্টো বললেন, আমি এখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট । আমার বাংলার অবস্থা কী? খুবই বিচলিত হয়ে আছি। ভুট্টো বললেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী সােভিয়েত নৌ এবং বিমানবাহিনীর সাহায্য নিয়ে ঢাকা দখল করে নিয়েছে। উদ্বিগ্ন বঙ্গবন্ধু, তার মানে ওরা আমার লােকদের হত্যা করছে। আপনি আমাকে দ্রুত ঢাকায় যাবার বন্দোবস্ত করুন। বঙ্গবন্ধুর কাছে। জানতে চাইলেন ভুট্টো, ‘পাকিস্তান ও বাংলদেশের মধ্যে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনে আপনার সাহায্য দরকার, আমরা একসঙ্গে থাকব, তার কি কোনাে সম্ভাবনা নাই’? বঙ্গবন্ধু বললেন, আমার জনগণের সঙ্গে কথা না বলে আমি কোনাে প্রতিশ্রুতি দিতে পারবাে না। আমি আগে ফিরে যাই, তারপর আপনার সঙ্গে কথা বলব”(২২/১০৪)। ৭ জানুয়ারি, ১৯৭২ ভুট্টো আবার সাক্ষাৎ করলেন বঙ্গবন্ধুর সাথে, মূল উদ্দেশ্য, “টুকরাে হওয়া পাকিস্তানকে একসঙ্গে করে দেশের ত্রাণকর্তা হওয়া। ভুট্টো বললেন, 

  ২০৭ 

  দুই দেশের মধ্যে কনফেডারেশনের ব্যবস্থা কি করা যায় না? বঙ্গবন্ধু বললেন, না, তা আর কোনাে দিনই সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় অতিথিশালায় (ভুট্টোর ৪৪তম জন্মদিনের) নৈশভােজে যােগ দিলেন ভুট্টো। আমি যেকোনাে মুহূর্তে ঢাকায় যেতে প্রস্তুত’   ভুট্টো এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বললেন, না, না। ভুট্টো বুঝলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করে লাভ হবে না। নৈশভােজ শেষে হাত খরচ হিসেবে ৫০হাজার ডলার দেওয়ার চেষ্টা করলে বঙ্গবন্ধু বললেন, টাকাটা আমার বিশেষ বিমান খরচ বাবদ রেখে দিন”(২২/১০৪-১০৫)। 

 “Mujib s arrival in London without prior notice was planned by Bhutto so that the event would not be well-publicised beforehand and Mujib would have a quiet, not a warm, public reception” (১৭/২৫৯)। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব “পাকিস্তান থেকে ছাড়া পান ৭ই জানুয়ারি ভাের রাতে অর্থাৎ ৮ই জানুয়ারি খুব ভােরে। রাত তিনটের সময় কামাল হােসেন এবং তাঁকে ভুট্টো বিমানে তুলে দেন। সকাল সাড়ে ছ টায় তারা এসে নামেন লন্ডনের হিথরাে বিমানবন্দরে (২/১৮০)। “৮জানুয়ারি, ১৯৭১। বিবিসি’র শব্দতরঙ্গে ভেসে আসছে, বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডনে পৌঁছে গেছেন’। ব্রিটিশ পুলিশ বঙ্গবন্ধুকে স্যালুট দিয়ে বললেন, স্যার, উই হ্যাভ বিন ওয়েটিং ফর ইউ’। বঙ্গবন্ধু বললেন, “দেখতেই পাচ্ছেন! আমি বেঁচে আছি” (২২/১০৫)। একান্ত দ্রুততার সাথেই হিথরাে বিমানবন্দরের ডিউটি অফিসার লন্ডনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া ডেস্কের প্রধান, সাদারল্যান্ডকে খবর দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি পৌছার আগেই বঙ্গবন্ধুর বিমানটি অবতরণ করেছিল। ততক্ষণে ডিউটি অফিসার বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুর জন্য একটি ভিআইপি-রুম বন্দোবস্ত করে কয়েকজন কর্মীকে বঙ্গবন্ধুর দেখাশােনায় নিয়ােজিত করে ফেলেছেন। 

 বঙ্গবন্ধু নিজেই বিমানবন্দর থেকে টেলিফোন করে লন্ডনে বাংলাদেশ মিশন-প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) রেজাউল করিমকে বললেন, “Rezaul Karim, this is Sheikh Mujib । অনতিবিলম্বেই সেখানে পৌঁছে গেলেন যুক্তরাজ্য বিদেশ মন্ত্রকের আয়ান সাদারল্যান্ড এবং রেজাউল করিম। লন্ডনে বঙ্গবন্ধু থাকার ব্যবস্থা করা হলাে বিখ্যাত ক্লারিজেস হােটেলে। বিগত নয় মাসের কোনাে খবরই জানা না থাকায় বঙ্গবন্ধু স্বভাবতই চরম উদ্বিগ্ন ছিলেন। দেশের কথা জানার জন্য, রেজাউল করিমের গাড়িতেই বঙ্গবন্ধু হােটেলে রওনা হলেন। আর ব্রিটিশ সরকারের দেয়া লিমুজিনটি ব্যবহার করতে দিলেন ড. কামাল ও তাঁর পরিবারকে। পথে যেতে যেতে, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলী সম্পর্কে রেজাউল করিমের বর্ণনা শুনতে শুনতে বিস্মিত-বিমূঢ় বঙ্গবন্ধু বারবারই বলছিলেন, “আমরা তাহলে সত্যি স্বাধীন হয়েছি ! 

  ২০৮ 

  বঙ্গবন্ধুর লন্ডনে আগমনের কথা জেনেই রেজাউল করিম খবরটা দিয়েছিলেন দ্বিতীয় সচিব মহিউদ্দিন আহমদকে। উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরই লন্ডনের পাকিস্তান মিশনের দ্বিতীয় সচিব মহিউদ্দিন আহমদ চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সাথে যােগ দিয়েছিলেন। “বিমান বন্দরের আলকক অ্যান্ড ব্রাউন ভিভিআইপি সুইটে মহিউদ্দিন আহমদ যখন প্রথম বঙ্গবন্ধুকে দেখলেন, তার চোখ দিয়ে অঝােরে পানি পড়তে থাকে। বঙ্গবন্ধু সেটি লক্ষ্য করে মধুকে (মহিউদ্দিন আহমদের ডাক নাম) বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলেছিলেন, ‘ভয় নেই, আমি এসে গেছি । রশীদ হায়দারের ‘মহানায়ক ফিরলেন (প্রথম আলাে’, ১৮জানু, ২০০৫) থেকে তথ্যটি উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গােলাম রহমান মন্তব্য করেছেন, “কত বড় মাপের মানুষ হলে সামান্য একজন দ্বিতীয় সচিবকে অমন আদর করতে পারেন, অভয় দিতে পারেন” (১(১)/৪৬২)। আমি নিজেও মহিউদ্দিন আহমদের কাছেই ঘটনাটি শুনেছি। আমার মনে হয়েছে, ‘ছােট্ট’ এ ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর আত্মবিশ্বাস এবং দেশের মানুষের প্রতি পিতৃসুলভ স্নেহের আন্তরিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। 

 “Among the early visitors was Anthony Mascarenhas, the Pakistani journalist of Goanese origin, whose expose  of attrocities committed by Pakistani troops in East Bengal in the  Sunday Times  created a worldwide sensation. He was personally known to Mujib Mujib wanted to reward Mascarenhas for his valuable service to the cause of the liberation struggle, for he confided to him :  I have a big scoop for you. We are going to keep some link with Pakistan but I can t say anything more till I have talked it over with others .don t write anything till I tell you . Mascarenhas tried to tell Mujib that this was a preposterous thought after what had happened in East Bengal .Mujib s re-education had begun, in the words of Mascarenhas” (১৭/২৬০-২৬১)। 

 ঢাকা থেকে লন্ডনের ক্ল্যারিজেস হােটেলে ফোনে কথা বললেন “সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, বেগম মুজিব। ভারতের লক্ষ্ণৌ থেকে ফোন করলেন ইন্দিরা গান্ধী। দীর্ঘক্ষণ দুজনের কথা হলাে”(২২/১০৫-১০৬)। বঙ্গবন্ধু টেলিফোনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডােয়ার্ড হিথের সাথে কথা বললেন। “Edward Heath cut short his weekend at the Chequers and returned to his official residence at No. 10 Downing Street to receive Mujib. The Commonwealth Secretary-General Arnold Smith called on him as the leader of a potential member of the Commonwealth. Prime Minister Heath left no doubt in 

  ২০৯ 

  Mujib s mind that Britain entertained friendly feelings towards Bangladesh and would accord recognition as soon as it was perceived to be firmly in control. Meanwhile the British government put a Royal Air Force jet at his disposal to fly him to Dhaka” (১৭/২৬১)। 

 “দেশ-বিদেশের বহু সাংবাদিক সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশের এই বিপ্লবী নেতার বক্তব্য শােনার জন্য ক্ল্যারিজেস হােটেলে ভিড় জমান। বঙ্গবন্ধু একটি লিখিত বক্তব্য পেশ করলেন। তিনি বলেন,  এক মুহূর্তের জন্যও আমি বাংলাদেশের কথা ভুলিনি। আমি জানতাম তারা আমাকে হত্যা করবে। কিন্তু আমার জনগণ মুক্তি অর্জন করবে। এ সম্বন্ধে আমার মনে কোনাে সন্দেহ ছিল না। সাংবাদিক সম্মেলনের পর বহু লােকের ভিড়ের মধ্য থেকে একজন বললেন, ‘যুদ্ধ-বিগ্রহের শেষে আমাদের উপমহাদেশেই বসবাস করতে হবে। কাজেই পাকিস্তানের সঙ্গে একটা সহযােগিতার ভাব রেখে আমাদের চলা উচিত। বঙ্গবন্ধু বললেন : ‘পাকিস্তানের সঙ্গে কোনাে আপস হতে পারে না। আমাদের স্বাধীনতা সম্পর্কে দর কষাকষির কথাই ওঠে না। আমরা পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করেছি। পাকিস্তান আমার কাছে অন্য যে-কোন একটা দেশের মতাে। ২৫ মার্চ (১৯৭১) পাকিস্তান একটি জাতি হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছে এবং আমার জনগণ বীরের মত যুদ্ধ করেছে। সর্বস্ব বিসর্জন দিয়েছে। আমি কখনাে তাদের অসম্মান করবাে না; এমনকি আমার জীবন দিয়ে হলেও আমি এই প্রতিশ্রুতি পালন করবাে”(১(৩)/১৬৮৮)। 

 লন্ডনে সকলেই ধারণা করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু লন্ডন থেকে সােজা ফিরে যাবেন ঢাকায়, “কিন্তু সবাইকে অবাক করে বঙ্গবন্ধু জানালেন, তিনি প্রথমে যাবেন দিল্লি, তারপর ঢাকায়”। বিশিষ্ট সংস্কৃতি-কর্মী গােলাম কুদ্ছ যথার্থই লিখেছেন, “স্বভাবতই একটি প্রশ্ন এসে যায়, প্রথমে তিনি ঢাকা না এসে দিল্লি গেলেন কেন? এখানেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা এবং অসীম দেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে তিনি দেখেছেন যে, বন্ধুত্ব আর মিত্রতার সুযােগ নিয়ে বহু দেশের সেনাবাহিনী আর ফিরে যায়নি। বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে নিয়ে কোনাে শঙ্কার মধ্যে থাকতে চাননি। নতুন করে কেউ যাতে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে চক্রান্তের জাল বুনতে না পারে তার জন্যে সর্বাগ্রে প্রয়ােজন ছিল ভারতীয় মিত্রবাহিনীর প্রত্যাবর্তন।  প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে প্রথম সাক্ষাতেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সর্বাত্মক সহযােগিতা প্রদানের জন্য ভারত সরকার এবং সে দেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট তারিখ জানতে চাইলেন। ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞায় অভিভূত হয়ে গেলেন। জানালেন 

  ২১০ 

  ১৭ মার্চ থেকেই ভারতীয় মিত্রবাহিনী প্রত্যাহারের কাজ শুরু হবে এবং ভারতীয় জনগণের পক্ষ থেকে এটিই হবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি জন্মদিনের শুভেচ্ছা। ইন্দিরা গান্ধী তাঁর কথা রেখেছিলেন” (১(২)/১০৯৮)। ভারতীয় মিত্রবাহিনী যথাসময়েই বাংলাদেশ ছেড়ে গিয়েছিল। 

 ১০ জানুয়ারি, সকাল ৮টা ১০মিনিটে বঙ্গবন্ধু নামলেন দিল্লি বিমানবন্দরে। “রাস্তায় রাস্তায় তখন ভারত-বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। অভিবাদন জানাতে দাঁড়িয়ে আছেন রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, মন্ত্রিসভার সদস্য, কূটনীতিক, সাংবাদিকসহ অনেকে। বিমান থেকে বেড়িয়ে সিঁড়িতে পা দিয়েই বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করলেন অগ্নিমন্ত্রের ধ্বনি, ‘জয় বাংলা । বিমানবন্দরের পাশে বিশাল মাঠে বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা করলেন। লাখ লাখ মানুষ একনজর দেখতে এসেছেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমি আমার স্বপ্নের সােনার বাংলায় ফিরে। যাচ্ছি। সেখানে গিয়ে আমি দেখতে পাব লক্ষ লক্ষ মানুষের বিজয়ের হাসি। আমি মুক্ত, স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছি। বঙ্গবন্ধু ‘জয় হিন্দ’ ধ্বনি দিয়ে বক্তৃতা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী বললেন, ‘জয় বাংলা’। অনুষ্ঠানের আচরণ স্পষ্ট করল, এ কোনাে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান নয়, পারিবারিক বন্ধুত্ব” (২২/১০৭)। 

 ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ বেলা প্রায় আড়াইটায় বিমান নামলাে ঢাকায়, পাকিস্তানি সেনাকারাগারে মৃত্যুর অপেক্ষাধীন বন্দিজীবন কাটিয়ে স্বাধীন স্বদেশে ফিরে এলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চারদিকে উল্লাস। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান। সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ। কাঁদলেন। কাঁদালেন। অনেকদিন পর সেই ভরাট কণ্ঠস্বর, ‘আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার সােনার বাংলা আজ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মুক্তিযােদ্ধা ও জনতার উদ্দেশ্যে জানাই সালাম। ইয়াহিয়া খানের কারাগারে মৃত্যুর জন্য আমি প্রস্তুতও ছিলাম, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যে মুক্ত হবে, এবিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনাে দেশের মুক্তি সংগ্রামে এত লােকের প্রাণহানির নজির নাই। আমার মা-বােনদের ইজ্জত লুণ্ঠন করে তারা জঘন্য বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে। সােনার বাংলার অসংখ্য গ্রাম পুড়িয়ে তারা ছারখার করে দিয়েছে” (২২/১০৮)। 

 পরের দিন “তাজউদ্দিনের সঙ্গে তাঁর সংক্ষিপ্ত আলাপ হয় সরকার গঠন সম্পর্কে। কিন্তু তিনি তাজউদ্দিনের কাছে একবারও জানতে চাননি, ন’ মাস মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে চলেছিলাে। জানতে চাননি নির্বাসিত সরকারের কথা এবং মুক্তিযােদ্ধাদের ভূমিকার কথা (জোহরা তাজুদ্দিনের সাক্ষাৎকার’; মতিউর রহমান, ২০০৪)। তিনি দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ এবং সব সংবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর হঠাৎ জেগে উঠেছিলেন বাস্তবতার আলােতে। কিন্তু ন মাস কী ঘটেছিলাে, নির্ভরযােগ্য সূত্র থেকে তিনি তা 

  ২১১ 

  শুনতে চাননি। তিনি সম্ভবত ভাবেন যে, যারা যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা সমস্তটা কৃতিতু নিজেরাই দাবি করছেন। এ ছিলাে তাঁর ভ্রান্ত ধারণা। কারণ, যােদ্ধারা একত্রিত হয়েছিলেন তাঁরই নামে, তারই আহ্বানে” (২/১৮১-১৮২)। “Nothing significant in history is achieved without paying a price. It had been a long struggle and Mujib personally had paid a heavy price for leading his people to emancipation, to freedom  His greater challenge was now ahead of him : How to transform a liberated Bangladesh in ruins into a Sonar Bangla of his dreams” (397240) 

 “জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১১ই জানুয়ারি অস্থায়ী সাংবিধানিক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে তিনি আওয়ামী লীগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। ১২ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ২৩ সদস্য বিশিষ্ট আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী (২১/৪২)। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে বঙ্গবন্ধুর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী (প্রবাসী সরকারের) সপরিবারে এসেছেন। তিনি সবার সঙ্গে প্রাণখােলা হাসি দিয়ে কথা বলছেন। আমরা সবাই অবাক হয়ে তাকে লক্ষ্য করছি। অনুষ্ঠানের পর তিনি সাংবাদিকদের বললেন, “আজ আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। নেতার অনুপস্থিতিতে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে জড়িত থেকে দেশ স্বাধীন করেছি। আবার নেতাকে মুক্ত করে, তাঁরই হাতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার তুলে দিয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। অন্তত ইতিহাসের পাতার এক কোণায় আমার নামটা লেখা থাকবে” (২৭/১২৮)। 

  ২১২ 

  বাংলাদেশ ১৯৭২-১৯৭৫: 

 সর্বগ্রাসী অনটন-ষড়যন্ত্র-অনাচার 

  বাংলাদেশ-সুহৃদ অন্নদাশঙ্কর রায়, ১৯৭২- ৭৫ সময়কালের মধ্যে তিনবার এসেছিলেন বাংলাদেশে। দেখেছিলেন বাংলাদেশের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া, দু’বার সাক্ষাতে আলােচনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু মুজিবের সাথে। তাঁর নিবন্ধ কাদো, প্রিয় দেশ  থেকে কিছু প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের মুক্তির পর তার দুহতম সমস্যা হলাে অস্ত্র সমর্পণে অনিচ্ছুক বিভিন্ন গােষ্ঠীর দ্বারা অনুষ্ঠিত গুপ্তহত্যা। এদের কেউ বা পাকিস্তানপন্থী রাজাকার, কেউ বা চীনপন্থী নকশাল। কেউবা স্বদেশপ্রেমিক, অথচ সমাজবিপ্লবী মুক্তিযােদ্ধা। কেউবা মুক্তিযােদ্ধা থেকে ডাকাত। পুলিশ দুর্বল, সৈন্যদল দুর্বল, সিভিল সার্ভিস দুর্বল। শত্রুরাষ্ট্র পাকিস্তানের চক্রান্ত সমানে চলছে। সরকার ধরপাকড় করতে গেলেই রব ওঠে ভারতের স্বার্থেই দেশবাসীকে নিরস্ত্র করা হচ্ছে। আমার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্যে একজন সাংবাদিক এসেছিলেন। তাঁর প্রশ্নের উত্তরে বলি, শেখ সাহেব অত্যন্ত দয়ালু মানুষ। কড়া হাতে শাসন করা তাঁর স্বভাবে নেই। মনে হলাে, সাংবাদিকেরও সেইরূপ ধারণা। সকলেই বুঝতে পারছিল যে, শেখ সাহেব হালে পানি পাচ্ছেন না। কিন্তু তিনি ভিন্ন আর কে হাল ধরতে পারেন?” (১(১)/৩৫-৩৬)। 

 বঙ্গবন্ধু “কথায় কথায় বলেন  আমার কাজ সারা হয়েছে। আমি আর থাকতে চাইনে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াব। দু লাখ লােক আমার সঙ্গে ঘুরবে। কিন্তু আমাকে যেতে দিচ্ছে কে? আমাকে আটকে রেখেছে ওই যাদের দেখছেন ওরাই’-আঙ্গুল দিয়ে দেখান তাঁর দলের চাইদের কয়েকজনকে। কোনাে নেতাই স্বয়ংসিদ্ধ নন। প্রত্যেকেরই একটা দল থাকে, দলের চাই থাকে। তাদের তিনি নাচান। তাকেও তারা নাচায়। সেদিন আমার সত্যি বিশ্বাস হলাে যে-কাজের জন্যে মুজিব এসেছিলেন, সে-কাজ সারা হয়েছে। দেশকে তিনি মুক্ত করে দিয়েছেন। তাকে শাসন করবে অন্য কেউ। গ্যারিবালডির পর যেমন কাভুর। কিন্তু বাংলাদেশের 

  ২১৩ 

  কাভুরটি কোথায়? তার ধারে কাছে দাঁড়াতে পারেন, এমন একজনও কি আছেন?”(১(১)/৩৬)। 

 বঙ্গবন্ধুকে উপলব্ধির জন্যই এখানে স্মরণ করছি, পাকিস্তানের বন্দিশালা থেকে ঢাকা ফেরার পথে লন্ডন বিমানবন্দরে তাকে সর্বদলীয় সরকার গঠনের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন পেয়ে সারা দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জীবিত আছে, তারা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা সরকার গঠন করবে। কিন্তু তােমরা যদি চাও অন্যরাও সরকারে যােগ দেবে, তা হলে সেই সুযােগ আমি দেবাে। ইলেকশন করা হােক, তােমরা দেশে আসাে, দেশের জন্য কাজ কর। আমাকে তােমরা ছেড়ে দাও, সরকার ওরাই গঠন করবে। আমি যেয়ে বাগিয়ার নদীতে ছাতা মাথায় দিয়ে মাছ ধরবাে। তােমরা একটা স্বাধীন দেশে এখন বসবাস করছে। এরপর তােমাদের আর কিছু আমার দেওয়ার নেই। তােমরা অনেক সুযােগ পাবে এবং আমি তােমাদেরকে সেই সুযােগ দেবাে, অঙ্গীকার করছি” (১(৩)/১৬৮৯)। অর্থাৎ এ কথাই বিশ্বাসযােগ্য যে, বঙ্গবন্ধু ক্ষমতা-লীলায় নয়, বরং পরিস্থিতির কারণেই রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে নিয়েছিলেন। 

 আবার ফেরা যাক শ্রী অন্নদা শঙ্কর রায়ের পর্যবেক্ষণমূলক বর্ণনায়। ১৯৭৫ র জুন মাসে ”ভুট্টো সাহেব আসেন ঢাকা সন্দর্শনে। তাঁর ভক্তসংখ্যা অগণ্য। তাঁরা তাঁকে রাজকীয় সংবর্ধনা জানান। যেন তিনিই বাংলাদেশের বিদেশী রাজা, শেখ সাহেব তুষ্ট হলেন কি রুষ্ট হলেন বােঝা শক্ত। তবে ওঁর ওই এক কথা। আগে বাংলাদেশের পাওনা অ্যাসেটস্ মিটিয়ে দিতে হবে আর পাকিস্তানি নাগরিকদের সরিয়ে নিতে হবে। ভুট্টো পাশ কাটাতে চেষ্টা করেন। শেখ সাহেব নাছােড়বান্দা। ভুট্টো হাসিমুখে এসেছিলেন, বিষন্নমুখে ফিরে গেলেন। অ্যাসেটসের শতকরা পঞ্চান্নভাগ চাই, যেহেতু অবিভক্ত পাকিস্তানে শতকরা পঞ্চান্নভাগ ছিল বাঙালি। যতই দিন যায় ততই শেখ সাহেবের বার্গেনিং পাওয়ার কমে আর ভুট্টো সাহেবের বাড়ে। যুদ্ধ জেতা আর সন্ধি জেতা এক জিনিস নয়। পাকিস্তানিরা যুদ্ধে হেরে যাওয়ার গ্লানি ভােলেনি। সন্ধিতে জিতে এখন তারা প্রতিশােধ নিতে চায়। শেখ সাহেবের বিরােধীপক্ষ তার ওপর চাপ দেয় যে, আর্থিক দুর্গতি থেকে বাঁচতে হলে বাংলাদেশকেই শর্তগুলাে নরম করতে হবে। কিন্তু শেখ সাহেবের ওই এক কথা। জীবনে কখনাে তিনি কারাে কাছে নত হননি। বাংলাদেশ সবদিক থেকে বড়াে” (১(১)/৩৭-৩৮)। এখানে প্রসঙ্গতই সেই সকরুণ বৈপরিত্রে দৃশ্যপট স্মরণ করা দরকার। “একাত্তরের মার্চে ঢাকায় জনপ্রিয় স্লোগান ছিল ‘ভুট্টোর বুকে লাথি মারাে   বাংলাদেশ স্বাধীন করাে । সেই ভুট্টো স্বাধীন বাংলায় বিপুল সংবর্ধনা লাভ করেন পঁচাত্তরের জুনে। দু’এক স্থানে পাকিস্তান জিন্দাবাদ  স্লোগান ওঠে বলেও শােনা যায়” (৩১/৫৩)। 

  ২১৪ 

  “আমরা অবাক হয়ে দেখি, বাংলাদেশের সংবিধান সংশােধিত (চতুর্থ সংশােধনী, বাকশাল, ১৯৭৫) হয়েছে। শেখ সাহেব স্বয়ং হলেন প্রেসিডেন্ট। নিজের হাতে রাখলেন দেশরক্ষা বিভাগ। সৈন্যদলটি আকারে ক্ষুদ্র হলেও তাতে তিনটি পরস্পরবিরােধী উপাদান। অভিজ্ঞ অফিসার যাঁরা, তাঁরা পাকিস্তানে আটকা পড়েছিলেন কেউ কেউ পাকিস্তানের সহযােগীও ছিলেন। তাঁদের চেয়ে কম অভিজ্ঞতা যাঁদের, তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে যােগ দিয়ে আরেক রকম অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন, সেটি বিদ্রোহের অভিজ্ঞতা। অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ তরুণরা দেশের স্বাধীনতার পর কমিশন পেয়েছেন, ইতিপূর্বে হয়তাে মুক্তিবাহিনীতে লড়েছেন। এই তিন শ্রেণীর মধ্যে .এমন প্রশ্নও তাে উঠতে পারে, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা কার কত বেশি? কে কতটা ধর্মপ্রাণ,  কে কতটা দেশভক্ত?  গণতন্ত্রের গণেশ ওল্টালে কার মনে হর্ষ, কার মনে বিষাদ ” (১(১)/৩৮-৩৯)। 

 “শেখ সাহেব দেশরক্ষার দফতর আপনার হাতে রেখে সংবিধানের মূলসূত্রগুলি সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। বাইরে থেকে আক্রমণের আশঙ্কা ছিল না। ভিতর থেকেই বিপর্যয়ের আশঙ্কা ছিল। পাকিস্তানি পঞ্চম বাহিনী সর্বক্ষণ সক্রিয়। টানপন্থীরাও কতক অঞ্চলে তৎপর। যাদের সেভাবে চিহ্নিত করা যায় না, তাদের হাতেও প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও তাদের মেজাজটাও ধ্বংসপ্রবণ। মাঝখানে তিনি পার্টির সওাপতিত্ব পালান্তরিত করে নিঃশ্বাস ফেলবার অবকাশ পেয়েছিলেন। কিন্তু সংবিধান সংশোধনের পর তিনিই হন একাধারে রাষ্ট্রপতি তথা দলপতি। দলটিও হয় দেশের এক ও অদ্বিতীয় দল। অন্য দলগুলােকে ভেঙ্গে তাদের সদস্যদের ডাক দেওয়া হয় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগে(বাকশাল) যােগদান করতে। মহানুভবতার পরিচায়ক সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই সঙ্গে নির্বুদ্ধিতারও। বাইরে থেকে যারা যােগ দিতে আসবে,তারা যে তাদের আপন আপন মতবাদ ভুলে যাবে তা নয়। দলের ভিতরে উঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরােবে”(১(১)/৩৯-৪০)। 

 “পনেরােই আগস্ট (১৯৭৫) প্রত্যুষে মুজিব পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর বহু আত্মীয়স্বজনকেও। এর নাম ক্রাইম এগেনস্ট হিউমানিটি। তারপর দোসরা নভেম্বর মধ্যরাত্রির পরে কারাগারে প্রবেশ করে বন্দি অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে যাদের, তাঁরা মুজিবের বিশ্বস্ত সহকর্মী তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল  ইসলাম, মনসুর আলী, কামারুজ্জামান। এর নাম ক্রাইম অব দ্য সেঞ্চুরি। গােটা বঙ্গোপসাগরের জল দিয়ে এই রক্ত মুছে সাফ করা যাবে না”(১(১)/৪৪)। অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখা থেকে বাংলাদেশের ১৯৭২- ৭৫ খ্রি. সময়কালের একটা দৃশ্যমান রাজনৈতিক ভাষ্য এবং এরই প্রান্ত-পরিণামে মুজিব-হত্যা এবং জেলহত্যাকাণ্ডের অমানবিক বিবরণ পাওয়া গেল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, প্রকৃত ঘটনাবলী ছিল উদ্ধৃত বিবরণের চেয়েও বহুমাত্রিক জটিলতা এবং ষড়যন্ত্রে আচ্ছন্ন। ঐতিহাসিক 

  ২১৫ 

  বাস্তবতার সন্ধানে,আবেগ-ভক্তি-বিরূপতা যথাসাধ্য এড়িয়ে বস্তুনিষ্ঠভাবে বঙ্গবন্ধুর শাসনকালের সাড়ে তিন বছর সময়টাকে বহুমুখী ভাষ্যে পর্যালােচনা করার প্রয়ােজন একান্ত অনস্বীকার্য। 

 প্রাজ্ঞজন, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী শাহ এ.এম.এস. কিবরিয়ার পর্যবেক্ষণ : “দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হচ্ছে যে, বঙ্গবন্ধুর তিন বছরের শাসনকাল সম্পর্কে সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস আজো লেখা হয়নি। বঙ্গবন্ধুর সমর্থকেরা যেভাবে তার অবদান মূল্যায়ন করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধাচারীরা মূল্যায়ন করেছেন বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে” (১(১)/৮৫)। বিচারপতি হাবিবুর রহমান লিখেছেন, “ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর রাজনৈতিক নেতাদের জনপ্রিয়তা কিছুটা নষ্ট হওয়ার কথা, কিন্তু তা যে এত তাড়াতাড়ি হয়েছিল তার পেছনে রয়েছে দেশের জনগণের প্রত্যাশা ও হতাশার টানাপড়েন, শেখ মুজিবের শত্রুদের নিরলস প্রয়াস এবং বন্ধুবর্গের নিষ্ক্রিয়তা। সহকর্মীদের মধ্যে যারা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তাঁদের তিনি শনাক্ত করতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি যাদের আনুগত্য ছিল না, তাদের। প্রশাসনে রেখে সাফল্যের সঙ্গে বিপ্লবাত্মক পরিস্থিতি মােকাবিলা করা সম্ভব নয়, এমন সাবধান বাণী ক্যাস্ট্রো, টিটো বা বুমেদিন উচ্চারণ করে থাকলেও শেখ মুজিব সে সম্পর্কে তখন তেমন দুশ্চিন্তা করেননি। শেখ মুজিব গঠনমূলক চিন্তা করার অবকাশ পাননি। রাজনৈতিক দলগুলাের ক্ষমতাহীনতা ও কোন্দল, সুযােগসন্ধানী বেসামরিক ও সামরিক আমলাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার চক্রান্ত ও দুনীতি, অর্থনীতিবিদদের অবাস্তব পরিকল্পনা এবং তাঁর চারপাশের ব্যক্তিদের সীমাহীন অর্থলিপ্সা মধ্যাহ্বে অন্ধকার সৃষ্টি করেছিল”(১(১)/৯৬-৯৭)। 

 দৈনিক সংবাদ’-সম্পাদক জহুর হােসেন চৌধুরী, বহুল পঠিত-আলােচিত ‘দরবারই-জহুর  শিরােনামের কলামে লিখেছিলেন, “দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জনসাধারণ। আশা করেছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে গড়ার জন্য এবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা শুরু হবে। তাদের মানসিক প্রস্তুতিও ছিল সে-কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। কিন্তু সব দল না হলেও অধিকাংশ দলের কার্যকরী ঐক্যর বদলে দেখা গেল আওয়ামী লীগের একাংশই (জাসদ  নামে) বেরিয়ে গেল। রাজনৈতিক দলগুলাের একে অপরকে দেশদ্রোহী, অমুকের দালাল, তমুকের দালাল বলা শুরু হয় স্বাধীনতার পর থেকেই, অর্থাৎ সে-পুরননা ট্র্যাডিশনের পুনরাবৃত্তি। তফাত এটুকু যে, এবার আর গলাবাজি হাতাহাতি নয়, রীতিমতাে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মারাত্মক খেলা। কারণ, সরকার সমর্থক এবং বিরােধী দলগুলাে, সকলের হাতেই অস্ত্র ছিল। শাসনযন্ত্রেও বিশৃঙ্খলা ক্রমে চূড়ান্ত হয়ে উঠল” (১৫/৫৯)। 

 অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে একজন ব্যর্থ প্রশাসক হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ অবসানের এক বছরের মাথায় ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২-এ ঢাকার আমেরিকান দূতাবাস 

  ২১৬ 

  থেকে প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে পাঠানাে বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল : “বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রায় সবকিছুই আয়ত্তে আনতে সক্ষম হয়েছেন। পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছে। তিনি যেভাবে প্রশাসনকে সাজিয়ে তুলেছেন, তাতে বুঝবার উপায় নেই যে, মাত্র এক বছর আগে এই দেশের কোনাে অস্তিত্ব ছিল না। ইতােমধ্যে বড় বড় দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বরখাস্ত করা হয়েছে। কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে কমতি থাকলেও এ কথা বলাই যায়, এই নতুন সরকারের প্রশাসনযন্ত্র সচল হয়ে উঠছে এবং এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভাবনার বিষয়, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনাে নাজুক অবস্থায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলা বাহিনীর প্রায় ৩০হাজার সদস্য, যারা দেশের ভেতরে থেকে। যুদ্ধ করেছে, তাদের প্রত্যেকের হাতে অস্ত্র রয়েছে, যা এখনাে উদ্ধার হয়নি”(২২/১১৫-১১৬)। 

 ড. দেওয়ান ওয়াহিদ নবী, স্বাধীনতা-পরবর্তী সমস্যা-সঙ্কটের পর্যবেক্ষণমূলক ব্যাখ্যায় লিখেছেন, “স্বাধীনতার সংগ্রামে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের সবার আদর্শ বা উদ্দেশ্য এক ছিল না। তাই স্বাধীনতার পর তাঁদের মধ্যে অনৈক্যের সুর বেজে উঠলাে। মুক্তিবাহিনীর মধ্যে মুজিববাহিনী জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। জাসদের অতি উৎসাহী সমাজতন্ত্রের আহ্বানে অনেক তরুণ সাড়া দিলে এবং আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী গঠনমূলক কাজে সাহায্য করেনি। স্বাধীনতা-বিরােধী পরাজিত শক্তি স্বাধীনতা লাভের পর নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। তাদের সংগঠন একেবারে দুর্বল হয়ে যায়নি। বিশেষ করে অতি-বাম কিছু দল দেশের কোনাে কোনাে অংশে অরাজকতার সৃষ্টি করে। এইসব কারণে পরবর্তীকালে একজন সেনা-নেতার নেতৃত্বে সমস্ত স্বাধীনতাবিরােধী দলগুলি একত্রিত হলে বেশ শক্তিশালী একটা জোট গড়ে উঠে। স্বাধীনতা-বিরােধী শক্তিগুলি বিশেষ করে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে। সবচেয়ে ক্ষতি যেটা করলাে, সেটি হচ্ছে আওয়ামী লীগের একদল মানুষের মনােবৃত্তি। এঁদের সহযােগিতায় একদল ব্যবসায়ী ও অমলা দুর্নীতির পাহাড় গড়ে তােলে। আমি ভিক্ষা করে নিয়ে আসি আর চাটার দল সব খেয়ে ফেলে’   শেখ মুজিবের এই উক্তির মধে যে কতটা দুঃখ, হতাশা, অভিমান আর ক্রোধ লুকানাে। রয়েছে, তা বুঝতে কারাে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়”(১(৩)১৫০৪-১৫০৬)। 

 “শেখ মুজিবকে নিয়ে আলােচনায় কখনাে ব্যক্তি মুজিবকে পরিচিত করানাে হয় না”। এবিএম মূসার প্রাসঙ্গিক মন্তব্য : “শেখ মুজিবের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর বিরাট হৃদয়। তাঁর সমসাময়িক কোনাে কোনাে রাজনীতিবিদ বলতেন, শেখের মাথায় কিছু নেই, মুখের জোরে রাজনীতি করে গেল। জনগণের আবেগকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন   এসব ঢালাও মন্তব্যের জবাবে বলতে হয়, এ দেশে 

  ২১৭ 

  নেতা হওয়ার জন্য একটিমাত্র বস্তু অতীব প্রয়ােজনীয়। তা হচ্ছে হৃদয়, বিরাট একটি হৃদয়ের অধিকারী হতে হবে। সর্বোপরি প্রয়ােজন ক্যারিশমা, জনগণকে কাছে টানার, উদ্বেলিত করার জন্য একটি বড়সড় ওজনদার কলিজা থাকতে হবে। শেখ মুজিবের তা ছিল” (২৫/৭৭-৭৮)। “শেখ মুজিব মানুষ ছিলেন, দেবতা ছিলেন না। তাঁর উপর দেবত্ব আরােপ করা যেমন কাম্য নয়, তেমনি ইতিহাসে তাঁর অবদানও অস্বীকার করা অন্যায়। আমরা যখন শেখ মুজিবের সমালােচনা করি, তখন তার পাশে অন্যান্য জাতীয় নেতাকে বসালেই বােঝা যায়, তিনি কোথায় বড় ছিলেন” (১(৩)/১৩১২)। 

 “যারা পাচারকারী এবং চোরাকারবারী তারা বিবেকহীন ব্যবসায়ী। কিন্তু যা জনগণের কাছে অসহ্য ছিলাে, তা হলাে এরা অনেকেই ব্যবসা করতাে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য অথবা অন্যকোনাে স্থানীয় নেতার ছত্রছায়ায়।  ৭২-এর ৬ই এপ্রিল শেখ মুজিব এ রকমের ১৬ জন নির্বাচিত সদস্যকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করেন। তিন দিন পর বহিষ্কার করেন আরও ৭ জনকে। সেপ্টেম্বর মাসে তিনি বহিষ্কার করেন আরও ১৯ জনকে। বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন বড়াে কর্তাকেও পদচ্যুত করেন”। ১৯৭২ র ১৯ আগস্ট ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “আমি ৪৬ জন গণপরিষদ সদস্যকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করেছি। অন্য কোন পার্টি জীবনে তা করে নাই। কিন্তু যারা বড় বড় কথা বলে, তাদের আয়নার দিকে চেয়ে কথা বলতে হবে।  ছাত্র ভায়েরা ও বােনেরা,  মানুষের মত মানুষ হও। স্বাধীন দেশের নাগরিক হও। মিথ্যা, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও”(১(২)/৬৩১)। কিন্তু চরম নেতিবাচক অভিজ্ঞতায় সবারই জানা, বঙ্গবন্ধুর ভালাে কথায় বা কঠোরতায়, আওয়ামী লীগের নীতিহীন অংশটিতে কোনাে পরিবর্তন ঘটেনি। আর এ কথাও অনস্বীকার্য যে, তখন বিভিন্ন মহলেই সকল প্রকার সমালােচনা এবং বিরূপতার টার্গেট করা হতাে বঙ্গবন্ধুকেই। 

 প্রাজ্ঞজন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মন্তব্য : “বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচয়ে দেখা দিলেও রাষ্ট্র হিসেবে তার বুনিয়াদ দৃঢ় হওয়ার অবকাশ মেলেনি। সক্রিয় ছিল বিভিন্ন গােষ্ঠী ও শক্তি, দেশের ভিতরে ও বাইরে। একযােগে কাজ করেছে।  কিসিঞ্জারের সঙ্গে নাম করতে হবে আরও একজন ভুট্টো ছিলেন এক আহত সর্প। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরােধী চক্রের সঙ্গে তার ছিল গােপন ও অব্যাহত যােগাযােগ। তবে এ সন্দেহও মন থেকে তাড়ানাে যায় না যে, বঙ্গবন্ধু তার সকল সুকৃতি তাঁর অসামান্য জনপ্রিয়তা, তার আদর্শের ধ্রুবতা, তাঁর প্রশ্নাতীত সততা সত্ত্বেও সেদিনের টালমাটাল সময়ের জন্য উপযুক্ত সরকার প্রধান ছিলেন কিনা। তাঁর মহৎ গুণ,   ক্ষমা, উদারতা   ওই সময়ে তার দুর্বলতা হিসেবে দেখেছেন অনেকে। তাঁকে দেবতার আসনে বসিয়েছিল যারা, সৎ পরামর্শ দেবার ইচ্ছা বা 

  ২১৮ 

  সাহস তাদের ছিল না। তার এতদিনের সংগ্রামের সাথী, একাত্তরের প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী, তাজউদ্দিন আহমদকে তিনি কেন তাঁর সঙ্কটের দিনে দূরে সরালেন, এ এক চরম বিস্ময়। তাজউদ্দিন আহমদের মতাে তীক্ষধী, দূরদর্শী ও পরীক্ষিত নেতাকে সর্বাধিক দায়িত্ব দিয়ে নিজেকে কিছুটা নেপথ্যে রেখে সরকারের অভিভাবকত্ব করা ছিল ওই অস্থির সময়ের দাবি। এ-সত্য উপলব্ধি করেননি বঙ্গবন্ধু” (১(১)/৬৪-৬৫)। 

 অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, স্বদেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধু “সম্মুখীন হয়েছিলেন পর্বতপ্রমাণ সমস্যার। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের পুনর্গঠন,  ঘাতক-দালালদের বিচার, যুদ্ধবন্দিদের বিচারের প্রশ্ন একদিকে, অন্যদিকে যুদ্ধবন্দিরা মুক্তি না পেলে পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের ছাড়া হবে না বলে ভুট্টোর হুমকি, ঘাতক-দালাল সংক্রান্ত আইন বাতিল করার দাবি, আটক বাঙালিদের পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের পরিবারের দাবি   এসব পরস্পরবিরােধী স্রোতের মধ্য দিয়ে তাঁকে চলতে হচ্ছিল। সর্বত্র অস্ত্রশস্ত্র ছড়িয়ে গিয়েছিল। তাঁর দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলাদেশ-বিরােধীরা মুক্তিযােদ্ধা-হত্যা থেকে পােস্ট অফিস লুণ্ঠন প্রভৃতি কাজে লিপ্ত হয়ে গেল। সবচেয়ে ক্ষতিকর হলাে তাঁর সাথে তাজউদ্দিনের দূরত্ব সৃষ্টিতে একদল মানুষের সাফল্য।  বঙ্গবন্ধুর সাফল্যের তালিকা দীর্ঘতর করা যেতে পারে, ওই বৈরী পরিস্থিতিতে তার ব্যর্থতা বা ভুল সিদ্ধান্তের তালিকাও তৈরি করা যেতে পারে। তিনি মানুষ ছিলেন -ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে ছিলেন না” (১(১)/২৪৫২৪৬)। 

 রাজনীতি-গবেষক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অজিত কুমার দাস লিখেছেন, ডানপন্থী ইসলামী দলগুলাে, যাদেরকে স্বাধীনতার পরপরই নিষিদ্ধ ঘােষণা করা হয় এবং যারা সংসদীয় গণতন্ত্রে মােটামুটি বিশ্বাস করলেও সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার কট্টর বিরােধী ছিল, তারাও নতুন সংবিধানের কট্টর বিরােধিতা শুরু করে এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে বানচালের জন্য উগ্র বামপন্থীদের সাথে হাত মেলায়। সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঘােষণা করে, বাংলাদেশ ভারতের অধীন। তাই দলটি স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা কায়েমের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান জানায়। আব্দুল হকের পূর্ব বাংলার সাম্যবাদী দল (মা-লে), মােহাম্মদ তােয়াহার পূর্ব বাংলার সাম্যবাদী দল, দেবেন সিকদারের কমিউনিস্ট পার্টি, অমল সেনের বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিনবাদী)  প্রায় একই ধরনের আহ্বান জানায়। আব্দুল হক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোকে “My dear Prime Minister  সম্বােধন করে ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক পত্র লেখেন। এতে তিনি ক্রীড়নক মুজিব সরকারকে উৎখাত এবং ‘পূর্ব পাকিস্তান’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ, অস্ত্র ও বেতার যন্ত্র চান। জামায়াতে 

  ২১৯ 

  ইসলামী, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগ পিডিপি প্রভৃতি ডানপন্থী দলগুলাে গােপনে ভুট্টোর সমর্থন লাভ করে  মুসলিম বাংলা’ স্থাপনের জন্য কার্যক্রম শুরু করে”(১(২)/৭৬২-৭৬৩)। 

 স্বাধীনতার কিছুকালের মধ্যেই সবিস্ময়ে মানুষ লক্ষ্য করে মজলুম জননেতা’ পরিচয়ের মওলানা ভাসানী ঘােষণা করলেন, মুসলিম বাংলার জন্য যারা কাজ করছে, তাদের আমি দোয়া করি। আল্লাহর রহমতে তারা জয়যুক্ত হবে। শুধু মুসলিম বাংলা গঠন নয়, উগ্র পিকিংপন্থীদের স্বাধীন পূর্ব বাংলা  গঠনের দাবির সাথেও তিনি সংহতি প্রকাশ করেন” (১(২)/৭৬৩)। মুনতাসীর মামুন ও জয়ন্ত কুমার রায় লিখেছেন : “রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে ভাসানী যুক্ত ছিলেন। প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে এবং নিপীড়িত হয়েছেন কর্তৃপক্ষের দ্বারা। কিন্তু, রাজনৈতিক জীবনের শেষ দিকে যেন ক্রীড়নক হয়ে গেলেন চরম-ডান ও বামপন্থীদের। এধরনের মনােভাব অনেক ক্ষেত্রে ইন্ধন যুগিয়েছে সামরিক ষড়যন্ত্রের এবং সংসদীয় গণতন্ত্র বিনাশের। মাওবাদীরা ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসকে ‘কালাে দিবস’, পরাধীনতার দিবস  বলে আখ্যায়িত করে। সিরাজ সিকদারের  পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’ ঐদিন ঢাকায় ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ’ এবং তাদের আওয়ামী লীগের পুতুল সরকারকে উৎখাতের দাবিতে হরতাল আহ্বান ও প্রচারপত্র বিলি করে। ভাসানী হরতাল সমর্থন করেন এবং ১৪ডিসেম্বর পল্টন ময়দানের জনসভায় ঘােষণা করেন, দেশে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে, সশস্ত্র বিপ্লব হল একমাত্র পথ। তাঁর বয়স বেশি না হলে নিজেই অস্ত্র ধারণ করতেন। মওলানা ভাসানীর জনসভার পরপরই মাওবাদীরা ঢাকাস্থ সােভিয়েত দূতাবাসের সাংস্কৃতিক ভবন, ভারতের একটি বিমান কোম্পানির অফিস, একটি দৈনিক পত্রিকা প্রভৃতি স্থানে হাত বােমা ও গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। ঢাকার সন্নিকটে ডিনামাইট দিয়ে রেল লাইন উড়িয়ে দেয় এবং ভৈরবের নিকট রেল লাইন খুলে ফেলে” (১(২)/৭৬৩-৭৬৪)। 

 সমকালীন পরিস্থিতি এবং নিঃসঙ্গ মুজিবের অক্ষমতা উপলব্ধির জন্য উল্লেখ করা যেতে পারে, ২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৪ সংবিধানের চতুর্থ সংশােধনী পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু মুজিব তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন, “কোনাে দেশের ইতিহাসে নাই বিপ্লবের পর বিপ্লবকে বাধা দিয়েছে যারা, শত্রুর সঙ্গে সহযােগিতা করেছে যারা যারা এ দেশের মানুষকে হত্যা করেছে, তাদের কোনাে দেশে কোনাে যুগে ক্ষমা করে নাই। কিন্তু আমরা করেছিলাম। বলেছিলাম, দেশকে ভালােবাসুন, দেশের জন্য কাজ করুন, (দেশের) স্বাধীনতাকে গ্রহণ করে নিন, থাকুন। কিন্তু অনেকের পরিবর্তন হয় নাই। তারা এখনাে গােপনে বিদেশীদের কাছ থেকে পয়সা এনে বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন” (১(১)/১০০)। এখানে প্রসঙ্গতই 

  ২২০ 

  স্মরণীয় যে, স্বাধীনতার বিরােধিতাকারীরা অপপ্রচার, সশস্ত্র সংঘাত এবং স্যাবােটাজ ইত্যাদি সকল অপকর্মেই জড়িয়েছিলেন। অপরদিকে, প্রকাশ্যে এবং সত্যিকার অর্থেই যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং স্বাধীনতায় আস্থাশীল ছিলেন, ন্যাপ (মােজাফফর) এবং সিপিবি’র মত বামপন্থী দলগুলিও তখন দৃশ্যতই দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছিল। একদিকে তারা মুজিব-সহযােগী ছিলেন, অন্যদিকে সম্ভবত রাতারাতি রাজনৈতিক খ্যাতি-প্রতিপত্তি অর্জনের জন্যই নানারকম মুজিব-বিরােধী কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। এসময়ও তারা সহযােগী শক্তি হিসেবে ‘ত্রিদলীয় ঐক্যজোট’ নামে আওয়ামী লীগের সমর্থক-সহযােগী-সুবিধাভােগী লাইনটা টিকিয়ে রাখছিলেন, অনেকে বলেন এঁদের আগ্রহেই মুজিব ‘ত্রিদলীয় ঐক্যজোট গঠনে সম্মত হয়েছিলেন, যদিও আওয়ামী লীগের দক্ষিণপন্থী অংশের প্রবল আপত্তি ছিল। আবার ঐক্যজোটের অংশভাগী হয়েও তারা মুজিব এবং আওয়ামী লীগের প্রতি সমালােচনা-আক্রমণের সব সুযােগই গ্রহণ করতেন। আওয়ামী-লীগ রাজনীতিতে কোনাে পরিকল্পনা, দূরদৃষ্টি বা বুদ্ধিমত্তার ছাপ থাকতে পারে, এটা তারা বিশ্বাসই করতে পারতেন না। 

 বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে শাজাহান সিরাজ বলেছিলেন, “বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে কোটিপতির সংখ্যা ছিল দু’জন, আর এখন (জুন, ১৯৮০ খ্রি.) সে সংখ্যা ষাট থেকে সত্তর জন”। তথ্যটি প্রকাশিত হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক বুলেটিনের ১৯৭৯ সালের অক্টোবর সংখ্যার ৪৮০নং পৃষ্ঠায় । তদানীন্তন আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির অমন বাস্তবতা প্রসঙ্গে দরবার-ই-জহুর’ কলামে জহুর হােসেন চৌধুরী তীর্যক মন্তব্য : “১৯৭৪ সাল মানে আওয়ামী লীগের লুটপাটের  উত্তুঙ্গ বছর। তবু আজকের অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আওয়ামী-বাকশালীদের লুটপাটের। কথা এখন যারা বলেন, তাঁদের যদি লজ্জা থাকত, তবে তাঁরা এ অভিযােগের পুনরাবৃত্তি বহু পূর্বেই বন্ধ করতেন।  যে দু’জন (পূর্বর্তন) কোটিপতির উল্লেখ করা হয়েছে তারা হয়ত পাকিস্তান আমলেরই কোটিপতি। আওয়ামী লীগের সাড়ে তিন বছরের রাজত্বে দু’তিনজন কোটিপতি হওয়া বিচিত্র নাও হতে পারে। কিন্ত গত পৌনে পাঁচ বছরে ৬২ জন কোটিপতি তৈরি হওয়া মাশাআল্লাহ”(৯/১৯৯-২০২)। 

 ১৯৪৭- ৭১ পাকিস্তানের ২৪ বছরকে মুজিব-রাজনীতির সংশয়াতীত সাহসী সাফল্যের সময় হিসেবে চিহ্নিত করেন অনেকেই। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী, বিশেষত পাকিস্তানি সেনা-কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযুদ্ধজয়ী বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন থেকে তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত (১০জানুয়ারি, ১৯৭২ থেকে ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫) সময়কালকে কিভাবে চিহ্নিত করা চলে? রাজনীতির কথা বলি কিংবা বাংলাদেশের শ্ৰেণীবিভক্ত মানুষের সমাজ মনস্তত্ত্ব, সহজ ব্যাখ্যায় এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। তবে এ-সত্য কারাে নজর এড়াবার নয় যে, মুজিব-হত্যার প্রায় দু’দশক পরে, যখন 

  ২২১ 

  রাষ্ট্র-রাজনীতি থেকে মুজিব কার্যতই নির্বাসিত, তখন মানুষ তাঁকেই  হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ নির্বাচিত করেছিল। তাহলে কি ১৯৭২- ৭৫ সময়কালে এ দেশের আবেগাক্রান্ত মানুষ অসীম প্রত্যাশায় এবং কোনাে প্রতারকের পরিকল্পিত প্রচারণায় মনস্তাত্ত্বিকভাবেই পথ হারিয়েছিল? 

 প্রসঙ্গতই দার্শনিক আঁদ্রে মালরাের কিছু মন্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে শিক্ষাবিদ খান সারওয়ার মুরশিদের সাথে আলােচনায় মালরাে বলেছিলেন, “আপনারা বাঙালিরা বড়াে ধৈর্যহীন। আপনারা সবকিছু একসঙ্গে পেতে চান   একটুও অপেক্ষা করতে নারাজ। জানেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরের ফ্রান্সের .প্রথম ক’বছর আমাদের কি কষ্টে কেটেছে? খাবার, পানি, কয়লা, বাসস্থান, যাতায়াত ব্যবস্থা সবকিছুর সঙ্কট ছিল। পৌরসেবা তাে ছিল না বললেই চলে”। অধ্যাপক মুরশিদ প্রশ্ন করেছিলেন মালরােকে, “মুজিব পারবেন তাে একটি নতুন রাষ্ট্র তৈরি করতে?  তীক্ষ ত্বরিত জবাব এলাে,  অবশ্যই, যদি না আপনারা শিক্ষিতরা, বুদ্ধিজীবীরা তাকে মেরে ফেলেন।  You are a cynical lot. Don t kill him like one of those tribes which kill their leaders and eat their flash । প্রাসঙ্গিক মন্তব্য অধ্যাপক মুরশিদের : “এ দেশের মধ্যবিত্ত সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা নেতিবাচক সমালােচনায় পটু এবং সময়ের আগেই মানুষ সম্পর্কে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকেন” (১(১)/১৮৯-১৯০)। ভিনদেশী দার্শনিক মালরাে এবং সেই সাথে অধ্যাপক মুরশিদের মূল্যায়ন-মন্তব্যগুলি নিয়ে হয়তাে তাৎক্ষণিকভাবে আমরা কিছুই ভাবিনি কিন্তু সামনে যাবার যুক্তি-শক্তি সঞ্চয়ের প্রয়ােজনেই পেছন ফিরে তাকিয়ে মনীষী-কথাগুলি এখনাে গভীরভাবেই ভাবার দরকার। 

 অতঃপর, বিভিন্ন নৈমিত্তিক প্রাত্যহিকতার বিবরণ এড়িয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অতি সংক্ষিপ্ত আলােচনাতেই মনােযােগ সীমাবদ্ধ রাখবাে। বিষয়গুলি হচ্ছে পর্যায়ক্রমিকভাবে ১৯৭২-এ রচিত বাংলাদেশের সংবিধান, ১৯৭৩-এ অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন, দালাল-যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ১৯৭৪’র দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৭৫-এ বাকশাল গঠন। 

  ২২২ 

  মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের অনন্য দলিল : 

 বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান, ১৯৭২ 

  ১০জানুয়ারি ১৯৭২, স্বদেশে ফিরে প্রথম ভাষণেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের রাষ্ট্রাদর্শ এবং সাংবিধানিক চিন্তার দিকটি উল্লেখ করে বলেছিলেন, “আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই যে, বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনাে ধর্মীয় ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র,সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা”। ইতিহাসবিদ সালাহউদ্দিন আহমদের পর্যবেক্ষণ : “এই অসাধারণ ঘােষণার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার মূলনীতিগুলি পরিষ্কারভাবে ব্যক্ত করা হয়েছিলাে। বস্তুত ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র   এই চারটি নীতিকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে সন্নিবেশিত করা হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণােদিতভাবে এই মূলনীতিসমূহের অপব্যাখ্যা করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা করে এসেছে।  তিনি মনে করতেন যে, বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক মূল্যবােধ ও মানবতাবাদী সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা উদ্ভাবন করতে হবে, যাতে জনগণের বৃহত্তম অংশের জীবনযাত্রার ন্যূনতম চাহিদা মিটানাে সম্ভব হয়” (১(১)/৫৫-৫৬)। 

 মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের বছর না পেরােতেই বঙ্গবন্ধু জাতিকে একটি সংবিধান (১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২) উপহার দিতে পেরেছিলেন। মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, “আর কোনাে দেশে এরকম একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এত দ্রুত একটি শাসনতন্ত্র প্রদান সম্ভব হয়েছে বলে জানা নেই। শাসনতন্ত্রের মূলনীতিসমূহ ছিল   গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। আর ১৯৭২সালের শাসনতন্ত্রে বিধৃত হয়েছিল সিভিল সমাজের প্রতিষ্ঠানসমূহ বা এককথায় এই শাসনতন্ত্র বাংলাদেশে পত্তন করতে চেয়েছিল সিভিল সমাজের ভিত্তি” (৩৩ (১)/৩৮)। বঙ্গবন্ধুর সংবিধান অনুসারে, বাংলাদেশের মানুষের জাতিগত পরিচয় 

  ২২৩ 

  নির্ধারিত হয় বাঙালি। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম, ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল-ইসলামের অভিমত : “মৌলিক মূল্যবােধের ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয় রাষ্ট্র। সংবিধান, বিচার, আদালত, সংসদ ও রাজনীতি  বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছিলাম, যে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল তা একটি আদর্শিক রাষ্ট্র। বাঙালির ঐতিহ্য, সভ্যতা ও মননে গড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চেতনায় উজ্জীবিত এক দেশ”(১(১)২০৭)। 

 হালিম দাদ খান লিখেছেন, “সংবিধান রচনায় পাকিস্তানিদের লেগেছিল ৯ বছর, (ভারতের তিন বছর) এবং বাঙালিদের ৯ মাস। হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম বাঙালির  সংবিধান রচিত হল। কিন্তু রচনার চেয়েও কঠিন কাজ ছিল একে বাস্তবে রূপ দেওয়া, যা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া ৪র্থ সংশােধনী থেকে শুরু করে (বাকশাল,১৯৭৫) পরবর্তী সংশােধনীসমূহ (১৯৯১ র সংশােধনী ব্যতীত) এর মৌল চরিত্র বদলে দিয়েছে। হালিম দাদ খান উল্লেখ করেছেন, ১৯৭২ র সংবিধান সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে বিএনপির নেতা-মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বাংলাদেশ : শেখ মুজিবের শাসনকাল  নামক বইতে লিখেছেন, “মাত্র এক বছরের মধ্যে সংবিধান প্রণয়নের জন্য আওয়ামী লীগকে প্রশংসা না করে পারা যায় না। এটি ছিল একটি ব্যাপক এবং সুলিখিত দলিল এবং এই উপমহাদেশের অন্যান্য সংবিধানের তুলনায় উন্নতমানের” (৩১/৪৬)। 

 স্মরণ করা যেতে পারে, বাংলাদেশের সংবিধানের আদর্শিক ভিত্তি প্রসঙ্গে সংবিধান রচনাকালেই ১৬ জুলাই ১৯৭২ সাংবাদিক ইউনিয়নের বার্ষিক সভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন : “আমি জানি, আমার মত আপনারাও চারটি আদর্শ সমর্থন করেন। এই চারটি আদর্শের ভিত্তিতে দেশকে বাঁচাতে চাই। আমরা নতুন প্রচেষ্টা নিয়েছি। গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার জন্য। দুনিয়ায় দেখা গেছে, সমাজতন্ত্র। কায়েম করতে গিয়ে অনেক সময় মানুষের মঙ্গলের খাতিরে, বাধা দূর করার জন্য রূঢ় হতে হয়েছে। সেটি আমি করতে চাই না। আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় কিনা, আমি চেষ্টা করে দেখছি। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আমার আন্দোলন। সেই জাতীয়তাবাদ না থাকলে স্বাধীনতার অস্তিত্ব নষ্ট হবে। ধর্মনিরপেক্ষতাও আমার আদর্শ। এখানে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নাই” (১(১)/৪৬৫)। ১৯ আগস্ট ছাত্রলীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমার দেশে একদল লােক সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। জীবনভর আমি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি।  জাতীয়তাবাদ, যা তােমরা বিশ্বাস কর, এটা হলাে   আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা, বাংলার ইতিহাস, বাংলার জাতীয়তাবাদ। আমি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি, তােমরাও তা’ কর। শােষণহীন সমাজ, সুষমবণ্টন, সম্পদের মালিক 

  ২২৪ 

  জনগণ, তােমরা তা বিশ্বাস কর। এই লক্ষ্যে পৌঁছাবার কোন শর্টকাট রাস্তা নেই। আস্তে আস্তে যেতে হবে” (১(১)/৪৯৯)। 

 “সমগ্র পাকিস্তান আমলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিপরীতে রাজনীতি করে আওয়ামী লীগের মধ্যে যে বাস্তবতাবােধের জন্ম হয় তা থেকেই আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ কর্তৃক গৃহীত ধর্মনিরপেক্ষতা বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল”। এমন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ইতিহাসবিদ ড. আবুল কাশেম উল্লেখ করেছেন, ১৯৭২সালে রচিত সংবিধানের বাস্তবায়ন সংক্রান্ত অংশে বলা হয়েছিল, “জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরােপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে সমিতি ও সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে। তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী কোন সাম্প্রদায়িক সমিতি বা সংঘ কিংবা অনুরূপ লক্ষ্যানুসারী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক অন্য কোন সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার বা অংশগ্রহণ করিবার অধিকার কোন ব্যক্তির থাকিবে না।  দক্ষিণপন্থী বুদ্ধিজীবীরা ভারতের চাপে আওয়ামী লীগ সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হয়েছে বলে মত পােষণ করেন এই অসত্য বক্তব্য প্রচারের মূল উদ্দেশ্য হল রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ভারতপন্থী হিসেবে ব্র্যাকেটবন্দি করে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা” (১(১)/৩১৭)। ভারতীয় সংবিধানে ১৯৭২সালে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল না, এটি আরাে চার বৎসর পর (১৯৭৬) সংযােজিত করা হয়। 

 প্রথম সংবিধান জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের সময় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমাদের পরিষ্কার আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এবং সেই আদর্শের ভিত্তিতে এ দেশ চলবে। ধর্মরিপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়।  কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না। .যদি কেউ ব্যবহার করে, তাহলে বাংলার মানুষ যে তাকে প্রত্যাঘাত করবে, এ আমি বিশ্বাস করি” (৩৪/৪র্থ মলাট)। একই ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘সমাজতন্ত্র সম্পর্কে স্পষ্ট করেই বলেছিলেন :“আমাদের আদর্শ পরিষ্কার হয়ে রয়েছে। এই পরিষ্কার আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এবং এই আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ চলবে। আমরা বিশ্বাস করি সমাজতন্ত্রে, সমাজতন্ত্র 

 হলে সাড়ে সাত কোটি মানুষ ৫৪,০০০ বর্গমাইলের মধ্যে বাঁচতে পারবে না। সেইজন্য অর্থনীতি হবে সমাজতান্ত্রিক”। আরাে বলেছিলেন, “ভবিষ্যৎ বংশধর, ভবিষ্যৎ জনসাধারণ কিভাবে শাসনতন্ত্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করবে তারই উপর। নির্ভর করে শাসনতন্ত্রের সাফল্য, তার কার্যকরিতা .ভবিষ্যৎ বংশধররা যদি সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মরিপেক্ষতার ভিত্তিতে শােষণহীন সমাজ 

  ২২৫ 

  গঠন করতে পারে, তাহলে আমার জীবন সার্থক, শহীদের রক্তদান স্বার্থক”(প্রাগুক্ত)। 

 বাংলাদেশের মূল সংবিধানের প্রেক্ষাপট এবং দার্শনিক চেতনা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর কথা দিয়েই প্রসঙ্গটির ইতি টানা যেতে পারে। ১৯৭৪’র ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু তার জীবনের শেষ বিজয় দিবসের ভাষণে বলেছিলেন : “দীর্ঘ ২৫ বছর যাবৎ বাংলাদেশের মানুষ যে মূল্যবােধগুলি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল তারই চূড়ান্ত পর্যায় মাত্র। এই আদর্শ বা মূল্যবােধের সংজ্ঞা হলাে   গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। বিদেশী ঔপনিবেশিক শাসকরা এবং দেশী প্রতিক্রিয়াশীল চক্র এই চারটি আদর্শকে বাঙালির জীবন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। তারা চেয়েছে প্রতিক্রিয়াশীলতা, ধর্মান্ধতা, পশ্চাঙ্গুখিনতা এবং অপসংস্কৃতি ও অপজাতীয়তা আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে। ১৬ ডিসেম্বরের জয় কেবল যুদ্ধজয় নয়, চারটি মূলনীতির এই আদর্শের বিজয় দিবস”(১(২)/১০২৩)। 

  ২২৬ 

  বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিপুল জনসমর্থন : 

 বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন, ১৯৭৩ 

  “শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পার্টি শুধু সংবিধানই দিলেন না, ..১৯৭৩ সালের মার্চের মধ্যে একটা সাধারণ নির্বাচনও দিয়া ফেলিলেন। এতাে তাড়াতাড়ি নির্বাচন দিবারও কোনাে তাগিদ ছিল না। ১৯৭০-৭১ সালের নির্বাচনের বলে আওয়ামী লীগ বিনা তর্কে ১৯৭৪-৭৫ সাল তক মেম্বর থাকিতে পারিতেন। একই দিনের নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বররা আজও মেম্বর আছেন” (২১/৪৩)। জাতীয় সংবিধান, ১৯৭২ প্রবর্তনের পরেই মুজিব সরকার মনােযােগ দিয়েছিলেন সংবিধানের আওতায় প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে। মওলানা ভাসানী দাবি তুললেন, সরকারকে পদত্যাগ করে সর্বদলীয় সরকার গঠনের মাধ্যমে  নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী মুজিবের সুস্পষ্ট বক্তব্য ছিল, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই প্রার্থীদের যােগ্যতা প্রতিপন্ন করতে হবে। যাদের কাছে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য এখন সরকারের পদত্যাগের কথা বলা হচ্ছে, তারা প্রায় সকলেই বিগত ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জামানত হারিয়েছিলেন। 

 অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বামপন্থী বুদ্ধিজীবী-সাহিত্যিক আহমদ ছফার  যদ্যপি আমার গুরু’ নামক গ্রন্থ-সূত্রে নির্বাচন প্রসঙ্গে জাতীয় অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় আব্দুর রাজ্জাক এবং বঙ্গবন্ধু মুজিবের একটি কৌতুহলােদ্দীপক সংলাপের উল্লেখ (অধ্যাপক রাজ্জাকের অননুকরণীয় ভাষাতেই) করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে কিছু কথা  শিরােনামের নিবন্ধে। শেখ সাহেবকে একবার (সম্ভবত জানুয়ারি,১৯৭১ খ্রি.) অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক সাহেব জিজ্ঞাসা করেছিলেন : “আপনার হাতে ত অখন দেশ চালাইবার ভার, আপনে অপজিশনের কী করবেন। অপজিশন ছাড়া দেশ চালাইবেন কেমনে। জওহরলাল নেহরু ক্ষমতায় বইস্যাই জয়প্রকাশ নারায়ণরে কইলেন, “তােমরা অপজিশন পার্টি গইড়া তােল। শেখ সাহেব কইলেন ‘আগামী ইলেকশানে অপজিশন পার্টিগুলাে ম্যাক্সিমাম পাঁচটার 

  ২২৭ 

  বেশি সিট পাইব না। আমি একটু আহত অইলাম, কইলাম,  আপনে অপজিশনরে একশ’ সিট ছাইড়া দেবেন না? শেখ সাহেব হাসলেন। ইতিহাস শেখ সাহেবরে স্টেটসম্যান অইবার একটা সুযােগ দিছিল। তিনি এইডা কামে লাগাইবার পারলেন। না”(১(১)/৯৫)। 

 “What Professor Razzaque suggested was a version of an experiment Kamal Ataturk had attempted to do in his country to encourage some measure of pluralism to strengthen the foundations of the Turkish Republic. It did not work in Turkey and it would not have worked in Bangladesh. Democracy can not be nurtured by an artificially created opposition” (১৭/৩০৫)। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর কোনাে গণতান্ত্রিক দেশেই সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশে এমন কৃত্রিম বিরােধী দল সৃষ্টির সফল প্রায়ােগিক নজির মেলে না। নেহরু কিন্তু জয়প্রকাশ নারায়ণকে গােনাগুনতি ‘সিট ছেড়ে না দিয়েই তাঁদের ‘অপজিশন’ সংগঠিত করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে অধ্যাপক রাজ্জাক কথিত মােট ৩০০আসনের মধ্যে ১০০কেন, আরাে বেশি সংখ্যক ‘সিট ছেড়ে দিলেও ‘সিট প্রত্যাশী সকল দলকে খুশি করা যেতাে কি? এভাবে আপােষে ‘সিট’ ভাগাভাগি কার্যত গণতন্ত্রকেই প্রহসনে পরিণত করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে পরবর্তী সময়ে জাপা-জাসদের এবং বিএনপি-ফ্রিডম পার্টির সিট ভাগাভাগির পরিণাম-কথা বাস্তব উদাহরণ হিসেবেই স্মরণ করা যেতে পারে। 

 অধ্যাপক রাজ্জাক তত্ত্বীয় বা একাডেমিক আলােচনা হিসেবেই বঙ্গবন্ধুকে অমন কথাগুলি বলেছিলেন এবং তাই বঙ্গবন্ধুর আপত্তি-অসম্মতিতে প্রাজ্ঞ অধ্যাপকের ক্ষুব্ধতার কোনাে কারণই ঘটেনি। বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর উল্লেখ করেছেন : “পরে যখন শেখ মুজিবের নাম উচ্চারণ করা প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে যায়, তখন ‘বাংলাদেশ : স্টেট অব নেশন’ বক্তৃতায় অধ্যাপক রাজ্জাক তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং তাঁকে বঙ্গবন্ধু বলে উল্লেখ করেন ষােলবার। বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব সম্পর্কে তিনি (অধ্যাপক রাজ্জাক) বলেন, এই উপমহাদেশের সমগ্র অঞ্চল বা কোনাে বিশেষ অংশের সঙ্গে ধর্ম বা শ্রেণীগত কাঠামাের দিক দিয়ে আমাদের অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। কিন্তু স্বতন্ত্র পরিচয় রাখার ক্ষেত্রে আমাদের অদম্য ইচ্ছাই এ সবকিছুকে অতিক্রম করেছে। এই আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু এবং এটাই এই বিশেষ মানুষটা আর জনতার মধ্যে গড়ে তুলেছিল অবিচ্ছেদ্য সেতুবন্ধন। বঙ্গবন্ধুর স্থান নির্ণয় করতে গিয়ে তার গুণের তালিকা প্রস্তুত করা বা তাঁর ত্রুটিবিচ্যুতির উপর স্ফীতবাক হওয়া অপ্রাসঙ্গিক। জনতা তাঁকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছিল। কারণ তার মধ্যে তারা জাতি হিসেবে নিজেদের পৃথক অস্তিত্ব বজায় রাখার যে গভীর ইচ্ছা তার বহিঃপ্রকাশ দেখেছিল” (১(১)/৯৫)। 

  ২২৮ 

  ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৭৩  প্রসঙ্গে প্রায় অনালােচিত একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা দরকার। এমন বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে নিষিদ্ধঘােষিত ধর্ম-সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং পশ্চাৎম্মুখী প্রতিক্রিয়াশীলতার পুনরুত্থানে মওলানা ভাসানীর তখনকার উদ্যোগটি সরাসরি সহায়ক হয়েছিল। “Maulana Bhashani, had gone into seclusion immediately after liberation. But the prospect of another election (1973) drew him back into the public arena. As a religious leader he could not resist the temptetion to bring together several religious groups, banned to operate on their own because of their pro-Pakistan ideology, under his United Action Committee. As a peasant leader he sought to attract various Maosists (opposed to liberation of Bangladesh) into the fold  The basis of their tenuous unity was a shared anti-indian feeling” (১৭/২৯৪)। 

 পাকিস্তানি ভাবধারার রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং দলসমূহের প্রকাশ্য আশ্রয়-ঠিকানা হিসেবেই ‘ইউনাইটেড অ্যাকশন কমিটি গঠনের পর মওলানা ভাসানী আরেকটি চরম ডানপন্থী সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। এ দেশের কমিউনিস্ট পার্টি রুশ এবং চৈনিক আদর্শের নামে বিভক্ত (১৯৬৫) হয়ে যাবার পর থেকে চীনপন্থী অংশটি উপদলীয় কোন্দলে ভেঙে ক্রমশই খণ্ড-ক্ষুদ্র হয়ে পড়েছিল। তবে প্রায় সকল উপদলই প্রকাশ্য রাজনীতির অবলম্বন হিসেবে ভাসানী-ন্যাপ এবং মওলানা ভাসানীকে ব্যবহার করতাে। উপদলীয় কোন্দলের চূড়ান্ত পর্যায়ে ভাসানী-ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটিও বাতিল (জানুয়ারি ১৯৭৪) করে দেয়া হয়। তখন দলটির সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক কাজী জাফর আহমেদ। এ সময় মওলানা ভাসানী ‘হুকমতে রাব্বানী পার্টি  নামে একটি ‘দক্ষিণপন্থী দল গঠন (ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪) করে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিতে নিজেকে নিয়ােজিত করেন” (৩১/৪৪)। অতঃপর মওলানাকে সভাপতি এবং মুক্তিযুদ্ধকালের ‘দালাল’ মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি(মার্চ ১৯৭৪) গঠন করা হয়েছিল। 

 ৭ মার্চ ১৯৭৩-এর নির্বাচনের প্রায় একমাস আগে, “১০ ফেব্রুয়ারি সকল জেলার ডেপুটি কমিশনার ও পুলিশ সুপারদের ঢাকায় ডেকে এনে শেখ মুজিব ‘নির্বাচনে সরকারি ও বিরােধী দলের মধ্যে কোনাে বৈষম্য না-করার আহ্বান জানান। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা তার এই সদিচ্ছার মূল্য দেয়নি”(৩১/৪৭)। তথাপি ভােট-কারচুপি প্রসঙ্গে পর্যবেক্ষকদের এমন মন্তব্য উড়িয়ে দেবার নয় যে, “There was also the general impression that the candidates of all the parties had 

  ২২৯ 

  indulged in electoral irregularities .Some of these were time-honoured methods going back to British days. What was qualitatively different in the 1973 elections was the direct involvement of the govt. machieary in the manipulation of votes in atleast 15 constituencies” (১৭/৩০৮) গােলাম মুরশিদের মন্তব্য, নির্বাচনে কারচুপির ঘটনা খুব বেশি ছিল বলে মনে হয় না। দেশের একটি প্রধান দল ছিলাে মােজাফফর ন্যাপ। আওয়ামী লীগের পরে সবচেয়ে বেশি ভােট (প্রায় ৯%) পেয়েছিল এই দল। কিন্তু একটি আসনেও জয়ী হতে পারেনি। মােজাফফর আহমেদ দাবি করেন যে, নির্বাচনে কারচুপি না হলে তাঁর দল ২৫টি আসনে জয়ী হতাে। কোনাে কোনাে পর্যবেক্ষকের মতে, অবাধ নির্বাচন হলে, বিরােধী দলগুলি হয়তাে বড়জোর ৩০/৪০টির মত আসনে জয়ী হতাে। ৩০০ আসনের সংসদে তা নিতান্ত নগণ্য” (২/২০৪)। উল্লেখ্য যে, উক্ত নির্বাচনে সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯১টি আসন পেয়েছিল আওয়ামী লীগ আর জাসদ পেয়েছিল ২টি, জাতীয় লীগ ১টি, স্বতন্ত্র ৬টি। 

 সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ফারুক চৌধুরী লিখেছেন, “শেখ মুজিব তাঁকে লন্ডনে বলেছিলেন যে, বিরােধী দলগুলাে যদি ১০০টি অসন পেত তাহলে দেশের রাজনৈতিক সমস্যা অনেক কম হত” (৩১/৪৮)। এখানে জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সাথে মুজিবের চিন্তার মিল লক্ষ্য করা গেলেও নির্বাচনে আসন বাটোয়ারার নীতিতে মুজিব কখনাে আস্থাশীল ছিলেন না। মার্চ ১৯৭৩, নির্বাচনে যতটুকু কারচুপি যেভাবেই হয়ে থাকুক-না-কেন, মুজিব স্বচ্ছ-সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষপাতী ছিলেন বলেই বিশ্বাস করা চলে। মাত্র দু মাস পরে চারটি আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। “The results of these by-elections announced on 30 May- 2 seats won by Awami League, 1 by JSd and one by an independent candidate – only served to emphasise that had the March elections been equally fair, the Awami League would have won with a comfortable majority.” (১৭/৩১০)। 

  ২৩০ 

  দালাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সাধারণ ক্ষমা : 

 বাস্তবতা এবং প্রবল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কথা 

  “বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের নয় মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দালালদের দ্বারা সংঘটিত নরমেধযজ্ঞকে ‘মানবেতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ’, ‘সাম্প্রতিক কালের নিষ্ঠুরতম হত্যালীলা ইত্যাদি শব্দমালায় বর্ণনা করা হয়। বলা হয়ে থাকে, রক্তই যদি স্বাধীনতার মূল্য হয়, তবে বাঙালি জাতি সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছে। ১৯৮১ সালের ডিসেম্বর মাসে সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘােষণার তেত্রিশতম বার্ষিকী রিপাের্টে বলা হয়, বিশ্বের ইতিহাসে যে সমস্ত গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে; তারমধ্যে স্বল্পতমসময়ে সর্বাধিক সংখ্যক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের গণহত্যায়। নিষ্ঠুরতার দিক দিয়েও এই হত্যাযজ্ঞের তুলনা নেই। এই বর্বরতায় ঘাতকবাহিনীর সমান নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছিল তাদের এ দেশীয় দালাল শান্তি কমিটি, জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, আল-বদর, আলশামস, মুজাহিদ, রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা। পৃথিবীর দেশে দেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের পর অজ্ঞাতনামা শহীদদের উদ্দেশ্যে স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা হয়েছে, আর তালিকা তৈরি করে সুচিহ্নিত করা হয়েছে স্বাধীনতাবিরােধীদের। আমাদের দেশে হয়েছে ঠিক তার উল্টো” (৩৫/৯-১০)। 

 “প্রতিটি দেশেই জাতীয় চেতনাবিরােধী কিছু লােক থাকে। জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে এরা ঘরশত্রু বিভীষণ’এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আমাদের দেশও এ-থেকে ব্যতিক্রম নন। ২৫ মার্চ ১৯৭১ হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর প্রথম সুযােগেই কিছু লােক হানাদারদের সহযােগিতা করার জন্য এগিয়ে যায়। ওরা প্রথমে শান্তি কমিটি’, পরে আল-বদর, রাজাকার, আল-শামস্ প্রভৃতি ঘাতকবাহিনী গড়ে তােলে। এই সহযােগীরা (কোলাবরেটর) সাধারণভাবে | ‘দালালরূপে পরিচিতি পায়। মুক্তির উষালগ্নে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ বুদ্ধিজীবীদের নিধন ছিল ওদের বাংলাকে মেধাহীন করার কৌশল।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর 

  ২৩১ 

  নাৎসিদের বিচারের অভিজ্ঞতায় কেউ কেউ বার্ট্রান্ড রাসেল, জ্যা পল সার্তে, আন্দ্রে মালরাে প্রমুখ বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বদের নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেন। স্বয়ং শেখ মুজিব বলেন : পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে নির্বিচার গণহত্যা করেছে, তার অনুসন্ধান ও ব্যাপকতা নির্ধারণের জন্য আমি জাতিসংঘের নিকট আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের আবেদন জানাচ্ছি। যারা অন্যায়ভাবে আমাদের মানুষদের মেরেছে, তাদের অবশ্যই বিচার হবে”(৩১/৬৪)। 

 গােলাম মুরশিদ লিখেছেন,“দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার মাসখানেক পরেই- ২৪ জানুয়ারি দালাল আদেশ জারি করা হয়েছিলাে। এই আদেশ অনুসারে হাজার হাজার দালাল গ্রেফতার হয়। ৩রা অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে ঘােষণা করেন যে, তখন পর্যন্ত ৪১হাজার ৮শ’ দালাল এই আইনের অধীনে আটক করা হয়েছে। তখন যদি শ খানেক দালালেরও যথার্থ বিচার এবং তাদের অমানবিক আচরণের জন্য কঠোর শাস্তি হতাে,তা হলে বাংলাদেশে অতাে দ্রুত পাকিস্তান প্রেম উথলে উঠতাে বলে মনে হয় না। দালালরা মুক্তিযােদ্ধা জিয়ার জাতীয়তাবাদী দলের উঁচু আসনে বসতে পারতাে না; দেশের মন্ত্রীর আসন পেতাে না। তাঁদের একজনের ফাঁসি হলাে না অথবা দীর্ঘমেয়াদি জেল হলাে না, এরচেয়ে বড়াে অবিচার আর কী হতে পারে? তবে কেবল শেখ মুজিব নিজেই এই দালালদের শাস্তি না হওয়ার জন্য দায়ী ছিলেন না। বাংলাদেশ যে ছােট্ট একটি দেশ এবং এখানে আত্মীয়তার বন্ধন জোরালাে ভূমিকা পালন করে   তাও এর জন্য দায়ী। সবাই সবার আত্মীয়, নিদেন পক্ষে দূর সম্পর্কের আত্মীয়” (২/২০০-২০১)। বঙ্গবন্ধু প্রায়ই বলতেন, “যদি, এক ভাই দালাল তাে আর এক ভাই মুক্তিযােদ্ধা। প্রত্যেক পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তাদের ক্ষতি বাড়াতে চাই না” (৩১/৯৪)। বাংলাদেশের সামাজিক-পারিবারিক পরিমণ্ডলে এখনাে দেখা যায়, একই পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে সক্রিয়ভাবেই জড়িত থাকেন। এখানে আদর্শের প্রশ্নটি আদৌ বড় নয়, পারিবারিক কুশলী-বিভাজনের বড় কথা হচ্ছে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনেও পারিবারিক সম্পত্তি-প্রভাব-প্রতিপত্তি অক্ষুন্ন রাখা। দালাল-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ এবং ব্যর্থতা, পরবর্তী সময়ে সাধারণ ক্ষমা ঘােষণা  ইত্যাদির বিস্তারিত আলােচনা এখানে তেমন প্রাসঙ্গিক নয়। তবে বলা দরকার, দালাল রাজাকারদের বিচারের প্রত্যাশা এবং ব্যর্থতার বিষয়টিকে সরলীকৃত দৃষ্টিতে না দেখাই সঙ্গত, অনিবার্যভাবেই এর সাথে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির বহুমুখী জটিলতা। তখনকার সামগ্রিক পরিবেশ-পরিস্থিতি মনে রেখেই সমালােচনা-বিরূপতা করতে হবে। অন্যথায়, ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যার আশঙ্কা থাকবেই। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর ১২জানুয়ারি ১৯৭২, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “ললামহর্ষক হত্যাকাণ্ডের কাহিনী আমি 

  ২৩২ 

  শুনেছি। তবু বাংলার মানুষ এত নিচে নামবে না (প্রতিশােধপরায়ণ হবে না), বরং যা মানবিক তা-ই করবে। তবে অবশ্যই আইনানুযায়ী অপরাধীদের বিচার হবে” (৩১/৬৭)। কিন্তু তারপরেও এ কথাই সত্য যে, বঙ্গবন্ধু দালাল-যুদ্ধাপরাধীদের যথাযথ বিচার করতে পারেননি। প্রশ্ন হচ্ছে, মুজিব কি কোনােরকম ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থচিন্তায় দালাল-যুদ্ধাপরাধী বিচারে অনিচ্ছুক ছিলেন নাকি বাস্তবতাই তাঁকে দুর্বলতা প্রদর্শনে বাধ্য করেছিল? 

 সাংবাদিক ম্যাসকারেনহাস উল্লেখ করেছেন, দালাল-রাজাকারদের বিচারের লক্ষ্যে জারিকৃত “আইনও দেশে গােলযােগ আর গণমানুষের হয়রানির হাতিয়ারে পরিণত হল। বহু সক্রিয় হানাদার বাহিনীর দালালও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব পেল। অন্যদিকে বহু নির্দোষ ব্যক্তিও ক্ষমতাসীনদের ব্যক্তিগত রােষানলে পড়ে সর্বস্ব হারাল। এমনকি, যে কোর্টে দালালির অভিযােগে রাজাকার, আল-বদর প্রভৃতির বিচার ও দণ্ডাদেশ প্রদান করা হত, সে-কোর্টের হাকিম নিয়ােজিত হয়েছিলেন রাজাকার সর্দার”। জনৈক ভুক্তভােগীর ভাষায়, “সারাদেশে এই এক নতুন অত্যাচার ও সন্ত্রাস শুরু হয়েছে। কারাে বিরুদ্ধে শত্রুতা উদ্ধার করতে হলে, সে একজন ‘কোলাবরেটর এই অপবাদ দেওয়াই যথেষ্ট। একাত্তরের রাজাকাররাই এখন কোলাবরেটর খুঁজে বেড়াচ্ছে .আসল কোলাবরেটর যারা, তারা দিব্যি সরকারের কাছাকাছি চলে গেছে” (৩১/৯০)। রাজনৈতিক এ অপরাধের দায়টা একান্তভাবেই রাজনীতিবিদ এবং তাদের সহযােগী-সহচরদের। 

 দালালদের বিচার পদ্ধতি এবং দালাল আইনের ত্রুটি প্রসঙ্গে ২৩ জুলাই দৈনিক বাংলা’য় ‘দালাল আইন সংশােধনের প্রয়ােজন  নামক নিবন্ধে বলা হয়েছিল, “পুলিশের সংখ্যা এমনিতেই অপ্রতুল। তদুপরি ‘কোলাবরেটর অ্যাক্টে’ অভিযােগ তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছে শুধু থানার ওসিকে। কিন্তু ওসির পক্ষে একা অসংখ্য মামলা তদন্ত করা এক প্রকার অসম্ভব। তাছাড়া, দালাল আইন বিশেষজ্ঞদের কিছু মন্তব্য রয়েছে। তারা বলছেন, দালাল আইন করা হয়েছে একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে সংঘটিত অপরাধের বিচার করার জন্য। কাজেই সে অপরাধ প্রমাণের জন্য থাকতে হবে সাক্ষ্যপ্রমাণের বিশেষ ধরন। কিন্তু বর্তমান আইনের সাক্ষ্যপ্রমাণের জন্য অনুসরণ করতে হয় একশ বছরের পুরনাে ‘ইভিডেন্স অ্যাক্ট । ফলে অপরাধ প্রমাণ করা হয়ে উঠেছে অনেক ক্ষেত্রে দুঃসাধ্য” (৩১/৯৩)। তৎকালীন আমলাতন্ত্র প্রসঙ্গে যথার্থই বলা হয়, “স্বাধীনতার পরপরই মুজিবনগর সরকার কন্টিনিউয়েন্স অব সার্ভিসেস অর্ডার’ জারি করে পাকিস্তানের পরাজিত প্রশাসনের অংশ এবং পাকিস্তান মেইড’ আমলাতন্ত্রকে ক্ষমতায় পুনর্বহাল করেন। এদের অনেকেই জাতীয় নীতি প্রভাবিত করার মতাে গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষপদ দখল করে। কিছু কিছু উচ্চপদস্থ বাঙালি 

  ২৩৩ 

  ছিলেন যারা ওই বিচারে ফেঁসে যাবার ভয়ে ভীত ছিলেন। ফলে তাদের কুকর্ম প্রকাশিত হবার আগেই তারা এ বিচারানুষ্ঠান বন্ধ করতে তৎপর হন”(৩১/৯৩)। অভিযােগ উঠেছিল পরাজিত পাকিস্তান বাহিনীর বাঙালি সৈনিক ও সেনাকর্মকর্তাদের পুনর্বাসন-পদায়ন সম্পর্কেও। অনস্বীকার্য প্রশ্ন, ‘শূন্য থেকে শুরু বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত এবং স্থানচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এবং বিধ্বস্ত রাষ্ট্রকাঠামাের পুনর্গঠন করার কাজগুলির দিকে সীমিত শক্তি-সম্পদ নিয়ােগের বদলে, নতুন আইন প্রবর্তন এবং পুলিশ-বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধির অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা কি আদৌ সম্ভব ছিল? 

 বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা, প্রায় এক কোটি শরণার্থীর ভরণপােষণ এবং সরাসরি যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ভারতের অর্থনীতির ওপর যে চাপ পড়েছিল, তারপরে কমবেশি এক লক্ষ যুদ্ধবন্দিদের জন্য প্রয়ােজনীয় ব্যয়-বিধান করা যথার্থই অসম্ভব বােঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সুতরাং ভারত স্বাভাবিকভাবেই যথাশীঘ্র একটা সমাধানের পথ খুঁজছিল। তদুপরি ছিল পাকিস্তানে আটক বেশ কয়েক হাজার সামরিক ও বেসামরিক বাঙালির পুনর্বাসনের প্রশ্নটি। বিষয়টিকে ভুট্টো স্বভাবতই যুক্ত করেছিলেন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি বিনিময়ের সাথে। বাংলাদেশের ভেতরেও পাকিস্তানে আটকে-পড়া বাঙালিদের যথাশীঘ্র ফেরত আনার ব্যাপারে সরকারের ওপর মানবিকনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। সবমিলিয়ে অনস্বীকার্য যে বাঙালি প্রত্যাবাসন এবং যুদ্ধবন্দি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়গুলি কার্যতই একসূত্রে গাঁথা আন্তর্জাতিক বিষয় হয়ে উঠেছিল। 

 ডিসেম্বর ১৯৭৩, আব্দুল গাফফার চৌধুরীকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন তিনি শীঘ্রই যুদ্ধাপরাধীদেরকে সাধারণ ক্ষমা ঘােষণা করে ছেড়ে দেবেন। বিস্মিত গাফফার চৌধুরী প্রশ্ন করেছিলেন, ‘পালের গােদাদেরকেও ছেড়ে দেবেন? বঙ্গবন্ধু বললেন, “হ্যা। সকলকে। কেবল যাদের বিরুদ্ধে খুন, রাহাজানি, ঘরে আগুন দেয়া, নারী হরণ বা ধর্ষণ প্রভৃতির অভিযােগ রয়েছে, তারা ছাড়া পাবেন না”। অতঃপর বিষন্ন কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “সকলকেই ছেড়ে দিতে হবে। আমিতাে চেয়েছিলাম নব্বই হাজার পাকিস্তানি সৈন্যদের ছেড়ে দিয়ে অন্তত ১৯২জন যুদ্ধাপরাধী অফিসারের বিচার করতে। তাও পেরেছি কি? আমি একটা ছােট্ট অনুন্নত দেশের নেতা। চারিদিকে উন্নত ও বড় শক্তির চাপ। ইচ্ছা থাকলেই কি আর সব কাজ করা যায়”? (১১/১৩-১৪)। ২৬ মার্চ, ১৯৭৫ তারিখে সােহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রদত্ত স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে অত্যন্ত ব্যথিত কণ্ঠে মুজিব বললেন, “আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করব। আমি প্রতিশ্রুত ভঙ্গ করেছি। আমি তাদের বিচার করিনি। আমি তাদের ক্ষমা করেছি। কেন না আমি এশিয়া ও বিশ্বের বন্ধুত্ব। চেয়েছিলাম” (৩১/৯৫)। 

 পৃষ্ঠাঃ২৩৪ 

  ইতিহাসবিদ এ. এল. খতিবের একটি প্রণিধানযােগ্য মন্তব্য : “মুজিব মস্তিষ্কের চেয়ে হৃদয় দ্বারাই বেশি চালিত হতেন। তিনি রেগে গেলেও শীঘই ক্ষমা করতেন এবং কারাে উপর রাগ করলেও দয়া দিয়েই ক্ষতিপূরণ করতেন”। ভুট্টোও জানতেন “ইমােশন্যাল এপ্রােচে মুজিবকে কাবু করা যায়। বঙ্গবন্ধুর দূরের-কাছের অনেকেই সুযােগের অপব্যবহার করেছেন, এ-সত্য অনস্বীকার্য বটে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করার জন্য প্রভূত সমালােচনাও হয়েছে মুজিবের। তবে অবশ্যই মনে রাখা দরকার, এসব সমালােচনার অনেকগুলিই যেমন ছিল উদ্দেশ্যমূলক রাজনীতির কথা তেমনি অনেকগুলি একান্ত বাস্তব কারণেই ছিল ভুক্তভােগীর মর্মান্তিক বেদনার প্রকাশ। প্রকৃত বেদনার্ত সমালােচনার তিনটি মাত্র উদাহরণ এখানে উল্লেখ করছি। 

 শহীদ-জননী জাহানারা ইমাম অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমকে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু “আমাদের অবিসংবাদিত নেতা সবাই তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। তাকে আমরা প্রাণের চেয়ে বেশি ভালােবাসি। ক্রমে তিনি দেশের সবচেয়ে বড়াে নেতা হয়েছেন। শেখ যখন (স্বাধীনতার পরে) এলেন, তখন আমার মনে হয় যে, তিনি দেশবাসীর, মুক্তিযােদ্ধাদের মােকাবিলা করতে পারছেন না। আসল মুক্তিযােদ্ধাদের বলা হলাে যে, তােমরা অপেক্ষা করাে কিংবা তােমরা নিজের স্কুলকলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাও। অনেক ভুয়া মুক্তিযােদ্ধা সার্টিফিকেট পেয়ে গেলাে। কতাে সােনার ছেলে, কতাে তরুণ -যাদের মনের মধ্যে ছিল আদর্শ, চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন- মৃত্যুবরণ কছে। কয়েকটা ভুলও বােধ হয় ওই সরকার করেছিল। যেমন দালালদের ক্ষমা করে দেওয়া হলাে। তারা তখন জেলে রয়েছে, কেউ লুকিয়ে রয়েছে। ক্ষমা করে দেওয়ার পর তারা বেরিয়ে এসে বেশ কিছুদিন মাথা নিচু করে থাকলাে। আস্তে আস্তে নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করতে লাগলাে। তখন যদি ওই দালালদের শেষ করে দেওয়া যেতাে, তা হলে তারা তাে এই ক্ষতি করতে পারতাে না” (২/২০৯)। ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে আল-বদরের হাতে শহীদ তিন ভাইয়ের (বদিউজ্জামান, শাহজাহান, ও করিমুজ্জামান) পরিবারের অভিভাবক মুক্তিযােদ্ধা শামসুল হুদা পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন : “রাষ্ট্রপ্রধান কাউকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু যারা লাখ লাখ স্বাধীনতাকামী লােককে হত্যা করেছিল, তাদের ক্ষমা করে দেওয়া অমার্জনীয় অপরাধ ছিল।  চরম ভুল সিদ্ধান্ত”(২২/৮৯)। শহীদ আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী সারা মাহমুদ বলেছিলেন, “১৯৭১সালে পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে মিলে যারা একর পর এক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, তারা আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে একইভাবে কাজ করছে। আর এটা ঐ সাধারণ ক্ষমারই ফল” (৩১/৮৯)। 

 স্বার্থান্বেষী নানা মহল থেকেই হামেশা বলা হয়, শেখ মুজিব নিজেই যখন সাধারণ ক্ষমা ঘােষণা করে গেছেন, তখন বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট 

 পৃষ্ঠাঃ২৩৫ 

  সরকার কর্তৃক একাত্তরের মানবতাবিরােধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগটি নিতান্তই নিরর্থক শত্রুতা মাত্র। কিন্তু এ কথা কি আদৌ সত্য? এবার পেছন ফিরে সে তথ্য-সত্যের দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। সাধারণ ক্ষমা ঘােষণা’র আগেও একাধিকবার নানা শর্তসাপেক্ষ দালাল আইনের পরিবর্তন এবং বিভিন্ন অপরাধীকে ক্ষমা করা হয়েছে। কিন্তু “শর্তসাপেক্ষ ক্ষমা প্রদর্শনেও পরিস্থিতির খুব ইতরবিশেষ ঘটেনি। হাজার হাজার লােক বিনা বিচারে আটক হয়ে রইল। পােষ্যরা মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছিল। দেশের পত্র-পত্রিকায় এ-সম্পর্কে বিরূপভাবে লেখা হচ্ছিল। মওলানা শামসুল হক (পাঁচবাগী) ও মওলানা ভাসানীও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাপ্তাহিক হলিডে’সহ বেশকিছু পত্রিকায় এ নিয়ে লেখা হয়। দালাল মশিউর রহমান যাদু মিয়া হাজত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সংবর্ধনা সভায় বিপ্লবী রাশেদ খান মেনন প্রমুখ পর্যন্ত তাকে আটক রাখার জন মুজিব সরকারের সমালােচনা করেন। সব মিলিয়ে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, পিছু হঠতে হঠতে আওয়ামী লীগ সরকার ৩০ নভেম্বর ১৯৭৩ নরহত্যা ও ধর্ষণকারী ব্যতীত সকল দালালের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘােষণা করে। সাধারণ ক্ষমার ফলে ৩৬,৪০০ দালাল মুক্তিলাভ করে”(৩১/৮৬)। 

 ৩০ নভেম্বর ১৯৭০ স্বরাষ্ট্র দফতরের জারিকৃত ঘােষণার ১নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয় :“সরকার নরহত্যা, নারীধর্ষণ এবং অগ্নিসংযােগ অথবা বিস্ফোরকের সাহয্যে ঘরবাড়ি অথবা জলযান ধ্বংসের অভিযােগে অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ছাড়া বাংলাদেশ দালাল আদেশ (পি.ও নং৮, ১৯৭২) বলে যারা আটক হয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরােয়ানু অথবা হুলিয়া রয়েছে এবং যারা এই আইনে সাজা ভােগ করছেন তাদের সকলের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘােষণা করছেন”। আদেশেই বলা হয়েছিল, “যাদের অনুপস্থিতিতেই সাজা দেয়া হয়েছে অথবা গ্রেফতারি পরােয়ানা বা হুলিয়া ঝুলছে, তারা যখন উপযুক্ত আদালতে আত্মসমর্পণ করে ক্ষমা প্রার্থনা এবং বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘােষণা করবে কেবল তখনই তাদের বেলায় ক্ষমা প্রযােজ্য হবে”। ‘সাধারণ ক্ষমা ঘােষণাকালে বঙ্গবন্ধু মুজিব আন্তরিকভাবেই আশা করেছিলেন যে, “এসব লােক দীর্ঘদিন ধরে আটক রয়েছেন এতদিনে তারা নিশ্চয়ই গভীরভাবে অনুতপ্ত। তারা নিশ্চয়ই তাদের অতীত কার্যকলাপের জন্য অনুশােচনা করছেন। মুক্ত হয়ে দেশগঠনের পবিত্র ও মহান দায়িত্ব গ্রহণের পূর্ণ সুযােগ তারা গ্রহণ করবেন এবং তাদের সকল তৎপরতা ও কার্যকলাপ ভুলে গিয়ে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন”(৩১/২৭)। বঙ্গবন্ধু মুজিবের এই সৎ আশাবাদ কার্যতই ব্যর্থ হয়েছে। মুক্তি পেয়েই অপরাধীরা পুরনাে খেলায় মেতে উঠেছিল। 

  ২৩৬ 

  ১৯৭৪ খ্রি. মনুষ্য-সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ : 

 গণমৃত্যুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কথা 

  “মুজিবের দুর্ভাগ্য, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনও তাঁর আমলে ব্যাহত হয়েছিলাে।  ৭২সালের ভয়াবহ খরায় এপ্রিলে জুন মাসে প্রচণ্ড ঘুর্ণিঝড়ে প্রচুর ক্ষতি হয়েছিলাে ফসলের।  ৭৩ সালেও ডিসেম্বরে উকূলীয় জলােচ্ছ্বাসে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবচেয়ে প্রবল হয়ে দেখা দেয়  ৭৪-সালে। আগস্টে যে অসাধারণ বন্যা হয়, তাতে তলিয়ে যায় দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা। প্রায় এক কোটি টন ফসল নষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন দেশ খাদ্যশস্য দান করছিলাে ঠিকই, কিন্তু তা দিয়ে মানুষকে দু’ বেলা খাওয়ানাে যায়নি।  ৭৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। ১৯৪৩সালের পর এমন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ বাংলায় আর কখনাে হয়নি। জাতিসংঘের আহ্বানে অনেক দেশই এগিয়ে আসে খাদ্য সাহায্য নিয়ে, কিন্তু সে সাহায্য পর্যাপ্ত ছিল না। এর মধ্যে আবার বাংলাদেশকে ‘শিক্ষা দেওয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুত সাহায্য দেরিতে পাঠায়। যে-জাহাজ দুটি এই শস্য নিয়ে আসছিলাে, দুর্ভিক্ষ একেবারে দোরের গােড়ায় দেখতে পেয়ে, মার্কিন সরকার তা অন্য দিকে পাঠিয়ে দেয় (২/১৯১-১৯২)। 

 “১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সিআইএ’র খাদ্য-রাজনীতির শিকার। মার্কিন খাদ্যশস্য সরবরাহকারী কোম্পানিগুলাে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত দুটি বড় চালানের বিক্রি বাতিল করে। পিএল-৪৮০ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে প্রদত্ত খাদ্যশস্য পাঠাতে দেরি করা হয়। কারণ দেখানাে হয়, কিউবার কাছে পাট বিক্রয় করার ফলে বাংলাদেশ সাহায্য পাওয়ার যােগ্য কিনা, তা নির্ধারণ করা প্রয়ােজন। যদিও একই সময় মিসর কিউবায় তুলা রপ্তানি করেছিল এবং মিসরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে পিছপা হয়নি। ১৯৭৪সালে ‘দুর্ভিক্ষ শব্দটা যতটা না ক্ষুধার্ত মানুষের জীবনে জড়িয়ে থাকল, তার চেয়ে হাজার গুণ প্রচার 

  ২৩৭ 

  করা হলাে সংবাদ মাধমে। প্রচার কাজেও সাম্রাজ্যবাদের গােয়েন্দা সংস্থার পােষ্য লােকজন। প্রচার করতে থাকে ‘হায় দুর্ভিক্ষ’ ‘হায় দুর্ভিক্ষ। কিন্তু কেন দুর্ভিক্ষ? কারা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে? তা একবারের জন্যও ভাবলাে 

 গুজবপ্রিয় দেশের মানুষ”(২২/১২২-১২৪)। 

 “মজুদকারীরাও দুর্ভিক্ষের জন্য কম দায়ী ছিলাে না। খাদ্যদ্রব্যের দাম হু হু করে বাড়ছিলাে” (২/১৯২)। “যখন দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে যায়, তখন ৫,৮৬২টি লঙ্গরখানা খুলে সরকার লাখ লাখ লােককে খেতে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাে। অবশ্য তা দিয়ে হাজার হাজার লােকের মৃত্যু ঠেকানাে যায়নি। ২২শে নভেম্বর খাদ্যমন্ত্রী জাতীয় সংসদে যে বিবৃতি দেন, জানা যায় যে, ততােদিনে সাড়ে সাতাশ হাজার লােক অনাহারে মারা গিয়েছিলাে। অপরপক্ষে, বেসরকারি হিসেবে মৃতদের সংখ্যা ছিলাে এক লাখেরও বেশি। দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ মুজিব শাসনের একটা বিরাট কলঙ্ক। জনগণের প্রতি তাঁর ভালােবাসা ছিল আন্তরিক, চিরদিন রাজনীতিও করেছেন জনগণকে নিয়েই। কিন্তু অর্থনৈতিক সঙ্কট, দুর্নীতি এবং দলীয় কোন্দলের ফলে তিনি জনগণ থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যান”(২/১৯৩-১৯৪)। 

 ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের সময় সরকারি লঙ্গরখানার মাধ্যমে প্রতিদিন ৪২লক্ষ বন্যার্তকে একবেলা সামান্য খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সরকারি লঙ্গর খানার পাশাপাশি, বিভিন্ন পুরাতন এবং নতুন সামাজিক-মানবিক সংগঠন নানা সূত্রে স্থানীয়ভাবে ত্রাণ-সহায়তা সংগ্রহ করে প্রতিদিন হাজার হাজার রুটি তৈরি করে বুভুক্ষু মানুষকে খাদ্য সরবরাহ করেছে। অপরদিকে, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র স্লোগানধারী জাসদ’ দেয়ালে দেয়ালে স্লোগান লিখেছিল : “হায়রে হায় বাংলাদেশ, রুটি খাইয়া হইলাম শেষ”। ১৯৭৪-এর মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষ এবং গণমৃত্যুর পেছনে অবশ্যই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পাক-মার্কিন ষড়যন্ত্র এবং সরকারি-বেসরকারি দলের কতিপয় নেতাকর্মীর অপকর্ম ইত্যাদির পাশাপাশি নীতি-নৈতিকতাহীন অপ-প্রচারও কম দায়ী ছিল না। ”ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব” ধরনের কবিতার কথাগুলােকেও জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে ইন্ধন যােগানাের অনুষঙ্গেই বিচার করতে হয়। তখন ষড়যন্ত্রমূলকভাবে প্রচারিত একটি সংবাদ-চিত্রের কথা : “কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারি এলাকার জেলেপাড়ায় শাড়ির পরিবর্তে জালা-পরা বাসন্তী আর দুর্গতির (সাজানাে) ছবি তুলেছিলেন দৈনিক ইত্তেফাক’এর ফটো সাংবাদিক । বাসন্তী উপাখ্যান তৈরি করেছিলেন রমনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। এসব ছবি-খবর ইত্যাদি জাতীয়-আন্তর্জাতিক চক্রান্তের যােগসাজশে পরিকল্পিত ছিল।  দেশে-বিদেশে ছবিটি নিয়ে আলােচনার ঝড় উঠেছিল। সেই সময় (বা এখনাে) শাড়ির তুলনায় জালের দাম ছিল অনেক বেশি। বােবা-মেয়ে-সাজানাে বাসন্তী (এবং দুর্গতি) কিন্তু ১৯৭৪সালে মারা যায়নি”(১(২)/১১২৭)। 

  ২৩৮ 

  বাংলাদেশের খাদ্য-সংকট নিয়ে আমেরিকার কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স, নিউইয়র্কের জার্নালে ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের প্রকৃত কারণ তুলে ধরা হয়। ফুড পলিটিকস্ শিরােনামের প্রতিবেদনে এমারথ চাইল্ড লিখেছেন, সিআইএ ‘খাদ্যই শক্তি  নামের নব্য মতবাদকে সামনে রেখে খাদ্য-রাজনীতি দ্বারা ক্ষমতা ও প্রভাব খাটানাের কৌশল উদ্ভাবন করেছে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ খাদ্য-রাজনীতির শিকার। প্রাণ হারিয়েছে হাজার হাজার মানুষ”(২২/১২২)। এসময়ই মার্কিন বিদেশমন্ত্রী কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে উপহাস করে বলেছিলেন “Bottomless busket”- কোনাে রকম সাহায্য করেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এখনাে কিসিঞ্জারের কটু-বাক্যটি বাংলাদেশে কোনাে কোনাে রাজনীতিবিদ উদ্দেশ্যমূলকভাবেই ব্যবহার করে থাকেন। জাতিসত্তার অবমাননার দিকটি তাঁরা মনেও রাখেন না। 

 প্রসঙ্গতই এ কথাও উল্লেখ্য যে, পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে, ১৯৯৮ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ায় ‘জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞবৃন্দ’ এক সুরেই লক্ষ লক্ষ লােকের মৃত্যুর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, গলা মিলিয়েছিলেন এ দেশের চেনামুখ রাজনীতিবিদবুদ্ধিজীবীরাও। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, নিজের মত করেই সে-সব বিশেষজ্ঞ-বুদ্ধিজীবী-আশঙ্কা চরম মিথ্যা প্রমাণ করতে পেরেছে। ১৯৭৪-এ বঙ্গবন্ধু পারেননি, কারণ, একসাথে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত মােকাবিলার শক্তি ছিল না বাংলাদেশের, প্রশাসন ছিল দুর্বল, ভৌত অবকাঠামাে বিধ্বস্ত, দুর্নীতি হয়ে উঠেছিল নতুন মহামারী। একটা অনভিজ্ঞ নতুন সরকারের পক্ষে, শুধু আন্তরিকতা দিয়ে সর্বগ্রাসী বিরূপতা সামলানাে যথার্থই অসম্ভব ছিল। 

  ২৩৯ 

  শাসনতন্ত্রের চতুর্থ সংশােধনী, ১৯৭৫ : 

 তথাকথিত একদলীয়  বাকশালী শাসন  

  স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সকল বেদনা-ব্যর্থতা, এমনকি বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের জন্যও বঙ্গবন্ধু-বিরােধীরা তাকেই দায়ী করে থাকেন। এক্ষেত্রে যে কারণগুলিকে তাঁরা চিহ্নিত করেন, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছে ‘বাকশাল’ ব্যবস্থাটি। প্রাসঙ্গিক সব কথার আগেই বলা দরকার, ব্যবস্থাটি কার্যকর করার আগেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে, সুতরাং ব্যবস্থাটির ভালাে-মন্দ সম্পর্কে বাস্তব পরীক্ষা কিংবা বস্তুনিষ্ঠ সমালােচনা করার মত অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেননি কেউই। বাকশাল’-কথায় পরবর্তী সময়ে, এমনকি এখনাে চায়ের টেবিল বা মাঠের বক্তৃতা গরম করেন যাঁরা, সকলেই বিষয়টির প্রেক্ষাপট এবং ভালােমন্দ সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত রয়েছেন বলে, ভাবার কোনাে কারণই নেই। বাংলাদেশের রাজনীতির কিছু কূটকৌশলী মানুষ এখনাে  বাকশাল’ বলে নিজেদের না-দেখা জুজুর ভয় দেখান অন্যকে। 

 ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ -‘বাকশাল (BAKSAL) পদ্ধতির শাসনব্যবস্থার প্রবর্তনকে বঙ্গবন্ধু বলতেন ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’, পরবর্তী সময়ে অনেকেই ব্যবস্থাটিকে বলেছেন ‘গণতন্ত্র-বিনাশী একদলীয় শাসন । একটি সাধারণ প্রশ্নের প্রেক্ষাপটেই বাকশাল সম্পর্কিত আলােচনা শুরু করা যেতে পারে : সমবায় সমিতিকে কি একক কর্তৃতুবাদী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হয়, নাকি বিবেচিত হয়। সমবায়ীদের যৌথ এবং সমন্বিত সিদ্ধান্তে পরিচালিত সংগঠন হিসেবে? যেকোনাে সমবায় ব্যবস্থায় যুক্ত হবার নিয়ম যেমন থাকে, থাকে যুক্ত না হবার এবং ছেড়ে যাবার নিয়মও। বাকশালও কি একেবারেই তেমন ছিল না? সমবায় ব্যবস্থাকে যদি সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলা হয়, বাকশাল ছিল এক নব-ধারার সামাজিকরাজনৈতিক পদ্ধতি। 

 পৃষ্ঠাঃ২৪০ 

  বাকশাল সম্পর্কে “মুজিবের সমসাময়িক বক্তৃতা থেকে যা জানা যায়, তা হলাে : রাজনীতিবিদ ও আমলাদের পারস্পরিক সন্দেহ দূর করা, আমলাদের দ্বারা রাজনীতিবিদদের মর্যাদা ক্ষুন্নকরণ বন্ধ করা, সমাজের ‘জ্ঞানীগুণী’ ও অন্যধরণের লােকদের সম্পৃক্ত করা। সামরিক, বেসামরিক, সরকারি, বেসরকারি কর্মচারী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যতদূর সম্ভব হয়, সবাইকে নিয়ে একটি নতুন দল, নতুন System-এর মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য স্থাপন করা। বলা হয়, প্রতিটি থানায় একটি প্রশাসনিক কাউন্সিল হবে। রাজনৈতিক কর্মী বা সরকারি কর্মচারী এর চেয়ারম্যান হবেন। বিভিন্ন বিভাগের সরকারি কর্মচারী, বাকশালের প্রতিনিধি, কৃষক, শ্রমিক, মহিলা এর সদস্য হবেন। এরাই থানা চালাবে। সব মহকুমা জেলা হবে। প্রত্যেক জেলায় একজন গভর্নর থাকবেন। সাংসদ, রাজনৈতিক কর্মী, সরকারি কর্মচারী এই গভর্নর হতে পারবেন। এই System চালু হওয়ার পর খারাপ হলে Rectiy করা হবে। মুজিবের ভাষায়, এটাও গণতন্ত্র   শােষিতের গণতন্ত্র। এখানে জনগণের ভােটাধিকার থাকবে। এটা আমাদের দ্বিতীয় বিপ্লব। লক্ষ্য দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানাে” (৩১/৫৯-৬০)। 

 মুজিবের প্রিয় প্রভাবশালী ছাত্রনেতা থেকে পােড়খাওয়া রাজনীতিবিদ আবদুর রাজ্জাকের পর্যবেক্ষণ, ১৯৭৪-এর অভিজ্ঞতাই মুজিবকে এধরনের চিন্তায় অধিকতর উদ্বুদ্ধ করেছিল, তদুপরি মণির পরামর্শও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে দলীয় সাধারণ সম্পাদক নীতিবান রাজনীতিক তাজউদ্দিন বাকশাল’ ধরনেণর কোনাে ব্যবস্থা আদৌ পছন্দনীয় মনে করেননি। মন্ত্রিসভা থেকে ১৯৭৪ সালে অপসারিত তাজউদ্দিন ১৯৭৫-এ একদলীয় শাসন প্রবর্তনের উদ্যোগের কথা জেনেই বঙ্গবন্ধুকে টেলিফোন করে বলেছিলেন, “মুজিব ভাই, এরপর বুলেট ছাড়া তাে আপনাকে সরানাের কোনাে উপায় থাকলাে না। ভাগ্যের পরিহাস, সেই বুলেটের অনিবার্য মুখেই মুজিব এগিয়ে যান ধীরগতিতে   নিজের এবং তাঁর মােশায়েবদের অজ্ঞাতে” (২০/২০৮-১০৯)। আজও কি এ কথা নিশ্চিত বলা চলে যে, বাকশাল প্রবর্তনের জন্যই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল? যদি তাই হয়, তাহলে মুজিব-হত্যার পেছনে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কথা ভুলে যেতেই হয়। তারপরেও প্রশ্ন এড়ানাে যায় না, বাকশালই যদি মুজিব-হত্যার কারণ হয়, তাহলে তাজউদ্দিন (প্রমুখের) হত্যার কারণ কি? 

 এস. এ. করিমের সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাতে “Normally a researved person, he (Tajuddin) did not hide his bittereness about the way things had gone wrong in Bangladesh.  .upon his arrival in Dacca he had publicly blamed the government for the economic crisis in the country Mushtaque told . Tajuddin had no right as a Cabinet Minister 

  ২৪১ 

  to criticise the policies of the government. He must resign and if he does not .he should be forced out of the government On 26 October (1974) Tajuddin resigned and retired to lead a quiet life” (৭/৩৪৫-৩৪৬)। এখানে। শুধু এটুকুই উল্লেখ্য যে, বাস্তব পরিস্থিতি এবং তথ্যপ্রমাণের বিচারে, মুজিব-হত্যার জন্য যেমন, জেল-হত্যা, তথা তাজউদ্দিন হত্যার জন্যও মােশতাক অবশ্যই ছিলেন। অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী এবং প্রত্যক্ষ অপরাধী। 

 ১৯৭৪ মে মাস থেকেই বিভিন্ন আলােচনায় মুজিবকে ‘প্রশাসনিক গণতন্ত্র এবং ‘রাজনৈতিক একনায়কতন্ত্র’   এ দুটি নতুন রাজনৈতিক পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার করতে দেখা যায়।  নভেম্বরে আওয়ামী লীগ দলের এক সভায় প্রসঙ্গক্রমে। মুজিব জানান যে, তার প্রস্তাবিত সাংধািনিক পরিবর্তনের ব্যাপারে যদি সংসদীয় দল বিরােধিতা উত্থাপিত করে, তবে জনগণের সঠিক রায় নেবার জন্য এর উপর গণভােট গ্রহণের ব্যবস্থা করবেন। বাকশাল গঠনের বিপক্ষে ছিলেন, এমন লােকের সংখ্যা আওয়ামী পরিবারে ছিল অতি নগণ্য। ১৮ জানুয়ারি ১৯৭৫  কেন্দ্রীয় নীতি-নির্ধারণী এক সভায় কেবল জেনারেল ওসমানী ও নুরে আলম সিদ্দিকী এর বিরােধিতা করেন। মুজিবের সামনে দাঁড়িয়েই ওসমানী বলেছিলেন, ‘আমরা আইয়ুব খানের মতাে কোনাে মুজিবুর খান দেখতে চাই না। পরে জাতীয় সংসদে ওসমানী ও ব্যারিস্টার মইনুল হােসেন এর বিরােধিতা করেন সংসদ থেকে পদত্যাগও করেন”(৩১/৫৭-৫৯)। একটা বিষয় নজর এড়াবার নয় যে, বঙ্গবন্ধুর মুখের ওপর অমন কঠিন কথা বলার পরেও বঙ্গবন্ধু এতটুকু ক্ষুব্ধ-বিরক্তি প্রকাশ করেননি। প্রসঙ্গত বঙ্গবন্ধুর কয়েকটি ভাষণের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা যেতে পারে। 

 সংবিধান সংশােধন উপলক্ষে ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে জাতীয় সংসদে প্রদত্ত বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন : “আজকে সংবিধান সংশােধন(৪র্থ সংশােধনী, বাকশাল) করে যে নতুন‘সিস্টিমে’ আমরা যাচ্ছি, এটাও গণতন্ত্র। এখানে জনগণের ভােটাধিকার থাকবে। এখানে আমরা শােষিতের গণতন্ত্র রাখতে চাই। সাম্প্রদায়িকতার বীজ বাংলার মাটিতে কোনােদিন আমরা ‘এলাউ করব না” (১(২)/১০১১)। ১৯ জুন ১৯৭৫ তারিখে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে চারটি প্রধান লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছিল- ১. দুর্নীতি দমন, ২. উৎপদন বৃদ্ধি, ৩. জন্ম নিয়ন্ত্রণ এবং ৪. জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। দারিদ্র-বিরােধী সমাজের বদলে একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তখন তার ধ্যান-জ্ঞান। সমবায়ের প্রণালীতে সর্বসাধারণ আপন শক্তিকে যখন ধনে পরিণত করতে শিখবে, তখনই স্বাধীনতার ভিত্তি মজবুত হবে। তিনি কো-অপারেটিভ গড়ার কথা বললেন। জমির মালিকানা থাকবে ব্যক্তিগত। সরকার হবে পার্টির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী। 

  ২৪২ 

  বঙ্গবন্ধু স্পষ্টতই বলেছিলেন :“সিস্টেম পরিবর্তন করেছি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটবার জন্য। সিস্টেম পরিবর্তন করেছি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবার জন্য। এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে, অফিসে না গিয়েও টাকা পাওয়া যায়। ফ্রি স্টাইলে চলছে সবকিছু। ফ্যাক্টরিতে গিয়ে কাজ না করে টাকা দাবি করে সাইন করিয়ে নেয়। যেন দেশে সরকার নেই। স্লোগান হলাে, বঙ্গবন্ধু কঠোর হও। বঙ্গবন্ধু কঠোর হবে। কঠোর ছিল, আছে। কিন্তু এত রক্ত, এত বাধা, এত দুঃখ দেখে আবদার করলাম, অনুরােধ করলাম, কামনা করলাম। চোরা নাহি শােনে ধর্মের কাহিনী”  .“আজকে যে সিস্টেম করেছি, তার আগেও বঙ্গবন্ধুর ক্ষমতা কম ছিল না। আমি বিশ্বাস করি না ক্ষমতা বন্দুকের নলে। বিশ্বাস করি, ক্ষমতা বাংলার জনগণের কাছে। জনগণ যেদিন বলবে, বঙ্গবন্ধু ক্ষমতা ছেড়ে দাও, বঙ্গবন্ধু একদিনও রাষ্ট্রপতি, একদিনও প্রধানমন্ত্রী থাকবে না। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতার রাজনীতি করে নাই। বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছে দুঃখী মানুষকে ভালােবেসে  শােষণহীন সমাজ কায়েমের জন্য” (২২/১২৫-১২৬)। 

 বঙ্গবন্ধুকে বুঝবার প্রয়ােজনেই আরেকটা উদ্ধৃতি দেয়া অপরিহার্য মনে করছি: “আমি ফেরেশতা নই। শয়তানও নই। আমি মানুষ। আমি ভুল করবই। আমি ভুল করলে আমার মনে রাখতে হবে, আই ক্যান রেক্টিফাই মাইসেলফ। আমি যদি রেক্টিফাই করতে পারি, সেখানেই আমার বাহাদুরি। আর যদি গোঁ ধরে বসে থাকি যে, না অামি যেটা করেছি সেটাই ভালাে, দ্যাট ক্যান্ট বি হিউম্যান বিয়িং। ফেরেশতা হইনি যে সবকিছুই ভালাে হবে। এই সিস্টেম ইন্ট্রোডিউস করে যদি দেখি যে খারাপ হচ্ছে, অলরাইট রেকটিফাই ইট। কেন না, আমার মানুষকে বাঁচাতে হবে। আমরা শােষণহীন সমাজ গড়তে চাই। আমরা একটা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি করতে চাই। উই ডু নট লাইক টু ইম্পাের্ট ইট ফ্রম এনিহােয়ার ইন দি ওয়ার্ল্ড। এটা আমার মত। মাটির মত” (২২/১২৬-১২৭)। 

 বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব “নিজে সৎ থাকলেও, দুর্নীতিবাজরা তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিলাে। এদের মধ্যে তাঁর কোনাে কোনাে আত্মীয়, স্বজন এবং দলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তাজউদ্দিন অথবা নজরুল ইসলামের মত ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিলেন। দরিদ্রদের দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার কারণ আর্থিক অনটন এবং আইনের শাসনের অভাব। কিন্তু প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দুর্নীতি করতেন লােভের বশবর্তী হয়ে”(২/১৯৬-১৯৭)। “ইতিমধ্যে বাইরের শত্রুরা চলে এসেছে। অন্দরমহলে। ষড়যন্ত্রের জালে ঘিরে ফেলে সারাদেশ। যেকোনাে মিথ্যা জনমানসে সত্য বলে বিশ্বাস করানাের জন্য ঘন ঘন উচ্চারণ (‘গােয়েবলসীয় প্রচার) করতে হয়। বিরােধীরা যত্নসহকারে সেই কাজটিই করল। নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির জন্মদাতা জাসদের জন্ম ৩১ অক্টোবর ১৯৭২। সরকারের নামে মিথ্যাচার ছড়ানাের 

  ২৪৩ 

  প্রধান মুখপত্র দৈনিক গণকণ্ঠ প্রকাশিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্থায়ী সরকারকে অসহযােগিতা করার প্রধান ব্যক্তি সিরাজুল আলম খানের পরামর্শে”(২২/১২৭-১২৮)। বাংলাদেশে তখন নেতিবাচক গুজব প্রচারের অনেক পত্র-পত্রিকা। একদার অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান মুখপত্র দৈনিক ইত্তেফাক, সম্পাদক মানিক মিয়ার মৃত্যুর পরে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে চরম নেতিবাচক ভূমিকা অনেক নিয়মিত পাঠককেই বিস্মিত এবং মর্মাহত করেছিল। মানুষ ব্যথিত-বিস্মিত হয়েছিল মওলানা ভাসানীর ‘হক-কথা  পত্রিকাটির চরম ‘নাহক’ প্রচারণাতেও। 

 তখন কোনাে কোনাে পত্রিকা সরকারের সমালােচনা করতে ভয় পেতাে, অপরদিকে কোনাে কোনাে পত্রিকায় নেতিবাচক অতিরঞ্জন আর গুজব প্রচারই হয়ে উঠেছিল মূল প্রতিপাদ্য। ক্ষুব্ধ হতাশায় বঙ্গবন্ধুকেও বলতে হয়েছিল, “বাংলাদেশকে ভালবাসবাে না, বাংলার মাটিকে ভালােবাসবাে না,  ‘বিকজ আমি ‘ফ্রি স্টাইল দিয়েছিলাম   যার যা ইচ্ছা তা লেখে, কেউ এ নামে বাংলাদেশকে ডাকে, ওনামে বাংলাদেশকে ডাকে, বাংলাদেশের নাম পর্যন্ত বলতে লজ্জা বােধ করে। সুতরাং ভাবা যেতেই পারে, গুজব-ছড়ানাে অসত্য-অসমীচীন খবরের উৎস বন্ধ করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, যাতে জনমনে অযথা আতঙ্ক ছড়ানাের পথ বন্ধ হয়। “৭৩ সালে স্বদেশ এবং হক-কথা’সহ তিনটি পত্রিকা নিষিদ্ধ করা হয়। . ৭৪ সালের ২০ শে নভেম্বর ‘প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স’ আইন পাস হয়। গণকণ্ঠ’ নিষিদ্ধ হয় পরের বছর ২৭শে জানুয়ারি। আর, ১৬ই জুন সরকারি আদেশ অনুযায়ী চালু রাখা হয় মাত্র চারটি জাতীয় পত্রিকা। অন্যগুলাের প্রকাশনা নিষিদ্ধ হয়। মােট কথা, সমালােচনার সকল দুয়ার খিল দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার” (২/২০৫)। 

 এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, বঙ্গবন্ধুর অন্যতম প্রিয়ভাজন “এনায়েতউল্লাহ খান সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘হলিডে  পত্রিকা স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে জোরালাে ভাষায় সমর্থন করেছিল।  ১৯৭৫ সালে বাকশাল কায়েম হওয়ার পর সংবাদপত্র প্রকাশনা বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকে পরামর্শ দেওয়ার জন যে তিনসদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠিত হয়, তার অন্যতম সদস্য ছিলেন এনায়েতউল্লাহ খান। বঙ্গবন্ধু চারটি পত্রিকা বাদে অন্য পত্রিকাগুলাে যে বন্ধ করে দিয়েছিলেন, তার পিছনে এনায়েতউল্লাহ খানের পরামর্শের বিষয়টি তিনি নিশ্চয় অস্বীকার করতে পারবেন না” (১(২)/১০৫৬)। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে এনায়েতউল্লাহ খানই হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর মস্ত সমালােচক। 

 “বঙ্গবন্ধু কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের অন্ধ সমর্থক ছিলেন না। সমসাময়িক আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিল তাঁর রাজনৈতিক মানস। তিনি উদারনৈতিক গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন বটে কিন্তু .গরিব-দুঃখী ও 

  ২৪৪ 

  খেটেখাওয়া মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে একটি শােষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার কথাও ভাবতেন। শুধুমাত্র দেশের কল্যাণের কথা ভেবেই বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটিয়ে বাকশাল কায়েম করেন।  বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন মতের মানুষকে এরমধ্যে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন যাতে সবাই এক জায়গায় সমবেত হয়ে সম্মিলিতভাবে দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করতে পারেন” (১(২)৭৬৬-৭৬৭)। বঙ্গবন্ধু গভীরভাবেই লক্ষ্য করেছিলেন, প্রত্যেক গােষ্ঠীই নিজ অবস্থান-মর্যাদা-স্বার্থ রক্ষায় যতটা সচেতন ততটাই সজাগ অপরের অধিকার অস্বীকার করতে। তাই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,“এক গ্রুপ আমরা পলিটিশিয়ান হয়ে গেলাম। এক গ্রুপ আমরা বুদ্ধিজীবী। এক গ্রুপ সরকারী কর্মচারি  কিন্তু একচুয়াল  যেটা ‘পিপল   একতাবদ্ধ করতে না পারলে সমাজের দুর্দিনে দেশের মঙ্গল হতে পারে না।  এই সন্দেহটা দূর করে সকলেই যে এক এবং সকলেই যে দেশকে ভালবাসে এবং মঙ্গল চায় এই পুল  আমি করতে পারি, যদি আমি নতুন একটা সিস্টেম’চালু করি, এটা নতুন দল সৃষ্টি করি   জাতীয় দল, যার মধ্যে এক মত, এক পথ, এক ভাব, এক হয়ে দেশকে ভালবাসা যায়। এজন্য আজ এটা করতে হয়েছে” (১(২)/৭৬৭)। বাকশাল নামক পদ্ধতিটি আদৌ কার্যকর করা হয়নি, অথচ প্রচণ্ড বিরূপ সমালােচনা করা হচ্ছে প্রায় চারদশক জুড়ে। আজ পরিচ্ছন্ন চিন্তায় পেছন ফিরে তাকালে কি মনে হয়, এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কোনাে রকম অবৈধ ক্ষমতালিপ্সা ছিল? অতঃপর নিজের মনের উত্তরের ভিত্তিতেই ভাবতে হবে, কারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করল, কেন করল? ততােধিক ভাবতে হবে আজো কারা এজন্য বঙ্গবন্ধুর সমালােচনা করে চলেছে? 

  ২৪৫ 

  এক নজরে বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল, ১৯৭২-১৯৭৫ : 

 বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি 

  বঙ্গবন্ধুর মন্দভাগ্য,মন্দভাগ্য বাঙালির, তাঁর স্বল্পকালীন শাসনামলেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে চরম ফসল-হানি ঘটে, তার সাথে যুক্ত হয়েছিল জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক চক্রান্ত। তারই পরিণামে দুর্ভিক্ষে কয়েক হাজার (সরকারি হিসেবে ২৭,৫০০) লােকের অনাহারে মৃত্যু ঘটে, আরাে পাঁচ-সাত হাজার মানুষ মারা পড়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতিজনিত সশস্ত্র সংঘাতে। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর তিন-সাড়ে তিন বছরের শাসনকাল বাংলাদেশের মানুষের জন্য কিংবা অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্যও আদৌ স্বস্তিতে কাটেনি। তবে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির বেদনাদায়ক অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে পাক-চীন-মার্কিন ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও আনন্দ-সংবাদও ছিল যথেষ্টই। সেগুলি মূলতই ছিল নবজাত বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র এবং সংগঠনসমূহের স্বীকৃতির সংবাদ। 

 ইতিহাসের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনােয়ার হােসেনের পর্যবেক্ষণ : “মুক্তিযুদ্ধের সময় ইসলামী বিশ্বের বাংলাদেশ-বিরােধী ভূমিকা, স্বাধীনতার পরে ইসলামী বিশ্বে পাকিস্তানের বাংলাদেশ-বিরােধী প্রচারণা এবং সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় নীতি   ইত্যাদির কারণে বাংলাদেশ ও ইসলামী বিশ্বের মধ্যে এক বিরাট মানসিক ব্যবধানের সৃষ্টি হয়েছিল। তবে পরিস্থিতি ও পরিবেশের প্রভাবে ক্রমান্বয়ে এ ব্যবধানের অবসান হয়”। প্রাসঙ্গিক আলােচনায় অধ্যাপক হােসেন বিস্তারিতভাবেই লিখেছেন, “সাংবিধানিকভাবে মুজিব সরকার ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। ১৯৭২-এর প্রথম সংবিধানে (ক) যাবতীয় সাম্প্রদায়িকতা, (খ) কোন একটি বিশেষ ধর্মের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার, এবং (ঘ) ধর্মের ভিত্তিতে পার্থক্য করার ঐতিহ্যকে বিলােপ করা হয়। ১৯৭১-এ ইসলাম ও ইসলামী সংহতির নামে যে নৃশংস বাঙালি নিধনযজ্ঞ চলেছিল,তার প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে এমনি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। বােঝা গিয়েছিল যে, রাষ্ট্রয় মূলনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ইসলাম 

  ২৪৬ 

  অনুপস্থিত থাকবে। এ-ধারণা বাস্তবে পরিণত হলাে যখন ১৯৭২-এ সরকার বাংলাদেশ-বিরােধী ভূমিকা গ্রহণকারী দক্ষিণপন্থী ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেন। তবে মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মহীনতা নয়, বঙ্গবন্ধু নিজেই তা মনে করেননি কখনই” (১(২)৬৭৯-৬৮০)। 

 হালিম দাদ খান বাংলাদেশের আন্তঃরাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি অর্জনের ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত একটি বছর-মাস ভিত্তিক তালিকা উপস্থাপন করেছেন (৩১/২২১-২২৩), যাতে দেখা যায় বঙ্গবন্ধুর শাসনামলেই বাংলাদেশ বিশ্বের ১১০টি রাষ্ট্র এবং ২৭টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি অর্জন করেছিল। তাতে এমন ধারণাই যুক্তিসঙ্গত যে, পাকিস্তানের প্রকট বিরােধিতা বা বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রের বা আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্যপদ লাভে কোনাে কার্যকর অসুবিধা ঘটেনি। পাক-মার্কিন-চীন অক্ষশক্তি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বাধা দিয়েছে। এদের সাথে সৌদি আরব এবং লিবিয়াও যুক্ত ছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এপ্রিল,১৯৭২-এ যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাওয়া গেছে। ফেব্রুয়ারি ১৯৭২, লাহােরে ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর যােগদান নিশ্চিত করতেই পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিল। তথাপি কোনাে কোনাে সূত্রে বলা হয়, মুজিব-হত্যার অব্যবহিত পরেই পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। 

 ইতিহাসের অধ্যাপক আবু মােঃ দেলােয়ার হােসেন উল্লেখ করেছেন, “মুজিব হত্যার ১২ ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের নতুন সরকারকে বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ ৫০ হাজার টন চাল, ১০ মিলিয়ন গজ সূতা এবং ৫ মিলিয়ন গজ নরম মসলিন উপহার দেওয়ার কথা ঘােষণা করে। পাকিস্তান সরকার ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলােকে ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশকে স্বীকৃতির উদাত্ত আহ্বান জানায়। পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, যেহেতু মােশতাককে ক্ষমতা গ্রহণে কেউ বাধা দেয়নি এবং জনগণ কর্তৃক তিনি সাদরে গৃহীত হয়েছেন, তাই মােশতাক সরকার আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্বীকৃতির সকল শর্ত পূরণ করছে। পরের দিন মন্ত্রিসভায় ভুট্টো বলেন,  প্রথমত, বাংলাদেশের ব্যাপারে অন্যান্য দেশের চেয়ে পাকিস্তানের বাড়তি নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। কারণ, আমরা একসময় একসঙ্গে একই রাষ্ট্র এবং একই মানসিকতাসম্পন্ন ছিলাম। পাকিস্তান সরকার একই দিন তার বিদেশের দূতাবাস ও মিশনগুলােকে বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে ভূমিকা রাখার জন একটি নির্দেশ জারি করে”(১(২)/৭১৫-৭১৬)। এখানে একটি প্রশ্ন করা যেতেই পারে, মুজিব-হত্যার পরবর্তী পরিস্থিতিতে ‘মােশতাক সরকার’এর প্রতি অতি দ্রুত সমর্থন এবং ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’এর প্রতি দ্রুত সমর্থন-সহযােগিতা প্রদানের পাকিস্তানি আহ্বানে বাংলাদেশের আদৌ 

  ২৪৭ 

  কোনাে লাভ হয়েছিল কি? তারচেয়েও বড় প্রশ্ন বাংলাদেশের অমন ‘অবৈধ’ নবনামকরণ করে পাকিস্তান কেন কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছিল? 

 প্রসঙ্গত গভীর ক্ষোভ-দুঃখ-লজ্জার সাথেই উল্লেখ করা দরকার, লন্ডন-প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক আব্দুল মতিন জানিয়েছেন, “বঙ্গবন্ধুকে হত্যার অব্যবহিত পর বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর ডালিম (শরিফুল হক) হত্যাকারীদের পক্ষ থেকে ঘােষণা করে : ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশ এখন থেকে একটি ইসলামিক রিপাবলিক” ((১(১)৪০৪)। সুতরাং বলাই বাহুল্য বাংলাদেশের ‘অবৈধ নব-নামকরণের ধৃষ্টতা  পাকিস্তান দেখিয়েছিল এক বাঙালি খুনির কথার সূত্রেই। ইতিহাসে বাংলাদেশ-বিরােধী ষড়যন্ত্র-অপরাধ-অপকর্মের অসংখ্য বিদেশী কূটনীতিক তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়, কিন্তু অনস্বীকার্য যে, সর্বক্ষেত্রেই জড়িত তথাকথিত, বাঙালি’ পরিচয়ধারী কিছু মানুষ। এটা মনে না রাখলে, মুজিব-হত্যার কথা বলি কিংবা বাংলাদেশের ইতিহাসের, বিচারে ভুল হবেই। ১৭৫৭ র পলাশীর করুণ ইতিহাসের জন্য ইংরেজ রবার্ট ক্লাইভ প্রমুখের আগ্রাসী মানসিকতাই শুধু দায়ী ছিল না, ততােধিক অপরাধী ছিল মীরজাফরদের লােভাতুর ষড়যন্ত্র। 

 ফেরা যাক মূল প্রসঙ্গে। সৌদি আরব (এবং সুদান) আর চীনের স্বীকৃতি এসেছে। বঙ্গবন্ধু-হত্যার অব্যবহিত পরেই, যথাক্রমে ১৬ এবং ৩১ আগস্ট ১৯৭৫ খ্রি.। সাধারণভাবে এ কথা অনেকেই বলেন যে, “পাকিস্তানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৬ আগস্ট সৌদি আরব এবং ৩১ আগস্ট বাংলাদেশকে চীনের স্বীকৃতি প্রদান পাকিস্তানের ওপর মােশতাক সরকারের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করে। মােশতাক ১৮ আগস্ট বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন অধ্যায় সৃষ্টির আহ্বান। জানান। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে বাংলাদেশে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলেও ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ ২৮ আগস্ট উপমহাদেশের নতুন বাস্তবতার আলােকে দুটি দেশের মধ্যে দ্রুত সম্পর্ক স্থাপনের তাগিদ দেয়” (১(২)/৭২০)। 

 বাংলাদেশকে সৌদি আরব ও চীনের সমর্থন প্রসঙ্গে প্রাক্তন আমলা শাহরিয়ার ইকবালের একটি মন্তব্য প্রণিধানযােগ্য। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় পাকিস্তানসহ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানকারী ১১০টি দেশের মধ্যে সৌদি আরব ছাড়া ইসলামী বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সকল দেশই ছিল। তার মৃত্যুর পর গণচীন ও সৌদি আরব বাংলাদেশকে (আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। প্রচলিত ধারণা যে, খন্দকার মােশতাক ক্ষমতা দখলের পরই এই দুইটি দেশ স্বীকৃতি দেয়। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়মে কোন দেশের স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্তটি স্বীকৃতিদানকারী দেশের। সরকার কতগুলাে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়ে থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর নতুন দেশের সরকারকে জানিয়ে দেয়া হয়। এই জানানােটি ‘Defacto Recognition নামে পরিচিত। আনুষ্ঠানিক পত্র অর্থাৎ ‘Dejure Recognition  কিছুদিন পর পাঠানাে 

 পৃষ্ঠাঃ২৪৮ 

  হয়। সৌদি আরব ও গণচীনের স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্তও অনুরূপভাবে হয়েছিল” (১(২)/২২০-২২১)। 

 শাহরিয়ার ইকবাল প্রাসঙ্গিক বিবরণে উল্লেখ করেছেন, “একদিন সন্ধ্যায় ভারতে অবস্থানকারী একটি আরব দেশের রাষ্ট্রদূত সৌদি আরবের তখনকার বাদশাহ ফয়সালের পাঠানাে কয়েকটি উপহার বঙ্গবন্ধুকে দিয়েছিলেন। একটি অতি মূল্যবান জায়নামাজ, একটি সােনার হাতঘড়ি এবং এক বাক্স খেজুর। বঙ্গবন্ধু আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, খেজুরের বাক্সটি যেন গণভবনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের খাওয়ার জন্য দেওয়া হয়। সােনার ঘড়িটি সরকারি তােসাখানায় সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়। জায়নামাজটি বঙ্গবন্ধুর পিতার জন্য তাঁর বাসভবনে পাঠানাের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সৌদি সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পরই বাদশাহ উপহার পাঠিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সাথে সৌদি আরবের সেই প্রথম যােগাযােগ। সরকারি চিঠিটি( Dejure Recognition) ২৯-৮-১৯৭৫ তারিখে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাঠানাে হয়েছিল। গণচীনের ঘটনাটিও অনুরূপ। হুমায়ুন কবীর তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘External Publicity’ বিভগের পরিচালক ছিলেন। একদিন তাকে গণভবনে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে ডেকে পাঠানাে হয়। অতি জরুরি এবং গােপনীয় কাজে তাঁকে হংকং যেতে হবে। বার্মায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কে. এম. কায়সার রেঙ্গুন থেকে হংকং হয়ে পিকিং যাবেন। সেখান থেকে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ-এন লাই-এর বঙ্গবন্ধুকে লেখা একটি চিঠি নিয়ে হংকংয়ে ফিরবেন। হুমায়ুন কবীর সেই চিঠি নিয়ে ঢাকায় ফিরবেন। হুমায়ুন কবীর নিষ্ঠার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দেয়া দায়িত্ব পালন করেছিলেন। চৌ-এন লাই সেই চিঠিতে বঙ্গবন্ধুকে জানিয়েছিলেন, গণচীন সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আনুষ্ঠানিক(Dejure Recognition) .পত্রটি ৩১-৮১৯৭৫ তারিখে বাংলাদেশ সরকারকে দেয়া হয়। খন্দকার মােশতাকের পাকিস্তানপন্থী পররাষ্ট্র সচিব সম্পূর্ণ ঘটনাটি নিখুঁতভাবে পাল্টে দিয়েছিলেন (১(২)/২২১-২২২)। 

 অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা লাভের। আনন্দ-গৌরব সত্ত্বেও সম্পদ-স্বজন-সম্ভ্রম হারানাের বেদনায় মানুষ ভারাক্রান্ত ছিল। প্রকাশ্য এবং গােপন জাতীয়-আন্তর্জাতিক চক্রান্ত জনমনে, এবং বিশেষত বঙ্গবন্ধুর মনেও নিদারুণ ক্ষোভ-দুঃখ-হতাশার সৃষ্টি করেছিল। এসব ষড়যন্ত্রেই বাংলাদেশে ঘটেছিল দুর্ভিক্ষ-গণমৃত্যু এবং গণহত্যাও। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব আর সরল-সহজ যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্যের কারণেই এ দুঃসময়ে অর্জিত বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি-সম্মান অর্জন ঠেকাতে পারেনি ষড়যন্ত্রকারীরা। কবির উপমায় পরিস্থিতিটা যেন যথার্থই ছিল,“দুঃখের তিমিরে .জ্বলে তব মঙ্গল আলােক”। 

  ২৪৯ 

  বাঙালির ইতিহাসের কলঙ্ক : 

 জাতির জনকের নির্মম হত্যাকাণ্ড, ১৯৭৫ 

  বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে আলােচনার শুরুতেই কিছু কথা বলা দরকার। সদ্য-স্বাধীন প্রায় বিধ্বস্ত বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের ‘অপ-শাসন, স্বজনপ্রীতি, অযােগ্যতা-অক্ষমতার কথাগুলি কোন কোন মহলে বহুল আলােচিত হয়ে থাকে। কারণ, এগুলি মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরােধী অপরাজনীতির প্রয়ােজন মেটায়। প্রসঙ্গত সবিনয়ে বলছি, প্রাজ্ঞ-প্রবীণদের জন্য নয়, বঙ্গবন্ধু মুজিবের প্রতি কৃতিত্ব-শ্রদ্ধা আরােপের অপ্রয়ােজনীয় উদ্দেশ্যেও নয়, তরুণ প্রজন্মের যারা সেই সময় এবং সংকটের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুকে জানতে আগ্রহী, নিম্নোদ্ধত দীর্ঘ প্যারাটি একান্তই তাঁদের প্রতি নিবেদিত। 

 “ভারত হতে প্রত্যাবর্তনকারী ১ কোটি লােকের পুনর্বাসন, ও দেশের অভ্যন্তরে ৩ কোটি ছিন্নমূল মানুষের জন্য খাদ্য সংস্থান, ৩ মাসের মধ্যে ভারতীয় সৈন্যদের ফেরত পাঠানা ও মুক্তিযােদ্ধাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ফিরিয়ে নেওয়া, মুক্তিযুদ্ধে নিহত ৩০ লাখ পরিবারকে আর্থিক সাহায্য ও ২লাখ নির্যাতিতা মা-বােনের দায়িত্ব গ্রহণ, চিকিৎসার জন্য পঙ্গু মুক্তিযােদ্ধাদের বিদেশ প্রেরণ, মুক্তিযােদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও নারী পুনর্বাসন বাের্ড গঠন, শিক্ষকদের, সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা দান, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ প্রণয়ন, ডঃ কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন ও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন, ১১ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, ৫৪ হাজার শিক্ষক নিয়ােগসহ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা পুনর্নির্মাণ, প্রতি থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও হাসপাতাল নির্মাণ এবং অস্থায়ী স্বাস্থ্যকর্মীদের স্থায়ী চাকরির মর্যাদা দান, জাতীয় সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৈবাহিনীসহ প্রতিরক্ষা বাহিনীকে জাতীয় মর্যাদায় পুনর্গঠন এবং কুমিল্লায় দেশের প্রথম সামরিক একাডেমি স্থাপন, পুলিশ, বিডিআর, আনসার ও বেসামরিক প্রশাসনের অবকাঠামাে গড়ে তােলা, পাকিস্তানে আটক প্রায় ৪ লক্ষ বাঙালিকে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসিত করা, ৭লক্ষ পাকিস্তানিকে ফেরত পাঠানাে, বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষার মর্যাদা 

  ২৫০ 

  বৃদ্ধি এবং জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলায় প্রথম ভাষণ দান, জাতি সংঘের সদস্যপদ ও আন্তর্জাতিক সংগঠনসহ ১৪০টি দেশের স্বীকৃতি লাভ অর্থনীতি পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কার্যক্রম যখন সুচারুভাবে সম্পন্ন প্রায়, কারখানায় ও ক্ষেতখামারে উৎপাদন বৃদ্ধি ও মুদ্রানীতির সংস্কারের ফলে দ্রব্যমূল্য যখন দ্রুত জনগণের ক্রয়ক্ষমতায় চলে এসেছে ঠিক তখনি দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র ও স্বাধীনতাবিরােধী শক্তি সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। দেশ নিক্ষিপ্ত হয় সামরিক অভ্যুত্থান ও স্বৈরশাসনের বেড়াজালে”। বিশ্ব ব্যাংকের ১৯৮৭সালের প্রণীত রিপাের্টে ১৯৭২-১৯৭৫ সালে অর্থাৎ বাংলদেশের সবচেয়ে সমস্যা সঙ্কুল ক্রান্তিকালে জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ৭ ভাগ। তা বঙ্গবন্ধুর আমলে গৃহীত পদক্ষেপেরই ফলশ্রুতি মাত্র। ১৯৭৫সালের প্রথম দিকে প্রতি সের চালের দাম ৪.৫০ টাকায় এবং মে মাসে ৩.৭৫টাকায় দাঁড়ায়”( ২১/১১৩-১১৫)। 

 উপরােল্লিখিত তথ্যাদির প্রেক্ষাপটে একান্ত আস্থার সাথেই বলা যেতে পারে, অসাফল্য-অপশাসনের জন্য নয় বরং অনস্বীকার্য কমিটমেন্ট এবং সাহস-সফলতার জন্যই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরও নির্ভার-নির্ভয় হতে পারেনি খুনিরা কিংবা দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা। তাদের ভয় ছিল, বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে যারা চরম সঙ্কটের মাঝেও মুক্তিযুদ্ধ সফল করতে পেরেছিলেন, তাঁরা অবশ্যই বঙ্গবন্ধু-হত্যার পরেও বাংলাদেশটাকে ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথে’ই নিয়ে যাবেন। সুতরাং একই গ্রুপের ঘাতকের হাতেই কারাবন্দি অবস্থায় প্রাণ দিতে হয়েছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী চারজন জাতীয় নেতাকেও। বাঙালির স্বপ্নের বাংলাদেশ কেন বাস্তব সত্য হয়ে উঠতে পারেনি, সে-কথা উপলব্ধি করতে হলে, আজ কিংবা আগামীকাল ভাবতেই হবে এসব হত্যাকাণ্ড এবং হত্যাকারীদের সংযােগ-পরিচয়ের কথাও। সুযােগসন্ধানী জ্ঞানপাপী হত্যাকারী এবং তাদের পেছনের ষড়যন্ত্রকারীদেরও ভাবতেই হবে, হত্যকাণ্ড ঘটিয়ে মুজিবকে অপসারণ করা গেছে, যেমন সবাইকে যায়, কিন্তু বাংলার মানুষের মন থেকে মুজিবকে অপসারণ করা যায়নি, সেটি আদৌ সম্ভব নয়। জীবিত মুজিব অপেক্ষা মৃত মুজিব ক্রমশ বিশালতর, প্রবলতর হয়ে উঠছেন। তারই প্রথম পর্বে ২০০৪ সালে মুজিব-হত্যার প্রায় ৩০ বছর পরে, বিবিসি-পরিচালিত জরিপে শ্রেষ্ঠতম বাঙালির আসনটি বাঙালিরাই নির্ধারণ করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য। মহাত্মা গান্ধীর নাম কি ঘাতকের গুলিতে মুছে গেছে ভারতের চলমান ইতিহাস থেকে, কঙ্গো থেকে লুলুম্বা কিংবা চিলি থেকে আলেন্দে? 

 মুজিব-হত্যার পরবর্তী সময়ে একেবারেই প্রত্যক্ষ ভিত্তিমূলক কিছু প্রশ্ন জেগেছিল মুজিব-অনুরাগী আব্দুল গাফফার চৌধুরীর মনে। আলােচনার প্রাসঙ্গিকতায় সেই প্রশ্নগুলি উদ্ধৃত করছি : “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কি জানতেন, তাকে হত্যা করার একটা বিরাট চক্রান্ত চলছে? তিনি কি জানতেন এই চক্রান্তে বিদেশীরা যেমন 

  ২৫১ 

  আছে, তেমনি আছে তাঁর নিজের দলের লােক? এই চক্রান্তের উদ্দেশ্য কি? শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা। না, বাংলাদেশেরও সর্বনাশ করা?”(১১/৯)। 

 এস, এ. করিমের পর্যবেক্ষণ : “What was virtually ignored by him (Mujib) was the likelihood of a deadlier threat from a better-armed and betterorganised body of men   the Army . With no threat to Bangladesh from across the border, the armed forces  perception that Mujib neglected them began when Rakkhi Bahini was created in February 1972 to fight the leftist insurgency and help in the restoration of law and order  When Mujib sent his second son Jamal, to recieve military training at Sandhurst in England, it was whispered that upon his return to Bangladesh, he would join their ranks for the sole purpose of keping a watch over them . Not surprisngly the cantonment voted overwhelmingly for opposition candidates during the 1973 elections” (১৭/৩৬৬)। 

 “এ কথা বললে অদ্ভুত শােনাবে যে, সেনা-সদস্যরা প্রায় সবাই মুক্তিযােদ্ধা হওয়ায়, তাও একটা সমস্যা সৃষ্টি করেছিলাে। মুক্তিযুদ্ধে তারা অংশ নিয়েছিলেন বিদ্রোহ করে। অর্থাৎ শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড, ভঙ্গ করে । এটা দেশের প্রতি তাদের ভালােবাসা এবং প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছিলাে। আবার, বিদ্রোহ করার এবং চেইন অব কমান্ড ভাঙ্গার মানসিকতাও জন্ম দিয়েছিলাে। যখনই তারা ছােটো অথবা বড়াে কোনাে অপরাধীকে ধরেছেন, তখন তাঁরা ওপর মহলের হুকুমে ছাড়া পেয়েছে। তার ওপর আবু তাহের, জিয়াউদ্দিন এবং জলিলের মতাে রাজনীতিসচেতন বহু সেনাসদস্যও ছিলেন   যারা ভিন্ন ধরনের সেনাবাহিনী গড়ে তােলার জন্য ভেবেছিলেন। মুজিব-হত্যার সবচেয়ে বড়াে নেতা ফারুকও এমনি এক ক্ষুব্ধ মেজর। মুন্সীগঞ্জে গিয়ে দারুনভবে তাঁর চোখে পড়ে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি। তখনই নাকি ফারুকের মনে হয় যে, জাতির পিতাকে হত্যা করবেন (২/২১১-২১২), পর্যবেক্ষণমূলক মন্তব্যটি গােলাম মুরশিদের। 

 হালিম দাদ খান লিখেছেন, মুজিব বলতেন, “আমরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মত একটা দানব সৃষ্টি করতে চাই না  বেগম মুজিবও সেনাবাহিনীর লােকদের ভীষণ ভয় করতেন। প্রহরারত সৈন্যদের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে তিনি স্বামীকে বলতেন, এ সমস্ত লােকেরা একদিন তােমার বিরুদ্ধে তাদের বন্দুক প্রয়ােগ করবে। স্বাধীনতা যুদ্ধকালেই সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ দেখা দেয়। সংসদ সদস্য ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করায় সামরিক অফিসাররা অ-খুশি ছিল এবং তারা ওসমানীকে এড়িয়ে চলত। মুজিববাহিনী সৃষ্টি তাদের অবিশ্বাসকে আরও বৃদ্ধি। করে। শফিউল্লাহ, জিয়া ও খালেদ মােশাররফ   এই তিনজনের মধ্যে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল”(৩১/১১১-১১২)। সুশৃঙ্খল নিয়ম এবং চেইন অব কমান্ড মেনে 

  ২৫২ 

  সেনাবাহিনী গড়ে তােলা সম্ভবত অসম্ভব ছিল মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে। বরং | মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কিছু অসন্তোষ-অস্থিরতার ধারাটাই বহমান থেকেছে এবং ক্রমশই প্রবলতর হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে। আবার সত্যের খাতিরেই মেনে নিতে হবে যে, একটা প্রবল রাজনৈতিক মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে (অথবা যদি বলেন, ঐতিহ্য নিয়ে) গড়ে উঠেছিল যে সেনাবাহিনী, তাতে নানা-রং-রাজনীতি ঢুকে গিয়েছিল জন্ম-মুহূর্তেই। 

 প্রসঙ্গতই প্রশ্ন জাগতে পারে, স্বদলীয় অনেক নেতাকর্মীর স্বজনপ্রীতি এবং অনাচারদুনীতির প্রতি কি মুজিবের সমর্থন ছিল কিংবা তিনি কি চোখ বন্ধ করে রাখতেন? শেখ সাদী জানাচ্ছেন, “বঙ্গবন্ধু দেখলেন দুর্নীতির নৈরাজ্যে সারা দেশে প্রাণদৈন্য। যতদিন না এই সমস্যা দূর হয়, ততদিন উন্নতির চেষ্টা ভিত্তিহীন। ১৯৭৫সালের ২১জুলাই বললেন, জনগণের সেবার জন্যই আমরা নির্বাচিত হয়েছি আজ আমার কাছে আপনারা তওবা করে যান যে স্বজনপ্রীতি করবেন না। ঘুষখােরদের সাহায্য করবেন না। মাত্র কয়েকটা লােকের জন্য বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ দূর করা যায় না। আমি এর প্রতিকার দেখতে চাই। .আমার কর্মী যারা আছেন, যারা আমার কথায় বন্দুক ধরে যুদ্ধ করেছিলেন, যারা আমার কথায় সবকিছু ত্যাগ করতে পারতেন, তাঁরা আমার একটা কথা রাখুন। ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করুন। ষড়যন্ত্রের জালে ঘিরে ফেলে সারা দেশ। আলােও আঁধারের দুই পথ সামনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানাে পাপ’ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত (কথাটি) বিশ্বাস করেছেন বঙ্গবন্ধু”(২২/১২৭-১২৯) 

 ১৯৭১ র ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে (২৬ মার্চ) বঙ্গবন্ধুকে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২নম্বরের বাসা থেকে গ্রেফতার করে সংবাদটি বিশ্ববাসীকে জানাতে (১০এপ্রিল) প্রায় দু সপ্তাহ বিলম্ব করেছিল ইয়াহিয়া খানের সেনা-আমলা চক্র। এ কথা আগেই বলা হয়েছে। অথচ মুজিব-হত্যার “তিন ঘণ্টার মধ্যেই মুজিবের মৃত্যু ও বাংলাদেশের পরিস্থিতির ওপর করাচি ও লাহােরের পত্র-পত্রিকাগুলাে বিশেষ বুলেটিন বের করে এবং রেডিও পাকিস্তান সকাল আটটার খবরে তা প্রচার করে”(১(২)/৭১৫)। আরাে উল্লেখ্য যে, “১৬ই আগস্ট উর্দু পত্রিকা ‘নওয়া-ই-ওয়াক্ত দীর্ঘ সম্পাদকীয়তে মােশতাককে পাকিস্তানের সঙ্গে একত্রিত হয়ে দেশের নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’ বা ‘পূর্ব পাকিস্তান ইসলামিক প্রজাতন্ত্র রাখার প্রস্তাব দেয়। পাকিস্তান টাইমস  এই পরিবর্তনের ফলে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম বাংলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করে। উর্দু দৈনিক ‘জং’ এক সম্পাদকীয়তে (১৮ আগস্ট) মন্তব্য করে, বাংলদেশের মানুষ পাকিস্তান ও পাকিস্তানি আদর্শের প্রতি বিদ্বেষী নয়। পত্রিকাটিতে মােশতাক সরকারকে মুজিব আমলের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভুলগুলাে শুধরে নিয়ে অনতিবিলম্বে সম্পর্ক স্থাপনেরও পরামর্শ দেওয়া হয়।  ১৭ আগস্ট রেডিও পাকিস্তানে প্রচারিত এক খবরে বাংলাদেশের নতুন সরকারের ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ’ নামকরণের প্রশংসা করে”(১(২)/৭১৬-৭১৭)। 

  ২৫৩ 

  ড. আবু মােঃ দেলােয়ার হােসেন আরাে উল্লেখ করেছেন, “২০আগস্ট লন্ডনে জামায়াতে ইসলামি প্রভাবিত ‘মিল্লাত  পত্রিকা ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পেছনে ভুট্টোর হাত রয়েছে বলে মন্তব্য করা হলে পাকিস্তান চিন্তিত হয়ে পড়ে।  অবশ্য মুজিব বিরােধীদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের সাক্ষ্যও এ ধারণাকে ঘনীভূত করে তােলে”(১(২)/৭১৭)। অপরদিকে ড. দেলােয়ার একথাও উল্লেখ করেছেন যে, “পাকিস্তানের (অন্যতম অখ্যাত পত্রিকা) আল ফাতাহ’র সম্পাদক ওয়াহাব সিদ্দিকী ২২ আগস্ট মুজিব-হত্যায় দুঃখ প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, মুজিব দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করার যথেষ্ট চেষ্টা চালান। কিন্তু দেশের অবস্থার যখন উন্নতি হচ্ছিল, ঠিক তখনই তিনি নিহত হন।  পাকিস্তানে ওয়াহাব সিদ্দিকীর সহমতের লােকের সংখ্যা হাতেগােনা। পকিস্তানের সরকারের সঙ্গে বিরােধী দলের বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরােধ থাকলেও বাংলদেশের নতুন সরকারের ব্যাপারে তাদের | মধ্যে মিলই ছিল বেশি”(১(২)/৭১৭-৭১৮)। 

 একান্ত স্বাভাবিকভাবেই “মুজিব হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ প্রকাশ করে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা স্বাধীনতা-বিরােধীরা। তাদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত লন্ডনে মুজিব হত্যাকাণ্ডের পরের দিনই তারা বাংলাদেশের হাই কমিশনার সৈয়দ আব্দুস সুলতানসহ স্বাধীনতাপন্থীদের দূতাবাস থেকে বের করে দেয়। বিক্ষোভকারীরা মুজিবের ছবি টেনে নামায় এবং তা ভেঙ্গে রাস্তায় ফেলে দেয়। গােলাম আযম জেদ্দা থেকে নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দানের জন্য মােশতাক ও ভুট্টোকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি পত্র পাঠান। পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে বাঙালি নেতা আহম্মদ আলী, খাজা খয়ের উদ্দিন, হামিদুল হক চৌধুরী, কামরুজ্জামান (বর্তমানে বিচারাধীন যুদ্ধাপরাধী), ও নসরুল্লাহ নামে একজন প্রাক্তন এমএনএ, সােহরাওয়ার্দীর কন্যা ও ভুট্টোর প্রাক্তন উপদেষ্টা আখতারি সােলায়মান ও ঢাকার নওয়াব খাজা হাসান আসকারি পাকিস্তান সরকারের বাংলাদেশের নীতিকে সমর্থন এবং মােশতাক সরকারের সাফল্য কামনা করেন। মূলত তাদের আগ্রহেই কনফেডারেশনের ইস্যুটি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ৯ সেপ্টেম্বর রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাকিস্তান বাংলাদেশ সংহতি পরিষদ’ নাম একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে”(১(২)/৭১৯)। 

 এবার মনােযােগ দেয়া যাক বঙ্গবন্ধু (এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবােধ) হত্যার জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটের দিকে। এখানে সামগ্রিকভাবে বিষয়টির উপলব্ধির তথ্য-ভিত্তি হিসেবে কয়েকটি সুদীর্ঘ নিবন্ধের সংক্ষেপিত অংশ উদ্ধৃত করবাে। প্রথমটি ইউরােপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি অনিল দাসগুপ্তের ‘মুজিব হত্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা  (১(৩)/১১৩২-১১৩৫)। দাসগুপ্ত লিখেছেন : “১৯৭১ সালে আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, দুনিয়ায় তাদের যে ক’জন দুশমন আছে, বাংলাদেশের শেখ মুজিব এদের অন্যতম। অন্য 

  ২৫৪ 

  দু’জন ছিলেন ভিয়েনামের রাষ্ট্রনায়ক থিউ ও চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দে। প্রতিশােধপরায়ণ কিসিঞ্জার তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে উৎখাত করার চক্রান্ত করেছিলেন। 

 মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফসুল্টজের ‘বাংলাদেশ : দ্য আনফিনিশড রেভুলেশন নামক গ্রন্থটি থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায় : “ক, আমেরিকান পররাষ্ট্র দপ্তরের অফিসাররা বলেছেন, যে চক্রটি মুজিবকে হত্যা করে, তাদের প্রতিনিধিগণ ১৯৭৪ সালের শরৎকালে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে এসে এ ব্যাপারে সাহায্য চায়। খ .ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের সি.আই.এ-এর ‘স্টেশন চিফ  ১৯৭৫সালের ১৫ আগস্ট অর্থাৎ মুজিব-হত্যার দিন পর্যন্ত চক্রান্তকারীদের সঙ্গে যােগাযােগ রক্ষা করে। চলেছে। গ, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মি. লিফসুল্টজকে জানিয়েছে যে, মাহবুব আলম চাষী, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, এ.বি.এস সফদার ছিলেন তখন মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সি.আই.এ-এর মুখ্য এজেন্ট। ঘ. ঢাকার সি.আই.এ-এর স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি বলেছেন,  আমাদের যােগাযােগটা এতাে ভাল ছিল যে, অভ্যুত্থানের খবর পেয়ে আমরা খুব শিগগিরই তা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে পেরেছিলাম। ঙ. চেরি স্বীকার করেন। যে, তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রে খবর পাঠান, তখনও অভ্যুত্থান চলছিল। পররাষ্ট্র দপ্তরের এই কর্মকর্তা আরাে বলেন, খন্দকার মােশতাক গংদের সঙ্গে এই যােগাযােগ ছিল ১৯৭১সালে, সেই কলকাতা থেকেই। ১৯৭১ সালে মােশতাক-চাষীদের সঙ্গে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে যােগাযােগ ছিল ১৯৭৫ সালেও তা অক্ষুন্ন ছিল। 

 “ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের জনৈক সিনিয়র অফিসার জানান, প্রস্তাবিত অভ্যুত্থান সম্পর্কে স্থানীয় ষড়যন্তকারীদের সঙ্গে ১৫ আগস্টের (১৯৭৫) চার-পাঁচ মাস আগে থেকেই ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। ঢাকার মার্কিন দূতাবাস তিন দিন আগেই ১৫আগস্ট (১৯৭৫)ছুটির দিন বলে ঘােষণা করেছিল। এই দুটি ছিল তালিকা-বহির্ভূত ছুটি। আর এই দিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ঢাকার মার্কিন দূতাবাস জানত ঐদিন তাদের আজ্ঞাবহ সেনাবাহিনীর একদল চক্রান্তকারী অফিসার শেখ মুজিবকে হত্যা করবে”। 

 “বঙ্গবন্ধু-হত্যায় প্রত্যক্ষভাবে নেতৃত্বদানকারী মেজর ফারুক-রশিদরা যতই দাবি করুক -মুজিব হত্যার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত তাদের নিজেদের, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে। .ফারুক-রশিদরা মূল চক্রান্তকারীদের হাতের হাতিয়ার ছিল। এর বেশি কিছু নয়। এই হত্যাকাণ্ডের কন্ট্রোল-রুম ছিল ঢাকার মার্কিন দূতাবাস, তার প্রমাণ হল   মুজিব-হত্যার প্রথম ঘােষণা আসে ওয়াশিংটনের ভয়েস অব আমেরিকা থেকে। অভ্যুত্থানের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই দুনিয়াময় ভয়েস অব আমেরিকা’ অভ্যুত্থানের খবর ছড়াতে থাকে। ..ফিলিপ চেরি নিজেই স্বীকার করেছেন,  শেখ মুজিব হত্যার খবর তিনিই ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। ..১৪১৫ আগস্টের কালরাতে দূতাবাসের সিনিয়র অফিসাররা অফিসে রাত 

  ২৫৫ 

  কাটিয়েছেন। এই ঘটনাই (সব মিলিয়ে) প্রমাণ করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কলঙ্কময়ী রাতে ভাের পর্যন্ত না ঘুমিয়ে ঢাকা মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যাকান্ড পরিচালনা করেছিলেন। এই হত্যা ষড়যন্ত্রে মার্কিনিদের সাথে পাকিস্তান ও পশ্চিম এশিয়ার দু একটি মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশে তাদের ক্রীতদাসদের দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক, ঘটনাটি ঘটিয়েছে। নিহত হয়েছেন খেটে-খাওয়া দুঃখী মানুষের নেতা বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান”। 

 অতঃপর দু টি উদ্ধৃতি রবিউল আওয়ালের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ষড়যন্ত্রের শিকার’ শীর্ষক নিবন্ধ (১(২)১১২১) থেকে। “স্বাধীন বাংলাদেশে বিচিত্র খলনায়ক এই মােশতাক চরিত্র। মাথায় টুপি, মুখে মধু, মনভরা ছলনা। মােশতাকের চরিত্রে স্থিরতা বলে কিছু ছিল না। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নমিনেশন না পেয়ে সে আওয়ামী লীগ পারলামেন্টারি পার্টির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ও কৃষকশ্রমিক পার্টির সরকারে গিয়ে ঢােকে। তার রাজনৈতিক জীবন ছিল পরস্পরবিরােধিতা, আত্মপ্রতারণা ও ভণ্ডামিতে ভরা। সারাজীবন সে ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের সমর্থন যুগিয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য আওয়ামী লীগের প্রগতিশীল অংশটির সাথে থেকেছে। কারাে কারাে মতে   তাকে (আ.লীগের প্রগতিশীল অংশে) রাখা হয়েছিল। প্রতিক্রিয়াশীল গােষ্ঠী তাকে ট্রয়ের ঘােড়ার মত ব্যবহার করেছে। তার সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়। সে মাহবুব আলম চাষী, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর প্রমুখকে সাথে নিয়ে  ওয়াশিংটনের সাথে যােগাযােগ প্রতিষ্ঠা করে। মুক্তিযুদ্ধ বানচাল করে – পাকিস্তানের সাথে করফেডারেশন  গঠন করাই ছিল এই চক্রের লক্ষ্য। কোলকাতার সার্কাস অ্যাভিনিউ আর থিয়েটার রােড আমেরিকানদের সাথেই মােশতাক, হােসেন আলী, চাষী, ঠাকুরদের ঘন ঘন ওঠা বসা। এই দলের সাথে যুক্ত হয়েছেন কর্নেল ওসমানী। একটা ক্ষেত্রে মােশতাকের সঙ্গে কর্নেল ওসমানীর মিল। দু জনেই ভারতের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। দু’জনেরই মাখামাখি ব্রিটিশ ও আমেরিকান সাহায্য সংস্থার লােক, কূটনৈতিক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে। 

 ১০ জানুয়ারি ১৯৭২, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন বলেছিলেন, “আমরা একটি নতুন পদ্ধতির উন্নয়ন করতে যাচ্ছি, যা হবে বাংলাদেশপন্থী, ভারতপন্থী, পাকিস্তানপন্থী এবং সর্বোপরি শান্তিপন্থী”। নিক্সনের এ কথাটিকে ‘সােনর পাথরবাটি বানানাের খায়েশ ছাড়া আর কিছু বলা যায় কি? প্রকৃতপক্ষে নিক্সন সরকার তখন এসব কোনাে দেশের প্রতিই সহানুভূতিশীল বা আন্তরিকভাবে দায়িত্বশীল ছিল না। পাকিস্তানি সেনা-কারাগারে বঙ্গবন্ধুর বেঁচে থাকার বিষয়টিতে “মার্কিনিরা কৃতিত্ব দাবি করে। কিন্তু ঢাকায় তার বিজয়ীর বেশে প্রত্যাবর্তন তাদের গর্বে (এবং অবশ্যই আত্মবিশ্বাসে) আঘাত হানে। কিসিঞ্জারের সাবেক সহকারী রজার মরিস মনে করেন   ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের সময় বঙ্গবন্ধু যে বীরের সম্বর্ধনা পান, তা ছিল সম্ভবত 

  (কিউবার ফিদেল) ক্যাস্ট্রোর ট্যাংকে চড়ে হাভানায় প্রবেশের পর মার্কিন বৈদেশিক নীতির হতবুদ্ধিতার একমাত্র পর্ব”। 

 এ আলােচনায় প্রাসঙ্গিকতার কারণেই বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা, স্বাধীনতার ঘােষক জিয়া’র কথা কিছু উল্লেখ করতেই হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়া একজন সাধারণ মেজর হলেও দেশ স্বাধীন হবার পরই তার উন্নতির সদর দরজাটি খুলে যায়। কর্নেল-ব্রিগেডিয়ার-মেজর জেনারেল হলেন। ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপাধ্যক্ষ। আর বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে খুনিরা ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট তাকে একেবারে সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে বসিয়ে দিল। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের রাজদণ্ডটি কার্যত তার হাতে এসে গেল। জেনারেল জিয়া। অত্যন্ত কৌশলী ও সুচতুর ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর পথের কাঁটা একে একে সরাতে লাগলেন। সরকারি দলিলপত্রে প্রকাশ, ১৯৭৭ সালের ৯ অক্টোবর থেকে দু মাস কালের মধ্যে মােট ১,১৪৩ জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে লন্ডন থেকে প্রকশিত এক নিবন্ধে মার্ক টালি  বলেন, ব্রাদার অফিসারদের হত্যার নির্দেশ দেওয়ার আগে সে সারারাত জেগে কোরাণ তেলাওয়াত করে”। 

 “কর্নেল(অব) তাহের ছিলাে জিয়ার ঘনিষ্ঠ জনদের একজন। জীবনদাতা বললেও অত্যুক্তি হবে না। স্বার্থের তগিদে জে. জিয়া তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলাতে একটুও দ্বিধা করেনি”। ১৯৭৩ সালের গােড়ার দিকে টাঙ্গাইলে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একটি গােপন সম্মেলন। আলােচ্য বিষয় ছিল: বাংলাদেশের সে সময়কার রাজনৈতিক অবস্থা। বিভিন্ন দিক নিয়ে আলােচনার পর উপস্থিত নেতৃবৃন্দ একটি সিদ্ধান্তে আসেন। এই প্রশাসনকে পাল্টাতে হবে। কি ভাবে? জনৈক বীর গেরিলা যােদ্ধার জবাব : বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রেখে। জিয়ার এক্ষেত্রে উল্টো সুর। তিনি বললেন, না, তাহলে হবে না। মুজিবকে বাঁচিয়ে রাখলে সবকিছু পণ্ড হয়ে যাবে। এ প্রশ্নেই বৈঠক ভেঙ্গে যায়”। মুজিব-হত্যার পরে, ১৯৭৬ সালের ২ আগস্ট ব্রিটেনের আই-টিভি মুজিব-হত্যা সম্পর্কে মেজর ফারুক ও মেজর রশীদের একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করেছিল। ম্যাসকারেনহাস গৃহীত ঐ সাক্ষাৎকারে “ফারুক স্বীকার করে, ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যাবেলা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের জন্য মেজর জেনারেল জিয়ার সঙ্গে সে সাক্ষাৎ করে। জিয়াকে সে বলে, আমরা জুনিয়র অফিসাররা (মুজিব হত্যার) সব ঠিক করে ফেলেছি। আমরা আপনার সমর্থন ও নেতৃত্ব চাই। .জিয়ার মন্তব্য ছিল : ‘আমি একজন সিনিয়র অফিসার। এ ধরনের ব্যাপারে আমি জড়িত হতে পারি না। তােমরা জুনিয়র অফিসাররা যদি এটা করতে চাও, এগিয়ে যাও’ (১(২)/১১৩০)। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করার পর(সামরিক) ফরমান জারি করে বাংলাদেশের চার মূলনীতি .নাকচ করে সামরিকতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন”। মুজিব-জীবনের অন্তিম ঘটনাবলী অনুধাবনের জন্য এ-সকল তথ্যের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। 

  আবদুল গাফফার চৌধুরী জানিয়েছেন, ১৯৭৩ সালের শেষ দিকে তিনি প্রথম লক্ষ্য করেছিলেন, “বঙ্গবন্ধু তার অস্বাভাবিক মৃত্যুর কথা ভাবছেন এবং বলছেন। মৃত্যুতে তার ভয় ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য যে কাজ তিনি করতে চান, আততায়ীর গুলি হয়তাে শেষ পর্যন্ত তাঁকে তা করতে দেবে না, এমন একটা শঙ্কা তিনি পােষণ করতে শুরু করেছিলেন।..এই প্রথম তার মুখে একটা চক্রান্তের ইঙ্গিত পেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম : আপনি কি সত্যি সত্যি ভাবছেন, কেউ আপনাকে হত্যা করতে চায? মুজিব বললেন, তুমি সাংবাদিক, তােমাকে এ কথা মুখ ফুটে বলতে হবে। কেন? তুমি কি বুঝতে পার না, কারা আমাকে হত্যা করতে চায়? এবং কেন চায়? ১৯৭৩ সালে মুজিব গেলেন আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে। সঙ্গে আমাকেও যেতে হল। ক্যাস্ট্রোর (কিউবার প্রেসিডেন্ট) ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কঠোর ব্যবস্থা দেখে মুজিব একদিন বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন ক্যাস্ট্রো অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা। তাঁর কি এত কঠোর প্রহরা দরকার? একজন “এইড’ বললেন, ক্যাস্ট্রোকে খুন করার চক্রান্ত কয়েকবার হয়েছে। এই চক্রান্তের পেছনে সি.আই.এ’র হাত রয়েছে বলে অভিযােগ উঠেছে। এই প্রথমবার দেখলাম সি.আই.এ’র নামে মুজিব একটু ম্লান হয়ে গেলেন। . কিছুদিন পরেই চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দে নিহত হলেন সামরিক অভ্যুত্থানে।  মুজিব বললেন : ‘আলেন্দে নিহত হয়েছেন খবরটা শােনার পর থেকেই আমি খুব অস্বস্তি বােধ করছি । শেখ মুজিবের যে নির্ভয়-চরিত্র ও প্রকৃতির সঙ্গে আমার পরিচয়, সেখানে বহুদূরের চিলির ঘটনায় তাকে শঙ্কাবােধ করতে দেখে বিস্ময় বােধ করেছি। (১১/১২-১৩)। 

 ১৫ এপ্রিল ১৯৭৪, কোলকাতার প্রেসক্লাবে আবদুল গাফফার চৌধুরীর সাক্ষাৎ আলােচনা হয়েছিল চিলির নিহত (সিআইএ-পকিল্পনায়) প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দের পত্নী মিসেস আলেন্দের। আলেন্দে-মুজিব এবং বাংলাদেশ সম্পর্কিত আলােচনায় মিসেস আলেন্দে বলেছিলেন : “এটা সি.আই.এ’র একটা সেট প্যাটার্ন। কোন পপুলার গভরমেন্টকে ওরা ধ্বংস করার জন্য প্রথমে সেই দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে দেয়। নানা গােলমাল শুরু করে। শ্রমিক ধর্মঘট উস্কে দেয়। ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এইভাবে পপুলার নেতা বা গভরমেন্টের জনপ্রিয়তা নষ্ট করে দিয়ে তারপর খুনখারাপি শুরু করে।  তারপর ধীরে ধীরে মিলিটারির মধ্য থেকে ওদের বাছাই করা লােকটিকে ফ্যাসিস্ট ডিক্টেটরের আসনে বসিয়ে দেয়। এইভাবে কঙ্গোতে ওরা লুলুম্বাকে মেরে বসিয়েছে মবুতুকে। ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্ণকে সরিয়ে বসিয়েছে সুহার্তোকে। চিলিতে আলেন্দেকে সরিয়ে বসিয়েছে পিনােচেকে। জানি না তােমাদের মুজিবের ভাগ্যে কি আছে? “(১১/২৬)। 

 সকলেই জানেন, বঙ্গবন্ধু কৈশােরকাল থেকেই কখনাে পালানাের রাজনীতি করেননি। বিখ্যাত সাংবাদিক শফিকুর রহমান বর্ণনা করেছেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের অন্তিম পর্বের কথা : “১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট রাতেও ঘাতকরা পাকিদের মতই গুলি 

  চালাতে চালাতে যখন বাসভবনে ঢুকেছিল তখনাে তিনি পেছনের দরজা দিয়ে পালাবার চেষ্টা করেননি, বরং সামনের দরজা খুলে একইভাবে What do you want  বলতে বলতে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছিলেন। মুখােমুখি হবার সাথে সাথে নূর হুদার হাত থেকে অস্ত্র পড়ে গিয়েছিল। জল্লাদ হাবিলদার মােসলেম অস্ত্র তুলে গুলি চালিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেল” (১(৩)/১১১৪)। ঘাতকের বুলেট লেগেছিল বঙ্গবন্ধুর বুকে, ভীত কিংবা পলায়ণপর মানুষের মত পিঠের ওপর নয়। এভাবেই সমাপ্ত হলাে একটি মহাজীবন- বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে হত্যা-প্রচেষ্টার খবরটি বঙ্গবন্ধুর আদৌ অজানা ছিল না, অতি সম্প্রতি প্রকাশিত ‘উইকিলিকস্ তথ্য থেকেও তা স্পষ্ট হয়েছে। “বঙ্গবন্ধুকে আগেও হত্যার চেষ্টা হয়েছিল” শিরােনামের খবরটিতে (জনকণ্ঠ, ১৪-০৪-২০১৩) বলা হয়েছে : ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার আগেও একবার তাঁকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সে সময় সরকারের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে এ নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে কোন রিপাের্ট প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। তখন ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানাে এক তারবার্তার তথ্যানুযায়ী ২১মে (১৯৭৫) সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট মুজিবুর রহমান হত্যা চেষ্টার টার্গেট ছিলেন বলে দুটি রিপাের্ট আমাদের হাতে এসেছে। এ তথ্যের মূল উৎস ছিল ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের এক বাঙালি রাজনৈতিক সহযােগী। আরেকজন হচ্ছেন সাংবাদিক, যিনি তথ্য অফিসার (মার্কিন দূতাবাস) এলপার্নকে এ খবর দিয়েছেন। দুটি বিবরণেই হামলায় গ্রেনেড ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হত্যা প্রচেষ্টায় মুজিব অক্ষত থাকলেও অজ্ঞাত দুই ব্যক্তি আহত হয়েছেন। নিক্সন প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও মুজিবের সম্পর্কে টানাপড়েন চলছিল। মুক্তিযুদ্ধে যখন পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে তখনও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এ টানাপড়েন অব্যাহত ছিল”। সুতরাং এমন বিশ্বাসই যুক্তিসঙ্গত যে, মুজিব জানতেন তাঁর জীবনের ওপর আসন্ন হুমকির কথা, কিন্তু তিনি ভয়ে-ভীরুতায় নত না হয়ে ব্যক্তিগত সাহস আর আত্মবিশ্বাসের অবস্থান থেকেই পরিস্থিতি মােকাবিলা করতে চেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে এমন ধারণাই সঠিক মনে হয় যে, সবকিছু জানার পরেও তাঁর জনগণের ওপর , মানুষের ওপর তিনি বিশ্বাস হারাননি। 

  মুজিব-হত্যার পরবর্তী সংক্ষিপ্ত সময় : 

 চার-প্রধানের শেষ-জন মওলানা ভাসানী 

  মওলানা ভাসানী। একাত্তরের অসহযােগ আন্দোলনের সময় ৯ মার্চ টাঙ্গাইল থেকে এসে পল্টনের বিরাট জনসভায় বলেছিলেন, আপনারা মুজিবকে জানেন না। সে আমার সাথে নয় বছর কাজ করেছে। সে কখনই জনগণের সঙ্গে বেঈমানী করবে না। সে আমার কাছে আমার ছেলের চেয়েও প্রিয়। আবার বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর মােশতাকের সাহসের তারিফ করে অভিনন্দন জানিয়ে ভাসানী তাকে একটি তারবার্তা পাঠান” (১(৩)১১২৪-১১২৫)। 

 ১৯৪৭-পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানে এবং ১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশেও সরকার-বিরােধী রাজনীতির প্রবাদ-পুরুষ ছিলেন মওলানা ভাসানী, এ কথা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি সত্য হচ্ছে, কথায়-কাজে প্রবল স্ববিরােধিতার জন্য তিনি কাছের-দূরের নানা মহলেই তীব্রভাবে সমালােচিতও হয়েছেন। সুদীর্ঘ সে প্রসঙ্গের অবতারণা, আজ এতকাল পরে, নিতান্তই অবান্তর। তবু সমকালীন পর্যবেক্ষণে মওলানা ভাসানীকে উপলব্ধির প্রয়ােজনেই উল্লেখ করা যেতে পারে, আবু জাফর শামসুদ্দীন, জহুর হােসেন চৌধুরী, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং বদরুদ্দীন উমরের মত ভাসানীর রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিবর্গও তাঁদের লেখায় মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক কথায়-কাজে স্ব-বিরােধিতা, অস্থিরতার কথা বলেছেন এবং বলেছেন রাজনৈতিক প্রয়ােজনের মুহূর্তে তাঁর ইচ্ছাকৃত অনুপস্থিতির কথাও। এসব কথার যৎকিঞ্চিৎ ইতােমধ্যে বিভিন্ন প্রাসঙ্গিকতায় উল্লেখ করা হয়েছে। 

 বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে মওলানা ভাসানী অল্পকালই বেঁচে ছিলেন। তিনি ১৭ নভেম্বর, ১৯৭৬ মৃত্যুবরণ করেন। “জীবনের শেষ পর্বে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল ‘ফারাক্কা মার্চ। ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে তিনি এই পদযাত্রা মিছিলের ডাক দেন”(৭(৪)/২৪২)। বলা হয়, “বাংলাদেশে ফারাক্কার প্রতিক্রিয়ার প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহী থেকে ফারাক্কা অভিমুখে লং মার্চের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন”, (৭(৪)/২১)। ফারাক্কা 

  প্রসঙ্গটির বাস্তবতা উপলব্ধির জন্য উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৫০-এর দশকে পানি-সমস্যা নিরসনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে পাকিস্তান ভারতের সাথে আলাপআলােচনার মাধ্যমে চুক্তি সম্পাদন করে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্কট নিরসন করলেও পূর্ব পাকিস্তানে সমস্যা ‘রাজনীতির প্রয়ােজনে জিইয়ে রাখা হয়েছিল। “ভারত ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশ হওয়ার আগেই শেষ করে ফেলে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর আমরা বুঝলাম ভারত আমাদের দেশটাকে) মরুভূমিতে পরিণত করার জন্য বদ্ধপরিকর। আওয়াজ তুললাম, ফারাক্কা বাঁধ মরণ ফাঁদ’; উড়িয়ে দাও, উড়িয়ে দাও। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের সঙ্গে ইন্দিরা সরকারের এ। ব্যাপারে একটি চুক্তি হলাে। কিন্তু ইতােমধ্যে সাবস্ত হয়ে গেছে, ‘শেখ মুজিবুর রহমান ভারতীয় দালাল’ এবং ঐ চুক্তিটা একেবারে বাংলাদেশকে বেচে দেয়ার শামিল। বঙ্গবন্ধু নিহত হলেন’ (১৫/১৫০)। “ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিবাদের নিরসন ঘটে ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬ তারিখে দু দেশের মধ্যে এক পানি-চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়া ৩০ বৎসর মেয়াদি এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাবে”(৭(৪)/২১। 

 এবার ফেরা যাক মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লং মার্চ’ প্রসঙ্গে। সুদীর্ঘকালের ভাসানী-অনুগামী রাজনীতিবিদ এবং বিশ্লেষক বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মওলানা ভাসানী সাম্রাজ্যবাদ ও সামাজিক সাম্রাজ্যবাদবিরােধী এক যােদ্ধা হিসেবে ভারত, রাশিয়া ও মার্কিনের, বিশেষ করে। ভারত ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম করেছেন। বার্ধক্য এবং অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি ভারতের ফারাক্কা নীতি প্রতিরােধের উদ্দেশ্যে ১৯৭৬ সালের মে মাসে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন এবং এবং রাজশাহী থেকে কানসাট পর্যন্ত মিছিল পরিচালনার কর্মসূচি ঘােষণা ও কার্যকর করেছেন” (৩৫/২৯)। 

 এ সম্পর্কে একটি নাতিদীর্ঘ বিবরণ দিয়েছেন জহুর হােসেন চৌধুরী। ১৯৭৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ফারাক্কা অভিযান। মওলানা ভাসানী ডাক্তারদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে কয়েক ক্রোশ পথ পায়ে হেঁটে জনতাসহ অগ্রসর হয়ে সীমান্তের কয়েক মাইল দূরে ‘হল্ট’ (Halt) করে একটা গরম বক্তৃতা দিয়ে ঢাকায় ফিলে আসেন। প্রথমে একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে পরে জ্ঞানােদয় হয়েছিল যে, মওলানার ঐতিহাসিক। অভিযানের ভয়েই ‘মালাউনরা ফারাক্কার পানি নিয়ে গােলমাল করার সকল দুরভিসন্ধি তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করে। নিশ্চিন্ত হলাম। এরপর ফারাক্কা সম্বন্ধে আর কোন। কথা এতদিন (আগস্ট, ১৯৭৮) সত্যি শুনিনি”(১৫/১৫১)। জহুর হােসেন চৌধুরীর বয়ানে কৌতুক-কটাক্ষ এতটাই প্রকট যে, তাতে মওলানা ভাসানীর ‘ফারাক্কা মার্চ এর উদ্দেশ্য-বিধেয় সম্পর্কেই সংশয় জাগে। 

  সশ্রদ্ধ অনুভব : শুধু সমাপন 

  রবীন্দ্রনাথের কথা : সব নদী সাগরে যায়, কিন্তু আমাদের ভাগ্য যে, সব নদী এক পথে যায় না। অনেকটা তেমনি করেই বলা চলে, প্রমুখ আজীবন জনগণকে সাথে নিয়েই রাজনীতি করেছেন। কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রেই। তাঁদের মত-পথ এক কিংবা অভিন্ন থাকেনি। তাতে রাজনীতির মূল লক্ষ্য অর্জন হয়তাে বিঘ্নিত-বিলম্বিত হয়েছে কিন্তু তাতে রাজনীতির বহুধা-প্রসারী নীতিনৈতিকতা এবং বাস্তব ক্ষেত্রগুলিও জনগণের সামনে উন্মােচিত হয়েছে, জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং অবদানে। জনগণের চেতনার জমিনে চারদিক থেকেই আলাে পড়েছে, তাই এ দেশের মানুষ যথাসময়ে যথা-কর্তব্য বেছে নিতে পেরেছে। 

 প্রমুখ চারজনই আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের নির্মাতা। রাজনৈতিক চিন্তা এবং চেতনায়, সমন্বিত সামগ্রিকতায় চারজনেরই উত্তরাধিকারী আমরা, এ-সত্য একান্তই অনস্বীকার্য। তাদের পারস্পরিক ভালোেমন্দের প্রসঙ্গে বাগবিস্তার কিংবা প্রত্যক্ষ কোনাে রকম প্রতি-তুলনা শুধু অর্থহীনই নয়, বরং ঐতিহ্য অস্বীকার করার মতই ধৃষ্টতা হবে। বরং এমন ভাবাই ভালাে যে, আজ কিংবা আগামী কাল, বাংলাদেশের মানুষ আমরা যেকোনাে রাজনৈতিক সঙ্কটে ভালাে-মন্দ মিলিয়ে সঠিক পথটি চিনে নিতে পারবাে, আমাদের চেতনায় প্রতিফলিত তাঁদের রাজনৈতিক জীবন ও কর্মের আলােয়। হক-ভাসানীসােহরাওয়ার্দী-মুজিবের প্রতি অনস্বীকার্যভাবেই শ্রদ্ধাশীল আমরা, যদিও সর্বদা সমভাবে গ্রহণযােগ্য হবে না তাদের উত্তরাধিকারের অভিজ্ঞতা কিংবা অবদান। 

 আমাদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের অনস্বীকার্য চার-প্রধান পূর্ব-পুরুষ সততই উত্তর পুরুষকে প্রভাবিত করবেন, এ-সত্য একান্তই অনস্বীকার্য বটে। 

  তথ্যসূত্র 

 ১. এম. নজরুল ইসলাম সম্পা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর, জ্যোৎস্না পাবলিশার্স, ২০০৭, রহমান স্মারক গ্রন্থ (১ম, ২য়, ৩য় খণ্ড), বাংলাবাজার, ঢাকা। 

 ২. গােলাম মুরশিদ, মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর : একটি নির্দলীয় ইতিহাস, প্রথমা প্রকাশন, ২০১১, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, ঢাকা-১২১৫। 

 ৩. আবুল হাসনাত সম্পাদিত, রবীন্দ্রনাথ : কালি ও কলমে, বেঙ্গল পাবলিকেশনস্ লিঃ, ২০১২, বেঙ্গল সেন্টার, নিউ এয়ারপাের্ট রােড, ক্ষিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯। 

 ৪. আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, নওরােজ কিতাবিস্তান, ১৯৭০, বাংলাবাজার, ঢাকা। 

 ৫. অজয় রায়, তীরের অন্বেষায় স্বাধীন বাংলাদেশ, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ২০১২, কনকর্ড এ্যাম্পােঃ ,কাঁটাবন, ঢাকা। 

 ৬. শরিফ শামসির সম্পাঃ এক দফার প্রবক্তা এম এ আজিজ, স্মারক গ্রন্থ, সমাজ অধ্যয়ন কেন্দ্র, ২০০৪, ১০৫, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম। 

 ৭. আব্দুল্লাহ আল-মুতী প্রমুখ সম্পাদিত, শিশু-বিশ্বকোষ, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, ১৯৯৫, ঢাকা,। 

 ৮. আবু জাফর শামসুদ্দীন, আত্মস্মৃতি ১ম খণ্ড, আঃ পারভে শামসুদ্দীন, ১৯৮৯, ৪/ক রাজার বাগ, ঢাকা। 

 ৯. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিঃ, ২০১২, ঢাকা। 

 ১০. কবীর চৌধুরী সম্পাঃ, বঙ্গবন্ধু : জননায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক, অন্বেষা প্রকাশন, ২০১০, ৯, বাংলাবাজার, ঢাকা। 

 ১১. আবদুল গাফফার চৌধুরী, ইতিহাসের রক্তপলাশ, বঙ্গবন্ধু শিল্পীগােষ্ঠী, ১৯৯৬, ৪৪, নবাবপুর রােড, ঢাকা। 

 ১২. কঙ্কর সিংহ ১৯৪৭’র বাংলা-ভাগ অনিবার্য ছিল, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ২০১২, ঢাকা। 

 ১৩. মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, India Wins Freedona, (The complete version), ওরিয়েন্ট লংম্যান লিঃ, ১৯৮৮, হায়দরাবাদ, ভারত। 

 ১৪. কামরুদ্দীন আহমদ, বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ, জহিরুদ্দীন মাহমুদ, ১৯৮২, ১ম ও ২য় খণ্ড, ইনসাইড লাইব্রেরি। 

 ১৫. জহুর হােসেন চৌধুরী, দরবার-ই-জহুর, লালন প্রকাশনী, ১৯৮৫, ২৬৩ বংশাল রােড, ঢাকা। 

 ১৬. ভবানী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, দেশবিভাগ পশ্চাৎ ও নেপথ্য কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, ২০১০, কলিকাতা-৭০০০০৯। 

 ১৭. এস. এ. করিম, Sheikh Mujib:Triumph &  Tragedy’, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিঃ, ২০০৯, রেড ক্রিসেন্ট হাউস, ৬১ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা। 

  ২৬৩ 

  ১৮. বদরুদ্দীন উমর, বাংলাদেশের কৃষক ও কৃষক আন্দোলন, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ২০১০, ঢাকা। 

 ১৯. শেখ হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রেক্ষাপট, জোনাকী প্রকাশনী। ১৯৯৯, বাংলাবাজার, ঢাকা। 

 ২০. খােকা রায়, সংগ্রামের তিন দশক (১৯৩৮-১৯৬৮), জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৮৬, ১০, পুরানাপল্টন, ঢাকা। 

 ২১. আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হােসেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সুবর্ণ জয়ন্তী স্মারক গ্রন্থ ১৯৪৯-৯৯ সাকো ইন্টারন্যাশন্যাল লিঃ, ১৯৯৯, ৬২-৬৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা। 

 ২২. শেখ সাদী, বঙ্গবন্ধু : ভাষা ও মনােজগৎ, স্কুল অব বেঙ্গল হিস্ট্রি, পুঠিয়া, ২০১২, রাজশাহী। 

 ২৩. শাহরিয়ার কবির, পাকিস্তান থেকে ফিরে, অনন্যা, ২০০২, ৩৮/২ বাংলাবাজার, ঢাকা। 

 ২৪. কর্নেল শওকত আলী, সত্য মামলা আগরতলা, প্রথমা প্রকাশন, ২০১১, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিঃ, ঢাকা-১২১৫। 

 ২৫. এ বি এম মূসা, মুজিব ভাই, ২০১২, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিঃ, ঢাকা। 

 ২৬. পঙ্কজ ভট্টাচার্য প্রমুখ সম্পাঃ, সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক স্মারক গ্রন্থ, সা. আ. মানিক স্মারক গ্রন্থ, প্রকাশনা কমিটি, ২০০৯, গােপীবাগ ফার্স্ট লেন, ঢাকা। 

 ২৭. এম আর আখতার মুকুল, আমি বিজয় দেখেছি, সাগর পাবলিশার্স,১৯৮৪, ঢাকা। 

 ২৮. বােরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর সম্পাদিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং  পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্র, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৩, ৩৬ বাংলাবাজার, ঢাকা। 

 ২৯. মে. জে. খলিলুর রহমান(অব) পূর্বাপর ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনা-গহ্বর থেকে দেখা, | সাহিত্য প্রকাশ, ২০০৫, ৩৭/২ পুরানা পল্টন, ঢাকা। 

 ৩০. স্বদেশ রায়, বিক্ষুব্ধ মার্চ ৭১, পল্লব পাবলিশার্স, ১৯৯১, ৬৪/৫ লেক সার্কাস, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫। 

 ৩১. হালিম দাদ খান, বাংলাদেশের রাজনীতি ১৯৭২-১৯৭৫, ২০০৪, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা-১১০০। 

 ৩২. তাদামাসা হুকিউরা, রক্ত ও কাদা ১৯৭১, প্রথমা প্রকাশন, ২০১২; ঢাকা-১২১৫। 

 ৩৩. মুনতাসীর মামুন, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ, সময় প্রকাশন, ২০০৪, ৩৮/২ বাংলাবাজার, ঢাকা। 

 ৩৪. আবুল খায়ের সম্পাদিত গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, সংঘ প্রকাশন, ২০০৭, ৪৮ এ-বি, পুরানা পল্টন, ঢাকা। 

 ৩৫. বদরুদ্দীন উমর, আমাদের সময়কার জীবন, কাশবন প্রকাশন, ২০০৫, ২৫৪, নবাবপুর রােড, ঢাকা।